এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • সিঁড়ি

    পাগলা গণেশ লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৭ বার পঠিত

  • আমিশা অবিনাশের হাত ধরে ফেলল।"তুমি আমাকে ছেড়ে যেও না,প্লিজ।তুমি জানো আমি মরে যাব।"কিন্তু অবিনাশ আবার নিস্পৃহ ভঙ্গিতে বলল,"মরলে মরবে।আমার হাত ছাড়ো,লোক দেখছে।"
    আমিশা - "দেখুক।তুমি আমায় ছেড়ে যেও না।তুমি যা বলবে আমি তাই করব,আমাকে তোমার দাসী করে রেখো,ছেড়ে যেও না।"
    অবিনাশকে খুব বিব্রত দেখায়।চারিদিকে চেয়ে দেখে,প্রায় সবাই তার দিকে তাকিয়ে আছে।এমন সময় পেছন থেকে একজন ধাক্কা দিয়ে বলল,"আরে এখানে দাঁড়িয়ে ন্যাকামি করছেন কেন, এগোন না মশায়।ওসব করতে গেলে সিঁড়ির কোণে গিয়ে করুন।সবার আপনাদের মতো এত বাজে সময় নেই।"
    অবিনাশ খুব বিব্রত হল,"সরি, সরি,মাফ করবেন।"
    বলেই ঘুরে দাঁড়াল আমিশার দিকে।তারপর তার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেল সিঁড়ির কোণে,তারপর গালে একটা সজোরে চড় কষাল।আমিশা ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেল,তারপর হেসে বলল,"মারো, যত খুশি মারো।কিন্তু ছেড়ে যেও না প্লিজ।"

    অবিনাশকে এবার অসহায় লাগল খুব।


    অমর অনেকক্ষণ ধরে হাঁটছে,কিন্তু বিশ্রাম যে করবে সিঁড়ির কোণায় পৌঁছাতে পারছে না।হয় কেউ আগে থেকেই সেখানে আছে,নাহয় ট্রাফিক ওকে টেনে নিয়ে চলে যাচ্ছে।এমন সময় ও মুখ তুলে তাকাল,সামনে অভিসার না!
    ও লোকটার পিঠে একটা টোকা মারল, লোকটা ব্যাজার মুখে পেছন দিকে তাকাল,কপালে দুই ভ্রুর মাঝে একটা বিশাল প্রশ্ন চিহ্ন। অমর উচ্ছসিত হয়ে বলল,"অভিসার কেমন আছিস ভাই?" বলেই জড়িয়ে ধরতে গেল.....কিন্তু অভিসার তার বুকে হাত দিয়ে আটকাল।"এই দাঁড়া,দাঁড়া,দাঁড়া!"
    অমর অপ্রস্তুত হল,আশেপাশের সবাই তাকিয়ে দেখছে।

    অভিসার ওর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। অমর হাত বেরিয়ে করমর্দন করল।অভিসারের হাতের ঘড়িটার দিকে নজর পড়ল,খুব দামী ঘড়ি,লাখ খানেক দাম তো হবেই!এরপর ও অভিসারের বাকি পোশাকগুলো দেখতে লাগল।গায়ে খুব দামী স্যুট,গলায় মোটা সোনার চেন উঁকি দিচ্ছে,চোখে দামী চশমা।যেন চলন্ত ঐশ্বর্য।ওর হঠাৎ গা জ্বালা করে উঠল।ও অভিসারকে ঠেলে দিল খুব জোরে।অভিসার টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেল। সিঁড়ির রেলিংটা ওর মাথায় লাগল জোরে।কিন্তু সামলে উঠে মাথাটা ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ।ততক্ষণে ওদের ঘিরে লোক জড়ো হয়ে গেছে।কয়েকজন অমরকে ধরে পেটাতে লাগল খুব।অভিসার এবার উঠল,গর্জন করে ছুটে গেল অমরের দিকে,তারপর "শুয়োরের বাচ্চা " বলে লাফিয়ে পড়ল অমরের উপর। অমর মার খেয়ে আধমরা হয়েই গিয়েছিল,এবার পড়ে গেল মেঝেতে।তার মাথা ঠুকে গেল সিঁড়ির কোণায়।সেখান থেকে দরদর রক্ত ঝরতে লাগল।অভিসার তার বুকের উপর চেপে বসল,একের পর এক ঘুষি চালিয়ে যেতে লাগল অমরের মুখে।প্রতিটি ঘুষির সাথে অমরের মুখ আরো বিকৃত হতে লাগল।একসময় তা একদলা রক্তমাংসে রূপান্তরিত হল।

    সবাই দাঁড়িয়ে দেখছিল ব্যাপারটা।কয়েকজন ক্ষীণ আপত্তি করেছিল,কিন্তু বাকিদের সোৎসাহ চিৎকার ও শিৎকারে তা চাপা পড়ে গেল।একজন রীতিমতো হর্ষধ্বনি দিচ্ছিল,কয়েকজনের অর্গ্যাজম হয়ে গিয়েছিল।তারা সুখের আতিশয্যে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়েছিল,শরীর বেঁকেচুরে যাচ্ছিল বারবার।

