এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • চেনা ওবেলিস্ক আর ধুলোট মৃত্তিকা

    শিবাংশু লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১৩ এপ্রিল ২০১৪ | ১৪৫১ বার পঠিত
  • ফাগুনের শুরু হতেই.......
    ----------------------------

    আবার বছর ত্রিশ পরে
    তার কথা লেখা হয় যদি,

    আবার বছর ত্রিশ পরে................

    একটা বিয়ের আমন্ত্রণপত্র ছাপা হয়েছিলো ঠিক তিরিশ বছর আগে। শুরুতে ছিলো প্রিয় কবির এই কবিতাংশটি, " সবিতা, মানুষজন্ম আমরা পেয়েছি, কোনও এক বসন্তের রাতে...." ;
    যাঁরা বুঝেছিলেন, তাঁরা জানতে চাননি, কেন এই কবিতাটি এলো। বাকি কিছু লোকজন হয়তো ভেবেছিলেন এই সব কবিটবির কারবারই আলাদা, না বোঝাই ভালো। অল্প কয়েকজন বয়স্য জানতে চেয়েছিলো, " এই সবিতাটি কে ? " কারণ, তারা অনেক বালিকার সঙ্গেই আমাকে যোগবিয়োগ করতো, কিন্তু তাদের মধ্যে তো 'সবিতা' নামে কেউ ছিলোনা।
    ----------------------------------------------------

    ধারধোর করে বিয়ে করেছিলুম। সেই ধাক্কা সামলাবার পর আর মধুচন্দ্র জাতীয় বিলাসিতার রেস্তো ছিলোনা। তাছাড়া আদর্শ বাঙালি ছেলের মতো টোপর নামিয়েই পুরী এক্সপ্রেস ধরতে ছোটার 'সাব-অল্টার্ন' তাড়নাও ছিলোনা কোথাও ( অবশ্য টোপর নামক একটি অতি কুরুচিকর গর্দভমুকুটের প্রতি আগ্রহী হবার কোনও কারণও বোধ করিনি। কারো কারো কাছে এটি একটি মিনি সমাজবিপ্লবের ঔদ্ধত্যের নিদর্শনও মনে হয়েছিলো সেকালে) । নবপরিণীতা ছিলেন কিঞ্চিৎ মেমসাহেব জাতীয়। তাঁর বন্ধুবান্ধব তো একশোভাগ, মায় তাঁর পিতামাতাও শুনেছি সেকালে সিমলাপাহাড়ে মধুচন্দ্র যাপন করেছিলেন। তাই সেই কন্যার কাছে জোড় ছেড়ে পাৎলুন পরার পরের অধ্যায়ই মধুচন্দ্র। অথচ সিমলাপাহাড় তো দূরের কথা, দলমাপাহাড়ও ছিলো তখন আমার নাগালের বাইরে। প্রস্তাব দিয়েছিলুম, চাইবাসা যাবে ? তবে তিনি তো বিবাহের পূর্বে সুনীল, শক্তি, সমীর, সন্দীপন কিছুই পড়েননি, তাই চাইবাসা নামক গ্রামটির প্রতি তাঁর ধারণাটি ছিলো নিতান্ত অবমাননাকর। অন্তত মধুচন্দ্রে যাবার পক্ষে নৈব নৈব চ। বিয়ে হবার আগে তিনি শুনেছিলেন বালকটি পদ্যটদ্য করে। কিন্তু তা বলে এতোটা ? সম্ভবত তখন থেকেই তিনি এই বিবাহটির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশা জলাঞ্জলি দেন। সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলেছে।

    কন্যার জীবনে কপিবুক মধুচন্দ্র আর আসেনি।
    -----------------------------------------------------------------

    পুরুষানুক্রমিক উত্তরাধিকার হিসেবে যে 'সবিতা'কে পেয়েছিলুম, তার জন্য কোনও টাকা খরচটরচ করতে হয়নি। তিনি ছিলেন মহর্ষির কনিষ্ঠ সন্তান। দিলদার মানুষ, দু'হাত ভরে দিয়ে গেছেন অনেক সম্পত্তি। তবে কোনও অর্থকরী ইশারা ছিলোনা সেখানে। সবটাই পরমার্থ। তিনি ছিলেন না সশরীরে, কিন্তু তাঁর ইজারা নেওয়া গ্রামে ছিলো প্রায় নিত্য গতায়াত। পর্ণা সিরিজের প্রথমদিকে সেই সব মুকাবিলার গল্প হয়তো কেউ কেউ পড়েছেনও। ইচ্ছে ছিলো কখনও সেই কন্যাকে নিয়ে সব বাঙালির জন্য বলিপ্রদত্ত ভুবনডাঙ্গায় তিনপহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো। মধুচন্দ্র নাই হোক, নিম অমাবস্যা হি সহি.....
    ------------------------------------------------------------

    একটা সময় ছিলো যখন ভাবতুম, ".... কী হবে ঘর ভাড়া দিয়ে, গাছতলাতে থাকবো শুয়ে / অতিথশালায় আসবো খেয়ে, করলাম অঙ্গীকার /

    আমি হাওয়া খেয়ে করবো পীরিত, ভাবনা কী তোমার ?"

    সেতো আজ দূররজনীর স্বপন যেন, দূর ফাগুনের বেদনও বলা যায় তাকে....। কন্যাকে বুলেটে চড়িয়ে এই সাতশো কিমি উড়ে যাবার কথা এখন আর ভাবিনা। তবু তেনাকে একবার শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাবো ভাবছি গত তিরিশ বছর। কেন হয়ে ওঠেনি, জানিনা। পায়ের তলায় সর্ষে তো ফুরোয় না। কিন্তু তবু হয়নি। এর মধ্যে নিমাইসাধন ভগ্ননীড় ঘোষণা করলেন, কোনও ভালোমানুষের পো নোবেল উড়িয়ে দিলো, শেষে রজতকান্ত এসে সারা খোলা মাঠঘাট ঘিরে ফেললেন পাঁচিলে পাঁচিলে। ঠিক যেভাবে ছোটোবেলা থেকে দেখছি টাটাবাবা তার জমিদারি ঘিরে রাখে জবরদখল বাঁচাতে। অতো চেনা মাঠপ্রান্তর, পথঘাট, তাদের উদাত্ত উন্মুক্ততা হারিয়ে ফেললো রূঢ় লালফিতের বাঁধনে। আমাদের শান্তিনিকেতন একটু একটু হারিয়ে ফেলছে সেই সব চরিত্র, যার টানে যেকোনও সময় নির্ভার ছুটে যাওয়া যেতো, চুপ করে কোপাই, খোয়াই, তিনপাহাড়ের কোণায় বসে নি:শব্দের গান শুনে জমে যেতো নেশার মৌতাত।
    -----------------------------------------------------------

    ছুটির নিমন্ত্রণ তো সতত বহাল থাকেই কয়েকজন আত্মজনের সঙ্গে। তাদের মধ্যে দু'জন এখন বিশ্বভারতীর বাংলা অধ্যাপক। একজন, ভগ্নীপ্রতিম, অপরজন তার সূত্রে পাওয়া অনুজ বন্ধু, যাদের সঙ্গে গপ্পোসপ্পো ফুরিয়ে ফেলা যায়না কখনও। দিন তো মাত্র চব্বিশঘন্টার। তাদের নিজস্ব দোতলা এখন সীমান্তপল্লী পেরিয়ে বাগানপাড়ায়। হঠাৎ ভাবা গেলো এবারের দূর ফাগুনের বেদন উদযাপন করতে যাই একবার ভুবনডাঙ্গায়। ত্রিংশশতাব্দীর উদযাপন যখন, প্রাণের আরাম,মনের আনন্দ তো চাইই। ছাতিমতলায় তার অফুরান আয়োজন।
    -------------------------------------------------------------

    বাড়ি থেকে রেলগাড়ি ধরতে যখন বেরোলুম তখনও শুকতারা জ্বলজ্বলে। কৃষ্ণকলি ভোরে শিরশির বয়ে যাওয়া ললিতবসন্তের ফাল্গুন। যাবো নিশ্চিন্তিপুর।


    ও পথিক হাওয়া
    ---------------------------
    জনশতাব্দী এক্সপ্রেস ভুবনেশ্বর থেকে হাওড়া পৌঁছোতে সময় নেয় সাত ঘন্টা। তার পর কিছুক্ষণ হাওড়া টিশনে লোকজন দেখে সময় কেটে যায়। অগণন মানুষের এরকম একটি বর্ণময়, ছন্দময় কোলাজ আমি তো কোথায় দেখিনি। শাশ্বত চলমান ইনস্টলেশন শিল্প। এক মূহুর্তের পুনরাবৃত্তি নেই তার। বোলপুরের লাইনে এখন অসংখ্য রেলগাড়ি। সেই দানাপুর প্যাসেন্জার বা রামপুরহাট ঠ্যালাগাড়ির আঠেরো শতকের বিলাস আর নেই। তাদের মধ্যে নবীনতম নিউ জলপাইগুড়ি শতাব্দী একটা সরেস গাড়ি। নতুন, আরামপ্রদ এবং বিন্যস্ত। বোলপুর পর্যন্ত থামেনা কোথাও, এমনকি বর্ধমানেও না। সোয়া ঘন্টায় পৌঁছে যায় গন্তব্যে। মসৃণগতিতে গাড়ি এগিয়ে যায়। বর্ধমান পেরিয়ে যায়, গুসকরা পেরিয়ে যায় নি:শব্দে, না থেমে, ভাবা যায় ? আশেপাশে নানা মডেলের শান্তিনিকেতনী কিছু খ্যাত-অখ্যাত সহযাত্রীদের দেখি। বাঙালি, কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্যোতি আছে তাঁদের কারো কারো। অজয় ব্রিজের ঝমঝমের মধ্যে ফোন আসে, এখুনি ক্লাস শেষ হলো। ঠিক সময়ে পৌঁছে যাবো। দেখতে না পেলে একটু দাঁড়াবেন। গাড়ি থামলো, নীচু প্ল্যাটফর্ম। ঠিক যেমন দেখেছি তিরিশ বছর আগে। স্টেশন দেউড়ির সামনে সহাস্য আননে দাঁড়িয়ে আছে অভ্র তার নীল গাড়িটি নিয়ে।
    --------------------------------------------------------------

    অভ্র ও তার স্ত্রী শ্রীলা বিশ্বভারতীর বাংলা অধ্যাপক। বাংলা স্ল্যাং নিয়ে গবেষণা প্রসঙ্গে অভ্রকে অনেকে চেনে। শ্রীলার গবেষণা ছিলো পরিচয় পত্রিকা ও রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে। সমাজতন্ত্রী বাঙালিমননে কবির জায়গাজমি নিয়ে এই সন্দর্ভটি একটি মূল্যবান সংযোজন। অবশ্য তারা এই নিয়েই থেমে থাকেনি। নিত্যনব উদ্ভাবনায় কাজ করে বিচিত্র বিষয় সমূহ নিয়ে। একটি পরস্পর পরিপূরক দম্পতি। শ্রীলা জামশেদপুরের মেয়ে, আমার আপন ভগ্নীপ্রতিম, আমার গুরু শঙ্খ ঘোষের প্রিয় ছাত্রী। অভ্র, খ্যাতনাম পন্ডিত অধ্যাপক প্রয়াত সোমেন্দ্রনাথ বসুর পুত্র। বাংলা, বাঙালি, বাঙালিয়ানার যে স্বীকৃত প্রকারটি আমাদের ধারণায় প্রোথিত, পারিবারিক ঐতিহ্য নির্বাহী দুজনে তাকে ধরে রাখে অনায়াস স্ফূর্তিতে। তাদের আতিথ্যস্বীকার করেই আমাদের এই যাত্রা।
    ------------------------------------------------------------------

    বোলপুর স্টেশন চত্বর থেকে বেরিয়েই সেই ঘিঞ্জি বাজারের রাস্তা। মহর্ষির সময় থেকেই তার কোন স্ফীতিবৃদ্ধি হয়নি মনে হয়। শান্তিনিকেতনের মতো একটা আন্তর্জাতিক ঠিকানাকে ধারণ করার বিন্দুমাত্র পরিসর নেই এই রাস্তাটিতে। পুরোনো বারাণসির পথঘাটের থেকেও শীর্ণ, সঙ্কুচিত। দু'তিনটি মোড়ের গিঁট পেরিয়ে বোলপুর থেকে শ্রীনিকেতনমুখী বড়ো রাস্তায় কিঞ্চিৎ স্বস্তি। সেইপথে চোখে পড়বে কবিগুরু অপটিক্যালস, রবীন্দ্রবস্ত্রভান্ডার বা বিশ্বকবি শু স্টোর্সের সারি। তবে একটু চমকে গেলুম পথের ডানদিকে একটি দোকানের নাম দেখে। 'পর্ণা হার্ডওয়্যার' নাম তার। পর্ণাকে শান্তিনিকেতন মনে রাখবে সেই বিশ্বাস নিশ্চয় ছিলো। কিন্তু তা বলে ঐ সারি সারি লোহার ছড়, সিমেন্টের বস্তা আর স্যানিটারি ফিটিংসের বেষ্টনীতে ঘেরা পর্ণার মুখটা আর মেলাতে পারলুম না। তবে ভরসা আছে, হারায়নি তা হারায়নি, বৈতরণী পারায়নি .......
    ----------------------------------------------------------

    অভ্র যে পথে গাড়িটি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলো, সেই সব রাস্তা মনে করাবে কুমোরপাড়ার গরুর গাড়ির অনুষঙ্গ। মোটরগাড়ি সেখানে এখনও বহিরাগত। সিমেন্টবাঁধানো পথের ভুলভুলাইয়া, সীমান্তপল্লী, মাঝিপাড়া, বাগানপাড়া, শেষ তক পৌঁছে গেলো 'খাপছাড়া', শ্রীলা-অভ্রের ভদ্রাসন। বাড়ির পথটি শেষে গিয়ে ঘা দিচ্ছে একটি পাঁচিলের গায়ে। নজর করে দেখি পাঁচিলের ওপারে এইতো সেই বিনয়ভবনের পিছুটানা অনন্ত মাঠ, কিন্তু তা আজ যেন বার্লিন দেওয়ালের অন্য পার। তাকে পেরিয়ে পায়ে পায়ে শ্রীনিকেতনের পুরোনো রাস্তায় পৌঁছোনো যাবেনা আর।
    ---------------------------------------------------------------

    আমি চা খাইনা। এতোটা পথ সফর করে এসেও কেমিতি বঙ্গসন্তান চা না খেয়েই এক্ষুনি বেরোতে চায় কোপাইয়ে কেমন সূর্য ডোবে এখনও, তা দেখার জন্য। রসিকরা তাড়াহুড়ো করে তাদের চায়ের পেয়ালা শেষ করে ফেলে। গাড়িতে কতোটুকু আর পথ ? একসময় হেঁটে যেন ফুরোতেই চাইতো না। ব্রিজ অন রিভার কোপাইয়ের কাছে এসে অভ্রের গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। নদীর ধার দিয়ে মোরম বাঁধানো রাস্তা। কিন্তু নদীটা কোথায় গেলো? এতো শীর্ণা, দীনা একটি জলধারা কতোদিন ধরে কতো শব্দকথা, শিল্পকথার টানা বিষয় হয়ে থেকে গেছে, তাকে তো আর খুঁজে পাওয়া গেলোনা। হয়তো সেই আফশোসেই শেষসূর্যও ডুব দিলো শালবন, বাঁশবাগানের আড়ালে। বাতাসে কোনও শীতলতা নেই, কিন্তু বহু নতুনদা-নতুনদি'দের ঘুরে বেড়াতে দেখলুম চাদর-টুপি-মাফলার গায়ে দুয়োরাণী কোপাইয়ের এপারওপার। দু'য়েকজন সব্জিটব্জি নিয়ে বসেছেন রাস্তার ওপারে। বাউলের মতো কয়েকজন লোকশিল্পী ইধরউধর গুবগুবি, দোতারা নিয়ে গান গাইছেন। ভালো-ই গাইছিলেন তাঁরা, তবে গানগুলি কলকাত্তাই শ্রোতাদের সঙ্গে মেলানো বাউলগান। এখন আর টানেনা। হয়তো শুনতে চাইলে এক-আধটা অসলি চিজ বেরোতেও পারতো, কিন্তু তখন আর সময় নেই। নিমীল সন্ধ্যা নামিছে মন্দমন্থরে.....
    -------------------------------------------------------------------

    প্রথম সাঁঝের ঝুঁঝকো সায়ন্তন, চেনা রাস্তা, চেনা ছায়া, চেনা চেনা ধুলোট লালিমা..... ফিরে আসে চেনা ওবেলিস্ক....

