শিক্ষা : এখন আর দেরি নয়….
এই মুহূর্তে আমাদের ক্লাসরুম গুলো ভালো নেই। এক গভীর অন্ধকারে ক্রমশই তলিয়ে যাচ্ছে সরকারি স্কুলগুলো। গোটা দেশ জুড়েই এমন অবস্থা – এ বলে আমায় দেখ,তো ও বলে আমায়। এসব যে খুব সাম্প্রতিক সময়ে ঘটছে এমন কিন্তু মোটেও নয়। এ অবস্থা চলছে অনেক দিন ধরেই,হাল আমলে হয়তো এই ডুবে যাওয়াটা নতুন গতি পেয়েছে। মাত্র কিছুদিন আগে গুরুর পাতায় যদুবাবুর একটি নিবন্ধ প্রকাশ পেয়েছে যার শীর্ষক ছিল সা বিদ্যা যা বিমুক্তয়ে, যার অর্থ – প্রকৃত শিক্ষা বা জ্ঞান হলো তাই যা মানুষকে মুক্তি দেয়। বিষ্ণু ভক্ত প্রহ্লাদ তার পিতা দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুকে উদ্দেশ্য করে এই কথাটি উচ্চারণ করেছিলেন। বালক প্রহ্লাদ যে জ্ঞান পথের পথিক হতে চেয়েছিলেন তা ছিল পরম জ্ঞান সাধনার পথ। নিজেকে নতুনভাবে খুঁজে পাবার পথ। সেই পথ থেকে আমাদের শিক্ষা বহুদিন হলো “মার্গাচ্চ্যুতং ভবতি।” সেই পথে আমাদের শিক্ষার ফিরে যাওয়া উচিত কিনা? তা নিয়ে প্রবল আলোচনা হতে পারে।
আমি এই মুহূর্তে সে পথে যাবো না, কিন্তু একথায় তো ভুল নেই যে আমাদের একালের শিক্ষা কাঠামো নড়বড়ে শুধু নয় তা রীতিমতো বিলীয়মান। ২০১৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে, অর্থাৎ চলতি সরকারের শাসনামলে সরকারি স্কুলের সংখ্যা এক ধাক্কায় কমেছে ১ লক্ষেরও বেশি। স্বাভাবিক ভাবেই ছাত্র ভর্তির সংখ্যাও ৫৪% থেকে কমে এসেছে ৪৯ %এ। স্কুল আছে ছাত্র নেই অবস্থা যেমন আছে তেমনই আছে ভরপুর ছাত্র অথচ স্কুল চালাচ্ছেন মাত্র একজন শিক্ষক বা শিক্ষিকা। পাশাপাশি এই সময়ের মধ্যে অসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বেড়েছে রীতিমতো ঝড়ের গতিতে। নদীর এ কুল ভাঙলে ও কুল গড়ার নিয়ম মেনেই এই সময়ের মধ্যে অসরকারি স্কুলের সংখ্যা বেড়েছে ১৬ থেকে ৩২ শতাংশ। আর এই বৃদ্ধির ফলে দেশের মোট বিদ্যালয়ের ৩১ থেকে ৪০ শতাংশ স্কুল এখন অসরকারি মালিকানার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এই স্কুলগুলোতে পড়াশোনা করতে হাজির হয়েছে দেশের মোট ছাত্র ছাত্রীদের প্রায় ৪০ % শিক্ষার্থী। অনুপুঙ্খ অনুসন্ধানে দেখা যাবে এই হিসেবের রাজ্যওয়াড়ি চিত্রটিও সর্বত্র সমান নয়। শিক্ষা আমাদের সবচেয়ে যত্নের ক্ষেত্র না হয়ে চরম অবহেলা ও অনাদরের মঞ্চ হয়ে উঠেছে। এই বৈষম্যের বাতাবরণের মধ্যে বেড়ে ওঠা শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে যে রাষ্ট্রিয় বৈষম্যের শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে তা বোধহয় বুঝিয়ে বলার অপেক্ষা রাখেনা। স্বয়ং নীতি আয়োগের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন অসঙ্গতি আর ভয়াবহতার কথা, সুতরাং এই প্রতিবেদনকে বিরোধীদের মনগড়া রাজনৈতিক অভিসন্ধি বলে খারিজ করার কোনো উপায় নেই। তিল তিল করে ক্ষইতে থাকা একটা ব্যবস্থার কঙ্কালসার চেহারা আজ একেবারেই উন্মোচিত হয়ে গেছে।
এমনি এক বিয়োগান্তক প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে আরও এক সমীক্ষার ফলাফল। এই সমীক্ষা অবশ্য খুব সম্প্রতি করা হয়েছে তেমন নয়, গত বছরের শেষের দিকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হার্ভার্ড গ্রাজুয়েট স্কুল অফ এডুকেশনের বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী হাওয়ার্ড গার্ডনার এক চমকপ্রদ ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। গার্ডনার সাহেবের মতে – “একটি
ক্লাস ঘরের বাঁধা চৌখুপ্পির মধ্যে বসে একজন গুরুঠাকুরকে সাক্ষী রেখে একই ধরনের পাঠে মশগুল হয়ে থাকার যে সাবেকি ব্যবস্থা এতোদিন ধরে আমাদের শেখার প্রচেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে, এবার তাকে বিদায় দেবার সময় এসেছে”। একই পাঠ সকলে মিলে একইভাবে মগজস্থ করার যে পদ্ধতি যাকে এতোকাল বিণা বাক্যব্যয়ে শেখা বলে জেনেছি তা একালে একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে। এবার একে বাতিল করতে হবে। এরফলে আগামীদিনে একেবারে চেনা ঢঙের প্রাথমিক শিক্ষাটুকু দেওয়া ছাড়া একালের স্কুলগুলোতে পড়াশোনা একেবারে উঠে যাবে। গার্ডনারের মতে, ১৮ বছর বয়সে পৌঁছলেই একজন ছাত্রের শেখার পর্বটি শেষ হয়ে যাবে এমন নয়, বছর শেষের একটা মাত্র পরীক্ষায় পাওয়া গুটিকয় নম্বরের ভিত্তিতে তাদের মূল্যায়ন করা যাবেনা। পদ্ধতিতে বদল আনতেই হবে। গার্ডনার মনে করেন যে এটা আমাদের প্রচল ধারায় একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চলেছে যেখানে সকলকে একই পাঠ না শিখিয়ে প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র ভাবনার খোরাক জোগাতে হবে। গার্ডনার মনে করেন যে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে এই পরিবর্তন অনিবার্য হতে চলেছে। ইতোমধ্যেই তাঁর ভাবনা চিন্তা নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে এবং স্বাভাবিক ভাবেই এমন চিন্তা ভাবনাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মতামত দেওয়ার লোকজনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। অনেকেই মনে করছেন যে তাঁর কথায় যুক্তি আছে, তাঁকে একেবারে ভ্রান্ত বলে বাতিল করে যাবে না।
এমন একটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের দেশের শিক্ষার তথ্য শিক্ষাব্যবস্থার চেহারার যে প্রতিবিম্বটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তা যে রীতিমতো ভয়াবহ তা বোধহয় আলাদা করে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন নেই। আমাদের এই সময়ের শিক্ষা কেবলমাত্র সাবেকি, প্রাচীন ধারার নয়, জোড়াতালি দেওয়া এই ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। ফাঁক ফোকর এতোটাই যে নতুন শিক্ষা নীতির বুলি ছুটিয়ে এই ভাঙনকে ঠেকানো যাবেনা। আমাদের এখানে এখনও স্মৃতি নির্ভর শিক্ষার রমরমা, বাঁধা কিছু প্রশ্ন, বাঁধা কিছু উত্তর মুখস্থ করেই আমাদের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা নামক বৈতরণী পেরিয়ে যায় বছরের পর বছর ধরে। যাঁরা পড়ান এবং যারা পড়ে তাদের উভয়েরই চিন্তা ভাবনার ক্ষেত্রগুলো একই সুতোয় বাঁধা,ফলে যতোই তাকে নাড়িয়ে দেবার বাহ্যিক আয়োজন করা হোকনা কেন ভেতরের অন্তর্লীন ঝঙ্কারে সেই বাঁধা পর্দায় সুর সাধার পর্ব চলে। আমাদের শিক্ষা নতুন জিজ্ঞাসা,নতুন বোধের জন্ম দিতে পারছে না, আমাদের শিক্ষার্থীরা পড়ে, মুখস্থ করে, পরীক্ষার খাতায় তা উগড়ে দেয় কিন্তু নতুন প্রশ্নের সামনে নিজেকে দাঁড় করাতে শেখেনা। অথচ এমন অসার ব্যবস্থা কবেই বাতিল করে দিয়েছে গোটা দুনিয়ার অগ্রণী দেশগুলো ! আর আমরা তাকেই আঁকড়ে ধরে আছি প্রশ্নাতীত আনুগত্যে।
আসলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ধাঁচাটা গড়ে তোলা হয়েছে একটা বাতিল হয়ে যাওয়া কলোনিয়াল ব্যবস্থাপনার ওপর। এই ব্যবস্থা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার সুযোগকে একেবারে শুরু থেকেই দমিয়ে রাখতে চেয়েছে। সবার জিজ্ঞাসা যদি এক হয় তাহলে উত্তর দেওয়া খুব সহজেই সম্ভব। জনে জনে আলাদা প্রশ্ন করলে যে মহাবিপদ! ওরা যতো বেশি জানে,তত কম মানে। সুতরাং বুলডোজার দিয়ে সব প্রশ্ন,সব জিজ্ঞাসা ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও। এই ব্যবস্থার মধ্যে সবকিছুকে ভেঙেচুরে নিয়ে নিজের মতো করে সাজিয়ে নেওয়া কি সহজ ব্যাপার ? গার্ডনার মনে করেন, আগামীদিনে দুনিয়ার সব স্কুলেই কেবলমাত্র কতগুলো প্রাথমিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের তালিম দেওয়া হবে – রিডিং, রাইটিং, ম্যাথস, আর এই সময়ের প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখে কোডিং আর তারপরেই শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত হয়ে উঠবে নিজেদের সুচিন্তিত প্রকল্প রূপায়ণের কাজে, নিজের কাজের মধ্যেই নতুন করে আবিষ্কার করবে নিজেকে, আর শিখবে এই মুহূর্তের উপযুক্ত AI প্রযুক্তি ও তার ব্যবহার।
গার্ডনার সাহেবের মতামতকে মান্যতা দিলে আমাদের চলতি শিক্ষা ব্যবস্থাকে আলবিদা জানাতে হবে বৈকি।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পুঁজির বিনিয়োগ বাড়ছে। সরকার হাত তুলে দিয়েছে, আর সেই ফাঁক দিয়ে অবাধে ঢুকছে অসরকারি মূলধন। এর কারণে আমাদের দুখিনী সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে নব্য পঠনপাঠন ব্যবস্থার ব্যবধান বাড়ছে, বাড়ছে এক দুর্লঙ্ঘ্য ব্যবধান। ফারাক আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে শিক্ষার উপকরণ হিসেবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার। আমাদের বোঝানো হচ্ছে ওই সব প্রযুক্তি ছাড়া পড়াশোনা,শেখা,বোধ নির্মাণ অসম্ভব,অপূর্ণ। একথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই যে শিক্ষা ও প্রযুক্তি দুইই আবহমানকাল থেকে হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। আজ প্রযুক্তিকে শিক্ষার ওপরে ঠাঁই দেবার এক অদ্ভুত প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আজ যেন আমাদের বোঝানো হচ্ছে শিক্ষা মানে প্রযুক্তি আর প্রযুক্তিই উত্তরণের একমাত্র পথ। অভিভাবকরা এই নবায়িত ব্যবস্থাকেই সন্তানদের উত্তরণের উপায় বলে মনে করছেন। ফলে দুই ব্যবস্থার মধ্যে শূন্যতা বেড়েই চলেছে।
শিক্ষার্থীদের দিকে আঙ্গুল তুলে লাভ নেই। আজ হঠাৎ করে চিন্তাশীল হতে বললে হবে কেন? কতগুলো বস্তাপচা বুলি কপচিয়ে গিয়েছি আমরা, বলেছি এই পথেই চলা অভ্যাস করো। আমাদের ব্যবস্থাপনায় উদ্ভাবনের কোনো অবকাশ রাখিনি আমরা, তৈরি করিনি স্বাধীন চিন্তার কোনো বিকল্প পথ। আমাদের শিক্ষকরাও ওই বাঁধা নিয়মের চলনে নিজেদের অভ্যস্ত করেছেন। আজ তাই সংকট তাঁদের সামনে এসে চোখ রাঙাচ্ছে।
বদলাতে হবে অনেক। সবার আগে বদল আনতে হবে আমাদের এতোদিনের ধারনায়।সময় সংক্ষিপ্ত। তাই উদ্যোগ নিতে হবে আজ,এখনই।
সোমনাথ মুখোপাধ্যায়।
আগস্ট ৩.২০০৬.
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।