    অভিসার এবার উঠে দাড়িয়ে চারিদিকে দেখতে লাগল।একজন হেলমেট হতে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল।অভিসার তার হাত থেকে হেলমেট কেড়ে নিল।তারপর সেটা নিয়ে সজোরে আঘাত করল অমরের মাথায়।' ফটাস ' করে একটা আওয়াজ হল।আবার আঘাত করল অভিসার,এবার অমরের মাথার খুলিটা বাক্সের ডালার মতো খুলে গেল,ভেতর থেকে মগজটা বেরিয়ে এল,গোলাপী সাদা।কয়েকজন আওয়াজ করল,"আহা, আহা!"
    অভিসার এবার সেই মগজের উপর হেলমেট নিয়ে প্রাণপণে আঘাতের পর আঘাত করে যেতে লাগল,সেই সুন্দর সাদা নরম মগজ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল।একটা হালকা আঁশটে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে।

    এমন সময় পুলিশের সাইরেন শোনা গেল,সবাই চলতে আরম্ভ করল আবার।শুধু অভিসার স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল এক কোণে।


    আরোহণ যদিও প্রতিদিন সকালে উঠে ভাবে আজকে সে আর হাঁটবে না,সিঁড়ির রেলিং টপকে ঝাপিয়ে পড়বে নীচে,কিন্তু পারে না।তার বাবা মা তার কাঁধে চেপে আছে।তাদের বয়স হওয়ার সাথে ওজন আরো বেড়েছে,যতদিন যাচ্ছে ক্রমাগত বাড়ছে।ওর দমবন্ধ লাগে,সবাই বলে আত্মহত্যা মানে বাপ-মাকেও মারা।সে তো হবেই, নিচে পড়লে কি আর বুড়ো-বুড়ি বাঁচবে!সবাই আরো বলে যা কিছু আছে এই সিঁড়িতেই,এর বাইরে আর কিছু নেই।যে গেছে সে আর কোনোদিন ফিরে আসেনি,এই সিঁড়ির বাইরে যে জগৎ, তা কোনো মানুষের জন্যই ভালো নয়,বরং ভয়ংকর,প্রাণঘাতী,ক্ষতিকারক।কিন্তু ওর মনে হয়,যা কিছু স্বাধীনতা,আনন্দ,খুশি - সব কিছু ওখানেই আছে।

    ওর বাপ- মা এখন ক্রমাগত ওর অঙ্গীভূত হয়ে যাচ্ছে।এখন ওদের পা-হাত ওর শরীরের সাথে মিশে গেছে, ওরাই মিশিয়ে দিয়েছে।যখন বিলীন করে দিচ্ছিল তখন ও বলেছিল,"কেন এমন করছ,রাখলে তো কাজে লাগবে।"
    ওরা বলেছিল,"কী হবে,তুই আছিস তো।তুই পারবি না আমাদের দায়িত্ব নিতে?"
    ও অসহায়ের মতো মাথা নেড়েছিল।ওরা বোধহয় ওর এই পলায়নপর পরিকল্পনার আভাস পেয়েছিল।

    এখন আবার বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে।আবার আর একটা জোঁক,উঃ!আর কোনো উপায় নেই।

    হেঁটে হেঁটে পায়ে ভেরিকোজ ভেন হয়ে গেছে,ওরা মা প্রতি রাত্রে তেল মালিশ করে দেয়।হাত তো নেই,ওর বাবা মুখে করে তেলের শিশিটা ধরে কত করে তেল ঢালে,আর ওর মা ঠোঁট,গলা,মাথা, স্তন ও মাথার অদ্ভুত সঞ্চালনে মালিশ করতে থাকে।তাতে ক্ষণিকের আরাম পাওয়া যায়।আবার সকালে উঠে হাঁটতে হয়।


    মেরিনা সিঁড়ির উপর শুয়ে আছে সকাল থেকে।প্রথম প্রথম লোক ওর চারপাশ দিয়ে ঘরে ঘুরে যাচ্ছিল।তাতেও কিছু অসাবধান,উদাসীন লোক লাথি মেরে যাচ্ছিল।কেউ "সরি " বলে যাচ্ছিল,বেশিরভাগই বলছিল না।ধীরে ধীরে সেটুকু ভদ্রতাও ত্যাগ করল।ওর বুকের উপর দিয়েই যেতে লাগল।কিন্তু ওর এমন অবস্থাও নেই যে মুখ দিয়ে যন্ত্রণাসূচক আওয়াজ করবে।ক্রমাগত পায়ের সংখ্যা,চাপের তীব্রতা ও উদাসীনতা বাড়তে লাগল।

    সন্ধ্যার দিকে মরল মেরিনা।তেমন কিছু সে ছিল না।রাত অবধি বেশ অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল শরীরটা।এতে অবশ্য শুধু মানুষের পদাঘাতের অনুগ্রহ ছিল না।কয়েকটা কুকুর, কাক,ইঁদুর প্রাণপণে সাহায্য করেছিল।পরদিন সকালে যখন ভালো করে দেখা গেল,শরীরটা সিঁড়ির সাথে প্রায় মিশে গেছে।সেটা এখন পুরু গালিচার মতো সিঁড়ির সাথে চিটিয়ে গেছে,কালচে গালিচাটা সিঁড়ির শোভা বাড়িয়েছে কিন্তু।

