এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • না-তারকার পুজো -- সপ্তমী ও ফুলকুমারি

    প্রতিভা সরকার লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ০৫ অক্টোবর ২০১৯ | ১৮৩৮ বার পঠিত
  • পুজো নানারকম। খবরের কাগজ আর টিভিতে পাবেন সেলিব্রিটির পুজো। সে পুজো সিনেমা রিলিজের। লাইফ স্টাইল ম্যাগাজিনে পাবেন সাজসজ্জার পুজো, খাওয়াদাওয়ার পুজো। গুরুর এবারের সিরিজ এসবের বাইরে অন্য পুজোর সন্ধান দেবে। যেখানে হয়তো আলো-টালো পৌঁছয়না। পৌঁছলেও অন্যরকম। পড়ুন পুজোর মধ্যে অন্য এক পুজোর খবর। রোজ একটি করে।


    একটা ছোট কালো কাঠের দুর্গা মূর্তি আছে আমার কাছে। চালচিত্রে খোদাই করা কালো প্রতিমার মতো দেখতে আমার ঠাম্মা আমায় দিয়ে গেছিল মরণকালে। আগেই শুনেছিলাম কোনো মেয়ে ফিসফিসিয়ে দেবীর কানে নিজের মর্মান্তিক দুঃখের কথা শোনালে দেবীর গাত্রবর্ণ আরো একটু কালো হয়ে যায়।
    তাহলে এই কষ্টি পাথরের মতো রঙে এই বংশের কতো মেয়ের মনের বিষ ঢালা আছে !! তবে না কালোর এমন জেল্লা !

    এই পুজোতে একজনের কষ্টের কথা শুনে যেন চোখের কাজলের মতো আরো ঘোরা কৃষ্ণবর্ণা হয়ে গেলেন দেবী। তার সঙ্গে আমার আলাপ তো বেশি দিনের নয়। তার গায়ের রঙ কুমারী গাছের ছায়ার মতো, বসন্তের শুরুতে যার ঝাঁকড়া মাথা জুড়ে নতুন পাতার রঙ হয় টকটকে লাল। সে মেয়ের চোখেমুখে কষ্টের কালি। স্বামী সন্তান ঘর, সব সে খেইয়ে লিয়েছে গ্য। সে এক আস্ত ডাইন।

    পিনাকী মিত্র বললো অন্য মানুষের পুজোর গল্প চাই, তাইতে আমার মনে পড়ল ফুলকুমারি মেঝেনের কথা। পুরুলিয়ার ফুলকুমারি। তার হাত ধরে গল্প করার সময় একবারও তো মনে হয়নি সে নাকি এক সব-খাওয়া ডাইন, যার নামে তার গ্রাম তো গ্রাম, আশেপাশের গ্রামগুলিও ভয়ে কাঁপে। 

    এই যে এই 'খাওয়া' কথাটা, মেয়েদের ক্ষেত্রে এই কথাটার প্রয়োগ খুবই অভিনব। শুধু গ্রামীণ আদিবাসী সমাজেই নয়, খোদ কলকেতায় প্রায়ই এই কথাটি বড়ো কদর্থে ব্যবহৃত হয়। কারো স্বামী সন্তান পরিজন অসুখে মারা গেলেও আমরা অবলীলায় পেছনে বলি সবাইকে খেয়ে নিয়েছে। ঝগড়া লাগলে বাঁধা বুলি, এতো খেয়েও পেট ভরল না, এবার কি আমাকে খাবি!

    সেখানে ফুলকুমারির পেটে বাঁশের খোঁচা মেরে যদি পড়শিরা দেখে ভুক্ত মানুষটির দেহাবশেষ হজম হয়েই গেল কিনা তাহলে সেটি খুব অস্বাভাবিক হয় না, কারণ সে ঘোষিত ডাইনী। আশেপাশে সবাই বিশ্বাস করে সে নিজের স্বামী সন্তানকেই খেয়ে নিয়েছে, এতো তার খিদে। কিন্তু চোখে জল নিয়ে ফুল পুজোর দিনে আমায় যে গল্প শোনালো তা একেবারেই অন্যরকম।

    - পুজোর দিনগুলো কীভাবে কাটাও ফুল ? 

