এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • হারানো ফিল্ম ক্রিটিকের সন্ধানে

    Parichay Patra লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৪ অক্টোবর ২০১৫ | ১৯৪৮ বার পঠিত
  • রাজকাহিনীর বেশকিছু রিভিউ বাজারে ঘুরছে, যার মধ্যে দুটি বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। একটি অনুজপ্রতিম বন্ধু সুয়াভোর রচনা, অন্যটি অভিলাষ রায় নামক একজনের। আমি সুয়াভোর লেখাটি পড়ে প্রচুর হেসেছি, মজা পেয়েছি, অভিলাষবাবুর লেখাটি আমার অপছন্দ হয়েছে, অপেশাদার মনে হয়েছে। রাজকাহিনী আমি দেখিনি, দেখার সুযোগ বা উৎসাহ নেই, তাই সে নিয়ে কিছু বলব না। কিন্তু সমস্যা হল এই যে বেশ কয়েকজন বন্ধু, যারা দর্শক হিসাবে সৃজিতের ছবি পছন্দ করেন, তারা কিছু আপত্তি তুলেছেন, কিছু কিছু কার্টুন ইত্যাদিও বানিয়েছেন। তাঁদের প্রধান বক্তব্য, যেমন অনিকেত চট্টোপাধ্যায় স্পষ্টই বলেছেন, বাংলা সাহিত্য পড়তে গেলে যেমন বিশ্বের অন্য নানা সাহিত্য পড়া বাধ্যতামূলক নয় তেমন বাংলা ছবি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, দেখতে গেলে, কেন ডায়াজ, গোদার, ফেলিনি দেখা অবশ্যকর্তব্য (আমি প্রায় ভার্বেটিম কোট করলাম)।

    এখান থেকে লাভ ডায়াজকে শুরুতেই বাদ দিলাম, এনাকে বাংলা বাজারে চেনানোর দায় আমি যেচে নিয়েছি কার্যত, আর বাঙালি কতজন লাভের ছবি দেখেছেন তা সম্ভবত হাতে গুনে বলা যায়। গতবারের ফেস্টিভ্যালে আমার প্রবল ফেসবুক প্রচারণা সত্ত্বেও নন্দন তিনে লাভের পৌনে ৬ ঘণ্টার ‘ফ্রম হোয়াট ইজ বিফোর’ দেখতে শেষ পর্যন্ত ১০ জন পেরেছিলেন বলে শুনেছি। লাভ দেখা রীতিমত ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জিং, শরীর যখন আর দেয় না তখন দাঁতে দাঁত চেপে মনের জোরে ছবিটা দেখতে হয় শেষের ঐশ্বরিক অনুভূতির জন্য, অনেকটা বিভূতিভূষণের জলসত্র গল্পের শিরোমণি মশায় যেমন মরুভূমি প্রতিম মাঠ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন মনের এই জোরে যে পথের শেষে তাঁর জন্য এক ঘটি ঠাণ্ডা কনকনে হিমজল পুরস্কার স্বরূপ রয়েছে। বহু লোক পালিয়েছে, ঘুমিয়ে পড়েছে, ছটফট করেছে, এমনকি আমার প্রিয়তম মাস্টারমশাইদের অন্যতমও এই শহরে লাভের ৮ ঘণ্টার ‘মেলানকলিয়া’ দেখতে গিয়ে এক চতুর্থাংশ দেখে পালিয়ে নিজ জানমালের হেফাজত করেন।

    আর গোদার ফেলিনি প্রমুখ? বাঙালিরা বরাবরই নামসর্বস্বভাবে এঁদের উচ্চারণ করেন। যদিচ ভুলেও লেট গোদার নিয়ে বেশি কথা বলেন না, লেট গোদার বড় কঠিন ঠাঁই, কাছা খুলে যাবে। তো কিছু টিপিক্যাল নন্দন ব্র্যান্ড আছেন বইকি যারা এই নামগুলি ব্যবহার করেন, সে নিয়ে প্রশ্ন নেই। সৃজিতের বা বাংলা বাজারের অন্য কারুর ছবি নিয়ে বেশি কথাও বলার কিছু নেই। কিন্তু আমার প্রশ্ন হল এই বিচ্ছিন্নতার ধারণা কোথা থেকে আসছে? কিভাবে তৈরি হল এই ইনসুলারিটি? আন্তর্জাতিক সিনেমার তুলনা-প্রতিতুলনার ধারণা অবান্তর, বাংলার মাটি বাংলার জল, এটা কেন মনে হল?

