বাঙালি খবরের কাগজ পড়ে একটি বিশেষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। প্রথমে রাশিফল — কারণ দিনটা মঙ্গলময় হবে কি না সেটা না জানলে বাকি সব খবর পড়ে কী লাভ। তারপর বিজ্ঞাপন — কারণ সরষের তেলে ছাড় আছে কি না সেটা আন্তর্জাতিক রাজনীতির চেয়ে জরুরি। তারপর মৃত্যু সংবাদ — কারণ পাড়ায় কে গেলেন সেটা না দেখলে বিকেলের আড্ডায় মুখ দেখানো যায় না। এই সুশৃঙ্খল অগ্রাধিকারের পর যদি চা এখনও গরম থাকে এবং বাড়িওয়ালার গলার আওয়াজ না আসে, তবেই বাঙালি বাকি খবরে চোখ বোলায়। কিছুদিন আগে এমন একটি খবর বেরোল যা রাশিফলের পাতা পেরিয়েও মাথায় ঢুকে গেল — এবং সেটা মাথায় ঢুকে গেলে বিপদ, কারণ মাথায় কিছু ঢুকলেই বাঙালি মতামত দেওয়া শুরু করে।
এক মার্কিন ভদ্রলোক ট্যুরিস্ট ভিসায় ভারতে এসে অদ্ভুত ভাবে ধরা পড়লেন। নাম ম্যাথু ভ্যানডাইক। ভদ্রলোকের বায়োডেটা পড়লে মনে হয় লিঙ্কডইনের সার্ভার হ্যাং করে গেছে। পেশা: গুপ্তচর, যোদ্ধা, চলচ্চিত্রকার, বিশ্লেষক, এনজিও-প্রতিষ্ঠাতা। অর্থাৎ, ভদ্রলোক যা যা হওয়া যায় সব হয়েছেন, শুধু বেকার হননি — সেটা অন্য অনেকের জন্য রেখে দিয়েছেন। সাধারণ ট্যুরিস্টরা তাজমহল দেখে, হোটেলের খিচুড়ি খেয়ে পেট খারাপ করে এবং ফিরে গিয়ে ব্লগ লেখে "India: A Spiritual Journey"। ভ্যানডাইক সাহেব মায়ানমার সীমান্তের কাছে গিয়ে বিদ্রোহীদের ড্রোন ওড়ানো শেখাতে বসলেন। পর্যটনের এই নতুন ধারাকে বলা চলে "এক্সট্রিমিস্ট ট্যুরিজম" — এক্সট্রিমলি কারাগারের দিকে ধাবমান।
এই পর্যায়ে বাঙালি বুদ্ধিজীবী গলা খাঁকারি দিয়ে বলবেন, "কিন্তু লোকটা তো গণতন্ত্রের জন্য লড়ছিল।" এই বাক্যটি শুনলেই বোঝা যায়, ভদ্রলোক রাত জেগে ওয়েস্টার্ন নিউজ পড়েন এবং দিনের বেলা কফিশপে বসে পৃথিবীর সমস্যার সমাধান করেন। গণতন্ত্র একটি সুন্দর শব্দ, যার মতো সুন্দর ব্যবহার আর কোনো শব্দের নেই। লিবিয়ায় গণতন্ত্র, সিরিয়ায় গণতন্ত্র, ইউক্রেনে গণতন্ত্র — ভ্যানডাইক সাহেব যেখানে গেছেন সেখানেই গণতন্ত্র নিয়ে গেছেন, ঠিক যেমন কেউ কেউ সর্বত্র নিজের মতামত নিয়ে যান। প্রশ্ন হলো এই ফ্রিল্যান্স গণতন্ত্র-বিতরণের খরচ কে দিচ্ছে। ইউটিউবের বিজ্ঞাপন থেকে অনেক কিছু করা যায়, কিন্তু একাধিক কনফ্লিক্ট জোনে অপারেশন চালানো সাধারণত সেই বাজেটে কুলোয় না। বিশেষজ্ঞরা এই শ্রেণিকে বলেন "ডিনাইয়েবল অ্যাসেট" — কাজ হলে হিরো, ধরা পড়লে "আমি চিনি না।" বাঙালির পাড়ার রাজনীতিতেও এই নীতি বেশ প্রচলিত।
এই পুরো নাটকের সবচেয়ে আমোদজনক অংশ হলো রাশিয়ার ভূমিকা। ভ্যানডাইককে ধরিয়ে দিয়েছে রাশিয়ার ইন্টেলিজেন্স। পুতিনের গোয়েন্দারা ইউক্রেন থেকেই লোকটাকে ট্র্যাক করছিলেন এবং ঠিক সময়মতো ভারতকে জানিয়ে দিলেন। রাশিয়া আর ভারত এখন যেন একই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে — একজন দেখল ছাদে সন্দেহজনক লোক, তৎক্ষণাৎ অপরজনকে ফরোয়ার্ড করে দিল। মায়ানমারের জুন্টার সাথে রাশিয়ার সম্পর্ক পুরনো ও উষ্ণ, অনেকটা বাঙালির সাথে মাছের ঝোলের মতো — যুগ যুগ ধরে চলে আসছে, কেউ প্রশ্ন করে না। সেই উঠোনে কেউ এসে হাইটেক খেলনা বিলোতে চাইলে বিরক্তি হওয়াটা স্বাভাবিক।