    - কী ভাবে কাটাই ! হামার স্বামীটার ক্যান্সার হঁয়েছিল। ডাক্তারবাবু বইলল উ আর বাঁচবেক নাই।

    এসব তো আমি নরেন বাবুর কাছে আগেই শুনেছি। কিন্তু পিনাকী বলে দিয়েছে পুজোর দিনের ওপর ফোকাস করতে। তাই ফুলকুমারিকে ট্র‍্যাকে ফিরিয়ে আনতে বলি,

    - এই যে তোমরা আরসা ব্লকে ঠাকুর দেখতে যাও দু/ আড়াই কিমি পায়ে হেঁটে, বাচ্চাদের নিয়ে, খুব আনন্দ হয়, না ? পাহাড়, কাশফুল, গাছপালার মধ্য দিয়ে যাও, আর কী শুদ্ধ অক্সিজেন চারদিকে !

    আমার চোখ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আবেশে বুজে আসে। আহা, কী আনন্দময় জীবন !

    ফুলকুমারির চোখে তবু কেমন ঘোর। যেন বহুদূর থেকে সে বলতে থাকে,

    - দুইটা বাচ্চার একটা গেল জ্বরে। গাঁয়ের লোক বুইলল, তুই ডাইন বটেক। মরদ, ছানা, সবাইকে খাইয়েছিস, এইবার হামরাদেরকেও খাবি। তুকে হামরা বাঁচায়ে রাইখবক নাই।

    ফুলকুমারি অবশিষ্ট ছানাটিকে কোলের কাছে টানে। মায়েপোয়ে এসে উঠেছে এই অনাথ আশ্রমে। দারোগা বলেছিল যতোক্ষণ থানার মধ্যে ততোক্ষণ নিরাপদ। কিন্তু কোনো বাঁশঝাড়ের অন্ধকারে বা নির্জন নদীর চরায় কে তার লাশ ফেলবে সে কথা পুলিশ জানবে কী ক'রে ? ফুলকুমারির আধার কার্ড, এপিক কার্ড বাক্স শুদ্ধ ছিনতাই করেছে শ্বশুরবাড়ির লোকজন। জমিজমা ভাগ কত্তে হবেক নাই এই উদের শান্তি। মিছা কথা বুলছে সবাইকে যে ফুলকুমারি নিজে সব লিয়ে গেছে।

      ফুলের কাঁধে ঝাঁপাঝাপি খেলা খেলে অনাথ আশ্রমের আরো তিন চার বাচ্চা, হাত ধরে টানে। এইবার তারা সপ্তমীর ঠাকুর দেখতে বেরোবে। কোনো ছানা নেতিয়ে পড়লে ফুলকুমারি বা পানমতী তাকে কোলে নেবে। জিলিপি খাবার বায়না ধরলে সুরেন মেলার মাঠে লাইন করে দাঁড় করাবে পঁচিশজন অনাথকে। তারপর সেকি ক্যালোরব্যালোর ! মেলাভর্তি লোক, এমনকি মা দুর্গার মৃণ্ময়ী মূর্তিও যেন হাসতে থাকবে বাচ্চাদের কান্ড দেখে।

    শুধু মন্ডপে দাঁড়িয়ে বছর পঁয়ত্রিশের ফুলকুমারি হাত জোড় ক'রে বিড়বিড় করতে থাকবে,

    - মাই, তোর মুখে হাঁসি, কিন্তু মনে দয়া নাই। নাইহলে হামদের গাঁয়ের লোক, থানা পুলুস, যারা এতো দমহে অত্যাচার কইরছে তারহাই তো অসুর বঠে। তুই তাদের বধ করছিস নাই কেনহেঃ? 