    একজন বলল,"গালিচাটা বেড়ে হয়েছে তো! কে বিছাল?"
    তৃতীয় কোণের নির্বাচিত প্রতিনিধি সেই সময় ওর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।তিনি দাঁড়িয়ে সপ্রতিভ ভঙ্গিতে বললেন,"আমিই বিছালাম।কদিন ধরেই ভাবছিলাম বিছাব,কিন্তু সময় হচ্ছিল না,ঘরে কেনা হয়ে পড়েছিল।কালকে অনেক কাজ ফেলে রেখে এটা করেছি।ভালো লাগছে,না?"
    সবাই একবাক্যে বলল,"হ্যাঁ,হ্যাঁ,খুব সুন্দর হয়েছে।পুরো সিঁড়িটাতেই বিছিয়ে দিন।"
    এমন সময় প্রতিনিধির ফোন এল,তিনি কানে দিয়ে এগিয়ে গেলেন।


    অনিরুদ্ধ প্রতিদিন সকালে-সন্ধ্যায় সিঁড়িটা ঝাঁট দেয়।বেতন পায়না।আজ সতের বছর ধরে এরকমই চলছে।যদিও কথা ছিল মাসে পনের হাজার টাকা পাবে,বছরে দশ শতাংশ হারে বাড়বে।কিন্তু প্রথম কমাস নিয়মিত বেতন পাওয়ার পর গড়িমসি আরম্ভ হয়।প্রথমে মাসের দশ তারিখ,তারপর পনের,কুড়ি শেষে বন্ধই হয়ে গেল।কিন্তু অনিরুদ্ধ কাজ ছাড়তে পারেনি।করবে কী?তাছাড়া ও চাকরি করে বলে একটা সম্মান আছে,সেটা পাবে কি?

    তবে উপরওয়ালারা আছেন, ওঁরা ব্যাপারটা দেখছেন।প্রতিবার গেলেই দেখে আদর করে বসান,চা খাওয়ান,কথা দেন এবারে টাকাটা পাইয়ে দিবেন।অনিরুদ্ধের বাবুদের উপর পুরো ভরসা আছে।এমন সুদর্শন,শিক্ষিত,মার্জিত লোকেরা কি এমন অন্যায় কাজ করতে পারেন!

    অনিরুদ্ধ ভাবে,আজ প্রায় ষোল বছরের টাকা বকেয়া,একসাথে পেলে অনেক হবে।তার উপর সুদ পাবে,বাবুরা বলেছেন।

    পেলেই একটা ঘর করবে,সিঁড়ির কোণে একটা ভালো জায়গা দেখা আছে,কিনে নেবে।আর একটা চাকাওয়ালা জুতো,তাতে চলতে সুবিধা হবে।নাহলে এই সিঁড়ি চড়া!
    একটা আফসোস ওর রয়ে গেল,ছেলেটাকে একটা ভালো স্কুলে পড়াতে পারল না।

    সে যাই হোক!
    গা ঝেড়ে উঠে দাঁড়াল অনিরুদ্ধ, নাহ,অনেক কাজ বাকি।


    আনজুম কয়েকদিন খুব ব্যস্ত।ওর একটা নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে,সিঁড়ির ঠিক মুখটাতে। কেনা জায়গা,কিন্তু লোকেরা মানছে না।বলছে ওদিকে যাওয়া আসা করতে অসুবিধা হবে।আনজুমও নাছোড়বান্দা,নিজের হোক সে ছাড়বে না।তাই নিয়ে সে কোর্টে কেসও করেছে।তার শুনানি পড়ছে পরপর।যদিও এটা অন্য কেসের ক্ষেত্রে(কি আজব বাংলা ভাষা,Case - ক্ষেত্র) হয় না,কিন্তু এটা নাকি জনগণের স্বার্থে।

    আনজুমের আইনজীবী অনেক করে আশা দিয়েছেন,তিনি জিতিয়ে ছাড়বেন,কিন্তু এই কদিনে তার কোনো আশা সে দেখতে পাচ্ছে না।তবে কি সারাজীবনের এত কষ্ট করে রোজগার করা টাকা সব জলে যাবে?
    না, তা সে কিছুতেই হতে দেবে না।গা ঝেড়ে উঠে বসে আনজুম,কিন্তু বিচারক নিজের মনস্থির করে ফেলেছেন,জনগণকে ক্ষ্যাপানো যাবে না,গরিষ্ঠের মতই ন্যায়, ভিড় ভুল হয় না।

    আনজুম হেরে গেল।তার ঘর গেল,জায়গা গেল,টাকা গেল,এমনকি বাড়ি তৈরির ইট,বালি,সিমেন্ট,গুটি,রড - তাও কে বা কারা নিয়ে গেল।সে সব হারিয়ে ফেলল,এমনকি তার চাকরিটাও গেল।

    কদিন সে এই ভেবে কাটিয়ে দিল,কোনো না কোনো চাকরি সে নিশ্চয় পাবে,এতদিনের অভিজ্ঞতা আছে ইন্ডাস্ট্রিতে,কেউ কি আর চাকরি দেবে না?