    (ক্রমশঃ)

    উঠিল বনের তৃণ....
    -------------------------------------------
    রাতে শুতে যাবার সময় অভ্র বলে দিয়েছিলো কাল সক্কালে পাঠভবনের বসন্ত-আবাহন অনুষ্ঠান আছে। এই অনুষ্ঠানটি সচরাচর শ্রীপঞ্চমীর সকালে পালন করা হয়, কিন্তু এবার কোনও কারণে হতে পারেনি। তাই রোববার, ন'তারিখে।

    যাঁরা শান্তিনিকেতন বলতে জানেন পৌষমেলা আর বসন্ত-উৎসব, তাঁরা বেশ বঞ্চিত প্রজাতি। দুটো'ই বহুদিন হলো স্থূল বাণিজ্যিক বিড়ম্বনায় পর্যবসিত হয়েছে। যাঁরা সামান্য হলেও পুরোনো স্মৃতি বা বহুচর্চিত শান্তিনিকেতনী রুচিবোধকে এখনও প্রাসঙ্গিক মনে করেন, তাঁদের উচিত শ্রীনিকেতন কুঠিবাড়ির প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত মাঘমেলা আর পাঠভবনের ছোটদের উপস্থাপনায় এই বসন্ত-আবাহনকে এসে একবার দেখা। মোটামুটি পাঁচ থেকে দশ কেলাসের ছেলেমেয়েরা উজ্জ্বল বর্ণময় সাজ-পোষাক, সঙ্গীত-নৃত্যে ভরিয়ে রাখলো পাঠভবনের বৃক্ষময় অঙ্গনটিকে। বসন্ত পর্যায়ের অতিশ্রুত গানগুলি বালকবালিকাগুলি যে সরল দক্ষতায় শোনালো আমাদের, সঙ্গে নয়নমোহন বর্ণোজ্জ্বল নৃত্যভঙ্গ, আমি সারাদেশে কোথাও তা পাইনি। হ্যাঁ, কলকাতাতেও তার জুড়ি পাওয়া যায়না।
    ----------------------------------------------------------

    শান্তিনিকেতনের খেলার মাঠটিকে একসময় একসময় মনে হতো অনন্তপ্রান্তর। মাঠের উত্তরপ্রান্ত থেকে ঐপারের মরূদ্যান, অর্থাৎ সারি সারি তিনটি ছাত্রী-আবাস, শ্রীসদন, বিড়লা আর গোয়েঙ্কা যেন ভবসাগরের অন্যপারের এক দৈবী স্বপ্ন। স্বপ্নই তো। বহুদিন আগে একদিন মাঠ পেরিয়ে একটা রোগা ফর্সা ধারালো মেয়ে নিজের হাতে বাঁধা বিছানা আর তোরঙ্গ নিয়ে থাকতে এসেছিলো শ্রীসদনের একটা ঘরে। দূরে কোথাও তার বাবা জেলশয্যায় আর মা রোগশয্যায় কাতর, বিচ্ছিন্ন। বহুদিন পরে মেয়েটি দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলো। একটা ঘর তার নামে এখনও রাখা আছে সেখানে। উর্দুতে বলতে গেলে ঐ চৌহদ্দির " গর্দিশ মেঁ হ্যাঁয়, চাঁদতারোঁ কা নিজাম"। তখন মাঠের বেড়াবাঁধা কোনও সীমা সংক্ষেপ ছিলোনা একেবারে। উত্তরপাশের রাস্তাটি টানা পশ্চিমদিকে চলে গেছে চীনাভবন হয়ে হিন্দিভবন। পাঠভবন যেতে গেলে গাড়ি রাখতে হবে ঐ মাঠের পাশে, বৃক্ষরাজির ছায়ায়।
    সেখান থেকে পায়ে পায়ে শ্রীসদনের রাস্তা পার করে ( অভ্র জানালো ঐ রাস্তাটির এখন নাম হয়েছে 'দু:খহরণ রোড'। যদিও দু:খবরণ করার জন্যও ঐ রাস্তাটিকে আশ্রয় করা যেতে পারে। শ্রীসদন ও বিড়লা ছাত্রী আবাসের আঙ্গিনায় রামকিংকরের যে মহিষ-আনন মকরপুচ্ছ মূল ভাস্কর্যটি এবং নৃত্যপরা নারীমূর্তিটি রয়েছে, দু'টিই শান্তিনিকেতন ঘরানার প্রতিনিধিমূলক নিদর্শন। এড়িয়ে গেলে চলবে না। এই পথটিতে সাইকেল আরোহিণীদের অন্তহীন আসাযাওয়া থেকেই বোধ হয় লেখা হয়েছিলো, ".... শুধু দেখা পাওয়া, শুধু ছুঁয়ে যাওয়া,/ শুধু দূরে যেতে যেতে কেঁদে চাওয়া, / শুধু নব দুরাশায় আগে চলে যায়-/ পিছে ফেলে যায় মিছে আশা.."। রসিক কবি কিন্তু এই গানটিকে গ্রন্থিত করেছিলেন 'বিচিত্র' পর্যায়ে।

    ভাবি, কতো কিছু শেখার বাকি থেকে গেছে.....
    --------------------------------------

    রাস্তাটি গিয়ে থামছে 'চৈতি' নামের মন্ডপটিতে। ছোট্টো কাঁচঢাকা বাংলা ধাঁচের একটি প্রদর্শশালা। নন্দলাল ভেবেছিলেন ছাত্রছাত্রীদের উত্তম শিল্পকাজগুলিকে এখানে দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে।

    ডানদিকে ফিরলেই পাঠভবনের প্রশস্ত অঙ্গন। 'শান্তিনিকেতন' নামক প্রায়োগিক ধারণাটি শুরু হয়েছিলো এই নির্মাণটির মধ্যে দিয়েই।
    --------------------------------------------------------------------
    দক্ষিণ ঘুরতেই ভেসে এলো কচিকাঁচাদের গলায় উদাত্ত স্বর সম্মোহন। ".............তোমার বাস কোথা হে পথিক?" এগিয়ে যাই স্রোতের অভিমুখে। পাঠভবনের পাশের বিস্তীর্ণ আমবাগানের খোলা মঞ্চটিতে আসর বসেছে বসন্ত -আবাহনের। গেরুয়া বসনের ছাত্র সম্পুট আর বাসন্তীবেশিনী ছোটো মেয়েগুলি হলুদ পলাশবন হয়ে ঘিরে বসে আছে অনুষ্ঠানমঞ্চ আর তার সঙ্গে কিছু দর্শকশ্রোতা আর অভিভাবকেরা। তাঁদের সবার হাতেই ক্যামেরা, সচলছবির, নয় অচল প্রতিবিম্ব। আমিও তাঁদের সঙ্গে যোগ দিই। সঙ্গিনী এ ধরণের অনুষ্ঠানের কথা শুনেছেন অনেক, কিন্তু দেখেননি কখনও। আমাদের মফস্সল প্রয়াসে গড়ে তোলা অসংখ্য অনুষ্ঠানের প্রযোজনা তিনি ইতোপূর্বে দেখেছেন, কিন্তু নবীনদের এই স্ফূর্ত আত্মপ্রকাশের সাক্ষী কখনও থাকেননি। তিনি একজন প্রথম শ্রোতা, তথাপি তাঁর মুগ্ধতার ভাগী হলুম, আমিও।
    ------------------------------------------------------------

    অনুষ্ঠানটি ভাঙার পর যে দৃশ্যটির জন্ম হলো তা দেখে এই বয়সে বুঝতে পারি, কবি কাকে খেলা ভাঙার খেলা বলেছিলেন। আমাদের লোহার শহরে গড়ন্ত বয়সকালে এমন ঋদ্ধ রসের আয়োজন আমাদের নসিব হয়নি।

    পিছনের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলো একটি একা রাধাচূড়া। তার গায়ের পত্রসবুজ ঝরে গেছে, শুধু মুকুটের মতো ছেয়ে আছে হলুদবসন্তের লা মার্সাই। সঙ্গিনীকে বললুম, একবার ঐ গাছটির সামনে দাঁড়াও তো। এই অন্য আলোটি একবার ক্যামেরায় ধরতে চাই।

    সিংহসদনের পুরোনো ঘন্টা বেজে উঠলো, একেবারে ঠিকসময়।

    (ক্রমশ:)

    কে সে মোর, কেই বা জানে....
    ------------------------------------

    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী গিয়েছিলেন যশোরের নরেন্দ্রপুরে। তাঁর বাপের বাড়ির দেশ। সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিদাদা, নতুন বৌঠান, সুরেন-বিবি এবং তাঁর ছোটো দেবর। দেবরটির বয়স তখন বাইশ। বিলেতফেরত এবং বেশ খ্যাতিমান লেখকের স্বীকৃতি পেয়ে গেছেন ইতোমধ্যে। কিন্তু তাঁর পিতৃদেব বিশেষ শংকিত তার নানা বিষয়বুদ্ধিরহিত কার্যকলাপে। মেজবৌঠানকে তিনি আদেশ করেছিলেন যতো শীঘ্র সম্ভব দেবরটিকে বিবাহ দিয়ে বিষয়সংসারে লিপ্ত করার প্রয়াস করতে। পিতৃদেবের আর কী দোষ ? অতো বিশালমাপের ভূসম্পত্তি দেখাশোনা করার লোক পাওয়া যাচ্ছেনা। বড়ো ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথ প্রতিভা ও পাগলামির সীমারেখায় দাঁড়িয়ে থাকেন। এলেমদার মেজোছেলে সরকারি চাকরি নিয়ে সুদূরবাসী। সেজো পুত্র হেমেন্দ্রনাথের ব্যাপারটি একটু গোলমেলে। মহর্ষি যেন তাঁকে ঠিক ভরসা করেন না। বীরেন্দ্রনাথ আর সোমেন্দ্রনাথ বদ্ধ উন্মাদ। আর জ্যোতিদাদা পিতামহের মতো ব্যবসায় বিশ্বাস করেন, জমিদারিতে নয়। অথচ গান-বাজনা-নাটক- কবিতা ইত্যাদির ফাঁকে যে সময়টুকু বাঁচে সেটুকু দিয়ে ব্যবসা চালানোর মতো বিষয়বুদ্ধি তাঁর নেই। শেষ পর্যন্ত ভরসা রবীন্দ্র। কিন্তু তিনিও নির্ঝরের স্বপ্নে মশগুল। এমতাবস্থায় তাঁকে বিয়ে দিয়ে সংসারী না করলে জমিদারি তো প্রায় গোল্লায় যায়। অতএব সব পাতি বাঙালি বাপ-মায়ের মতো মহর্ষিও রবি'র আশু বিবাহ দিতে অগ্রণী হলেন। কিন্তু সেই চিরকেলে বল্লালি বালাই। একে বেম্ম তায় পিরিলি। সারা বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ কুলগৌরবের শ্রেষ্ঠতমা কন্যাটি যাঁকে পেলে ধন্য হয়ে যাবে তাঁর জন্য মেজোবৌঠান হন্নে হয়ে গন্ডগ্রামের আট বছরের একটি শিশুকন্যাকে খুঁজে যাচ্ছেন। কিচ্ছু চাইনা, শুধু মেয়ে হলেই হলো। দু'চারটি দেখেছেনও, কিন্তু এতো নীরেস। রবি তো দূরের কথা, তাঁর নিজের পক্ষেও একেবারে নৈরাশ্যজনক। এদিকে কলকাতায় ফেরার সময় এগিয়ে আসছে। এই সময় তাঁদের দর্শন করতে আসেন জোড়াসাঁকোর সেরেস্তার একজন কনিষ্ঠ কেরানি বেণীমাধব রায়। তিনি তাঁর বয়স্থা কন্যাটিকে ( বয়স নয় বছর)পাত্রস্থ না করতে পেরে উদ্বিগ্ন হয়ে লম্বা ছুটি নিয়েছেন। একটা হেস্তনেস্ত করেই ফিরবেন এবার। করজোড়ে, বিগলিত বিনয়ে তিনি কর্তাদের আমন্ত্রণ করলেন তাঁর গৃহে একবার পদধূলি দিতে। জানেন না কর্তারা আদৌ রাজি হবেন কি না। জ্যোতিদাদা বললেন, বেশ যাবো একবার। পরদিন সবাই মিলে গেলেন বেণীমাধবের গৃহে। বেণীমাধব কীভাবে আপ্যায়ন করবেন ভেবে পাননা। কন্যা ভবীর উপর ভার দিয়েছেন অতিথিদের মিষ্টান্ন পরিবেশন করতে। সেই শ্যামলী নয় বছরের বালিকাটির অবস্থাও তথৈবচ। এতোজন রাজাগজাকে কীভাবে আদর করতে হবে সে কিছুই জানেনা। যাই হোক মেজোবৌঠান ভবীকে দেখে তাঁর স্কন্ধলগ্ন ভারটি থেকে মুক্ত হবার একটা উপায় খুঁজে পেলেন। জ্যোতিদাদা একটু আপত্তি করেছিলেন। কারণ তাঁর স্ত্রীও ঠাকুরবাড়ির মিষ্টান্নপরীক্ষকের ( কিঞ্চিৎ সম্মানিত পরিচারকই বলা যায় ) পৌত্রী।

