এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • স্বাধীনতা

    শঙ্খ কর ভৌমিক লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৬ আগস্ট ২০১০ | ১১২৭ বার পঠিত

  • এই নিবন্ধটি প্রচলিত অর্থে Ýকান Ýছাটগল্প অথবা প্রবন্ধ নহে। বরং মফ:স্বলী পরিমন্ডলে লালিত পালিত, কিঞ্চিৎ পুরাতন মূল্যবোধ Ýপাষণকারী এক মধ্যবয়স্ক ব্যক্তির স্বগতোক্তিরূপে স্বীকার করিয়া লইলে পাঠকের বিরক্তির ভার লাঘব হইলেও হইতে পারে।
    মদীয় পিতামহ ছিলেন কারাবিভাগের Ýদার্দন্ডপ্রতাপ বড়কর্তা। তিনি ছিলেন কঠোর এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। এতদ্‌সত্ত্বেও উদার মনোভাব ও সহানুভূতিসম্পন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর কারণে তিনি কারাগারের সিপাহীসান্ত্রী হইতে আরম্ভ করিয়া বন্দী অপরাধী - সকলেরই হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে প্রতিষ্ঠালাভ করিয়াছিলেন। ßশশবে Ýদখিয়াছি, বহু প্রাক্তন অপরাধী বিজয়াদশমী উপলক্ষ্যে তাঁহাকে প্রণাম করিতে আসিত এবং তাঁহার পদপ্রান্তে বসিয়া সুখ দু:খ ইত্যাদি নিবেদন করিত। অথচ,Ýস্নহের ঠাকুর্দাসুলভ প্রদর্শন সম্বন্ধে এহেন ব্যক্তির কিছু কার্পন্য ছিল। অন্য পাঁচজন পিতামহের ন্যায় রূপকথার গল্প বলা অথবা Ýপ±ত্রপৌত্রীগনের সহিত হাস্যপরিহাসে লিপ্ত হওয়াকে তিনি সম্ভবত দুর্বলতা জ্ঞান করিতেন। ফলত: তাঁহার সহিত আমার মানসিক ßনকট্য কখÝনাই রচিত হয় নই। বরং, সর্বদা মানুষটির সহিত একপ্রকার দূরত্ব রক্ষা করিয়া চলিতাম। ইহাতে তাঁহারও সামান্য Ýখদ ছিল বলিয়া আমার ধারনা।
    তবে ßশশবে পিতামহী ও অপরাপর অভিভাবকদিগের নিকট প্রচুর গল্প শুনিতাম যাহার অধিকাংশ কারাগার সম্বন্ধীয়,যদিও আমার জন্মের পূর্বেই তিনি অবসর গ্রহণ করিয়াছিলেন। Ýস সকল কাহিনী বালকমনের কল্পনায় কারাগার নামক স্থানটির এক বাস্তব অবাস্তব মিশ্রিত চিত্র অঙ্কন করিয়াছিল। তদবধি, Ýল±হকপাটপরিবেষ্টিত Ýসই রহস্যময় স্থান আমার বিষম Ýক±তূহলের উদ্রেক করিত।
    এই স্থলে, সম্পূর্ণ বিপরীত স্বভাবের অপর এক পুরুষ সম্বন্ধে দু চার কথা বলিব। ইনিও কারাগারের সম্বন্ধে বর্ণনা করিতেন । কিন্তু তাঁহার অভিজ্ঞতা ছিল কারাবাসের অভিজ্ঞতা, অতএব ভিন্ন দৃষ্টিকোণ হইতে দৃষ্ট। মানুষটি দাদুভাই - আমার মাতামহ। কারাগারের এই দ্বিতীয় চিত্রখানি আমাতে অধিকতর Ýরখাপাত করিয়াছিল ।
    Ýয সময়ের কথা বলিতেছি তখনও স্বাধীনতা সংগ্রামী নামক অধুনালুপ্ত প্রজাতির মুষ্টিমেয় সংখ্যক কিছু নিদর্শন জীবিত ছিলেন। ইঁহারা Ýশ্বতবর্ণের ধুতি-জামা পরিধান করিতেন ও দ্বিধাবিভক্ত দুই জাতি পুনর্মিলিত হইয়া তাঁহাদের জীবদ্দশাতেই অখন্ড ভারতবর্ষের সৃষ্টি করিবে- এই জাতীয় কষ্টকল্পিত তত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন । শত শত শহীদের রক্ত কদাপি ব্যর্থ হইবে না- এই আশাবাদী ভাবনা ছিল ইঁহাদের চালিকাশক্তি । এই বলে বলীয়ান হইয়া ইঁহারা সরকারী Ýখারপোষ হাসিমুখে প্রত্যাখ্যান করিতেন।