    ধীরে ধীরে সে নিজের বেতনের দাবি কমাতে লাগল;কিন্তু না,তাতেও কাজ হল না।ওরা প্রথমে বেশ আগ্রহ দেখায়,কিন্তু যখনই ওর এই ব্যাপারটার কথা জানতে পারে,একবাক্যে না করে দেয়।ওদের চোখে আনজুম প্রতিবারে ভয় আর ঘৃণা দেখেছে।

    এবার আর উপায় নেই,আত্মীয়স্বজনরা সংস্রব এড়িয়ে চলে,বন্ধুবান্ধবরা কথা বলে না,দেখা হলে না দেখার ভান করে মুখ ফিরিয়ে চলে যায়।ক্রমে ও ভাবল যদি একটা দোকান খোলা যায় সিঁড়ির ধারে!
    খুলল,কিন্তু চলল না।লোকে এগিয়ে এসেও কিছু না নিয়ে চলে যায়।ওকে চিনতে পারলেই আর কেউ কিছু কেনে না।যারা চেনে না,না জেনে কিনতে আসে,ও দেখেছে তাদের ওর বাবা-মা,আত্মীয়স্বজন,বন্ধুরা আটকে দেয়।ও শুনেছে একদিন ওর নিজের মা একজন অচেনা লোককে আটকে বলছে,"মশাই আপনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি?জানেন না ও কে?"
    লোকটা হকচকিয়ে গিয়েছিল,কোনমতে বলেছিল,"কে উনি?"
    মা -"আরে ওই যে সিঁড়ি জবরদখল করেছিল না!"
    লোকটার মুখে সে কী প্রচণ্ড ভয়,ঘৃণা আর রাগ যে দেখেছিল আনজুম!

    সত্যিই তো ও দোষ করেছে।সিঁড়ি দখল করতে চাওয়া নাহয় মানা যায়।কিন্তু তার কোনো গ্লানি থাকবে না,প্রায়শ্চিত্ত করবে না,বরঞ্চ গলাবাজি করে বলবে,"যা করেছি ঠিক করেছি,আমি আর শেষ দেখে ছাড়ব,এই সিঁড়ি দখল আমি করবই।"
    'ছিঃ, ছিঃ, ছিঃ,মরে যাওয়া উচিত ওর।'
    মরতে গিয়েও ছিল একদিন।কিন্তু একজন চিনতে পেরে বাঁচিয়ে নিয়েছিল।ও আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিল,"আপনি একজনমাত্র লোক যে আমার সাথে এমন সহানুভূতিশীল আচরণ করল।"
    সে লোকটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলেছিল,"সহানুভূতি?তাও আপনাকে? আরে আপনি এত সহজে মরে যাবেন,শাস্তি ভোগ করতে হবে না আপনাকে?"


    "ইস,এ কী করলেন?"
    "কেন কী করলাম?"
    "আপনি এগিয়ে গেলেন কেন?"
    "সবাই তো যাচ্ছে!"
    "সবাই যাচ্ছে বলে আপনিও যাবেন?"
    "তা যাব না?"
    "না, যাবেন না।"
    "তা আপনি কে মশাই?"
    "আমি কে!জানেন না বুঝি?এই সব শোনো,ইনি আমাকে চেনেন না।"
    আশেপাশের কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে পড়ল।ওর দিকে একটা ঘৃণা,রাগ,তাচ্ছিল্য ও আশ্চর্যের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকল।আদনানের নিজেরও খুব লজ্জা লাগল।সে ভাবতে লাগল,"কে এই লোকটা?নিশ্চয় কেউ নেতা গোছের হবে,বা অফিসার।"
    তার তেরিয়া ভাবটা কমে এল।বিগলিত হয়ে বলল,"মাফ করবেন।"
    বলে সুট করে লোকের পেছনে পেছনে এগিয়ে চলল।

    কয়েকদিন এভাবে চলার পর ওর ইচ্ছা হল,এগিয়ে গেলে কেমন হয়?এই লোকটা যা অস্তে আস্তে চলছে,তাতে এর পেছনে ফেলে হয়ে গেছে।ওর পেছনে এসে কতজন এগিয়ে গেল,কিন্তু ওর ইচ্ছা হওয়া সত্ত্বেও যেতে পারল না। কে জানে এখন যদি সেই লোকটা চলে আসে!যদিও সে এই কদিনে লোকটাকে আর আশেপাশে দেখেনি,সে নিশ্চয় অনেক আগে চলে গেছে।

    এর কদিন পর সে নিজের কাঁধে একটা টোকা পেয়ে ঘুরে দাঁড়াল।তার হৃদপিন্ড দ্রুত চলে আরম্ভ করল। আরে,এ তো সেই লোকটা।আদনান ভয় ভয় জিজ্ঞাসা করল,"ভালো আছেন?"তার গলাটা অতি বিনয়ী শোনাল,মনে হল যেন তেল মারছে।
    লোকটা কিন্তু ওসবে কান দিল না।"কেমন আছেন?এখনো এখানেই,বেশ কড়কে দিয়েছিলাম সেদিন, অ্যাঁ!"বলে হ্যা হ্যা করে অসভ্যের মতো হাসতে লাগল।আদনানের খুব রাগ হল,মনে হল এক ঘুষি মারে নাকটায়,কিন্তু পরক্ষণেই ভয় হল,যদি ছুরি-টুরি থাকে!
    "ভালো আছি,আপনি কেমন আছেন?"বলে আদনান একটু হাসার চেষ্টা করল।কিন্তু সেটা যে ঠিক হাসির মতো হল না,সে নিজেও বুঝতে পারল।লোকটা বুঝতে পারল আদনান ভয় পেয়েছে।এবার সে আদনানের কাছে এগিয়ে এল,তার কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে বলল,"খানকির ছেলে,যদি এখান থেকে একজনকেও এগোনোর চেষ্টা করেছিস,এই যে ছুরি দেখছিস,গলায় বসিয়ে টেনে দেব।রক্তটা ফিনকি দিয়ে বেরোলে,এই যে কুকুরগুলো দেখছিস,এদের খাওয়াব,মরার আগে দেখে যেতে পারবি,তোর রক্তের কী সদগতি হল।"বলেই আবার হ্যা হ্যা করে হাসতে লাগল।