    আন্না তরখড়, স্কটবোনেদের সঙ্গ করে আসা রবি কিছুতেই রাজি নয়। শেষে মহর্ষি তাঁকে মুসৌরিতে ডেকে পাঠালেন। সোজা ভেটো, তোমাকে ঐ মেয়েকেই বিবাহ করে বিষয়কর্মে মনোসংযোগ করতে হবে। ওসব গানবাজনা, গদ্যপদ্য অনেক হয়েছে। কত্তাবাবার ইচ্ছাই আইন। সেই ভবী ওরফে ভবতারিণী একটি 'কাপড়ের পুঁটলি'র রূপ নিয়ে বাবু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী হয়ে জোড়াসাঁকোতে পদার্পণ করলেন। আসলে বেণীমাধবের ঘরভাড়া করে মেয়ের বিয়ে দেওয়ার সঙ্গতিও ছিলোনা। তাই বিবাহটিও ঠাকুরবাড়িতেই সম্পন্ন হয়েছিলো। সেখান থেকে 'ভাই ছুটি' একটি ইতিহাস।
    ----------------------------------------------------------------
    'নতুন বাড়ি' বলে তিনটি খড়ছাওয়া কুঁড়েঘরের যে আশ্রয়টি রয়েছে, সেখানে আমরা দু'জন দাঁড়িয়ে এই সব সাতপাঁচই ভাবছিলুম। ব্রহ্মচর্যাশ্রমের সব ছাত্র, শিক্ষক আর অন্যসব আশ্রমিকদের জন্য সারা দিনরাত কাঠের উনুনে তিনি রান্না করে যেতেন। পাচক রাখার সঙ্গতি ছিলোনা তখন। ছেলে রথী লিখেছেন, মায়ের সম্ভবত কালাজ্বর হয়েছিলো। সারাদিন গরমে, ধোঁয়ায় পাকশাল সামলাতে সামলাতে তাঁর অত্যন্ত স্বাস্থ্যহানি হয়েছিলো। রোগের ধকল আর সামলাতে পারেননি। এই নতুনবাড়িটি ( বস্তুত নিতান্ত মাটির কুঁড়েঘর) তৈরি করা হয়েছিলো তাঁর জন্যই। রোগমুক্তির পর যখন তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে আসবেন, তখন ছেলেমেয়েদের নিয়ে যাতে একটু শান্তিতে থাকতে পারেন। সেই ফিরে আসা আর হয়নি। ছোটোবৌয়ের 'নতুন'বাড়ি তাঁর জন্য নতুনই থেকে গেছে। দুদিকে এককামরার দু'টি ঘর আর মাঝখানের একচিলতে উঠোনের পিছনে আরেকটি মাটির ঘর। প্রিন্স দ্বারকানাথের পৌত্রবধূর না-দেখা আশ্রয়। ঠিক তার পাশেই বেশ বড়ো দেহলি বাড়ি। কবি সেখানে থেকেছেন বহুদিন। ঐ দেহলি বাড়ির সামনেই তো মুজতবা আলিসাহেবের মরাঠি বন্ধু ভান্ডারে, কবিকে দরবেশ ভেবে জোর করে পুরো অঠন্নি বকশিস দিয়ে এসেছিলো। দেহলি বাড়িতে এখন একেবারে ছোটোদের জন্য চলে আনন্দ পাঠশালা, সুন্দর বাগান দিয়ে ঘেরা।
    --------------------------------------------------------

    খড়ে ছাওয়া আরেকটি বড়ো মাটির বাড়ি রয়েছে চৈতীর সামনে, পাঠভবনের দিকে যেতে। নাম বেণুকুঞ্জ। বিয়ের পর রথীন্দ্রনাথ সেখানে কিছুদিন প্রতিমাদেবীর সঙ্গে বাস করেছিলেন। পরবর্তীকালে পন্ডিত বিধুশেখর শাস্ত্রী, দীনবন্ধু এন্ড্রুজও থেকেছেন সেই বাড়িতে। তার ঠিক পাশেই রয়েছে, যে মানুষটির দৌলতে আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীতকে ধরাছোঁয়ার মধ্যে পেয়েছি, সেই দিনেন্দ্রনাথের দোতলা বাড়ি 'দিনান্তিকা'। এই বাড়িটির স্থাপত্য ষড়ভুজ দেওয়ালের কাজ। দিনের শেষে শান্তিনিকেতনের সব অধ্যাপকদের চা-চক্র বসতো এই বাড়িটির বারান্দায়। কে আসতেন না সেখানে ? সেখান থেকে দক্ষিণে পাঠভবনের দিকে একটু এগোলেই ডানদিকে একটি খোলা জায়গা। সেটিই বিখ্যাত গৌরপ্রাঙ্গন। আশ্রমের আদিযুগের শিক্ষক গৌরগোপাল ঘোষ মশায়ের নামে। এখানেই আশ্রমের ছেলেরা খেলাধুলো করতো প্রথম যুগে। মাঠের পাশেই জমকালো রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সিংহসদন। কবির বন্ধু রায়পুরের জমিদার লর্ড শ্রীনাথ সিংহের অর্থানুকূল্যে তৈরি হওয়া একটি প্রাসাদ। সেখানের সভাগৃহটিতে মহাজনসম্মিলন হয়েছে অসংখ্যবার। ১৯৪০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ সমাবর্তন এই বাড়িটিতেই অনুষ্ঠিত হয়েছিলো। সেই উপলক্ষ্যে তাঁরা সর্বোচ্চ সম্মানসূচক ডি লিট উপাধি দিয়েছিলেন কবিকে। তাঁদের পক্ষ থেকে এসেছিলেন সার মরিস গয়্যার এবং সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন। এই ভবনটির দুদিকে আছে পূর্বতোরণ আর পশ্চিমতোরণ। তিনটি হর্ম্যের সামগ্রিক স্থাপত্য নতুনধরণের ইন্দো-ইস্লামিক পদ্ধতির। শান্তিনিকেতনে ভারতীয় স্থাপত্যের নানা রূপ নিয়ে যেসব পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছিলো, সিংহসদন চত্বরেই তার সূচনা। সিংহসদনের ঘন্টাঘর থেকেই শান্তিনিকেতনের সময় বাঁধা হয়।

    ঘন্টা বাজে দূরে .....
    -------------------------------------------------------
    সিংহসদনের পথের উল্টোদিকেই সাঁচীতোরণের আদলে তৈরি অন্য ঘন্টাতলা। তার দু'দিকে ছায়াসুনিবিড় ঝুরিবাঁধা বটগাছে সর্বতো শান্তিকল্যাণ ছেয়ে থাকে। সেই লাল বেদীটিতে নিশ্চুপ খানিক বসে সময়ের বয়ে যাওয়া দেখার ইচ্ছে আমার এখনও রয়ে গেছে। বাঁদিকে যেই তাকাই, টানা চলে গেছে শান্তিনিকেতনের হৃদয়, আম্রকুঞ্জ, বকুলবীথি, শালবীথি। বিস্তৃত প্রান্তরে নীচু নীচু আমগাছের সারি। শ্যামল ছায়ায় ভরে আছে ঝরাপাতার জাজিম পাতা পাঠশালা। ছোটবেলা থেকে বইয়ে পড়া গাছের নীচে পাঠশালার মুক্তাঙ্গন। এখনও বরকরার, স্ফূর্ত, আশ্বাসী। আমরা দু'জন কখনও গিয়ে বসি গুরুর বেদীতে, কখনও চেলাদের ভূমিলগ্ন আসনে। এজন্মে তো আর এই ইশকুলে বসে অক্ষরপরিচয়ের সাধ মিটলোনা......

    ভালো করে পড়গা ইশকুলে, নয়তো কষ্ট পাবি শেষকালে,
    .....আমরা অধমছাত্র জগাই-মাধাই,

    গুরু, মোদেরকে ফেল করালে.....

    (ক্রমশঃ)

    নিভৃত নীলপদ্ম লাগি
    ---------------------------------
    তিনি সতত নির্জনতা খুঁজতেন। প্রিন্স দ্বারকানাথের পুত্র, ভোগসুখ বিষয়প্রবৃত্তির শীর্ষে থাকা মোকাম কলকাতার এক নম্বর পরিবারের ঐতিহ্যধারক, খুঁজে যেতেন ঈশ্বর নামের এক প্রহেলিকাকে। নির্জনতা তাঁর কাছে ঈশ্বরের আরেক নাম। রামমোহন তাঁকে ডাকতেন বেরাদর, পুত্র রমাপ্রসাদের বন্ধু ছিলেন তিনি। তিনি তো কেশব সেন ছিলেন না, তাঁর ঈশ্বরচর্চা ছিলো অন্তর্মুখী। ঊনবিংশশতকের বাঙালির হাজার ভালোমন্দ শাদাকালোর পরিপ্রেক্ষিতে তিনিও ছিলেন যুগ বদলের স্ববিরোধের একটি স্তম্ভ। বাড়িতে দুর্গোৎসব হতো, তিনি পৌত্তলিকতার বিরোধী বলে প্রতিবাদে পাহাড়ে চলে যেতেন। অনেকদিন লেগেছিলো তাঁর এই মূর্তিপূজা নিবারণ করতে। একদিকে সংসারে নির্লিপ্ত, অন্যদিকে অতি সংলিপ্ত। ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর জুড়ি সেকালের বঙ্গীয় নক্ষত্রসমাজে আর কেউ ছিলোনা। কিন্তু যেমন তাঁর কনিষ্ঠ পুত্র বলেছিলেন, "বহু জনতার মাঝে অপূর্ব একা", তিনি ছিলেন তাই। পুত্রবধূ জ্ঞানদানন্দিনী তাঁর স্মৃতিকথায় খুব সরলভাবে লিখেছিলেন, " আমার শ্বশুরমশায় তো কলকাতায় থাকতেন না। তিনি হিমালয়ে ঈশ্বরকে খুঁজে বেড়াতেন। " কেন বেড়াতেন ? কী প্রয়োজন ছিলো তাঁর, কোন আকুলতা ? লোকজন রামায়ণের সংসারী ঋষি বিশ্বামিত্রের প্রতি প্রযুক্ত আখ্যাটি ধার করে তাঁকে বলতো 'মহর্ষি'। রাজা জনকের অনুকরণে 'রাজর্ষি' বলতো না। এটাও একটা তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়। তাঁর সংসারী সত্ত্বাটিকে অনেক বেশি ছেয়ে থাকতো তাঁর অতিসংসারী সত্ত্বা, সেটাই কি কারণ ?
    ---------------------------------------------------------------

    ভুবনডাঙ্গার মাঠে দেবেন্দ্রনাথের ছাতিমগাছ আবিষ্কার, বাংলার আবহমান সংস্কৃতি ইতিহাসে একটা অন্যযুগের বীজবপন বলা যায়। তিনি কীভাবে, কখন এই গাছটিকে ধ্যানের আশ্রয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, তা নিয়ে পন্ডিতজনের নানা মত রয়েছে। অঘোরনাথ চট্টোপাধ্যায়, অজিতকুমার চক্রবর্তী, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় বা প্রমথনাথ বিশী, সবাই ভিন্ন ভিন্ন কথা বলেছেন। তবে প্রশান্তকুমার পাল মশায় জ্ঞানেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে একমত। দেবেন্দ্রনাথ গুসকরায় এক নির্জন প্রান্তরে তাঁবু খাটিয়ে ধ্যান করতেন। সেখান থেকে একদিন তাঁর সুহৃদ রায়পুরের জমিদার ভুবনমোহন সিংহমশায়ের আমন্ত্রণে পাল্কিতে দিগন্তবিস্তৃত ভুবনডাঙ্গার মাঠ পেরিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁর বাড়ি। পথে তাঁর চোখে পড়ে ঐ ছাতিমগাছটি। তিনি পাল্কি থামিয়ে কিছুক্ষণ ঐ গাছের ছায়ায় বসে ঈশ্বরচিন্তা করলেন। তাঁর মনে হলো এই স্থানটিই নির্জনে ঈশ্বরকে স্মরণ করার উপযুক্ত ঠিকানা। ফিরে গিয়ে ১৮৬৩ সালের পয়লা মার্চ সেখানকার জমিদার প্রতাপনারায়ণ সিংহের থেকে বার্ষিক পাঁচ টাকা খাজনায় মৌরসি পট্টা নিলেন ভুবনডাঙ্গা গ্রামে বাঁধপারের বিশ বিঘে জমি। উদ্দেশ্য ছিলো সেখানে ব্রাহ্ম উপাসনা ও চর্চার জন্য একটি আশ্রম প্রতিষ্ঠা করা।
    ------------------------------------------------------------
    এই প্রান্তরে ১৮৬৩ সালেই মহর্ষির নির্মিত প্রথম অট্টালিকাটির নাম ছিলো শান্তিনিকেতন গৃহ। তার নামেই সমগ্র ভূখন্ডটির নাম হলো 'শান্তিনিকেতন'। ১৮৯০ সালে উপাসনা গৃহ নির্মিত হবার আগে পর্যন্ত এখানেই ব্রহ্ম-উপাসনা হতো। ১৯০১ সালে কবি যখন পাঁচ জন ছাত্রকে নিয়ে ব্রহ্মচর্য আশ্রম প্রতিষ্ঠা করছিলেন, তখন তিনি সস্ত্রীক এই ভবনটিতেই থাকতেন। গীতাঞ্জলির অধিকাংশ কবিতা এখানেই রচিত। পাশেই ছাতিমতলায় ধ্যানের বেদী। তাঁর প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ, আত্মার শান্তি। শান্তিনিকেতন গৃহ একটি দোতলা সুরম্য ভবন। আইওনিক স্তম্ভ, ত্রিকোন কর্নিশ আর সবুজ খড়খড়ি দেওয়া দীর্ঘ জানালারা। বাড়িটির পিছন দিকের বিস্তারটি ক্রমশ কমে গেছে। কপালে লেখা " সত্যাত্ম প্রাণারামং মন আনন্দং"। এখানে এখন একটি জাদুঘর। শৈশব থেকে কবি এসে এখানেই থাকতেন। বাড়িটির ঠিক সামনেই প্রতিষ্ঠিত রামকিঙ্করের বিমূর্ত ভাস্কর্য ' অনির্বাণ শিখা'। একটু এগিয়েই ডানদিকে সেই বিখ্যাত বিপুল বটবৃক্ষটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। যার নীচে কোনকালে একটি ছোটো জলাশয় ছিলো। আর ছিলো পাথর জমিয়ে তৈরি করা বালক রবীন্দ্রনাথের তিনটি ঢিবি, যেজন্য তার নাম তিন পাহাড়। রাস্তার ওপারেব উপাসনাগৃহ বা ব্রাহ্মমন্দির, যার ডাকনাম কাঁচঘর।
    --------------------------------------------------------------
    শান্তিনিকেতনের ভূগোল বিষয়ে আর বেশি বলা নিষ্প্রয়োজন। উত্তরায়ণ প্রাঙ্গন, তার অভিনব স্থাপত্যের বাড়িগুলি, কলাভবন, সঙ্গীতভবন, চীনাভবন, হিন্দিভবন, নিপ্পনভবন, রতনকুঠি, মালঞ্চ,নাট্যঘর ইত্যাদি ইত্যাদি। শান্তিনিকেতন হয়তো এখন ভগ্ননীড়, হয়তো তা প্রতিষ্ঠাতার সাধিত রুচি ও সম্ভ্রমবোধ অনেকটাই হারিয়ে ফেলেছে, বিংশশতকের গোড়া থেকে পঞ্চাশদশক পর্যন্ত যেসব অভ্রভেদী মাপের সাধকরা গড়ে তুলেছিলেন একটা বিশ্বস্বীকৃত সারস্বততীর্থ, তাঁদের সমতুল্য আজ আর কেউ নেই, ধীরে ধীরে, কিন্তু নিশ্চিত পদক্ষেপে, পর্যটন বাণিজ্যের পল্লবগ্রাহী আখড়া হয়ে উঠছে, তবু..........একটা তবু থেকে যায়। নিছক লৌকিক অভ্যেসে কাল কাটানো সংখ্যাগুরু অধিবাসীদের মধ্যে কিছু মানুষ এখনও নিভৃত নীলপদ্মের খোঁজ করার স্পর্ধা করে যান। খুঁজে পা'ন কি না তা হয়তো সতত প্রমাণ করা যায়না। তবু তো মনে থাকে, "হারায়ে সেই মানুষে, তার উদ্দিশে, দেশবিদেশে.......... "
    ------------------------------------------------------------
    অনেক সুখে অনেক দুখে তোমার বাণী নিলেম বুকে
    ফাগুনশেষে যাবার বেলা আমার বাণী যাবো বলে

    আমি যাবো না গো অমনি চলে ..........।

    (ক্রমশঃ)

    যারা বিহান-বেলায় গান এনেছিলো....
    ----------------------------------------------------