    ভাবলেই মনে হবে এর জন্য আমাদের ফিল্ম সোসাইটি আর ফিল্ম স্টাডিজ উভয়েরই দায় বড় কম নয়। ফিল্ম সোসাইটি ফিল্ম ক্রিটিসিজমের কোন দীর্ঘস্থায়ী ধারাই তৈরি করতে পারেনি কণ্টিনেণ্টের মত। আর ফিল্ম স্টাডিজ জনপ্রিয় সিনেমার কালচারালিস্ট আলোচনায়, ইতিহাসাশ্রয়ী গবেষণায়, তার সঙ্গে নেশন-স্টেটের সম্পর্ক খুঁজে পেতে এত বেশি ইনভেস্ট করেছে যে সিনেমার ট্রান্স-ন্যাশনাল সংযোগের জায়গাগুলিকে ভাবতে সে ভুলে গিয়েছিল। এবং ভুলে গিয়েছিল ফিল্ম-টেক্সটটির বৃহত্তর সামাজিক-রাজনৈতিক সংযোগের প্রশ্ন ছাড়াও একটা মস্ত জিনিস আছে, সেটা টেক্সটটা স্বয়ং। তার মিজঁ-সীন, তার ইমেজ, তার শব্দ, তার সময়ের এক্সপ্লোরেশন, তার দৃষ্টিপাত (কে দেখছে? কোথায় বসছে রেকর্ডিং অ্যাপারেটাস, কেন বসছে?), তার ফিজিক্যালিটি, তার মেটিরিয়ালিটি। মহৎ ক্রিটিক ছবির এনক্লোজড বিশ্বে ঢুকে পড়বেন অন্তর্ঘাতের মত, এবং খুঁজে নেবেন বা বানিয়ে নেবেন করিডোর, যা খুলে যাবে ছবির মুক্তবিশ্বে, এক ছবি থেকে আরেক ছবিতে, ছবির সমালোচনার ভাষা হয়ে যাবে ছবিরই ভাষা। যেমন জোনাথন রোজেনবম কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অব চেরি’র উপরে লেখা প্রবন্ধে ছবির স্টাইলকেই হুবহু রচনাবয়বে নিয়ে এসেছিলেন, একটি তখন অপরের প্রতিবিম্ব, একে আমরা বলি মাইমেটিক ক্রিটিসিজম। লেসলি স্টার্ন যেমন ছবিকে পড়েন ক্রমাগত নিজের জীবন আর ছবি-শরীরে ঢুকে বেরিয়ে, যা একেবারেই এক শারীরিক অভিজ্ঞতা, ছবির রিদম আর একো, সেনসেশন আর স্টিমুলেশন সমস্ত কিছুতে তখন লেখা রেসপণ্ড করতে শুরু করে। এই হচ্ছে দ্য সাটল সায়েন্স এবং এক্স্যাক্ট আর্ট অব ফিল্ম ক্রিটিসিজম, যেখানে কোন ফুলিশ ওয়াণ্ড-ওয়েভিং না থাকায় সবাই বিশ্বাস করতে চাইবেন না যে এও ম্যাজিক। বহু সাধনার প্রয়োজন এমনিতেই। ইনসুলার হয়ে থাকলে, সারাজীবন ইন্ডিজিনাস ছবির আলোচনাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখলে, দেশের ছবির আলোচনায় অন্য প্রসঙ্গ না আনতে চাইলে, কি করে আমাদের দেশে ফিল্ম ক্রিটিসিজম ডেভেলপ করবে?
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ২৪ অক্টোবর ২০১৫ | ১৯৪৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    আয়না  - Anjan Banerjee
    আরও পড়ুন
    পত্তাদকাল - %%
    আরও পড়ুন
    বাদামি - %%
    আরও পড়ুন
    বিজাপুর - %%
    আরও পড়ুন
    হামপি - %%
    আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কল্লোল | unkwn.***.*** | ২৪ অক্টোবর ২০১৫ ১২:৪১70269
  • "ছবির সমালোচনার ভাষা হয়ে যাবে ছবিরই ভাষা। যেমন জোনাথন রোজেনবম কিয়ারোস্তামির ‘টেস্ট অব চেরি’র উপরে লেখা প্রবন্ধে ছবির স্টাইলকেই হুবহু রচনাবয়বে নিয়ে এসেছিলেন, একটি তখন অপরের প্রতিবিম্ব, একে আমরা বলি মাইমেটিক ক্রিটিসিজম।"