    আদনানের মনে হল,"ভালো করেছি কিছু না করে।"
    লোকটা ওকে পেরিয়ে চলে গেল।নিজেকে হঠাৎ খুব বুদ্ধিমান মনে হল আদনানের।সে জীবনে কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়নি,তাই প্রতিবারে ও বেঁচে গেছে।
    সেবারে যখন ওর বাড়ি ছুরি করতে এসে চোরগুলো ওর বাবাকে খুন করল,ও ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল,বিছানার তলা থেকে বেরোয়নি।তারপর ওরা যখন ওর মাকে মেঝেতে ফেলে ধর্ষণ করল,তখনও ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, টুঁ শব্দটিও করেনি।ওদের প্রত্যেকের হাতে ছোরা ছিল,ও কী করতে পারত একা?
    তারপর ওরা মায়ের গলার নলিটা কেটে ফেলেছিল,রক্তের ধারা গড়িয়ে এসে ঢুকেছিল বিছানার নিচে।ও তখনও ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল,বেরোয়নি,টুঁ শব্দটিও করেনি।ওর মা ওর দিকে হাত বাড়িয়েছিল,কিন্তু ও বেরোয়নি,ঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

    এরকম অনেক উদাহরণ আছে।

    আদনান বেঁচে আছে।


    আড্ডা দিতে বেশ লাগে কিন্তু এখানে।কেউ কিছু বলতে পারে না,কিন্তু ওই শালা কেয়ারটেকারটা বড্ড জ্বালায়।ওর একটা ব্যবস্থা করতে হবে।

    অরুণ, আসিফ আর অঞ্জন ইউনিভার্সিটিতে পড়ছে।ওদের কলেজে যে ছাত্র ইউনিয়নটা আছে,ওরা তার সক্রিয় সদস্য।আজ কুড়ি বছর আগেও তিনটে ইউনিয়ন সক্রিয় ছিল,কিন্তু এই দিদির 'ল্যান্ডস্লাইডিং ' জয়ের পর থেকে তারা সব ডাইনোসর হয়ে গেছে।পুরোনো খবরের কাগজ আর লোকের নষ্ট্যালজিয়াতে তারা বেঁচে আছে।

    তাই কোনরকম বাধা বা বিরোধকে তারা সরাসরি পার্টি,সরকার তথা দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল মনে করে এবং অন্যদের সামনেও প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে।এদিকের সিঁড়ির রেলিংটা যখন ওদের পছন্দ হল,ওরা স্বাভাবিকভাবেই ভেবেছিল কেউ ওদের কোনরকম বাধা দেবে না।কিন্তু কেয়ারটেকারটা সরল সাধারণ মানুষ,সে তার মালিক ও কাজকে ভগবান মনে করত।ফলে সে বাধা দিল।কিন্তু কাজটা যে এতবড়,গর্হিত অপরাধ - তা সে বুঝতে পারেনি।

    একদিন সকালে সে ঝাঁট দিচ্ছে রেলিং টার কাছে,ওরা এল।অঞ্জন ওদের মধ্যে নেতা।সে এগিয়ে এসে বলল,"কাকা,কেমন আছ?"
    আসলাম(কেয়ারটেকার) মুখ তুলে তাকাল।সে মনে মনে একটু অবাক হলেও ঝামেলা এড়ানোর জন্য বলল,"ভালো আছি বাবা।"
    অঞ্জন আসলামের ভালোমানুষির আর ঝামেলা এড়ানোর চেষ্টা দেখে এক পা এগোলো।"আজকে আড্ডা দিতে দিবে তো কাকা?"
    আসলাম আরো বিনীত হল,ঝুঁকে পড়ল সামনের দিকে।ঠিক অঞ্জনের পা ছুঁই ছুঁই অবস্থায় থেমে বলল,"না বাবা,মালিক মানা করেছে।"
    অঞ্জনের মুখ এবারে লাল হয়ে উঠল,তার কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোতে লাগল রাগের চোটে।সে এক পা পিছিয়ে গিয়ে সজোরে একটা লাঠি কষাল আসলামের পিঠে।সে এমনিতে বুড়ো লোক,একটু কলকুঁজো।অঞ্জনের অমন লাঠি খেয়ে সে ছিটকে গিয়ে পড়ল রেলিংয়ের গায়ে।পিঠটা সজোরে ঠুকে গেল রেলিংয়ের রডে। তারপরে ষাট বছরের বুড়ো শরীরটা আছড়ে পড়ল সিঁড়িতে।অঞ্জনের মুখে একটা তৃপ্তির বাঁকা হাসি ফুটে উঠল খুব ধীরে।