    সীমান্তপল্লীর পর মাঝিপাড়া। সেখানে থাকেন এ তল্লাটের আদি অধিবাসী সাঁওতালেরা। কৌম সমাজের কিছু নিয়ম আছে যা উপর ব্রাহ্মণ্য ব্যবস্থার প্রভাব বিশেষ পড়েনি। বিকেল থেকে সাঁঝগড়ানো আলোয় হাঁটছিলুম বাগানপাড়ার দিকে। মোড়ে একটি ছোট্টো ঠ্যালাগাড়িছাপ তেলেভাজার দোকান। আমাদের দেশের ভাষায় গুমটি। সামনে ভিড় মন্দ নয়। কড়াইতে টগবগ করছে বাঙালির পাপের ভরা। উঁকি দিয়ে দেখি সাঁওতাল একটি মেয়ে, বড়োজোর বিশবাইশ, সেই কর্ত্রী। দু'হাতে কাটাকুটি, ভাজাভুজি করে যাচ্ছে, সঙ্গে দোকানদারিও। যাঁরা বাঙালি খদ্দের, তাঁদের সঙ্গে পরিষ্কার বাংলায় কথাবাত্তাও চলছে। জায়গাটা তো আদত গ্রাম, সব্বাই সব্বাইকে চেনে, হয়তো একটু বেশিই চেনে। তাঁদেরকে বিদায় করে আমার দিকে সপ্রশ্নচোখে তাকায়। নতুন চেহারা, আগে দেখেনি তো। দেখি একদিকে বেগুন ফালি করে রাখা আছে। প্রশ্ন করি, বেগনি ভাজবে নাকি? কতোদিন বাইরে এসব কুখাদ্য খাইনি। সুনীলের ভাষায় প্রবাসে সকলই চলে। মেয়েটি বলে, দাঁড়াও, এদেরকে ভাগিয়ে তোমায় দিচ্ছি। দেখি তিনচারটি ছোকরা, বাইকে হেলান দিয়ে অপেক্ষা করছে। মেয়েটি তার বারকোশ থেকে বেশ কয়েকটা ঠোঙা বের করে ছেলেগুলোকে ডাকলো। ওরা সাঁওতালিতে কথা বলছিলো, আমি বুঝতে পারছিলুম। ছেলেগুলো সন্ধের ঝোঁকে নেশা করবে বলে তেলেভাজা কিনতে এসেছে। মেয়েটি ওদের ঠোঙা সরবরাহ করতে করতে দেখলুম বকাবকি করছে একজন স্বাস্থ্যকর্মীর মতো। বিষয়, মদ্যপানের কুফল। ছেলেগুলো হেসে গড়িয়ে পড়ছে, যেন এর থেকে বেশি মজার কথা আর কখনও শোনেনি। তার পর মেয়েটি আমার জন্য বেগনি ভাজতে ভাজতে বললো, বলো, মদ কতো সব্বোনাশ করে। আমি বলি, ঠিক। সে আবার বলে, মানুষ নেশা করলে জন্তু হয়ে যায়। আমি আবার বলি, ঠিক। তার পর সে বলে যায়, আমি শুনে যাই। মনে পড়ে যায় আমার সিংভূমে দীর্ঘদিন ধরে দেখা আদিবাসী পুরুষদের হাঁড়িয়া থেকে মৌয়া, মৌয়া থেকে চোলাই, তার পর পঞ্চাশ ফুরোবার আগেই ফুড়ুৎ হয়ে যাওয়া। সেই সব অরণ্যপ্রান্তরের কেতা শান্তিনিকেতনেও ? পরে শুনলুম এখানেও বহু আদিবাসী পুরুষ ইশ্কুলে লেখাপড়া শেষ করেন। বোঝা যায় তারা ধলভূম, কোলহানের ভাইবন্ধুদের থেকে অনেক বেশি আলোকপ্রাপ্ত। কিন্তু রক্তের বীজকে উপড়াতে পারেননি। তাঁদের গ্রামকে ঘিরে ফেলেছে বাঙালি মধ্যবিত্তদের মধ্যে সম্ভবত শ্রেষ্ঠ, রুচিশীল, স্বচ্ছল গোষ্ঠীর একটা বড়ো অংশ। তাঁদের সঙ্গে নিত্য বিনিময়, তবু অন্ধকারের শক্তি কী ব্যাপক।

    পরে শুনলুম ঐ মেয়েটিকে নিত্য তার নেশাড়ু স্বামী মারধোর করে। আবার ইভনিং শো'তে বাইকে করে সিনিমা দেখাতেও নিয়ে যায়।
    ------------------------------------------------------------------

    আমি এখন সময় পেলেই অধিকারীজনদের সঙ্গে রবীন্দ্রসঙ্গীতের বর্তমান আর ভবিষ্যত নিয়ে বিনিময় করি। শান্তিনিকেতনে এলে তা নিয়ে নানা সূত্র খোঁজা স্বাভাবিক। যেহেতু সে মাথার চারিপাশে। গায়নের ধরণে শোনার অভ্যেস পাল্টায়, না শ্রোতারাই ঠিক করে দেন কীভাবে গান গাইতে হবে। বিশ্বায়িত বাজারের পণ্য হিসেবে রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্থানটি ঠিক কোথায় ? শ্রীলা, অভ্রের সঙ্গে আড্ডা চলে। অভ্রের মতে, সাহানাদেবীর গানের থেকে কাননদেবীর গানের পেশকারি অধিক উজ্জ্বল। আমিও এ বিষয়ে একমত। আমরা দু'জনেই সাহানাদেবীর একান্ত অনুরাগী শ্রোতা। এমন কি কবি নিজেই বলতেন, সাহানাদেবীর গলায় তাঁর গান পূর্ণ মর্যাদা পায়। কিন্তু রাইচাঁদ বড়াল বা পঙ্কজকুমার কাননদেবীর গানের মধ্যে কোন রসায়নটি যোজনা করতেন যাতে তাঁর গান অধিকাংশ শ্রোতার ভালো লাগতো। আমি কঠোর অনুসন্ধান করেও কিন্তু এই সব পরিবেশনার মধ্যে কোনও আপোস করার অভিপ্রেত পাইনি। তাঁদের নিষ্ঠা, সচেতন শ্রোতার কাছে এখনও প্রাসঙ্গিক। ঠাকুরবাড়ির কুলুঙ্গি আর শান্তিনিকেতনের উপাসনাগৃহের বাইরে যে সংখ্যাগুরু শ্রোতার দল, তাঁদের জন্য পঙ্কজকুমার, সঙ্গে কুন্দনলাল যে রসটি পরিবেশন করতে পারতেন, দাবি অনুযায়ী অনেক বেশি উৎসমুখী, 'শুদ্ধ' ঘরানার শিল্পীরা সেটা পারতেন না। অথচ ইন্দিরাদেবী দেবব্রতকে আলাদা করে পথনির্দেশ দিতেন, একক গাইতে উৎসাহিত করতেন। শান্তিনিকেতনের ধারায় অন্যমাত্রার স্ফূর্ত গায়ন নিয়ে এসেছিলেন সুচিত্রা। ছয় থেকে আট দশকে একসঙ্গে এতোজন সিদ্ধ শিল্পী রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের মান'কে যে পর্যায়ে তুলে দিয়েছিলেন, সেটা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জটি পরবর্তী শতকের শূন্য ও প্রথম দশকের গায়কদের নাগালের বাইরে চলে গেলো। একেবারে শীর্ষস্থানে থাকা পরিবেশকরাও ' গলাটা ভালো' জাতীয় মন্তব্যের সীমায় বাঁধা রয়ে গেলেন।
    -------------------------------------------------------------------
    রবীন্দ্রসঙ্গীতে উত্তম পুরুষকণ্ঠের অধিকারী সমর্থ শিল্পীর অভাব চিরকালই রয়েছে। নব্বই দশক থেকে যখন আকালটি তুঙ্গে উঠছিলো, একজন শিল্পী একা রবীন্দ্রসঙ্গীতের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিবেশনের মান'কে ধরে রাখতে সক্রিয় ছিলেন। তাঁর গান প্রথম শোনার পর থেকেই, শ্রোতা হিসেবে তাঁর গীত সমস্ত গান মুগ্ধ হয়ে শুনেছি। একজন বড়ো শিল্পীর মতো সীমাবদ্ধতাকে পাত্তা না দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশনের একটি সমন্বিত ধারা, যেখানে শান্তিদেবের স্ফূর্তি উৎসারিত হয় সুবিনয়ের ঋদ্ধ সুরবিন্যাসে। আমরা তাঁর থেকে শুনি এক নতুনধরণের একালের রবীন্দ্রসঙ্গীত, যেখানে হাত কেটে বা পা ছেঁটে নতুন হবার বহ্বাড়ম্বর নেই। হ্যাঁ, আমি বলছি মোহন সিং খঙ্গুরার কথা। শান্তিনিকেতনে এসে তাঁর সঙ্গে একটা সন্ধে-আড্ডার সুযোগ কি ছাড়া যায়। অবশ্য নয়। অনেক কথা হলো, অনেক আড্ডা। শোনা ও শেখা, এভাবেই তো এগিয়ে যাওয়া।
    -------------------------------------------------------------------

    প্রহর পরে প্রহর যে যায়, বসে বসে কেবল গণি,
    নীরব জপের মালার ধ্বনি, অন্ধকারের শিরে শিরে,

    ......যারা বিহান-বেলায় গান এনেছিলো আমার মনে........

    (ক্রমশঃ)

    আর বছরে এমনি দিনেই ফাগুনমাসে
    ----------------------------------------------

    এবার বসন্তে ভুবনডাঙ্গায় পলাশ নেই। আগুন রঙ বা পীতবাস, কিছুই খুঁজে পাওয়া যায়না। কৃষ্ণচূড়ার সময় আসেনি, কিন্তু রাধাচূড়া সেও এতো অমিল হয়ে আছে। বসন্তে শুধু শুকনো পাতা, ঝরা ফুলের মেলা। আম্রকুঞ্জ ঝরাপাতার নরম কার্পেটে এপার ওপার। সন্ধের পর মালতী আর হাস্নুহানা এদিকওদিক থেকে উঁকি দিয়ে গন্ধ ছড়িয়ে যায় আমার পূর্বাশ্রমের আশ্রমবালিকাদের মতো। হাপিত্যেশ করে পলাশ পাওয়া গেলো সুরুলকুঠির কাছে শ্যামবাটিতে। তাও কটা মাত্র গাছ। আর রাধাচূড়া শুধু একজায়গায়। হ্যাঁ, একা দাঁড়িয়ে ছিলো পাঠভবনের মাঠে তার চোখজুড়োনো কাঁচাহলুদ মুকুট পরে। ক্যামেরার সাবজেক্ট হিসেবে রুক্মিণীর সঙ্গে রাধা বেশ লাগসই। কিন্তু আমার রুক্মিণীদেবীটি একাই রাধা, বৃন্দা, ললিতা, বিশাখা, স-অ-ব ভূমিকা একাই কুক্ষিগত করে রাখতে চা'ন। সেই ঘন্টা দেড়েক অং বং পড়ে বাড়িতে জেনেশুনে একজন বাঙালিনীকে ঢোকানোর পাপ, সে কি আর এক জন্মে মিটবে ? এমত পুং বাঙালির শেষ অ্যাম্বিশন, কেষ্টার বাপ হয়ে নিত্য মুষলপর্বের শেষে জরাব্যাধের জন্য অপেক্ষা করা। "এ জনমে মিটিল না সাধ", হায় অতুলপ্রসাদ সেন....
    -------------------------------------------------------------------
    শিল্পের ইতিবাচক মূল্য নিয়ে আবহমানকাল ধরে সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি কথা লেখা, বলা হয়েছে। কিন্তু বাঙালির সিলপোসাধনা এক অন্যমেরুর উপলব্ধি।

    অন্যান্য অনেক দেশবাসির মতো বাঙালি, শুধু ধর্ম অথবা শুধু জিরাফ নিয়ে তৃপ্ত থাকতে পারেনা। এমনকি পেশাদার রাজনীতিকদেরও সৈল্পিক ইসে থাকতে হবে। ভোটে জিতে মন্ত্রী হতে গেলেও তাকে রেনোয়ার মতো ছবি আঁকতে হবে, 'ক্যাসিও' বাজিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীতের সুর তুলতে হবে, ডজন ডজন 'পদ্যে'র বই ছাপতে হবে, গাড়ির ড্যাশবোর্ডের উপর হলুদ মলাট দেওয়া 'গীতবিতান' বই রাখতে হবে ( যার প্রথম কবিতাটি হলো ' ধনধান্যপুষ্পে ভরা')। শরীরে একফোঁটা শিল্পীসুলভ মেধা, রুচি বা সম্ভ্রমবোধ না থাকলেও চলবে, মাথায় শুধু কার্বন ডাই অক্সাইড ভরা থাকলেও চলবে, কিন্তু বাঙালির 'প্রবাদপ্রতিম' সিলপোরুচিবোধের তকমাটি চাইই চাই। বাবা ড়বিন্দোনাতের উত্তরসূরি না....!! তাতে কী আসে যায়, যদি বোম বোম তাড়কবোমই শেষ পর্যন্ত সব সিল্পের উৎস হয়ে দাঁড়ায় ....
    ------------------------------------------------------------

    বাঙালির বার্মুডা ত্রিভুজটি তৈরি হয়েছে তিনটি বিন্দু ঘিরে। তাদের নাম বকু, তারু আর সন্তু। আপামর বাঙালির ঐহিকপারত্রিক সর্বরোগহর বটিকার জোগান দেয় এই ত্রিভুজ। বাংলার প্রত্যন্ত গ্রাম, গঞ্জ, মফস্সল থেকে যেকোন ফাটামস্তান, কাটাগুন্ডা একটা 'কোচ'বাসভাড়া করে পুণ্যার্থীদের পাল্কিশুদ্ধু গঙ্গাস্নানের স্টাইলে এই ত্রিভুজদর্শনের ব্যবস্থা করে দেন। একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন বোধ হয়। বকু মানে বক্কেশ্বর, তারু মানে তারাপীঠ এবং সন্তু হলো শান্তিনিকেতন। প্রথম দুটি উদ্দিষ্টের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার মতো পুণ্যস্থানের অভাব নেই ধারে কাছে, কিন্তু বেচারা শান্তিনিকেতনের কপালে এই ত্রিভুজের তৃতীয় বাহু হবার গৌরব লাভ বেশ বিড়ম্বনাজনক। প্রায় প্রতিদিন বকু-তারুতে পুণ্য করে ফেরার পথে সিঁদুরতিলক সহিত বা রহিত অসংখ্য মানুষজন বাসের গর্ভ থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়ে দৌড়োতে দৌড়োতে রবিকবির আঁতুড়ঘর, বাসরঘর খুঁজে বেড়ায়, রতনকুঠি থেকে নকল নোবেলের কাচবাক্স পর্যন্ত। বাঙালি হতে গেলে জিরাফ যে কতো প্রয়োজনীয়, কতো অমোঘ ব্যাগেজ, তাঁরা প্রমাণ করে যান পদে পদে।
    ------------------------------------------------------------------

    শান্তিনিকেতন গৃহ থেকে ধীরে ধীরে কলাভবনের দিকে হাঁটছিলুম। হঠাৎ দেখি অন্যদিক থেকে ষাট-সত্তর জনের একটি দঙ্গল প্রায় ছুটতে ছুটতে এদিক লক্ষ্য করে ধেয়ে আসছে। তাদের হাবভাব ভঙ্গির মধ্যে বেশ একটু জঙ্গি মার্কন্ডেয়পুরাণের ঢং রয়েছে। এই সব জনতাকেই আমরা ব্রিগেডে দেখি নানা রঙের ঝান্ডা হাতে বিপ্লবের স্বপ্নে মশগুল। হঠাৎ থেমে তাদের নেতা একটু দূরে কিছু একটা দেখিয়ে ভাষণ দিচ্ছেন। কাছে গিয়ে শুনি জনতাকে রামকিংকরের 'কলের ডাকে'র মাহাত্ম্য শোনাচ্ছেন তিনি। বাঁকুড়া জেলায় যে গামছার থেকেও মহীয়ান কিছু, মানে রামকিংকরের মতো 'কিছু', উল্লেখ করার মতো রয়েছে, সে কথাই তিনি ব্যাখ্যান করছিলেন। এক মহিলাকে তাঁর সঙ্গীর প্রতি বলতে শুনলুম, অ্যাত-অ রদ কইর্ছ্যেঁ, চাঁদি ফাটাই দিবেক ইবার, কিন্তুক ইয়ার বকর বকর থাইমতে লারছে। সঙ্গী বিজ্ঞের মতো বললেন, ইটা রবিঠাকুরের ঘর বঠে, তুই বুইঝত্যে লারছিস, কঠিন কান্ড-অ সব....
    -------------------------------------------------------------------

