এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বই

  • ঘোস্ট গার্ল : টোরি এডেন

    কৃষ্ণকলি
    আলোচনা | বই | ১২ আগস্ট ২০০৭ | ৭৩৭ বার পঠিত
  • এখন সবাই 'মিসির আলি' পড়ছেন। কাজেই এই বইটির আলোচনা বেশ প্রাসঙ্গিক হবে মনে করলাম। সত্যি বলতে কি মিসির আলির কোন এক উপন্যাসে এই বইটির কথা আছেও। লেখিকা টোরি এডেন একজন এডুকেশন্যাল সাইকোলজিস্ট। 'বিশেষ যত্ন নেওয়া দরকার' এমন বাচ্চাদের ক্লাস নিতেন উনি। এই 'ঘোস্ট গার্ল' সেরকম এক বাচ্চারই ঘটনা। সত্যি ঘটনা।

    পেকিং বলে ছোট একটা শহরে টোরি এক সময় চাকরি নিয়ে গেছিলেন। 'স্পেশ্যাল' ক্লাসটিতে ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা মাত্র চার। চার জনের সমস্যা চার রকম, প্রত্যেকটির থেকে প্রত্যেকটি আলাদা। চারজনের মধ্যে তিনটি ছেলে, রিউবেন, ফিলিপ আর জেরেমিয়া। এদের কথা টোরি বলেছেন বটে। কিন্তু বইটার নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে এই গল্পের ফোকাস হল ক্লাসের একমাত্র ছাত্রীর ওপরে।তার নাম জেড একডাল। সবার মুখে মুখে জেডি।এই মেয়েটিই আলোচিত 'ঘোস্ট গার্ল'।

    মেয়েটির সমস্যা হলো সে ক্লাসে কোন কথা বলে না। বাড়িতে বলে যদিও। শুধু ক্লাসে নয়,বাড়ির বাইরে সে কোন শব্দই মুখ দিয়ে বার করে না। ইলেক্টিভ মিউটিজম। আট বছরে পা দেওয়া জেডি কোনদিন কাঁদে না,হাসেনা, কারু কোন কথার উত্তর এমনকি মাথা নেড়েও দেয় না। ও একটা চাবি দেওয়া পুতুলের মত। আরো তো আরো, কেউ কোনদিন ওকে এমনকি নাক টানতেও দেখেনি। সর্দি হলে নাক বেয়ে জল পড়ে যায় ওর কোলের ওপর। জেডি থাকে নির্বিকার।

    টোরি অবাক হন, ওর পড়াশোনার রেকর্ড কিন্তু রীতিমত ভালো।ওঁর ধারনায় জেডির আই কিউ একশো বারো-একশো ষোলর আশে পাশে হবে। তাহলে কারণটা কি যার জন্য ও এরকম? কারণটা কি যার জন্যে ওকে এই স্পেশ্যাল ক্লাসে আসতে হচ্ছে?

    মেয়েটি দেখতে সুন্দর। নির্মল নীল চোখ,গাঢ় রঙের এক ঢাল চুল, কিন্তু সব সময় কুঁজো হয়ে থাকে সে। এক্কেবারে ঝুঁকে থাকে সব সময়,কেউ মুখ দেখতে পায় না ওর। আর হাত দুটোকে রাখে পেটের ওপর জড়ো করে। যেন একটা বোঝা আঁকড়ে রয়েছে। কেউ কোনদিন ওকে সোজা হয়ে দাঁড়াতে দেখেনি। ওর মা বলেন ও নাকি জন্মেছিলো এই ভাবেই। টোরি ভাবতে থাকেন তাহলে কি ওর এই সমস্যার কারণ কোন জন্মগত ব্রেন ড্যামেজ?