    আসলাম অজ্ঞান হয়ে গেছে।ওরা ফিরে গেল।আশেপাশে এত লোক পেরিয়ে গেল,কেউ তুলল না আসলামকে,কেউ প্রতিবাদ করল না।আসলাম সেখানে পড়ে রইল।

    এর মধ্যে দিনকয়েক পেরিয়ে গেছে।সেদিন রৌদ্রোজ্জ্বল সুন্দর একটি শীতের সকাল।কুয়াশা তেমন নেই,পাখিরা হয়তো আনন্দে কিম্বা স্বভবজাতভাবে কিচমিচ করছে।আসলাম বুঝতে পারে না পাখিরা কেন সকাল-বিকাল এমন প্রাণান্তকর চিৎকার করে।ওরা কি বাড়ি ফিরে ওদের স্ত্রীকে নিজেদের দিনযাপন ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে শোনায়,যেমন ওর বাবা শোনাতেন ওর মাকে?

    এখন ও বিছানায় শুয়ে আছে।গত কয়েকদিন ওকে নিয়ে সবাই জেরবার, তা নিয়ে ওর মনে একটা সুপ্ত অপরাধবোধও আছে।এদিকে কোনো রোজগার নেই।মালিক এককালীন কিছু টাকা দিয়েছিলেন,কিন্তু সে টাকা চিকিৎসা করাতেই কম পড়ে গেছে।তার উপর ডাক্তার বলেছেন কম করে তিনমাস বিশ্রাম নিতে হবে,একেবারে বেডরেস্ট।

    কিন্তু একমাসের মাথায় আসলামকে আবার কাজে যোগ দিতে হল।শরীর চলছে না,শিরদাঁড়া,কোমর বিদ্রোহ করছে,কিন্তু কিচ্ছু করার নেই,কাজে যেতেই হবে।ঘরে কানাঘুষো শুরু হয়েছিল আগেই,কিন্তু তাও সহ্য করা যাচ্ছিল।দিনকয়েক তো আর সেই দয়াটুকুও করছে না।আসলামের খুব খারাপ লেগেছিল প্রথমে,যাদের জন্য সারাজীবন খেতে খেতে শেষ করে দিল,তারা আজ একমাস ঘরে বসতে এত অতিষ্ট হয়ে গেল?ওরা কি জানে না,যে ও শখ করে বসে নেই!ডাক্তার বলেছে তিনমাস বিশ্রাম নিতে,সে তো ওদের সামনেই।তাও ও শুনত না,কিন্তু শরীর শুনছে না যে,ও কী করবে!

    বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল।কিন্তু তারপর মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবল,"ওদের কী দোষ!"

    মালিক ওকে দেখে অবাক।কিন্তু কিছু বলল না,শুধু জিজ্ঞেস করল,"শরীর কেমন?"
    আসলাম বিনীত উত্তর দিল,"ভাল।"
    -"তুমি আজকে বসো,কাজ দেখো,যদি ভালো না লাগে বাড়ি চলে যাও।কাল তোমাকে বলব কী কাজ করবে তুমি।"
    আসলামের বুক দুরুদুরু করে উঠল।একটা বিপদের ঘণ্টা ওর মনে বাজছে।মুখে বলল,"ঠিক আছে বাবু।"

    ও সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে রইল।ওর জায়গায় অন্য একজন লোককে নিয়োগ করা হয়েছে।ওর দুঃখ হল,চোখে জল চলে এল।এতদিন ধরে কাজ করছে সে,মালিক কিনা একমাস অপেক্ষা করতে পারল না?আবার মনে হল,"এই একমাস কি সব অসুরক্ষিত পড়ে থাকত? ঠিকই করেছে।অন্য কেউ হলে ওকে কাজ থেকে বের করেই দিত,তার তুলনায় মালিক তো অনেক ভালো।অন্তত যা হোক কাজ তো দিচ্ছে।

    পরেরদিন সে আবার গেল।মালিক তাকে দেখে হাসিমুখে বলল,"আসলাম এসেছ,আমি এই তোমার কথাই ভাবছিলাম।এসো, বসো।"
    আসলাম ধীর পায়ে এগিয়ে গেল।গিয়ে বসল সামনের চেয়ারটায়।
    মালিক তার দিকে তাকিয়ে বলল,"দেখো আসলাম,যে কাজটা তুমি করতে,দেখতেই তো পাচ্ছ,অন্য একজন করছে।আমার উপায় ছিল না,ডাক্তার বলেছিল তোমাকে তিনমাস বিশ্রাম নিতে,এতদিন তো আর ফেলে রাখা যায় না!"
    আসলাম বিনয়ে গলে গেল,সে বলল,"ঠিকই তো,ঠিকই তো। ও নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না।আমাকে একটা কাজ দিন বাবু।"
    শেষে তার গলা কান্নায় ভিজে এল।মালিক তাড়াতাড়ি তার পিঠে হাত বুলিয়ে বলল,"আরে,চিন্তা নেই,আমি আছি তো?"
    আসলামের বুকে বল এল।