    গত বছর কুড়ি-পঁচিশ শান্তিনিকেতনে গেলে একটা অবশ্যগন্তব্য ছিলো ইন্দ্রনাথ মজুমদারের বইবিপণী 'সুবর্ণরেখা'। সম্প্রতি ইন্দ্রনাথ প্রয়াত হয়েছেন। তাঁর এই দোকানটি শুধু কেনাবেচার ঠেক ছিলোনা, সেখানে শান্তিনিকেতনের বনেদি আড্ডাধারিরা একত্র হতেন ছুটির দিনে বা অলস সন্ধেবেলা। চারদিকে অভিজাত স্বভাবময় বইয়ের সাজঘর, একপাশে আড্ডা চলতো পৃথিবীর সব বিষয় নিয়ে। বাঙালির সব পেয়েছির আসর। মনে পড়ছে বহুদিন আগে আমি তখন পাটনাতে থাকি। সাঁওতাল পরগণার সীমান্তে একটা ব্রাঞ্চ অডিট করতে গিয়ে রয়েছি সিউড়ির একটি সরাইখানায়। মাঝখানে একটা রোববার। সক্কালবেলায় বাস ধরে পৌঁছে গেলুম বোলপুর। ঘুরতে ঘুরতে নন্দন ভবনে, হঠাৎ দেখি মন্ত্রী সুভাষ চক্রবর্তী বেরিয়ে আসছেন সেখান থেকে, পিছনে অনেক বরকন্দাজ। আমার সামনে এসে হাতটা বাড়িয়ে দিলেন, কখন এলে ? আমি নিতান্ত অপ্রস্তুত। বলি, এই এলুম। বেশ, বেশ, আমার একটু তাড়া আছে, আজ আসি, হ্যাঁ। বলতে বলতে তিনি নিষ্ক্রান্ত। তাঁর সঙ্গীর দল আমাকে এলেমদার কিছু ভাবলেন বোধ হয়। আমি নিতান্ত ভ্যাবাচ্যাকা। ভাবতে বসি, তাঁর কোন পরিচিতের সঙ্গে আমাকে তিনি গুলিয়ে ফেললেন কে জানে ?ভিতরে তখন শ্রদ্ধেয়া অমিতা সেন'কে আশ্রমিকরা সম্বর্ধনা দিচ্ছেন। তার পরে তাঁকে দেখার আর সুযোগ হয়নি।

    বেশ তাও খেয়ে পৌঁছে যাই 'সুবর্ণরেখা'য়। ঢুকতে গিয়ে দেখি আড্ডা বসে গিয়েছে ততোক্ষণে। আবার একজন হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। দেখি আমাদের সুজিতদা, জামশেদপুরের সুজিত চট্টোপাধ্যায়। আমাদের শহরের আদি শান্তিনিকেতনী আশ্রমিক ছিলেন তিনি ছাত্রজীবনে। তারপর ফিরে আসেন নিজের গাঁয়ে। উচ্চপদস্থ অধিকারী হয়ে কর্মরত ছিলেন একটি নামকরা সংস্থায় বহুদিন। আদ্যন্ত রুচিমান, বিদগ্ধ একটি শিল্পী মানুষ, অবসর নিয়ে শান্তিনিকেতনে স্থিতু হয়েছেন। আমাকে পরিচয় করিয়ে দেন ইন্দ্রনাথবাবুর সঙ্গে, 'আমাদের' জামশেদপুরের ছেলে। এই 'আমাদের' শব্দটির উচ্চারণ জামশেদপুরের সঙ্গে যেভাবে মানিয়ে যায়, 'আমাদের শান্তিনিকেতনে'র থেকে তার অভিঘাত অনেক সুদূরস্পর্শী। গাঁয়ের লোক হবার এই প্রিভিলেজটি বুঝেছিলেন বলেই মোহনদাসের আহ্বান, ব্যাক টু ভিলেজ। আমাদের এই লেজটি থাকেই, বেশ মোটাও বলা যায় তাকে। কখনও তো কাউকে বলতে শুনিনা, এইটি 'আমাদের' কোলকাতার ছোঁড়া।

    জামশেদপুরের লোকের শরীরে তো গঙ্গা থাকেনা, থাকে শুধু সুবর্ণরেখা। জন্মের পর প্রথম গন্ডূষ জল থেকে সব খেলা শেষ করে অস্তি বিসর্জন, সবই সুবর্ণরেখার বিগলিত করুণায়। সেই জন্য সেদিনও সুবর্ণরেখায় অনেক আড্ডা, বই নেওয়া, যথারীতি কোঁচড়ে দু'চার মুদ্রার বাসভাড়া মাত্র বাঁচিয়ে।
    -------------------------------------------------------------------

    সেই সুবর্ণরেখায় এবার গিয়ে দেখি আমার জানা শ্রাবণদিনের সেই উদ্বেল নারীর মতো স্রোতস্বিনী, চৈত্রের মরা সোঁতা যেন। ইন্দ্রনাথ গত হতেই কর্তৃপক্ষ দোকান খালি করার লুটিস ধরিয়ে দিয়েছেন। বিজলি কেটে দিয়েছেন। ভিতরে দেখি ইন্দ্রনাথের এক পুত্র অর্ধঘুমন্ত অবস্থায় ধুনি জ্বালিয়ে বসে আছেন। আলো নেই, হাওয়া নেই। বই সংগ্রহের অতি ক্ষীণদশা। সব চেয়ে আফশোস পুরোনো, মূল্যবান বাংলা আকর গ্রন্থের প্রাপ্তিস্থান হিসেবে সুবর্ণরেখার সেই গৌরব অস্তমিত। ভিতরের গুদামে অনেক বই হয়তো আছে, কিন্তু আলো নেই, অন্ধকার, ধূলিধূসর। কোথায় পাবো তারে। চাইলেও নিজের বইটি খুঁজে নেওয়া যাবেনা।

    কষ্ট হলো, বেশ কষ্ট।
    -----------------------------------------------------------------

    সুবর্ণরেখায় দেখি একজন প্রবীণ মানুষ প্রশ্ন করছেন, চন্দ্রনাথ বসু'র কোনও বই আছে ? নিজের বই খুঁজতে খুঁজতে আড়চোখে তাঁকে দেখি। নাতিদীর্ঘ, এই নিদাঘে শীতবস্ত্রে ভারাক্রান্ত নিরীহ গৌড়জন, উল্লেখ্য শুধু ঐ 'চন্দ্রনাথের বই'। দোকানমালিকের উত্তর ছিলো নেতিবাচক। তিনি আবার প্রশ্ন করেন, কোথায় পাওয়া যাবে একটু বলতে পারেন ? সে প্রশ্নেরও কোনও উত্তর নেই। আমি আমার বইয়ের সওদা নিয়ে বেরিয়ে আসি। তিনিও আসেন। মুখটি বিষণ্ণ। আমি তাঁকে বলি, চন্দ্রনাথের একক বই তো পাবেন না, তবে অন্য লেখকের সঙ্গে সংকলিত 'দুষ্প্রাপ্য সাহিত্য সংগ্রহ'একটি নামের একটি গ্রন্থ রিফ্লেক্টের আছে, সেখানে তাঁর একটি লেখা 'পশুপতিসম্বাদ' পাওয়া যায়। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তকাগারের সাইটে তাঁর 'হিন্দুত্ব' নামের বিতর্কিত লেখাটি পাবেন। আপনি যদি কলকাতায় থাকেন তবে কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে খোঁজ করবেন, পেয়েও যেতে পারেন। তিনি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রবীণা সহধর্মিণীকে বলতে থাকেন, তোমায় বলেছিলাম না, শান্তিনিকেতনে অনেক পন্ডিতেরা থাকেন, একটা খোঁজ পেয়েই যাবো ( পন্ডিত ?? কী সাংঘাতিক !!)। দ্যাখো, পেয়েই গেলাম। আমি কিঞ্চিৎ প্রমাদ গণি, এতো উৎসাহের কারণ কী হতে পারে ? আমি আবার বলি, কিছু মনে করবেন না, আপনি চন্দ্রনাথ বসু সম্বন্ধে এতো আগ্রহী কেন, জানতে পারি কি ? তিনি একটু থামেন। তারপর বলেন, ছোটোবেলা থেকে শুনছি তাঁর লেখার কথা, কিন্তু এতো বয়স হলো, কখনও পড়িনি। তা বেশ, কিন্তু এতো লেখক থাকতে তাঁর লেখা খোঁজার ইচ্ছে কেন হলো ? ইয়ে মানে, চন্দ্রনাথ বসু হলেন আমার ঠাকুরদার বাবা। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, বহুদিন ধরে খুঁজছি, আপনি একটা খোঁজ দিলেন।

    ভাবি, শিকড়ের সন্ধানে একটি চরিত্র.....

    (ক্রমশঃ)


    সব কুঁড়ি মোর ফুটে ওঠে তোমার হাসির ইশারাতে
    ------------------------------------------------------------

    বীরভূমের মাটিকাদা, গাছগাছালি, সবার মধ্যেই একটা নিজস্ব আবহের মাত্রা রয়েছে। আবহের এই পার্থক্যটি একটু পূর্বদিকে গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে গেলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার কিছু দক্ষিণপশ্চিমের রাঢ়ভূম, মল্লভূম, মানভূমের সঙ্গেও তার ফারাক বেশ প্রত্যক্ষ। মহানগরের কবি, শিলাইদার কবি, আন্তর্জাতিক কবি, সব অবতারগুলিকে মনে রেখেও আমার মনে হয় তাঁর সৃষ্টিকে বীরভূমের ভূপ্রকৃতি যে বিশেষ মাত্রাটি দিয়েছিলো, সেটার অনন্যতা প্রশ্নাতীত। ছোটোবেলা থেকে 'শান্তিনিকেতন' বাড়ি, ছাতিমতলা, তিনপাহাড়ের নিশ্চিন্ত পরমার্থকেন্দ্রিক স্বাচ্ছন্দ্য থেকে জীবনের নানা পর্ব ছাড়িয়ে, শ্যামলী পেরিয়ে শ্রীনিকেতনের শ্রমস্বেদসিক্ত কবি সৃজনশীলতার এক ভিন্ন অবয়ব এবং আত্মা আবিষ্কার করেছিলেন। আজকে আমরা যে কবিকে চিনি, সেই ধারণাটির ধাত্রী হিসেবে বোলপুর-শান্তিনিকেতন, বৃহদার্থে বীরভূমের রোদ-মাটি-জল তাদের নিজস্ব ভূমিকা খুব সফলভাবে পালন করেছিলো। সারা বিশ্ব জুড়ে চোখ ঝলসানো সৃষ্টিবৈভবের সম্রাজ্ঞীরা কবির জন্য নিজেদের সব সম্ভ্রম উজাড় করে যখন রিক্ত, তখন ময়নাপাড়ার কালো মেয়েটি বীরভূমের আলের ধারে একা একা দাঁড়িয়ে থেকে বেঁধে রেখেছিলো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নামে একটি বিস্ময়কে।

    তা'সে যতই কালো হোক, ভুল করেনি কবির গহন চোখ....
    -----------------------------------------------------------------

    শান্তিনিকেতনের শান যে সর্ব অর্থেই রবির উপর নির্ভরশীল তাতে কোনও সন্দেহ নেই। মানে, সেখানে শুধু সূর্যবংশীয়দের বাস। একটা সূর্য ডুবেছিলো ১৯৪১ সালের অগস্টমাসে, আরেকটা তো রোজই ডোবে কালীসায়রে আর কোপাইয়ের বাঁশবনের পিছনে আঁধারসবুজে। মনে হয় এখানে লোকজন সব সৌর শক্তিতে বেঁচে থাকেন। পৌষমেলা ছাড়া বছরের আর কোনও সময়ই সাঁঝ নামার পর এখানে পথেঘাটে মানুষজনকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়না। আগে তো ছিলো শুধু হেঁটে বেড়ানো লোকজন, তাঁরাও আঁধার পড়ে গেলে পথে নামতেন না। এখন তো অন্ধকার ফুটো করে এক-আধটা দুচাকার আলো ক্বচিৎ কখনও সরু সরু রাস্তায় হুসহাস করে মিলিয়ে যায়। যেহেতু সবাই সবাইকে চেনেন, তাই কাউকে ডানদিকের বদলে বাঁদিকে যেতে দেখলেই শ্রীযুক্ত 'ক' বলে ওঠেন, কী ব্যাপার? আজ শ্রীযুক্ত 'খ' ওদিকে কোথায় যাচ্ছে। খুব যে ঔৎসুক্য আছে, তা নয় তবে " নোট করিয়া রাখা হইলো" গোছের একটা উদ্যম দেখা যায়।
    -----------------------------------------------------------------