    এভাবে কি "বাবা কেন চাকর"এর সমালোচনা লেখা যায়? একবারটি এমন একটা ছবির সমালোচনা লিখবেন ভাই।

    কিন্তু, এখনো বোঝা গেলো না যে বজরঙ্গি ভাইজান দেখতে গেলে কেনো ফ্যানি অ্যান্ড আলেকজেন্ডার বা কোমল গান্ধার দেখতে হবে।
  • sosen | unkwn.***.*** | ২৫ অক্টোবর ২০১৫ ০২:৫২70271
  • পৌনে ছঘন্টা ধরে ছবি দেখা শুনে বুক ধড়ফড় করছে। কিন্তু লেখাটি ক্রিটিসজমের ক্রিটিসজম হলেও বেশ লাগল। আশাকরি ফিলিম ক্রিটিকদের কানে পৌঁছাচ্ছে।
  • anag | unkwn.***.*** | ২৫ অক্টোবর ২০১৫ ১০:৩৬70272
  • একটি বাজে প্রশ্ন রাখছি - সুয়াভোর রিভিউটি কোথায় পাওয়া যাচ্ছে? আমি ওটা এখনো দেখি নাই, সেজন্য বলছি।
  • পরিচয় | unkwn.***.*** | ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ০৩:০৫70273
  • অনগ, সুয়াভোর লেখাটি ফেসবুকে পাবেন। আর সোসেন, পৌনে বা পুরো ছয় ঘণ্টার ছবি লাভের কাছে কিছুই নয়। ওনার ৮, ১০, ১১ ঘণ্টার ছবি আছে। নতুন ছবি যেটা করছেন সেটা নাকি ২০ ঘণ্টা হতে পারে, সেটার ট্রেলার আধ ঘণ্টার। আর ওনার ছবি উনি সবসময় ফেস্টিভ্যাল কর্তৃপক্ষকে বাধ্য করেন ব্রেকহীন ভাবে দেখাতে। আমার ওনার পৌনে ছয় এবং পুরো ছয় ঘণ্টার ছবি হলে বসে দেখার অভিজ্ঞতা আছে। সদ্য পৌনে ছয়ের ছবিটা এই আগস্ট মাসেই দেখলাম, পাছে বাথরুমে যেতে হয় তাই জল খাইনি।
  • কল্লোল | unkwn.***.*** | ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ০৪:২৪70274
  • ঐ ২০ ঘন্টা ছাবিটির জন্য তবে উপোষ-টুপোষ করবেন নাকি?

    আপনার কাছে অতিথি, পলাতক ও নির্জন সৈকত নিয়ে একটা লেখার অনুরোধ ছিলো। সময় সুযোগ পেলে ভেবে দেখবেন।
  • pi | unkwn.***.*** | ২৬ অক্টোবর ২০১৫ ০৪:৩৯70275
  • এনাগ, উপরের ফেবু লিন্কে পেয়ে যাবেন। যদি গ্রুপে থাকেন।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে মতামত দিন