    ঘরে ফিরে দেখি আমার গৃহদেবীর গায়ে যেটুকু অন্য রঙের দাগ অবশিষ্ট ছিল তার প্রায় সবটাই উবে গেছে। এক ঘোরা কৃষ্ণা বিষণ্ণবদনা দেবী নিজের অপারগতায় যেন মুখ লুকোতে পারলেই বাঁচেন।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ০৫ অক্টোবর ২০১৯ | ১৮৩৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | unkwn.***.*** | ০৬ অক্টোবর ২০১৯ ০৩:৩৬79914
  • "মাই, তোর মুখে হাঁসি, কিন্তু মনে দয়া নাই। নাইহলে হামদের গাঁয়ের লোক, থানা পুলুস, যারা এতো দমহে অত্যাচার কইরছে তারহাই তো অসুর বঠে। তুই তাদের বধ করছিস নাই কেনহেঃ? "

    গুরুতর প্রশ্ন। লেখাটি অনেককাল ভাবাবে।

    #

    দক্ষিণ আফ্রিকার স্কুলগুলোতে নাকি একবার জরিপ করা হলে অধিকাংশ বাচ্চা জবাব দিয়েছিল, আদোতে যীশু একজন কালো মানুষ ছিলেন! কল্পিত ভগবান এভাবেই বুঝি একান্ত হয়ে ওঠেন।
  • দিলীপ ঘোষ | unkwn.***.*** | ০৬ অক্টোবর ২০১৯ ০৪:১৪79915
  • অক্ষম ধর্ম, অক্ষম রাষ্ট্র, অক্ষম সমাজের কথা, খুব অল্প কথায়!
  • Pradip Kumar Biswas | unkwn.***.*** | ০৬ অক্টোবর ২০১৯ ০৯:৪৩79916
  • কথক ঠাকুরের কথায় শুনেছি একবার দেবি চন্ডিকা এক অসুরের সাথে যুদ্ধে এএতটা যে রাগে তিনি এতটা ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন যে তিনি অগ্নিবরনা হয়ে ছিলে। সেতি প্রশ
    মিত করতে তিনি হ্রদের জলে স্নান করে কালো রঙ ধারন করে শান্ত হন। আমি চাইব দেবি এই কাহিনি শুনে ক্রোধে অগ্নি বরনা হয়ে গিয়ে এই কাহিনির অসুর দের। নিধন করু।

    . ................ ....... .
  • নিরমাল্লো | unkwn.***.*** | ০৬ অক্টোবর ২০১৯ ১১:০৮79917
  • বড় নিষ্টুর সত্য, তবে বোধহয় চিরকালীন সত্য।
  • i | unkwn.***.*** | ০৮ অক্টোবর ২০১৯ ০৭:৩০79918
  • রোজ একটি করে, তিনটি পর্বই পড়ে ফেলেছি। পর্বগুলি আপাত বিচ্ছিন্ন - পরিব্রাজকের স্কেচবই বা ডায়েরির তিনটি ছেঁড়া পাতা- অথচ কৃষ্ণবর্ণা দেবীর মিথ, স্বপ্নার কন্যার আঁকা নৌকো, নদী পেরিয়ে তেলকুপি গ্রামের মন্দিরে জিতেনের ভাঙা স্বরে দেবীর আরেক আখ্যান- একটি বিনি সুতোয় গাঁথা মালা যেন।
  • দ্যুতি | unkwn.***.*** | ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ১০:০৮79919
  • আমার বিয়ের পর থেকে কয়লা খনি জীবন। মাঝে দু বছরধানবাদ মেইন শহরে গিয়ে আবার ফিরি পুরনো কোলিয়ারি মুনিডিতে। একটু শহুরে হাওয়া গায়ে লাগছিল।ফিরে মনে হচ্ছে এই জায়গাগুলো পৃথিবীধ্বংস হলেও এক থাকবে। এরকম এক ব্যাপার এখানের বস্তি জুড়ে। সেখানে নাকি মন্ত্র পড়ে মানুষ মারে কিম্বা তার অসুখ হয়। কোনো অশরীরীআত্মা ভরকরে, এরকমকত বিশ্বাস আজো।
    এদের বলে বুঝিয়ে হয় না কিছুই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা খুশি মতামত দিন