এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিদ্যাসাগর সম্মান পেলেন যিনি, তিনি বিদ্যাসাগরকে বর্ধমানে জন্ম দিয়ে ছাড়লেন। মেদিনীপুর এখনও ঠিকানা খুঁজছে।

    হারামির হাতবাক্স লেখকের গ্রাহক হোন
    ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৯৯ বার পঠিত
  • খবরটা প্রথমে পড়ে ভেবেছিলাম, WhatsApp University-র নতুন ব্যাচের ফাইনাল পরীক্ষা। তারপর টিভি৯-এর ফুটেজ দেখলাম। না, রিয়েল। একদম লাইভ। আর চারদিন পরেই, ২৬ সেপ্টেম্বর, বিদ্যাসাগরের ২০৬তম জন্মদিন। তার আগেই বাঙালি জাতি একটা নতুন গবেষণাপত্র পেয়ে গেল: "বীরসিংহ গ্রাম, জেলা বর্ধমান: এক অনাবিষ্কৃত ভূগোল।"
     
    গুগল ম্যাপ এখন কাঁদছে।
     
    স্কুল মালদার কাদিরপুরের। মঞ্চে প্রধান শিক্ষক, সদ্য 'বিদ্যাসাগর সম্মান' প্রাপ্ত। সাংবাদিক সোজা প্রশ্ন করলেন, বিদ্যাসাগর কোথায় জন্মেছিলেন? উত্তর এল: বর্ধমান। ঈশ্বরচন্দ্র শুনলে নির্ঘাত ওপর থেকে বলতেন, "বাবা, আমি অনেক জেলা ঘুরেছি, কিন্তু সীতাভোগ-মিহিদানার জেলায় জন্মানোর সৌভাগ্য হয়নি।"
     
    তারপর শুরু হল আসল খেলা। 'সহজ পাঠ' নাকি বিদ্যাসাগরের। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাও তাঁর, রবীন্দ্রনাথের ছড়াও তাঁর। হিসেবটা একবার দেখুন। বিদ্যাসাগর মারা গেছেন ১৮৯১-এ, সহজ পাঠ বেরিয়েছে ১৯৩০-এ। অর্থাৎ মৃত্যুর উনচল্লিশ বছর পরে তিনি ভূত হয়ে প্রাইমার লিখেছেন, আর ঠাকুরবাড়ি সেটা চুপচাপ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। এই গল্প নিয়ে Netflix-কে একটা ডকু-সিরিজ বানানো উচিত। নাম: "The Ghostwriter of Bengal"।
     
    পদবি জিজ্ঞেস করলে জানা গেল, সেটা আর মনে নেই। জন্ম-মৃত্যুর সালও নেই। বেচারা 'বন্দ্যোপাধ্যায়' আর 'বিদ্যাসাগর'-এর ফারাকটা বুঝিয়ে দিলেন না, সোজা ধরে নিলেন দুটোই ফ্রি-ফায়ার আইডির মতো, যার যা খুশি বসিয়ে নাও।
     
    তখন সাংবাদিক বললেন, পুরো নামটা ইংরেজিতে বোর্ডে লিখে দিন। এবার আসল সাসপেন্স। ভিডিওতে যা দেখা গেল, স্যার ইতস্তত করে বলে উঠলেন, "লাইভ বন্ধ করুন।"
     
    জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। পরীক্ষার হলে চুরি দেখেছি, ট্রেনে টিকিট ছাড়া ফাইন দেখেছি। কিন্তু লাইভ বন্ধ করতে বলা হল স্পেলিং-এর ভয়ে! ভাবুন। ঈশ্বর চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। Ishwar Chandra Bandyopadhyay। বানানটা কঠিন, কিন্তু তাই বলে ক্যামেরা অফ? ক্যামেরা তো সত্যি বলে ফেলে, সেটাই তার অপরাধ।
     
    সবচেয়ে বুক ভাঙল বাচ্চাদের দেখে। ক্লাস ফাইভ। 'অ, আ, ক, খ' বলতে পারে না। বিদ্যাসাগরকে চেনে না। যে মানুষটা 'বর্ণপরিচয়' লিখে বাংলা বর্ণমালাকে আমাদের হাতে তুলে দিলেন, তাঁর নামে সম্মানিত স্কুলে বর্ণপরিচয়ই পরিচয়-সংকটে ভুগছে। 'গোপাল অতি সুবোধ বালক'-এর গোপালের কথা আর কী বলব। এই স্কুলে সে বোধহয় ভর্তিই হয়নি, আর হলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে আছে।
     
    আর গেটের ওপরে জ্বলজ্বল করছে: "সফলতার প্রথম সিঁড়ি হলো শিক্ষা।"
     
    সিঁড়িটা আছে, মানছি। কিন্তু ওপরে ওঠার পথটা কোন দিকে? কারণ এই সম্মান-সিঁড়ি যে কোন লিফটে চড়ে নামল, সেটা বেচারা বাচ্চারা জানে না। আমরাও না।
     
    বাচ্চাগুলোর কোনো দোষ নেই। ওদের হাতে না আছে বই, না আছে শেখানোর মতো কেউ, আছে শুধু 'সফলতা' লেখা একটা দেওয়াল। ওরা ওই দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বড় হবে, আর বড় হয়ে ভোট দেবে, সম্মান দেবে, সম্মান নেবে। চক্র সম্পূর্ণ।
     
    আমার মাস্টারমশাইদের প্রতি এতটুকু রাগ নেই। যাঁরা সত্যিই স্কুলে গিয়ে, চক দিয়ে, নিজের পকেটের পয়সায় বাচ্চাদের 'ক' শেখান, তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। আমার ঝগড়া ওই সিস্টেমের সঙ্গে, যেখানে সম্মান আগে পৌঁছয়, জ্ঞান পরে আসে, আর নির্বাচন কমিটি কোন ফাইলে কার নাম টিক দিল সেটা কেউ জানে না। ফাইলটা নাকি 'গোপনীয়'। অথচ ফাইলে একবার সাধারণ জিকে-র প্রশ্ন চালালেই বোধহয় সব উত্তর খুলে যেত।
     
    বিদ্যাসাগর সারা জীবন চটি পরে সাহেবদের মুখের ওপর কথা বলেছেন। আজ বেঁচে থাকলে ওই চটিতেই সোজা মালদা চলে যেতেন। মারতে নয়, ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের পাশে বসে 'অ' শেখাতে। তারপর একটু ফুরসত পেলে বোর্ডে নিজের নামটা ইংরেজিতে লিখে রেখে যেতেন, পরের সম্মান-প্রাপকের সুবিধার জন্য।
     
    এবার আপনার পালা। ধরুন, আপনাকে এই সম্মান-কমিটির চেয়ারম্যান করা হল। প্রথম দিনেই প্রার্থীকে কোন প্রশ্নটা করবেন? কমেন্টে লিখুন। তবে সাবধান, বানান ভুল করলে কিন্তু আমরা 'লাইভ বন্ধ' করতে বলব না, স্ক্রিনশট নেব।
     
    Context:

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। খেলতে খেলতে প্রতিক্রিয়া দিন