মায়ানমার এখন একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ধাঁধা, যা বাঙালি বুদ্ধিজীবী চা খেতে খেতে অনায়াসে সমাধান করে ফেলেন। ২০২১-এর সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাশিয়া ও চীন জুন্টার পাশে, আমেরিকা বিদ্রোহীদের পাশে। নৈতিকতার চাদর গায়ে দিয়ে মাঠে নামা আমেরিকার বহু পুরনো অভ্যাস — ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের পর সরাসরি সেনা পাঠানোর উৎসাহ একটু কমেছে বটে, কিন্তু উদ্যমটা কমেনি। তাই ভ্যানডাইকের মতো ফ্রিল্যান্সার পাঠানো হয় বাজার বুঝতে। সমস্যা হলো, বাজার বুঝতে গিয়ে বাজার নিজেই তাঁকে বুঝে ফেলল।
ড্রোন প্রশিক্ষণের বিষয়টা আলাদাভাবে বলা দরকার, কারণ এটা আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক আবিষ্কার — সবার নাগালে, সবার বাজেটে। আগে যুদ্ধের জন্য লাগত হাজার সৈন্য, ট্যাংকের সারি, জেনারেলের লম্বা বক্তৃতা। এখন লাগে একটা ড্রোন, একটা রিমোট এবং একজন কিশোর যে ভিডিও গেম খেলতে অভ্যস্ত। ভারত এই বিপদটা বুঝেছে — কারণ আজ যে প্রযুক্তি মায়ানমারের জঙ্গলে উড়ছে, কাল সেটা উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো অস্থির প্রান্তেও পৌঁছে যেতে পারে। তাই দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আবেগ নয়, বাস্তববাদ — এই দুটো জিনিস বাঙালি কফি হাউসে খুব ভালো বোঝে, কিন্তু দিল্লি মাঝে মাঝে সত্যিই প্রয়োগ করে।
এই ঘটনার আসল পরিচয় হলো এটি "শ্যাডো ওয়ার"-এর একটি দৃশ্যমান অংশ — যে যুদ্ধে বড় শক্তিরা সরাসরি মুখোমুখি হয় না, প্রক্সি পাঠায়, ইন্টেলিজেন্স আদান-প্রদান করে এবং সুবিধামতো পাশ সরে যায়। যুদ্ধ এখন মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেশনের মতো পরিচালিত — ডনবাসে লড়া যোদ্ধা এখন মায়ানমারে কনসালট্যান্ট। এই আন্তর্জাতিকতার রূপটা ইউনেস্কোর স্বপ্নের সঙ্গে মেলে না, তবে ব্যবসায়িক মডেল হিসেবে বেশ টেকসই। ভারত ভ্যানডাইককে গ্রেফতার করে একটাই বার্তা দিল: প্রক্সি যুদ্ধ খেলো, কিন্তু আমাদের উঠোনে নয়। এটি পরিপক্কতার লক্ষণ — এবং পরিপক্কতা বাঙালির কাছে সবচেয়ে বিরল বস্তু, কারণ আমরা পরিপক্কতার চেয়ে বিতর্ককে বেশি ভালোবাসি।
তাই পরের বার যখন কেউ "গণতন্ত্র রক্ষা"র পতাকা নিয়ে কোনো দেশে ঢুকবেন, একটু আকাশের দিকে তাকিয়ে নেবেন। ড্রোন উড়ছে কি না দেখুন। আর যদি কাউকে ট্যুরিস্ট ভিসায় মায়ানমার সীমান্তের দিকে যেতে দেখেন, ধরে নিন তিনি তাজমহল দেখতে যাচ্ছেন না। খেলাটা দৃশ্যমান নয়, কিন্তু চলছে — এবং আমরা বাঙালিরা রাশিফল পড়তে পড়তে সেই খেলার দর্শক হয়ে চা ঠান্ডা করে যাচ্ছি। বিপদ হলো, এই খেলায় দর্শকেরও টিকিট কাটতে হয় — সে টিকিটের নাম ভূরাজনীতি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।