    মাতামহ ছিলেন ইঁহাদেরই একজন। Ýশানা যায়, ßশশবে আমার মাতা Ýচার পুলিশ Ýখলিবার অপরাধে তাঁহার নিকট তিরস্কৃত হইয়াছিলেন। কারণ, মাতামÝহর বিশ্বাস ছিল সদ্য স্বাধীন মাতৃভূমিÝত এমনকি তস্কর সম্প্রদায়ও Ýচ±র্য্যবৃত্তি পরিত্যাগপূর্বক ভগ্নদেশ পুনর্গঠনে অংশগ্রহন করিবে। Ýদশবাসী বিশ্বাস করিয়া যাঁহাদের হস্তে Ýদশ গঠনের দায়িত্ব ন্যস্ত করিয়াছিল, তাঁহাদের অধিকাংশই Ýয তস্কর ছিলেন- এই সরল সত্য অনুধাবন করিতে তাঁহার কিছু বিলম্ব হইয়াছিল। পুণ্যবান তিনি, স্বাধীন Ýদশের শহীদ ßসনিকের শবাধার ক্রয়বিক্রয় সম্বন্ধীয় উৎকোচের Ýখলা তাঁহাকে Ýদখিয়া যাইতে হয় নাই।
    মাতামহ ছিলেন দৃঢ়চেতা অথচ সদাপ্রফুল্ল ও মিষ্টভাষী। তাঁহার সহিত আমার সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের। ত্রিভুবনে তিনি ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি আমার Ýকান মতামতকেই বালকের Ýখয়াল বলিয়া নস্যাৎ না করিয়া যথোচিত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করিতেন । আমি উত্তরোত্তর তাঁহার আরো অনুরাগী ভক্ত হইয়া উঠিতেছিলাম।
    বয়:বৃদ্ধির সহিত সংগতি রক্ষা করিয়া, রামায়ণ মহাভারত বা রূপকথার পরিবর্তে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রত্যক্ষ বিবরণগুলি ক্রমশ: আমাকে অধিকতর আকৃষ্ট করিতে লাগিল। দাদুভাই যখন তাঁহার অভিজ্ঞতা বর্ননা করিতে থাকিতেন আমি প্রশ্নবাণে তাঁহাকে জর্জরিত করিতাম । তিনিও, ßধর্য্য সহকারে, বালকের পক্ষে Ýবাধগম্য ভাষায় আমার Ýক±তূহল নিরসন করিতেন।
    Ýশষ জীবনে স্বাধীনতা সংগ্রামের কথকতায় তাঁহার অনীহা Ýদখা Ýদয়। Ýবাধ করি আমাদের স্বাধীন Ýদশের Ýনতাদের তস্করসুলভ কার্য্যকলাপের কিছুকিছু তাঁহার কর্ণগোচর হইয়া থাকিবে। আমার 'তার পর কি হল?' প্রÝশ্নর উত্তরে নিরুৎসাহ ভঙ্গিতে বলিতেন 'তারপর Ýদশটা বিক্রি হয়ে Ýগল' । বলা বাহুল্য, Ýদশ কাহারা কিরূপে Ýবচিল তাহা শিশু মস্তিকের বুঝিবার পক্ষে কিছুটা জটিল ছিল। অতএব বিরস বদনে নীরবতা অবলম্বন করিতাম।
    তাহার পর বহু বৎসর অতিক্রান্ত। পিতামহ, মাতামহ উভয়েই পরলোকে। সংসারী হইয়াছি। আমার মায়ের পার্শ্বে বসিয়া আমার কন্যাটির গল্প শুনিবার দৃশ্যখানি স্মৃতির পালে হাওয়া Ýদয়- দাদুভাইয়ের সহিত যাপিত সুন্দর সময়গুলিকে স্মরণ করায়।
    অদ্য ১৪ই অগাস্ট শনিবার, আমার সাপ্তাহিক ছুটির দিন। স্ত্রী-কন্যাকে লইয়া ßবকালিক ভ্রমণে বাহির হইয়াছিলাম। পথেই বসবাসকারী কিছু দরিদ্র বালকবালিকা Ýক পথিপাÝর্শ্ব দন্ডায়মান Ýদখিলাম। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে উহারা কাগজের নির্মিত জাতীয় পতাকা প্রতিটি এক টাকা দরে বিক্রয় করিতেছিল। স্বাধীনতা প্রাপ্তির পঞ্চদশ বৎসরের মধ্যেই Ýদশের সকল বালক বালিকার বিদ্যালয়ে পঠনপাঠনের ব্যবস্থা করা হইবে- এই প্রতিশ্রুতি Ýকান এক Ýনতা দিয়াছিলেন- ইতিহাসে পড়িয়াছিলাম, মনে পড়িয়া যাওয়াতে মনে মনে একবার ২০১০ হইতে ১৯৪৭ বিয়োগ করিয়া লইলাম।
    কন্যা জিজ্ঞাসা করিল "বাবা, ওরা কি স্বাধীনতা বিক্রি করছে?'
    বহু বৎসরের ওপার হইতে আমার মাতামহের Ýদশ বিক্রয় হইয়া যাওয়া বিষয়ক হাহাকার Ýযন ভাসিয়া আসিল।
    বিদেশীর হস্তে ছিনতাই হইয়া যাওয়া স্বাধীনতা ফিরাইয়া আনিতে আমার পূর্বপুরুষ যুদ্ধ করিয়াছিলেন। স্বদেশীর হস্তে স্বাধীনতার বিক্রয় হইয়া যাওয়া Ýরাধ করিতে আমার বংশধর যুদ্ধ করিবে Ýতা? Ýসই অস্ত্রশিক্ষা আমি Ýযন তাহাকে দিতে পারি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১৬ আগস্ট ২০১০ | ১১২৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন