খবরটা প্রথমে পড়ে ভেবেছিলাম, WhatsApp University-র নতুন ব্যাচের ফাইনাল পরীক্ষা। তারপর টিভি৯-এর ফুটেজ দেখলাম। না, রিয়েল। একদম লাইভ। আর চারদিন পরেই, ২৬ সেপ্টেম্বর, বিদ্যাসাগরের ২০৬তম জন্মদিন। তার আগেই বাঙালি জাতি একটা নতুন গবেষণাপত্র পেয়ে গেল: "বীরসিংহ গ্রাম, জেলা বর্ধমান: এক অনাবিষ্কৃত ভূগোল।"
গুগল ম্যাপ এখন কাঁদছে।
স্কুল মালদার কাদিরপুরের। মঞ্চে প্রধান শিক্ষক, সদ্য 'বিদ্যাসাগর সম্মান' প্রাপ্ত। সাংবাদিক সোজা প্রশ্ন করলেন, বিদ্যাসাগর কোথায় জন্মেছিলেন? উত্তর এল: বর্ধমান। ঈশ্বরচন্দ্র শুনলে নির্ঘাত ওপর থেকে বলতেন, "বাবা, আমি অনেক জেলা ঘুরেছি, কিন্তু সীতাভোগ-মিহিদানার জেলায় জন্মানোর সৌভাগ্য হয়নি।"
তারপর শুরু হল আসল খেলা। 'সহজ পাঠ' নাকি বিদ্যাসাগরের। সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতাও তাঁর, রবীন্দ্রনাথের ছড়াও তাঁর। হিসেবটা একবার দেখুন। বিদ্যাসাগর মারা গেছেন ১৮৯১-এ, সহজ পাঠ বেরিয়েছে ১৯৩০-এ। অর্থাৎ মৃত্যুর উনচল্লিশ বছর পরে তিনি ভূত হয়ে প্রাইমার লিখেছেন, আর ঠাকুরবাড়ি সেটা চুপচাপ নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছে। এই গল্প নিয়ে Netflix-কে একটা ডকু-সিরিজ বানানো উচিত। নাম: "The Ghostwriter of Bengal"।
পদবি জিজ্ঞেস করলে জানা গেল, সেটা আর মনে নেই। জন্ম-মৃত্যুর সালও নেই। বেচারা 'বন্দ্যোপাধ্যায়' আর 'বিদ্যাসাগর'-এর ফারাকটা বুঝিয়ে দিলেন না, সোজা ধরে নিলেন দুটোই ফ্রি-ফায়ার আইডির মতো, যার যা খুশি বসিয়ে নাও।
তখন সাংবাদিক বললেন, পুরো নামটা ইংরেজিতে বোর্ডে লিখে দিন। এবার আসল সাসপেন্স। ভিডিওতে যা দেখা গেল, স্যার ইতস্তত করে বলে উঠলেন, "লাইভ বন্ধ করুন।"
জীবনে অনেক কিছু দেখেছি। পরীক্ষার হলে চুরি দেখেছি, ট্রেনে টিকিট ছাড়া ফাইন দেখেছি। কিন্তু লাইভ বন্ধ করতে বলা হল স্পেলিং-এর ভয়ে! ভাবুন। ঈশ্বর চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। Ishwar Chandra Bandyopadhyay। বানানটা কঠিন, কিন্তু তাই বলে ক্যামেরা অফ? ক্যামেরা তো সত্যি বলে ফেলে, সেটাই তার অপরাধ।
সবচেয়ে বুক ভাঙল বাচ্চাদের দেখে। ক্লাস ফাইভ। 'অ, আ, ক, খ' বলতে পারে না। বিদ্যাসাগরকে চেনে না। যে মানুষটা 'বর্ণপরিচয়' লিখে বাংলা বর্ণমালাকে আমাদের হাতে তুলে দিলেন, তাঁর নামে সম্মানিত স্কুলে বর্ণপরিচয়ই পরিচয়-সংকটে ভুগছে। 'গোপাল অতি সুবোধ বালক'-এর গোপালের কথা আর কী বলব। এই স্কুলে সে বোধহয় ভর্তিই হয়নি, আর হলেও অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে আছে।
আর গেটের ওপরে জ্বলজ্বল করছে: "সফলতার প্রথম সিঁড়ি হলো শিক্ষা।"
সিঁড়িটা আছে, মানছি। কিন্তু ওপরে ওঠার পথটা কোন দিকে? কারণ এই সম্মান-সিঁড়ি যে কোন লিফটে চড়ে নামল, সেটা বেচারা বাচ্চারা জানে না। আমরাও না।
বাচ্চাগুলোর কোনো দোষ নেই। ওদের হাতে না আছে বই, না আছে শেখানোর মতো কেউ, আছে শুধু 'সফলতা' লেখা একটা দেওয়াল। ওরা ওই দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে বড় হবে, আর বড় হয়ে ভোট দেবে, সম্মান দেবে, সম্মান নেবে। চক্র সম্পূর্ণ।
আমার মাস্টারমশাইদের প্রতি এতটুকু রাগ নেই। যাঁরা সত্যিই স্কুলে গিয়ে, চক দিয়ে, নিজের পকেটের পয়সায় বাচ্চাদের 'ক' শেখান, তাঁদের সঙ্গে আমার কোনো ঝগড়া নেই। আমার ঝগড়া ওই সিস্টেমের সঙ্গে, যেখানে সম্মান আগে পৌঁছয়, জ্ঞান পরে আসে, আর নির্বাচন কমিটি কোন ফাইলে কার নাম টিক দিল সেটা কেউ জানে না। ফাইলটা নাকি 'গোপনীয়'। অথচ ফাইলে একবার সাধারণ জিকে-র প্রশ্ন চালালেই বোধহয় সব উত্তর খুলে যেত।
বিদ্যাসাগর সারা জীবন চটি পরে সাহেবদের মুখের ওপর কথা বলেছেন। আজ বেঁচে থাকলে ওই চটিতেই সোজা মালদা চলে যেতেন। মারতে নয়, ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের পাশে বসে 'অ' শেখাতে। তারপর একটু ফুরসত পেলে বোর্ডে নিজের নামটা ইংরেজিতে লিখে রেখে যেতেন, পরের সম্মান-প্রাপকের সুবিধার জন্য।
এবার আপনার পালা। ধরুন, আপনাকে এই সম্মান-কমিটির চেয়ারম্যান করা হল। প্রথম দিনেই প্রার্থীকে কোন প্রশ্নটা করবেন? কমেন্টে লিখুন। তবে সাবধান, বানান ভুল করলে কিন্তু আমরা 'লাইভ বন্ধ' করতে বলব না, স্ক্রিনশট নেব।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।