    ওর মালিক এবার একটুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।তারপর বলল,"দেখো আসলাম,আমি চাইনা তুমি এরকম অবস্থায় দিন কাটাও।তুমি তো সেই বাচ্চা বয়স থেকে আমার এখানে কাজ করছ।তোমার মতো বিশ্বস্ত লোক আমার আর একটা নেই।কত লোক এল-গেল,কত লোক আমার সাথে বেইমানি করল,কিন্তু তোমাকে নিয়ে আমার একদিনের জন্যও চিন্তা করতে হয়নি।কিন্তু আমি বাধ্য,আমার কাছে আর কোনো কাজ নেই।তবে যদি এই দারোয়ান কাজ ছেড়ে দেয়,আমি কথা দিচ্ছি,তোমাকে ওর জায়গায় বহাল করব।তুমি এসো।"

    আসলামের হঠাৎ চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে গেল,মাথাটা টলে গেল,সে বুঝতে পারল সে পেছন দিকে পড়ে যাচ্ছে,কিন্তু ও নিজেকে সংযত করতে পারল না।তারপর .....ওর আর কিচ্ছু মনে নেই।

    ওর জ্ঞান যখন হল,বেশ রাত হয়ে গেছে।ও চোখ খুলেই দেখল,মালিক ওর মুখের উপর ঝুঁকে আছে।ওকে চোখ খুলতে দেখেই বলল,"আসলাম রাত অনেক হল,এবার তুমি বাড়ি যাও।"

    আসলাম আর কিচ্ছু বলল না।সে বাড়ির পথ ধরল।দরজায় টোকা দিতেই স্ত্রী দরজা খুলল,খুলেই তাকে দেখে তার চোখ জ্বলে উঠল।"মরতে ফিরে এসেছ?মরে গেলে না কেন?রোজগার করতে পারে না,ঘরে ছেলেমেয়েগুলো না খেয়ে বসে আছে,দুটি চাল পর্যন্ত নেই বাড়িতে।মরে গেলে অন্তত লোককে বলতে পারতাম,আমার ভাতার মরে গেছে,কেউ একটু দয়া করো গো।"

    আসলামের মন এমনিতেই খারাপ ছিল,সে রাগে সোজা চলে গেল সিঁড়ির সবচেয়ে উপরের ধাপে।সেখানে থেকে লাফিয়ে পড়ল একেবারে নিচের ধাপে।বেশ কয়েক সেকেন্ড লাগল,যখন পড়ল,বিকট আওয়াজ হল একটা।তারপর সব শেষ।

    কয়েকটা কুকুর অভুক্ত অবস্থায় অলস শরীর এলিয়ে শুয়েছিল সিঁড়ির পাশে।তারা আসলামকে পড়তে দেখে আর বিকট আওয়াজটা শুনে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল।কিন্তু বেশ কিছুক্ষণ সে নড়াচড়া না করাতে,ওরা সাহস করে এগিয়ে এল।শুঁকে শুঁকে দেখে যখন নিশ্চিত হল,মরেনি কিন্তু কামড়ালে আর নড়াচড়া করতে পারবে না,নেতামত কুকুরটা এক কামড় বসাল।আসলামের শরীরটা একটু নড়ল যেন।এবার অন্য কুকুরগুলো সাহস পেল।তারা খুব উৎসাহের সাথে খেতে আরম্ভ করল। যে কজন সিঁড়ি দিয়ে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল,তারা দেখলই না ব্যাপারটা।

    ক্রমে কুকুরগুলো আসলামের পুরো শরীরটা খেয়ে ফেলল।তারপর তার অবশিষ্ট হাড়গুলোর চারপাশে গোল করে বসে হু-হু-হু করে চেঁচাতে লাগল।কয়েকজন সেই আওয়াজে সচকিত হয়ে সেদিকে তাকাল।একজন বলল,"কি নোংরা?আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করে না কেন কে জানে!"

    সকালে একদল লোক এসে জড়ো হলো হাড়গুলোর চারপাশে।তারা নিজেদের মধ্যে বলতে লাগল,"কিছু বলা হয় না তাই,সিঁড়ির উপর এমন আবর্জনা পড়ে থাকবে কেন?"
    একজন বলল,"এই প্রতিবাদ দরকার।"
    একজন বলল,"আন্দোলন করতে হবে।"
    এর মধ্যে একজন চিৎকার করে উঠল,"রাস্তার মাঝে আবর্জনা কেন,সিঁড়ি মালিক জবাব দাও।"
    আশপাশ থেকে আরো কয়েকজন সমবেত কণ্ঠস্বরে চিৎকার করে উঠল,"জবাব দাও,জবাব দাও।"

    এভাবে একটা মারাত্মক বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল।এসব হইহল্লা শুনে পুলিশ এল।লাঠি দিয়ে পেটাতে থাকল,তাতে ছুটে যেতে গিয়ে পদপিষ্ট হয়ে মরল কয়েকজন।সব ফাঁকা হয়ে যেতে সিঁড়ি পুরসভার সাফাইকর্মীরা এসে হাড় ও লাশগুলো নিয়ে চলে গেল।

    আবার সবকিছু আগের মতোই চলতে লাগল।


    আজকের দিনটা খুব ব্যস্ত।কিছু একটা হতে চলেছে।চারিদিকে টগবগ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।বয়স্ক ব্যক্তিরা নিজ নিজ কাজে ব্যস্ত।তারা আওয়াজটা শুনেছেন,মনে মনে অবাক হলেও তাদের মুখাবয়বে তার চিহ্নমাত্র নেই।ওর একধরনের স্বচর্মনির্মিত মুখোশ পরেন,তাতে ব্যাপারটা স্বাভাবিকও থাকে,আবেগীয় প্রকাশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।শুধু চোখগুলোকে নিয়ে সমস্যা।ওদের রোদচশমা দিয়ে ঢেকে রাখা যায়,কিন্তু এই আধো অন্ধকার,স্যাঁতসেঁতে সিঁড়িতে চলা সেক্ষেত্রে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে।এমনকি বেশ কয়েকজন এই চেষ্টা করতে গিয়ে পড়ে গিয়ে মরেছে।তাই আর কেউ ওই ঝামেলায় যায় না।কিন্তু তাতে আবেগ ধরা পড়ে যায়,বিব্রত হতে হয়।কিন্তু ওরা মেনে নিয়েছে,শিখে গেছে।

    সদ্য কিশোর ও যুবকরা এসবের ধার ধারে না।ওরা একটু বেপরোয়া,নিয়ম ভঙ্গের।তাছাড়া ওদের করার কিছু নেই।ওদের মুখের চামড়া মুখোশে পরিণত হতে সময় লাগে,আর যেটুকু হয়েছে তা ওদের নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার অভাবে বাচ্চা হাতির কাছে শুঁড়ের মতো হয়ে আছে।ফলে বেপরোয়া ভাব দেখানো ছাড়া উপায় নেই,বরং সেটা বেশি কুল লাগে।

    কিন্তু তাতে বেশি বয়সী কাকু-কাকিমারা খুব সমস্যা করেন।ওদের এই অপারগতা নিয়ে উপহাস করেন,টিটকিরি দেন।মাঝে মাঝে তা অসহ্য হয়ে গেলে ওদের মধ্যে অদূরদর্শী কেউ প্রতিবাদ করতে যায়,তাদের আর দেখা মেলে না।

    সেদিন রাতের দিকে খুব হইচই শোনা গেল সিঁড়ির রেলিংয়ের দিক থেকে।প্রথমে লোকজন কিছু বুঝতে পারেন, পরে যখন আগুনের লেলিহান শিখা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল,তখন ওরা প্রাণভয়ে পালাতে লাগল সিঁড়ির মাঝের অংশগুলোতে।তাতে বেশ কয়েকজন নিচে পড়ে গেল,প্রাণভয়ে ভীত জনতা তাদের ভ্রুক্ষেপ করল না,ফলে যা হবার হল,গালিচা আর একটু পুরু হয়ে গেল।

    রাত আটটা নাগাদ আগুনটা নিভল।না,দমকলকর্মীরা কেউ আসেনি,রেলিং পুড়ে ছাই হয়ে যেতে সিঁড়ির যা কিছু দাহ্য ছিল সেগুলো পুড়তে আরম্ভ করে,তারপর সদ্য মৃত লোকগুলো এবং শেষে যখন সেগুলোও পুড়ে গেল,তখন আগুনের আর কিচ্ছু করার রইল না।

    আশ্চর্যের কথা গালিচার আস্তরণ যেগুলো কিছুতেই তোলা যায়নি,সেগুলো পুড়ে ছাই হয়ে গেল।সিঁড়ি এখন সম্পূর্ণ নগ্ন,পাছায় একটা হাত আর সামনে একটা হাত দিয়ে অসহায়ের মতো এদিক ওদিক তাকাতে লাগল,কেউ এসে তার অঙ্গ ঢেকে দিবে!

    দিতে এল।নতুন ছেলেমেয়েগুলো।ওরা সব বিপ্লবী,অন্তত নিজেদের তাই তো বলে।এর সম্পূর্ণ নতুন ডিজাইন,নতুন রং,নতুন সুতোয় বোনা গালিচা নিয়ে এল।মনে রাখতে হবে গালিচাই কিন্তু।তারপর নতুন ধরনের খুব শক্তিশালী আঠা ও কলকব্জা এনে গালিচাটাকে সিঁড়ির সাথে জুড়ে দিতে লাগল।আগের প্রজন্ম যখন লাগিয়েছিল তখন তারাও সেই সময়ের সেরা আঠা আর কলকব্জা লাগিয়েছিল।সেটা তাদের আগের প্রজন্মের থেকে শক্তিশালী ছিল,কিন্তু এবারের আগুন আলাদা ছিল।

    সিঁড়ি আবার স্বাভাবিক হল,রেলিংটা লাগাতে কয়েকদিন দেরি হয়েছিল,তাতে কয়েকজন অসতর্ক লোক পড়ে মরল।এরকম হয়,এরকম রক্ত লাগে বিপ্লবকে অভিষিক্ত করতে।রেলিং লাগল,আবার সবকিছু আগের মতো চলতে লাগল।

    কিচ্ছু পাল্টায়নি,কিচ্ছু পাল্টায় না।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন