এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  গপ্পো

  • ছাতিম পাতা

    কুলদা রায় লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ১৪ নভেম্বর ২০১১ | ৮৮০ বার পঠিত
  • নদীটা সাদা। এবং কালো। মাঝখানে ফুলে ফুলে উঠেছে। বাবা বলল, মধুমতির জলে তালতলার খাল আইসা পড়ছে।

    এরপর ধানক্ষেত। কাটা হয়ে গেছে। নাড়া পড়ে আছে। ফাঁকে ফাঁকে কলমির ফুল। শালুক। তিরতির করছে ছোট জল।
    বাবা বলল- ঐ দ্যাখ।

    একটি মেঠো ইঁদুর আকাশের দিকে তাকাল। চিঁ চিঁ করে ডাকতে ডাকতে সামনে এগিয়ে গেল। মোটা সোটা। একটি বিড়ালের মত। বাবা হাততালি দিল। বললেন, যাহ?। ইঁদুরটি থেমে গেল। ফিরে তাকাল।

    রাস্তার মাঝামাঝি ভাঙা। সেখানে বাঁশের জালি বসানো। বিল থেকে জল খালের দিকে সড় সড় করে নেমে যাচ্ছে। জালির ওপাশে নৌকা। আর পুঁটিঁ, শোল, পাবদা, রয়না মাছ ভেসে আসছে জলের সঙ্গে। জালির ওপাশে খালের মধ্যে একটি নৌকা। জালিতে বাঁধা পেয়ে লাফিয়ে উঠছে মাছগুলো। পড়ছে নৌকার মধ্যে। এর পাশে একটি কুঁচে বক একপায়ে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে দেখছে। খুব চুপচাপ। বাবা এই ভাঙনটুকু কোলে তুলে পার করে দিল।

    গ্রামের শুরুতেই একটি বটগাছ। নিচে একটি গরু চরছে। আর একজন খুব বুড়ো লোক গুড়ুক গুরুক করে তামাক টানছে। দুচোখ বন্ধ। চোখ বন্ধ রেখেই বুড়ো বলে উঠলেন, টাউন থিকা আসা হৈতাছে। টাউন থিকা আসা হৈতাছে?

    বাবা দাঁড়াল। বলল, হ।

    বুড়ো খুক খুক করে কাশতে শুরু করলেন। আর বলতে লাগলেন, টাউন থিকা আসা হৈতাছে। কাশি চলছে। আর তামাক টানারও বিরাম নেই। বারবার বলছেন, টাউন থিকা আসা হৈতাছে। গলার শিরা ফুলে উঠেছে। গরুটা গলা তুলে একবার ডাক দিল, হাম্বা। একটি নেলি বাছুর ছুটে এসে বাটে মুখ দিল।

    খোকা বলল, বাবা। বাবা।

    বাবা খোকাকে নিয়ে হাঁটা শুরু করল।

    বুড়ো তামাক খেতে খেতে বললেন, যাওয়া অবি কোতায়?

    --নারিকেলবাড়ি।

    --নারিকেলবাড়ি। নারিকেলবাড়ি। কাশতে কাশতে বারবার বলছেন। আর তামাক খাচ্ছেন। ওরা একটু এগিয়ে গেছে। মাথা উঁচু করে বললেন, অ, নারিকেলবাড়ি। মাস্টার বাবুর বাড়ি। মাস্টারবাবুর বাড়ি।

    তারপর কি মনে করে বললেন, একটু তফাতেই কালি খোলা। খুউব জাগ্রত দেবি। পেরনাম কৈরা যাইয়েন। বড়ো জাগ্রত দেবি।
    বুড়োর চোখ বন্ধ। গরুটা ঘাস খাচ্ছে।

    রোদ ওঠেছে। ফুল ফুটেছে। ফুলের ভেতর দিয়ে একজন মহিলা ছুটে এলেন। খোকার হাত ধরে বললেন, আহা, কচি পোলা। ইকটু জিরাইয়া যান।

    খোকাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে এল। বারান্দায় জলচৌকিতে বসালেন। আঁচল দিয়ে ঘাম মুছিয়ে বললেন, মুখডা শুকায়ে গেইছে। খিদা লাগছে, বাজান?

    একজন মাঝবয়েসী লোক বকুলতলায় নামাজ পড়ছিলেন। বাবার জন্য শীতল পাটি পেতে দিলেন। সুতার নকশী করা। একটি গোলাপ ফুল। নিচে লেখা: মনে রেখ- ভুল না আমায়। দুপাশে দুটো ময়ূর। পেখম তুলেছে।

    বললেন, বসেন, বসেন। যাইবেন কুথায় এই রৈদে। ত্যাজ কুমলে যাইয়েন।

    বিবিজান ততক্ষণে সানকিতে করে গুড় আর মুড়ি নিয়ে এসেছেন। আর দুটো মিঠে কলা। বললেন, খাও বাজান। হুড়ুম খাও।

    তিনি হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। দুটো ছেলে মেয়ে এসে তার কোল ঘেষে দাঁড়িয়েছে। একজন আঁচলে মুখ পুরে চুষছে। চেয়ে চেয়ে খোকাকে দেখছে । মুখে গুড়-মুড়িতে মাখামাখি। একটি মাছি ঠোঁটের কাছে ভন ভন করছে। ফিক করে হেসে দিয়েছে মেয়েটি। তার ফ্রকে কাদামাটি।

    দুটো কচি ডাব কেটে দিলেন ইরফান মাঝি। বাবা যতত্র করে খেলেন। শাঁসটুকু খেলেন আরও তৃপ্তি করে। প্রাণ ঠাণ্ডা হয়ে এসেছে। ইরফান মাঝি বললেন, যাইবেন কুথায়?

    --নারিকেলবাড়ি।

    -- অ, মাস্টারবাবুর বাড়ি? কি লাগে?

    -- শ্বশুর।

    -- অ, তাইলে দেরি কৈরেন না। যান। তিনি আমার বিয়া দিছিলেন।

    ইরফান মাঝি তাঁকে উদ্দেশ্য করে একটি সালাম দিলেন। আর তার বিবি দিলেন এক শিশি আবে জমজমের পানি। খোকার মাথা আঁচড়ে দিলেন লাল কাঁকুই দিয়ে। হাত ধরে এগিয়ে দিলেন বাড়ি থেকে রাস্তা অবধি। বললেন, ফি আমানুল্লাহ।

    কিছু পথে জল-কাদা। বাবার কাঁধে চড়ে খোকা পার হল। শোলার খেতে কয়েকটি শালিক বসে আছে। শির শির করে দুলছে ক্ষুদে ক্ষুদে কচি পাতা। গায়ে একটুকু ছোঁয়া লাগে।

    উঠোনে একটি কুকুর ঘাড় গুজে শুয়ে আছে। তারপাশে একজোড়া খড়ম। এক বালতি জল। তিনটি তালগাছের ছায়া টিনের চালের এসে পড়েছে। জং ধরা টিনের উপর পাটখড়ি ছড়ান। একটি লাউগাছ বেয়ে উঠেছে। পাতা সবুজ। সজীব।

    ঘরের বেড়াগুলো নল খাগড়ার। পূব দিকের বেড়া খুলে রাখা। সেখানে একটি টিয়া পাখি খাঁচা। বলে উঠল, অতীত আইছে। বসতি দেও।

    লোকজন সরে গেল। মাটির উপরে হোগলার পাটি পাতা। সেখানে কে একজন শুয়ে আছেন। মাথার কাছে প্রদীপ। জ্বলছে মিটমিট করে। সাদা চুল- সাদা ভ্রু। সাদা দাড়ি। চোখ বন্ধ। অস্ফুট গলায় কি যেন বললেন। তার কানের কাছে দিদিমা মুখ নিয়ে বললেন, আপনের সেজো জামাই আইছে। আর নাতি। বীণার ছেলে।

    দূর থেকে ভেসে এল হা হা হাসি। মেজো মামা হাসছেন। পেয়ারাগাছের নিচে। হাসতে হাসতে হু হু করে কাঁদছেন।

    বাবা ঝুঁকে পায়ের কাছে নত হল। প্রণাম করল। খোকাকে এগিয়ে দিল।

    তাঁর ভ্রু নড়ে উঠল। ঠোঁট কেঁপে উঠেছে। অস্ফুট স্বরে কিছু বললেন। দিদিমা মাথার কাছে রাখা একটি পুরনো বইয়ের পাতা উল্টালেন। ভেতর থেকে কি একটা বের করে খোকার হাতে দিলেন। একটি পুরনো পাতা। বিবর্ণ। ছাতিম পাতা। শিরা বেরিয়ে পড়েছে। পাতার উপরে কালো অক্ষরে আবছা করে লেখা-

    তিনি আমার-
    চোখের আরাম,
    মনের আনন্দ,
    আত্মার শান্তি।


    টিয়া পাখিটা বলে উঠল, অতীত আইছে। বসতি দেও।

    খোকার গরীব দাদুর আর কিছুই ছিল না। এই একটি মাত্র সম্বল- ছাতিম পাতা। পঞ্চাশ বছর আগে এনেছিলেন ভুবনডাঙ্গা থেকে। কুড়িয়েই এনেছিলেন। বাঁকা অক্ষরে নাম লিখে দিয়েছিলেন কবি ঠাকুর- রবি ঠাকুর।

    তিনি একবারই মাত্র চোখ খুললেন। অদ্ভুত সবুজ দুটি চোখ। নবীন পাতার মত। প্রদীপের মত। জ্বলজ্বলে।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • গপ্পো | ১৪ নভেম্বর ২০১১ | ৮৮০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    ঘ - শর্মিষ্ঠা
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আদরবাসামূলক মতামত দিন