    টোরির রিসার্চের বিশেষ বিষয় ছিলো এই ইলেক্টিভ মিউটিজম। উনি জানেন ঠিক কি ভাবে চললে এই ধরণের বাচ্চারা কথা বলে উঠবে। জেডিও কথা বলে ওঠে।

    আস্তে আস্তে টোরির সাথে একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে জেডির। ও কথা বলে ওঁর সাথে। নানান কথা। জেডি ছবি আঁকে। অদ্ভুত সব ছবি। একটা সাদা বাড়ি, নীল ছাদ, তার সামনে একটা অদ্ভুত ফিগার। ঠিক যেন একটা ঘন্টার দুখানা পা, আর মাথায় লম্বা চুল। টোরি জিগ্যেস করলে ও বলে এটা ওর বন্ধু টাশি। আরেকদিন আঁকে কালো একটা পটভূমির মধ্যে দু দুখানা অমন ঘন্টা,পা ওয়ালা। তাদের চোখ আছে, মুখ নেই।এই দুটো নাকি ও আর ওর বোন অ্যাম্বার। টোরি জানতে চান, তাহলে অমন দেখতে কেন? ছোট মেয়েদের বুঝি অমন দেখতে হয়? জেডি স্পষ্ট উত্তর দেয়। ছোট মেয়ে কেন হবো? আমরা তো ভুত। ভুতদের মুখ থাকেনা। আমি অ্যাম্বার,টাশি সব্বাই ভুত।

    জেডের বাবা মায়ের সাথে কথা বলতে যান টোরি। নিতান্ত সাধারণ গেঁয়ো ধরণের মানুষ গুলি। কথা বার্তা বিশেষ সাজিয়ে গুছিয়ে বলার অভ্যেস নেই। টোরি অবাক হয়ে লক্ষ্য করেন যে জেডির এই অস্বাভাবিকতা নিয়ে ওঁদের কোনই উদ্বেগ নেই। ও তো জন্ম থেকেই এমনি।ও নিয়ে ভাবার কি আছে? ওঁদের আরো দুই বাচ্চা মেয়ে আছে, অ্যাম্বার আর সাফায়ার। কেউ তো অমন নয়। জেডি কে নিয়ে একটু ধৈর্য্য ধরতে হবে শুধু, ওর জন্য বিশেষ কিছু ভাবার নেই।অবাক হওয়া ছাড়া কি আর করবেন টোরি?

    --'জেডি, ও জেড, তুমি সোজা হয়ে দাঁড়াও না কেন সোনা? ব্যথা লাগে? পিঠে কষ্ট হয়?'

    --'না ব্যথা নেই। আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবোনা। তাহলেই আমার ভেতরে যা আছে সব বাইরে পড়ে যাবে'।

    কে ওকে শিখিয়েছে এসব কথা? মিস এলি বলেছেন। মিস এলি, ববি, স্যু এলেন, জে আর। এরা সবাই আসে ওর কাছে। অনেক কিছু বলে। অনেক কিছু .......
    এই চরিত্র গুলো তো জনপ্রিয় টেলি সিরিয়াল 'ডালাস' এর। তুমি কি টিভির কথা বলছো জেডি?
    টিভিতেও,এমনিও। এমনিও তো ওরা আসে প্রায়ই। মিস এলি আমাদের কোক খেতে দেন। তারপর আমরা ভুত হয়ে যাই। কখন আবার মানুষ হই তা মনে থাকেনা,কেননা আমি ঘুমিয়ে পড়ি তো, অ্যাম্বারও। খালি টাশি আর মানুষ হবেনা কোনদিন। ও তো মরে গেছে।

    আস্তে আস্তে টোরির সাথে মানসিক বন্ধন দৃঢ় হতে থাকে জেডের। স্কুল ছুটির পরে ও ওঁর কাছে আসে। ক্লোকরুম, যেখানে বসে টোরি ওঁর পরের দিনের ক্লাসের প্ল্যান করেন,বা কোন কাজ করেন সেই খানে আস্তে আস্তে জেড নিজেকে একটু একটু করে মেলে ধরতে থাকে টোরির সামনে। কিন্তু সেই সময় ঘরের দরজায় তালা দিয়ে দিতে হয়। কেন? দরজা খোলা থাকলে কি হবে? 'না না, মিস এলির মাকড়সা রা যদি দেখে ফেলে? মিস এলি আমাকে মেরে ফেলবে।' ভয়, ভীষণ ভয় মাকড়সাকে। ওরা সব দেখে, তুমি কি করছো,কি বলছো স-অ-ব দেখে।

    ঐ বন্ধ ঘরেই টোরি আবিষ্কার করেন যে জেড সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে। ঐ ঘরেই ও একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলে যে ওর পোষা বেড়াল জেনি কে মিস এলি নিয়ে গেছে। মিস এলি ওকে খেয়ে ফেলবে।

    পাতার পর পাতা উল্টে যেতে থাকি অদ্ভুত বিস্ময়ে। কি আছে এর পেছনে? কোন মনস্তাঙ্কিÄক কারণ? টোরি একদিন দেখেন জেড কোলাজের প্রোজেক্টে বানিয়েছে একটা ক্রস,তার চারধারে লাল গোল্লা। এর মানে কি জেডি? জেড বলে 'এক্স মার্কস দ্য স্পট'। প্রায়ই আঁকে ও এই চিহ্ন টা এখানে ওখানে। কারুর ওপর খুব রেগে গেলে বলে 'তুমি এখুনি মরে যাবে।' বলে ফেল্ট পেন দিয়ে তার গায়ে ঐ চিহ্ন এঁকে দেয়।'এবার তুমি মরে যাবে'।

    পুরোনো সহকর্মীদের সাথে আলোচনা করলে একজন শিশু মনো-বিশেষজ্ঞ ফ্রায়েডীয় পন্থা মেনে বলেন এই চিহ্নের মূলে যৌনতা আছে। ঐ গোল্লা হলো নারী যোনি, আর ক্রস হলো শিশ্ন। কিন্তু টোরির বন্ধু হিউ যে সাইকোলজির কিছুটি জানেনা সে একদিন হঠাৎ ঐ চিহ্নটা দেখে ফেলে বলে 'আরে এই প্রতীকটা তো একটা বিশেষ ধরণের বইয়ে দেখা যায়'। কি বই? কিসের বই? উত্তরটা শুনে টোরি স্তম্ভিত হয়ে যান। বুঝতে পারেন না বিশ্বাস করবেন কিনা।

    আবার পাতার পর পাতা রুদ্ধশ্বাসে পড়তে থাকি। আরো কত অদ্ভুত রিভিলেশন, জেডের কত নতুন নতুন হতবাক করে দেওয়া কথা। গোয়েন্দা গল্পের মত মনে হতে থাকে। তফাৎ শুধু এই যে এটা গল্প নয়। সত্যি ঘটনা। শেষের দিকে টোরি নিজেই লিখেছেন যে 'শেষটা এই ভাবে লিখতে পারলেই বোধহয় ভালো হতো,কিন্তু তাহলে তো এটা ফিকশন হয়ে যেতো। বাস্তবকে আমি পাল্টে লিখবো কি করে?'

    ভারী স্বচ্ছ ভাষা, গভীর মানসিক ব্যাখ্যা, মনের না খোলা দরজা একের পর এক খুলে যেতে থাকে। হাড় হিম হয়ে যায়, অজানা জিনিষ জেনে ফেলে ভয় পেয়ে যেতে হয়।শেষ অব্দি কি হলো তা জানার জন্য উৎকন্ঠা হয় সত্যি সত্যি।

    কিন্তু শেষ অব্দি কি হলো তা নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না। বইটি পড়ুন,যদি ইচ্ছে হয়। নতুনের দাম সাড়ে সাত ইউ এস ডলার। পুরোনোও পাওয়া যাচ্ছে অ্যামাজন বা ই-বে তে। শুভ অধ্যয়ন।

    আগস্ট ১২, ২০০৭
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১২ আগস্ট ২০০৭ | ৭৩৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। কল্পনাতীত মতামত দিন