    আমার ঠাকুরদা ছিলেন সেকালের আগমার্কা নর্থ-ক্যালকাটান। বিডন স্ট্রিট, নতুনবাজার, ছাতুবাবুর বাজার। প্রথমে ওরিএন্টাল সেমিনারি পরে বেঙ্গল টেকনিক্যাল কলেজ। পড়াশোনার বাইরে কার্যকলাপের মধ্যে প্রধান, আদি ও সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে গান শুনতে যাওয়া। সাহেবি লোক, বেশ মেজাজি, উগ্র ন'ন, তবে সেকালে যাঁদের রাগি বলা হতো, সে রকম, জাঁদরেল মানুষ। তাঁর যিনি দাদা ছিলেন, বয়সে অনেক বড়ো, সেকালের পাস করা ডাক্তার। তাঁর শ্রদ্ধেয় গুরু ডাক্তার প্রতাপ মজুমদারের আজ্ঞামতো অ্যালোপাতি ছেড়ে গ্রামে ফিরে যা'ন, গরিব মানুষদের হোমোপাতি চিকিৎসা করতে। তা তাঁদের বিষয়-আশয় ছিলো বেশ ভালো রকম আর তিনি ছিলেন বেনেভোলেন্ট ডিক্টেটর গোছের মানুষ। সব সময় ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতেন। অস্ত্র বলতে তুখোড় ইংরিজিতে হুংকার আর একটি দোনলা বন্দুক, সর্বক্ষণের সঙ্গী। এই ভদ্রলোকের কথা আমার দাদুর মুখে অনেক শুনেছি বাল্যকালে। দাদুর মতো রোয়াবি মানুষও নাকি দাদাকে খুব ভয় পেতেন। আমরা বেশ বিস্ময়বোধ করতুম।
    বহু বহু কাল পরে আমি তখন দক্ষিণ-পূর্ব সিংভূমে মুসাবনি নামে একটি পাহাড়ি জঙ্গল ঘেরা শহরে দোকান চালাই। সেই জায়গাটা এককালে ভারতের তামাব্যবসায়ের রাজধানী ছিলো, কিন্তু আমি পৌঁছোবার আগেই তার জেল্লা অনেক ম্লান। ব্রাজিল থেকে আমদানি করা তামা এদেশে সস্তায় পাওয়া যেতো। গৌরব কমে গেলেও ব্রাঞ্চটি ছিলো বেশ বড়ো। কারণ অনেক রকম সরকারি-বেসরকারি আপিসদফতর তখনও সেখানে চলমান। তা একদিন এক বাঙালি ভদ্রলোক আমার কাছে কিছু কাজে এলেন। তিনি কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও বিভাগে কর্মরত ছিলেন তখন। গপ্পো করতে করতে তিনি জানালেন, তাঁর যেখানে আদি বাড়ি সেখানে তখন এক রাজনৈতিক নেতা বড্ডো হুড়দঙ্গ শুরু করেছেন, মানুষের অশান্তির একশেষ। তারপর নিজেই বলেন, হয়তো শুনেছেন, জায়গাটার নাম চমকাইতলা। আমি বলি, নিশ্চয় শুনেছি। আসলে শুনেছিলুম আমাদের আদি বাড়ি নাকি ঐ জায়গাটার খুব কাছে। সে কী? কোন গ্রাম? আমি নামটা বলি। তিনি উত্তেজনায় প্রায় চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। আরে ওটা তো আমাদের পাশের গ্রাম। কোন বাড়ি? আমি জানাই, সেসব আমি কিস্যু জানিনা। কারণ আমার পিতৃদেবও বড়ো হবার পর সেবাড়ি দেখেননি। তবু আমার পদবি যখন এই, তখন সেই নামেই কোনও বাড়ি হবে হয়তো। তিনি উচ্চস্বরে স্বগতোক্তি করেন, দে-বাড়ি, মানে লালবাড়ি। আমি বলি, হয়তো... কারণ বাবার মুখে শুনেছি সেই বাড়িটা ছিলো লালরঙের। তিনি বলে ওঠেন, আরে সেতো সেই বিখ্যাত ঘোড়সওয়ার ডাক্তার দে'র বাড়ি ছিলো। সবসময় বন্দুকহাতে, পুলিশও ভয় পেতো। আমি বলি, আপনি নিশ্চয় দেখেননি। আরে না, আমি কী? আমার বাবাও দেখেননি। তবে গপ্পোটা সেকালে সব্বাই জানতো। তারপর তিনি গাঁয়ের লোক পেয়ে কামারাদোরিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন। তৎক্ষণাৎ নেমত্তন্নো জানান সেই গ্রামে ( এখন বোধ হয় আর ঠিক গ্রাম নেই) তাঁর বাড়িতে অতিথি হতে। আমিও পুলকিত হই। নিজের গাঁয়ের লোক। যদিও ঠাকুরদাদারা পুরুষানুক্রমিকভাবে আদত কলকাতার লোক, তবু এ জাতীয় গাঁ-গেরামের টান এক অন্য মাত্রা।
    ------------------------------------------------------------------
    এটা হলো শিবের গীত। তবে ধান ভানাটা কেমন, সেটা একটু বলি। একেবারে শৈশবে আমার পিতৃদেব আর জ্যাঠামশাই বাবা-মার সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে যেতেন। তখনও তাঁদের দশ ভাইবোনের মধ্যে শুধু তিনজনেরই জন্ম হয়েছে। মানে গত শতকের তিরিশের দশকের প্রথমদিকে কখনও। তা জামশেদপুর থেকে সেখানে যেতে গেলে ট্রেনে খড়্গপুর নেমে গাড়ি বদলে গড়বেতা ইস্টিশন। সেখান থেকে গরুর গাড়িতে গ্রামের বাড়ি, ফুলকুসমা, গোয়ালতোড় পেরিয়ে। সেই পথে যখনই কোনও গ্রামের ভিতর দিয়ে গাড়ি পেরোতো, দাওয়ায় বসা গাঁয়ের গণ্যমান্যরা বলে উঠতেন, কে যায় ? কার বাড়ি ? আগেই বলেছি, ঠাকুরদা ছিলেন খুব সাহেবি স্বভাবের। এইসব ব্যক্তিগত প্রশ্নের কোনও উত্তর দিতেন না। কিন্তু বারম্বার এইসব প্রশ্ন শুনলে তিনি বেশ গরম হয়ে যেতেন। রাগ বেড়ে গেলেই উত্তরে তিনি বলে উঠতেন, "তোর বাপ"। ঠাকুমা খুব অপ্রতিভ হতেন। কিন্তু অভিজ্ঞ গ্রামবাসীরা বুঝে ফেলতেন, আরে এ নিশ্চয় দে-ডাক্তারের ভাই।

    এতো গৌরচন্দ্রিকার অর্থ, সেই ট্র্যাডিশন আজও চলেছে। মানে, " কে যায় ? কার বাড়ি??", শান্তিনিকেতনের বিভিন্ন পল্লীতে অহরহ, এখনও।

    (ক্রমশঃ)
    সেইখানে মোর পরাণখানি, যখন পারি বহে আনি
    -----------------------------------------------------------------------------
    যখন জোয়ান বয়স ছিলো, তখন শান্তিনিকেতনে গতায়াত ছিলো মূলত: দুটি কারণে। এক, যদিও পারিবারিক ভাবে আমরা রবিরসে সতত নিমজ্জিত, কিন্তু জামশেদপুরের মতো একটি ছোটো বহুজাতিক শহরে বাড়ির বাইরের আবহে রবির উদয় বিশেষ থাকতো না। পঁচিশে বৈশাখে ঘামতে ঘামতে রবীন্দ্র-উপাসনার বাইরে নিমগ্ন রবীন্দ্রচর্চার পরিসরটুকু ছিলো খুব ছোটো, কয়েকটি পরিবারকেন্দ্রিক মাত্র। শান্তিনিকেতনে গেলে, লোহার গুঁড়ো, স্মেল্টারের আগুন আর ম্যাক্সিপ্রেসের ভয়ানক শব্দদূষণ মাখা রবীন্দ্রবিভবের বাইরে একজন অন্য রবীন্দ্রনাথ প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ হয়ে ঘিরে থাকতেন। পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রির রোদে আনখ পুড়ে যাবার পর বাইশ ডিগ্রির বাতানুকূল ঘরে শান্তিকল্যাণের মতো স্বস্তিময়, স্বাচ্ছন্দ্যসরস। অপর কারণটিও কিছু কম আকর্ষণীয় ছিলোনা। সেই পাড়ায় তখন অবিরল দেখা হয়ে যেতো ময়নাপাড়ার মেয়েদের সঙ্গে। সহজ, অকৃত্রিম, একটু বর্তুল উচ্চারণ, ন্যূনতম প্রসাধিত, ধুলোট পায়ের কন্যাসব। হয়তো ঈষৎ প্রগলভ, কিন্তু ঠিক ন্যাকা নয়, মহানগরের সবজান্তা মেয়েদের মতো নয় একেবারে। কিন্তু তাদের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপের জন্য মাঠেঘাটে ঘাসবিহারী হওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিলোনা। সারা তল্লাটে একটু বসে গপ্পো করার মতো কোনও সরাইখানা ছিলো নিতান্ত অমিল।

    শ্রীলা-অভ্র দুজনেই জানায় সে বালাই এখন একেবারেই নেই। প্রচুর খাবারদাবার ঠেক হয়েছে চারদিকে। তাদের মধ্যে কিছু, বোলপুরের মাপে বেশ বিলাসবহুলও বলা যায়।

    তবে তো খেপ মারতেই হয়।
    --------------------------------------------------------------------
    কোথায় যাওয়া যায় ভাবতে ভাবতে অভ্র চলে সোনাঝুরিতে একটা ধাবায়। প্রকৃতির কাছাকাছি বোঝাবার জন্য খড়, বাঁশ, কাঠের গড়ন দেওয়া একটি খোলা সরাই। কিন্তু সে বড্ডো ভিড়। নাহ, বিশ্বায়ন গিলে ফেলেছে ভুবনডাঙাকেও। এবার এগো-ই অন্য ঠিকানায়। শ্রীনিকেতন-ইলমবাজার রাস্তার মোড়ে একটি সাজানো বাগান ঘেরা রেস্তোঁরা, খড়িমাটি। পরিবেশ ভালো, খাবারও ঠিক আছে। কিন্তু আদত শান্তিনিকেতনীরা অভিযোগ করেন সেখানে সম্প্রতি একটি সুরাপান কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উঁকি দিয়ে দেখি নিতান্ত পরিমিত আয়োজন। আমাদের অনেকের বাড়ির সেলারও তার থেকে অনেক বেশি প্রাচুর্যময়। আর ঐ জায়গায় গেলে আমি কখনও সুরাপান করিনি, এবারও করলুম না (না, কিছু প্রমাণ করার নেই)। মনে পড়ে যায়, কলকাতায় গ্র্যান্ডের বলরুমে মেহদি হাসান সাহেবকে একবার গজলের পর সুফি গাইতে অনুরোধ করা হয়েছিলো। তখন তিনি সবিনয়ে জানান, গাইতে বসার আগে তিনি কিছু মদ্যপান করেছিলেন। তাই সুরাগ্রস্ত হয়ে সুফি গাইবার পাপ তিনি করবেন না। তাঁকে যেন মার্জনা করা হয়।

    আসবপান মানুষের লঘুতম ব্যসন। গভীরতর নেশার আয়োজন যেখানে থাকে, সেখানে সুরা তার আকর্ষণ হারিয়ে ফেলে।
    -------------------------------------------------------------------
    পরের দিন একটি পারিবারিক উদযাপনে অভ্র নিয়ে যায় একটি অন্য সরাইখানায়। মার্কস এবং মিডোজ নামে ভোজনের ব্যবস্থাসহ একটি থাকার জায়গা। তুলনামূলক স্থান বিচারে বিলাসিত আয়োজনই বলা যায়। মহানাগরিক স্বচ্ছলতার স্বাচ্ছন্দ্যে অভ্যস্ত অতিথিরা, যাঁরা হয়তো লালসবুজের ধুলোজলে এখনও সহজ শান্তিনিকেতনকে নিছক আরেকটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই গণ্য করেন, তাঁদের স্বস্তি দেবে। সাজানো ভোজনদালানটির সংলগ্ন একটি স্নুকার পুলঘর। সামগ্রিক আবহটি সমুদ্রধারের রিসর্টের ধাঁচে। নিজের মধ্যে স্ববিরোধ অনুভব করি। স্থানমাহাত্ম্যের বিচারে এ জাতীয় নির্মাণটির প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে মনে প্রশ্ন আসে, আবার ইঞ্জিনের পিছনে কামরার মতো উত্তরটিও মসৃণ এসে যায়। এক সময় যে তুমুল তর্ক করতুম, শান্তিনিকেতন কোনও বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নয়। সন্নিহিত পৃথিবীর শাদাকালো, ধুলোধোঁয়া, সব কিছুর দায়ই তাকে বহন করতে হবে। তাই তো হয়েছে, এভাবেই। স্বাগত, হে সোনার পিত্তল মূর্তি।
    ------------------------------------------------------------------

    একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে-একবার বেদনার পানে
    অনেক কবিতা লিখে চলে গেল যুবকের দল;
    পৃথিবীর পথে পথে সুন্দরীরা মূর্খ সসম্মানে
    শুনিল আধেক কথা- এই সব বধির নিশ্চল
    সোনার পিত্তল মূর্তি; তবু, আহা, ইহাদেরও কানে
    অনেক ঐশ্বর্য ঢেলে চলে গেল যুবকের দল:
    একবার নক্ষত্রের পানে চেয়ে- একবার বেদনার পানে।
    ( মহাপৃথিবী: জীবনানন্দ)

    (ক্রমশঃ)


    যে পথ সকল দেশ পারায়ে উদাস হয়ে যায় হারায়ে
    -------------------------------------------------------------

    বহুদিন আগে একটা পদ্য লিখেছিলুম, তার প্রথম লাইনটা," কোনোদিন নদী বয়েছিলো, আজও তার টায়ারের দাগ রয়ে গেছে। " উপলক্ষ্যটি ছিলো প্রথম খোয়াই দেখার অভিজ্ঞতা। সুরুল থেকে সিউড়ির রাস্তায় একটু এগিয়েই বাঁদিকে মোচড় মেরে বিনুরিয়া খালের পাশে পাশে যে লালমাটির রাস্তাটি এগিয়ে গেছে সোজা পশ্চিমে, সোনাঝুরি নামের প্রান্তরটি তার ডানদিকে অবিন্যস্ত শুয়ে থাকে। মৃদু লাল, মধ্য লাল, মেদুর লাল, লালিম আভায় ঘোর ধুলোট মৃত্তিকা, জ্বরতপ্ত প্রেমিকের মতো শুয়ে। প্রেয়সী জলধারা এখন শীর্ণ আকালষোড়শী, কোনও শূশ্রুষা এনে দেয়না আর। মেঘের কাছে অনিবার্য ফিরে গেছে সে, অন্তরীক্ষের কাছে। শুধু দুজনের নখর আশ্লেষের দাগ আঁকাবাঁকা খোয়াই জন্ম নিয়ে অপেক্ষা করে আছে। হে মেঘমদির শবরী, এই সব ক্ষতচিণ্হে ভিজে আঙুল বুলিয়ে দিও একদিন, তার বেশি কোনও প্রত্যাশা নেই তার।
    ----------------------------------------------------------------
    সোনাঝুরির খোয়াই পর্যটকদের অবশ্য দর্শনীয়। আদি সোনাঝুরি গাছগুলি সংখ্যালঘু এখন। সামাজিক বনায়নের দৌলতে গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউক্যালিপ্টাস বৃক্ষ। মাঝখানের সমতল ধুলোর আঙিনায় প্রতি শনিবার বসে খোয়াইয়ের হাট। 'শান্তিনিকেতনী' ব্র্যান্ডের হাতের কাজের ভালো নিদর্শন লভ্য এখানে। বাণিজ্যও মনে হয় আশানুরূপ। বাউলব্র্যান্ড রঙচঙে সাজানো মোটিফসেলাই জোব্বাও পাওয়া যায় এখানে। একতারা, দোতারা হাতে দাড়ির আড়ালে উৎসুক ওষ্ঠের গানও শোনা যায়। কেউ কেউ ভালো-ই গা'ন, কিন্তু আসল বাউল-ফকিরদের দেখিনি এখানে। যে পথটি বেয়ে এইখানে পৌঁছোতে হয়, সেই পথটিই আমার কাছে মনে হয় কবির কাছে নিয়ে যাবে আমায়। চোখজুড়োনো দৃশ্যছবি আমাদের রাঢ় বাংলার আনাচেকানাচে দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু, এই পথটি এক অন্য জন্মের ঝর্ণাতলার নির্জন মনে হয়। মুখবইতে ছবি দেখে সামরান লিখেছিলেন, এ এক অসম্ভব পথ। সত্যিই, ঐ পথে হেঁটে, ধুলো মেখে, স্বেদসিক্ত হয়ে ফিরে আসার পরেও মনে হয় পথটি নিখুঁত জাদুবাস্তবের পরিভাষা। প্রবলভাবে আছে, কিন্তু নেই হয়ে।
    ------------------------------------------------------------------------

    সেই ধুলোডাঙ্গাটির একপাশে খোয়াইয়ের হারিয়ে যাওয়া জলধারার খাদ, জলের মতো-ই এঁকেবেঁকে কোথাও চলেছে। যাঁরা কলোরাডো দেখেছেন, এই আয়োজন তাঁদের জন্য নয়। আমার দেখা বাংলায় আর একটি জায়গাতেই এই দৃশ্যের জন্ম দেখা যায়, অনেক ব্যাপক, বিস্তৃত নির্মাণ তা। গড়বেতার কাছে গনগনির মাঠে দীর্ঘ ঘোর সবুজ কাজুবনের আঁচল সরিয়ে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায় লালপাড় নদীর সীমন্তরেখা। শিলাবতী নদীর শুকনো সোঁতা, লালমাটির শিরা-উপশিরা ছিন্নভিন্ন করে, শিহর জাগিয়ে নিশ্চল অপেক্ষায় রয়েছে সেখানে। নিচের দিকে উঁকি দিলে একটু শিরশির করে ওঠে অনুভূতিগুলি।

    আমাদের গ্র্যান্ড নয়, পাতি ক্যানিয়ন। বাঙালি মেয়েদের মতো, কৃশা, লঘূত্তমা, কিন্তু অমোঘ আর্তি জড়িয়ে থাকে তাদের সারা গা'য়। কচি সবুজ আঁচল জড়ানো শিশিরচিকন কলাগাছের মতো মসৃণ, সর্বতো নারীর মতো।

    সোনাঝুরির খোয়াই সেই বন্যতাকে ধরতে পারেনা। সে মেঘদেবতার হেলায় রিক্তা অম্বালিকার দোসর।
    ---------------------------------------------------------------------------------

    আমার বাবা প্রথম শান্তিনিকেতনে যেতেন গত শতকে চল্লিশদশকের শেষদিক থেকে। তখন তিনি কলকাতায় কলেজছাত্র। ততোদিনে সূর্য ডুবে গিয়েছে, কিন্তু গোধূলির কিছু লালিমা তখনও আকাশে বেঁচে ছিলো, যথেষ্ট উজ্জ্বল। শান্তিনিকেতনের পথেঘাটে খালিপায়ে, কখনও চটি পরে, টোকা বা ছাতা মাথায় বহু ডাকসাইটে মানুষেরা ঘোরাফেরা করতেন। দর্শনধারী কিস্যু ঠাহর হবে না, কিন্তু নামটাম শুনলেই চমকে যেতে হতো। বাবা বলতেন ওখানে রিকশাচালকদেরও একটা অন্যস্তরের জানাবোঝার জগৎ ছিলো। বাইরের লোকজন তো চিরকালই সেখানে আসেন নিয়মিতভাবে। শান্তিনিকেতনে তাঁদের জন্য পান্ডার ডিউটি করতেন ঐ রিকশাচালকেরা। আসলে শান্তিনিকেতনে পর্যটকের লিস্টিটি প্রথম তৈরি হয়েছিলো রিকশাচালকদের দৌলতেই।

    নতুনবাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে ছিলুম ছায়ায়। এক রিকশাসওয়ার দম্পতিকে চালক প্রশ্ন করছেন, বলুন তো রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর আসল নাম কী ? তাঁরা এদিকওদিক ভেবে বললেন, মৃণালিনী না ? এইতো, জানেন নাতো, উনার নাম ছিলো ভবতারিণী। তাই...? হমম, তিনি হলেন যশোরের মেয়ে। এই বাড়িটায় থাকতেন, হুই যে ওদিকের ঘরটা, উনার রান্নাঘর ( এই কথাটা যদিও সত্যি নয়, কারণ ঐ বাড়িতে তাঁর থাকার সুযোগ হয়নি )। পর্যটকেরা চমৎকৃত হয়ে শুনতে থাকেন। খানিক পরে সেই রিকশাচালককেই দেখি কলাভবনের সামনে দেওয়ালের অলংকরণ দেখিয়ে সেই দম্পতিকেই বলছেন, ঐ যে দেওয়ালের আঁকা, ওটা মানিদা'র করা। মানি'দা কে ? সে কী, নাম শোনেননি ? খুব বড়ো আটিস। তাঁরা মাথা নাড়েন। কে জি সুব্রামনিয়ান বেশ ভারি নাম, রিকশাচালকের সব সময় মনে থাকেনা হয়তো।

    কলকাতায় ছিলো 'বাবু' কালচার, শান্তিনিকেতনে শুরু থেকেই 'দাদা' কালচার। সম্ভবতঃ কবি নিজে, অবনীন্দ্রনাথ আর দু'য়েকজন 'কড়া' শিক্ষক ( যেমন জগদানন্দ প্রমুখ) ছাড়া সবাই 'দাদা'গিরির অংশ ছিলেন।
    ---------------------------------------------------------------

    শান্তিনিকেতনের গৌরব ছিলো না ইঁটকাঠ, ধুলোমাটি, কুবেরযক্ষের মেহরবানি। সেখানে ছিলো শুধু এক দল মানুষ, যারা দায়িত্ব নিয়েছিলো সারা বিশ্বে বাংলাভাষায় বেঁচে থাকা মানুষদের জীবনে একটা নতুনধরনের সেরিব্রাল মাত্রা যোগ করার। এই মাত্রাটির দৌলতেই বাংলাভাষীরা দীর্ঘদিন ধরে বোধবুদ্ধির জগতে অন্যান্য দেশবাসিদের থেকে নিজেদের উৎকৃষ্ট ভাবার অহংকার করে এসেছে। প্রাথমিকভাবে উৎসটি ছিলো দ্বারকানাথের দুই পুত্রের দেহকোষে ওয়াটসন-ক্রিক সাহেবের নক্শায় আঁকা কিছু প্রোটিনের কারিকুরি। কালক্রমে সেই সব সংক্রামক প্রোটিনশৃঙ্খলের জাদু ছড়িয়ে পড়েছিলো যতোসব মরা গাছের ডালে ডালে, আকাশে হাততোলা আগুনের মতো। পৃথিবীর সভ্যতার ইতিহাসে, কোনও জাতির সমগ্র সাংস্কৃতিক চেতনায়, একটি মাত্র পরিবার থেকে স্ফূরিত এই জাতীয় বন্ধহীন প্রভাবী দিগদর্শনের নমুনা আর দেখা যায়না। সেই পরিবারটির বাইরে আরো যে সমস্ত মহৎ মননশীল অস্তিত্ত্বগুলি সেই ধারাটিকে শুধু ধরে রেখেছিলো তাই নয়, তাকে ক্রমাগত পরিবর্ধন, পরিমার্জনও করেছিলো, তাঁদের সিংহভাগ একসময় এই ছোট্টো ভূখন্ডটিতেই নিজেদের উপনিবেশ গড়ে তুলে ছিলেন। তাঁরাই ছিলেন শান্তিনিকেতনের আসল সম্পদ, বুনো রামনাথের ব্রাহ্মণীর হাতে লালসুতোর মতো গর্বিত অলঙ্কার। সেই আর্ষরীতির অনুগামী হয়তো এখন অনেক কমে এসেছে, তবু রয়ে গেছেন বেশ কিছু মনস্বী মানুষজন।
    --------------------------------------------------------------
    এই গোত্রের একজন মানুষ, ড. অশোক কুমার দাস। বর্ষীয়ান শিল্প ইতিহাসবিদ, আন্তর্জাতিক স্তরে স্বীকৃত জাদুঘর বিশারদ, মুঘল ও অন্য ভারতীয় লঘুচিত্র বিশেষজ্ঞ এবং কলাসমালোচক। অনেক পালকই আছে তাঁর মুকুটে। দীর্ঘদিন জয়পুর প্রাসাদ জাদুঘরের অধিকর্তা ছিলেন। তার পর বিদ্যাচর্চার সূত্রে সারা বিশ্ব পরিভ্রমণ করেন নিয়মিত। সারস্বত সাধনা জীবনচর্যার অংশ। প্রেসিডেন্সি থেকে স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ, ভারতীয় জাদুঘর থেকে ব্রিটিশ মিউজিয়ম, মেট্রোপলিটান থেকে খুদাবক্শ, সর্বত্র তাঁর ঘর বাঁধা আছে। বিশ্বভারতীর সত্যজিৎ রায় অধ্যাপক হিসেবে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন। তার পর থেকে গত আঠেরো বছর এখানেই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা।

    বাগানপাড়াতেই তাঁর সুরম্য বাড়িটিতে বসে নানা আড্ডা। ইতিহাস থেকে হয়তো শুরু, তারপর সেখান থেকে উদ্যানচর্চা, ভোজনবিলাস বা সাহিত্যসহকার, কিছুই অস্পৃশ্য থাকেনা। তাঁর সহধর্মিণী শ্রীমতী শ্যামলী দাসের গবেষণা ও বিশেষ চর্চা রয়েছে ঐতিহ্যজাত ভারতীয় বয়নশিল্প ও তার বিবর্তনধারার ক্ষেত্রে।

    শান্তিনিকেতন এখনও 'শান্তিনিকেতন' হয়ে রয়েছে এই স্তরের আশ্রমিকদের বোধিব্রত ও জীবনচর্চার সুবাদে। আমাদের সমৃদ্ধ দুপুরভোজে আপ্যায়িত করলেন তাঁরা।

    স্মৃতির সিন্দুক এভাবেই ক্রমে ভরে ওঠে।
    (ক্রমশঃ)

    সামনে চেয়ে এই যা দেখি
    ----------------------------------------
    দক্ষিণ-পশ্চিমদিক দিয়ে সড়কপথে শান্তিনিকেতন যাওয়ার জন্য লোকে দুর্গাপুর থেকে জিটি রোড ধরে পানাগড় যাওয়ার পথে কাঁকসা মোড় থেকে বাঁদিকে ঘুরে যায়। এই চোদ্দো নম্বর সড়কটি সটান উত্তরপূর্বে রামনাবাগান জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে অজয় নদের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকে। পূর্ব বর্ধমানের এককালের বিখ্যাত দুর্গাপুরের জঙ্গল এখন এইটুকুই টিকে আছে। বাংলাদেশের যতো সাবেকি ডাকাতের কিম্বদন্তী এই শাল বনের সুদীর্ঘ রেঞ্জটি আশ্রয় করেই একদিন গড়ে উঠেছিলো। তিরিশ বছর আগে যখন বাইকে চড়ে এ তল্লাটে যাওয়াআসা ছিলো তখন এই জঙ্গলটি গৌরবে মিনি সারান্ডার স্টেটাস রাখতো নিশ্চয়। এখনও রয়েছে, কিন্তু গাছগুলি মূলত: সামাজিক বনসৃজনের ফসল। প্রাচীন বনস্পতি সব চেরাইকলে রেস্ট ইন পীস। তবু সিংভূমের লোক শালবনের ছায়ায় সেমত সুন্দর, যেমতি সিপাইরা সুন্দর জেলে।

    এই জঙ্গলের শেষে পথটি পেরিয়ে যায় বর্ধমানের সীমানা, অজয় নদের সেতু। তার পরেই ইলামবাজারের তেমাথা। তেমাথার মোড় থেকে উত্তর-পশ্চিমদিকে রাস্তাটা চলে গেছে শ্রীপুর হয়ে হেতম পুর, দুবরাজপুর। আর পূবদিকের রাস্তাটা গেছে চৌপাহাড়ির জঙ্গল পেরিয়ে সটান সুরুল গ্রাম। উত্তরদিক থেকে আসা সিউড়ির রাস্তা এখানে এসে মিলেছে ভুবনডাঙ্গা জংঅশনে। রাঢ়বঙ্গের প্রামাণ্য ল্যান্ডস্কেপ যতো ছড়িয়ে আছে এই পথের দুধারে।

    চোখে আমার বীণা বাজায়.......
    ---------------------------------------------------------------

    সত্তর দশকের ঠিক পরে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির প্রাসঙ্গিকতা ও অবমূল্যায়ন নিয়ে আমাদের প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে যে চর্চাটি হতো, সেখানে পূর্বধারণাগুলির অবস্থান ছিলো মেরুপ্রমাণ দূরত্বে। কলকাতার যে সব ছেলেরা আলিপুর, বহরম পুরের জেলহাজত থেকে বেঁচে ফিরে এসেছে বা আমাদের গ্রামের হাজারিবাগ জেলফেরত দাগি ছেলেপুলেদের রবীন্দ্রপ্রসঙ্গ নিয়ে ভাবনাচিন্তায় ছিলো তীব্র দোলাচল। আমার স্বল্প পরিচিত একটি কলকাতা থেকে আগত তরুণ ( যাকে কেউ কেউ মিনিমাও বলতো, অন্যেরা বলতো যদুপুরের পাকা ) নানারকম বৈপ্লবিক তত্ত্ব দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে ব্যাখ্যা করতো। আমাদের ছোটো শহরের পরিপাকের পক্ষে সে জাতীয় কথাবাত্তা ছিলো বেশ দুরূহ। সেসময় আমিও বড়োজোর বছর কুড়ি। একদিন একটা আড্ডায় শুনি সে তার তত্ত্বকথা বেশ উচ্চস্বরে প্রচার করে চলেছে। বহু বহুকাল পরে গত বছর এক "প্রথিতযশা" বাঙালি গায়কের একটি ঘোষণা শুনেছিলুম। নিজের গাওয়া একটি অতি নিম্নরুচির মিউজিক ভিডিওর শেষে তিনি ইংরিজিতে বলে উঠলেন definitely it is filthy, because it is political . 'পলিটিক্যাল' হতে গেলে যে ফিলদি হতে হয় সে শিক্ষা মিনিমাও আমাদের দিয়ে ছিলো। পরবর্তীকালে বিভিন্ন জনবিনিময়ে যখন আপাদমস্তক পলিটিক্যাল আমি, কবিকে নিয়ে কিছু বলাবলি করতুম, মিনিমাও নিশ্চিত সেখানে যেতো। সব কিছু শুনে বলতো, ইয়োর অ্যাপ্লিকেশন অফ মার্ক্স অন টেগোর ওয়াজ পারফেক্ট, বাট অ্যাট দি এন্ড অফ দি ডে, হি ওয়াজ ডেফিনিটলি ডেকাডেন্ট।

    একদিন আমাকে খুব সিরিয়সভাবে শুধালো, " সি, শেকভ ওয়াজ ফার মোর পাওয়ারফুল স্টোরি রাইটার, সো ওয়াজ টলস্টয় অ্যাজ আ নভেলিস্ট। হি ক্যান নেভার বিট শেকস্পিয়র অ্যাজ আ ড্রামাটিস্ট অ্যান্ড হি অ্যাজ আ পোয়েট, উড লুজ হিজ ক্রাউন টু টূ মেনি পিপল। হোয়াট ইউ পিপল ফাইন্ড সো স্পেশাল 'বাউট হিম ?

    এত্তো ইংরিজি বলেও সে ঢাকতে পারেনা তার ডাফ লেন, মোহনবাগান রো থেকে গড়িয়ে আসা অন্ধগলির পাতি কলকাতা।

    এই সব মানুষকে অনেক কথাই বলা যায়, আবার নিশ্চুপে উপভোগও করা যায় তার শিকড়হীন উদ্দীপনা। দ্বিতীয়টিকেই সঠিক ভেবেছিলুম তখন, এখনও তাই ভাবি।

    আরও ভাবি 'শান্তিনিকেতন'ও তো অনেকের কাছে ' ডেকাডেন্সের' একটি প্রকৃষ্ট নমুনা।
    ---------------------------------------------------------------------------

    দ্বারকানাথের সাহেব সেক্রেটারি মনিবের বারম্বার সিদ্ধান্ত বদলানোর অভ্যেসে বড়ো বিড়ম্বিত থাকতেন। সেই বিখ্যাত " বাবু চেঞ্জেস হিজ মাইন্ড" উক্তিটি তাঁরই করা এবং তা নিয়ে কবিরও বেশ শ্লাঘা ছিলো। ইওরোপযাত্রার জন্য জাঁকজমকের সঙ্গে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হাওড়া স্টেশন থেকে ফিরে আসা ও যাত্রা সম্পূর্ণ নাকচ করে দেওয়ার ঘটনা আমরা জানি। আরও জানি এ জাতীয় ঘটনা একবার নয়, বারবার ঘটেছে। গতানুগতিক স্থিতির স্বাচ্ছন্দ্য কবির একেবারে নাপসন্দ ছিলো। আরও অনেক ব্যাপারের মতো তাঁর বাসস্থান পরিবর্তনের নেশাও ছিলো কিম্বদন্তীসুলভ। সুধীর কর মশায় লিখেছেন, একসময় দেহলি বাড়ি ছিলো তাঁর প্রিয় আস্তানা। ঐ বাড়ির দোতলার বারান্দায় বসে গ্রীষ্মকালের প্রবল তপ্ত হাওয়ায় তাঁর সৃজনশক্তি স্ফূরিত হতো। পরবর্তীকালে খ্যাতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে উত্তরায়ন প্রাঙ্গনের অট্টালিকাটি, উদয়ন, নির্মিত হয়। সেখানে কবি বেশ কিছুদিন বসবাস করেন। তার পর আরেকটু কোনায় গিয়ে কোণার্কবাড়ি। তাও পুরোনো হয়ে গেলো শ্যামলীবাড়ি তৈরি হবার পর। শ্যামলীবাড়িটির প্রতি তাঁর বেশ পক্ষপাত ছিলো শুনেছি। কিন্তু সে মাটির বাড়ি বৃষ্টির ধাক্কায় বিপজ্জনক হয়ে পড়লে 'পুনশ্চ'। নামেই পরিচয় এই বাড়িটি নির্মাণের উদ্দেশ্য। সে বাড়িও 'পুরোনো' হয়ে যায় অচিরাৎ এবং শেষ পর্যন্ত তার পাশে উদীচী বাড়ি। সেখান থেকেই তিনি কলকাতার পথে শেষযাত্রায় প্রয়াত হ'ন। এই বিরাটশিশুর ছেলেখেলার নমুনা হিসেবে এই নিত্য নতুন বাড়ির নেশা একটি উল্লেখ্য বিষয় হতেই পারে। শান্তিনিকেতনের পর্যটকেরা অবশ্য ছুটতে ছুটতে বাড়িগুলির দেওয়ালে প্রলম্বিত দীর্ঘ আলোকচিত্রগুলি দেখতেই ব্যস্ত থাকেন। এই সব বাড়িরই স্থাপত্য একটু মনোসংযোগ করে দেখতে হয়। সিমিট্রির মামুলি ফর্মুলাকে কীভাবে বিনির্মাণ করা যেতে পারে তার কিছু নিদর্শন পাওয়া যাবে এই আবাসভবনগুলিতে। ভাগ্যিস, বাবু চেঞ্জড হিজ মাইন্ড সো অফন।
    -------------------------------------------------------------------------

    তার ভালো নাম শ্রয়ণ, মানে আশ্রয়। সে আরেকটু জমকালো নামের প্রত্যাশী। তাই নিজে লেখে শ্রয়ণেন্দ্রনাথ। এই বিস্তারের পিছনে ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে নিজের বাড়ির নামকরণ ঐতিহ্যেরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। তার বয়স বছর দশ। তবে যে নামে সে ধন্য, তা হলো চোটুরাম।

    এই শৈশব পেরিয়ে বালকত্বের দিকে প্রায় এগিয়ে যাওয়া ছেলেটিকে দেখে আমার মনে হয়, তাঁর পরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থায় শিশুদের ঠিক যেভাবে অগ্রসর হওয়ার কথা কবি ভেবেছিলেন, তার একটি নিদর্শন দেখতে পাওয়া যাবে। বুদ্ধিমান, কিন্তু প্রগলভ নয় ;সংবেদনশীল, কিন্তু দ্বিধাগ্রস্ত নয়; স্নেহাকাঙ্খী, কিন্তু আত্মসর্বস্ব নয়। সে ছবি আঁকে, গান গায়, প্রচুর পড়ে, প্রচুর খেলে, প্রচুর কথাও বলে। কল্পনাপ্রবণ, নিজস্ব ধরনের যুক্তিধারার প্রতি বিশ্বস্ত এবং অর্গলহীন ছেলেমানুষ। কিছু তার বাবার থেকে পাওয়া 'ঈশ্বরচিন্তা' নিয়ে আমার সঙ্গে বেশ প্রত্যয় পরবশ হয়ে আলোচনা করে। তার মতে ঈশ্বর নেই, কারণ তিনি থাকলে তাঁর পূজার সময় প্রাণীবলি হতে দিতেন না। অন্তত: পাঁচশো বছরের কম বয়সী কোনও মন্দির স্থাপত্য তার মতে নকল মন্দির। তার জীবনের লক্ষ্য নানারকম। কখনও সে পুরাতত্ত্ববিভাগের কর্তা হতে চায়, কখনও রকেটবিজ্ঞানী। কখনও বা তার সাধ হয় শান্তিনিকেতনের গাইড হবে। এই সাধটি পূর্ণ করার জন্য সে শান্তিনিকেতনে আমার স্বনিযুক্ত গাইডের ভূমিকা নেয়। প্রখর রোদ ও গ্রীষ্মের মধ্যে সে তার ছোট্টো সাইকেলটি টেনে টেনে আমাদের প্রতিটি বাড়িঘর, গাছপাথর, ফুলের বাগান দেখিয়ে বেড়ায়। নিপুণভাবে দ্রষ্টব্য লক্ষ্যগুলির ইতিহাস-ভূগোল বর্ণনা করে। তার একমাত্র দাবি, তার বক্তব্যের প্রতি যথেষ্ট সিরিয়স মনোনিবেশ করতে হবে। তার রৌদ্রক্লান্ত মামী সফরটি সংক্ষেপ করতে চাইলে সে বেশ ক্ষুব্ধ হয়। রথীন্দ্রনাথের জাদুঘরটি আজ খুলেছে। সেটি না দেখলে যে ঘোর অবিচার হবে সে কথা সে বিশদভাবে পেশ করে। শান্তিনিকেতনের অভ্যস্ত আশ্রমিক উচ্চারণ " আমাদের সব হতে আপন" তার জন্য চূড়ান্ত অনুভব। আমি যখন তাকে বলি, এখানকার লোকেরা খুব ন্যাকা হয়। সে প্রধূমিত ক্ষোভের উত্তাপে জর্জর হয়ে তার মা'কে অভিযোগ জানায়, শিবাজিমামা সুবিধের লোক নয়, ভীষণ আজে বাজে কথা বলে।

    আমি ভাবতে ভালোবাসি, এই রকম শিশু, বালকেরা শান্তিনিকেতনে আরও রয়েছে। কিন্তু আজকের শান্তিনিকেতন কি তাদের ছায়া দিতে পারার এলেম রাখে ?

    কবি'কে তো এরাই বাঁচিয়ে রাখবে।
    ------------------------------------------------------------------------

    তোমার মোহনরূপে
    ---------------------------------

    রবীন্দ্রসঙ্গীত শোনার যে অভ্যেস এখন শ্বাসক্রিয়ার মতো অবিরল‚ অনর্গল্‚ তার পিছনে একটা দীর্ঘ প্রস্তুতি রয়েছে। এই অভ্যেসটি আমাদের বেড়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজেও বড়ো হতে থাকে। আমার শরীরের দৈর্ঘ্য‚ প্রস্থ‚ মনের মধ্যে গড়ে ওঠা নানা রকম বেড়া‚ তাদের ভাঙা আবার গড়ে তোলার যে খেলা‚ যা সংক্ষেপে আমার ঐহিক জীবন ‚ তাকে জড়িয়ে ধরে আঙুরলতার মতো সেও আকাশের দিকে হাত বাড়াতে চায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত এই মূহুর্তে জীবনে যে পর্যায়ের ছায়াবিস্তারী মহীরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে‚ সেখানে মুগ্ধতা‚ প্রেম‚ সম্মোহন‚ আকর্ষণ ইত্যাদি শব্দ অপরিসর মনে হয়। একটা শব্দ কিছুটা কাছে যেতে পারে‚ সেটা হলো পরিপূর্ণতা। আমাদের প্রজন্মের সৌভাগ্য‚ গত একশো বছরের অধিক কাল‚ তিন-চার পুরুষ ধরে রবীন্দ্রসঙ্গীত নামক যে শিল্পধারা গড়ে উঠেছে ‚ তার শ্রেষ্ঠ ফলগুলি আস্বাদন করার সুযোগ আমরা পেয়েছি ় এর ভালো দিকটা হলো‚ মানুষ হয়ে জন্মাবার সূত্রে একটা সেরা সম্পদ লাভ। আর নেতিবাচী দিকটা‚ রস উপভোগের মাত্রাটির মান আকাশছোঁয়া হয়ে যাওয়া। এই শিল্পে সের্গেই বুবকা বা এডুইন মোজেসের দল বা তোমারি তুলনা তুমি প্রাণ‚ তাঁদের খেলা সাঙ্গ করে বাড়ি ফিরে গেছেন। একসঙ্গে আকাশে অগুন্তি নক্ষত্র ছিলো যখন‚ তার শ্রেয়ফল আমাদের নসিব হয়েছিলো। আবার যখন অন্ধকার আকাশে একটি-দু'টি মিটমিটে তারা নিষ্প্রভ সীমাবদ্ধতায় কোনমতে জেগে থাকার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছিলো‚ তার সাক্ষী থাকার সুযোগও হয়েছে আমাদের। এরকম একটি সময়ে কাগজে পড়েছিলুম‚ আনন্দ পুরষ্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে এক শিল্পী এমন উচ্চমানের রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেছেন‚ যাকে সেই তোমারি তুলনা ইত্যাদি বলা যেতে পারে। তাঁর নাম তার আগে আমি শুনিনি‚ নামটি অবাঙালিসুলভ।
    ------------------------------------------------------

    সুমন যেমন হঠাৎ এসে আমাদের বাংলাগান শোনার অভ্যেসটি আমূল বদলে দিয়েছিলেন‚ তেমনি রবীন্দ্রসঙ্গীতে প্রায় সমসময়ে যিনি এই কাজটি করেছিলেন তাঁর নাম মোহন সিং খঙ্গুরা‚ সবার মোহনদা। তিনি প্রায় আকৈশোর শান্তিনিকেতনবাসী। শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্যে নারীকণ্ঠের কিন্নরী শিল্পীর সংখ্যা পরুষদার্ঢ্যের কণ্ঠশিল্পীর থেকে বেশ অধিক। সত্যিকথা বলতে অশোকতরু ছাড়া এই মূহুর্তে আর কারো নাম মনে পড়ছে না। পরিশীলিত‚ সুরেলা কণ্ঠ‚ গভীর প্রস্তুতি ও ধীমান পরিবেশনা‚ পুরুষশিল্পীদের মধ্যে এই সব লক্ষণ অবিরল না হলেও কয়েকজন শিল্পী নিশ্চয় ছিলেন যাঁরা এই শিল্পরীতিটিকে নতুন মাত্রা দিয়েছেন। রসিকজনের আকাঙ্খা পূর্ণ করার ক্ষমতা তাঁদের ছিলো। কিন্তু পঙ্কজকুমারের ঘরানা পূর্ণতা পাবার পর‚ সাধারণ শ্রোতাদের কাছে রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়নের এক অন্যতর শৈলি লোকপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই লোকপ্রিয়তা রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বনিযুক্ত অভিভাবকদের নির্দেশিত শুদ্ধতার মাত্রাবোধকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানায়। রবীন্দ্রসঙ্গীত যে শুধু নিভৃত গৃহকোণে গুনগুনানো নিজের মুদ্রাদোষে একলা হয়ে থাকা এককের গান নয় বা ব্রাহ্মমন্দিরের যান্ত্রিক ভক্তসম্পূট‚ সেই অবস্থানটি শক্তি পেয়েছিলো পঙ্কজকুমারের আজীবন প্রয়াসে। তিনি এতো অধিকমাত্রায় রবিসঞ্জীবিত ছিলেন যে হয়তো সম্পূর্ণভাবে নিজেও বোঝেননি ‚ ভবিষ্যতের দেওয়াল লিখন তাঁর সঙ্গীতভাবনাকেই স্বাগত জানাবে। একটি শব্দ দিয়ে মোহনদা সেদিন রবীন্দ্রসঙ্গীতকে বোঝাতে চেয়েছিলেন‚ যার অমোঘত্ব প্রশ্নহীন। কিন্তু হয়তো আজকের দিনেও অনেকের মনে তা নিয়ে দ্বিধা থাকতে পারে। শব্দটি ছিলো 'ম্যাজেস্টিক'।
    ------------------------------------------------------

    মোহনদার শান্তিনিকেতনের বাড়িটিতে পৌঁছোনোর শাখাপথটি সংকীর্ণ। রথের গৌরবে তৃপ্ত মানুষদের একটু হেঁটে তাঁর দুয়ার পর্যন্ত পৌঁছোতে হবে। এটি কোন উল্লেখনীয় বিশেষত্ব নয়‚ কিন্তু আমার মনে এর একটা প্রতীকী ইশারা এলো। রবীন্দ্রসঙ্গীতের কাছে পৌঁছোতে গেলে অনিবার্যভাবে কিছুটা ধুলোমাটির পথে হেঁটে যেতে হবে। রাজার রথে চড়ে তার কাছে সরাসরি পৌঁছোনো যায়না। অথচ অনেক 'রাজা'ই সে কথা বোঝেন না। এমন অভিমান তেনাদের‚ এমনি অভিমান ....

    গলিটির শেষে দু'টি দোতলা বাড়ি। বাঁদিকের বাড়িটিতে মোহনদার ভদ্রাসন। বারান্দায় জুতো খুলতে খুলতে শুনি ঘরের ভিতর তানপুরা যন্ত্রের গুঞ্জন। ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখি মোহনদা বসে আছেন একটি নিচু আসনে‚ তানপুরা যন্ত্রটি থেকে সুর উঠে আসছে। মেঝেতে মাদুরপাটি পাতা রয়েছে। অভ্র-শ্রীলা তাঁর স্নেহধন্য‚ সেই অধিকারে আমারও স্বাগত সেই গৃহে। পিছনের দেওয়ালে দু'টি প্রতিকৃতি‚ পন্ডিত ধ্রুবতারা যোশি এবং পন্ডিত অশেষ বন্দ্যোপাধ্যায়। দুই গুরুর স্নেহচ্ছায়ায় আশ্রিত শিষ্য সেইখানে বসে সুরসাধনা করেন। সামনের কাচের আলমারিতে আরো প্রতিকৃতির সঙ্গে দুজনের মুখের ছবি‚ যাঁরা এখন নয়নের মাঝখানে বসবাস করেন। পুত্র বিক্রম এবং তাঁর মাতৃদেবী। একাকী যাবোনা অসময়ে‚ এরকম প্রতিশ্রুতি তাঁরা দিয়েছিলেন কি না জানা নেই ; কিন্তু সেভাবেই চলে গেছেন।

    একপাশে একটি টিভি‚ তার উপর বেশ কয়েক খন্ড রবীন্দ্ররচনা সংকলনের পঞ্জাবি অনুবাদ। আমরা গিয়ে মাদুরে বসি।
    ------------------------------------------------------
    মোহনদার প্রথাবদ্ধ সঙ্গীতশিক্ষা মূলতঃ শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে আগ্রহী হয়েছিলেন পরবর্তীকালে। তাঁর শাস্ত্রীয়সঙ্গীতে গভীরপাঠ তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এক ভিন্ন গরিমা দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এ ব্যাপারে তিনি শুধু পথিকৃৎই ন'ন‚ এখনও একম অদ্বিতীয়ম। গত একশো বছর ধরে বিভিন্ন শাস্ত্রীয় সঙ্গীতকারেরা রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছেন। এখনও কেউ কেউ গেয়ে থাকেন। কিন্তু তা একান্তভাবে তাঁদেরই গান হয়ে থেকে যায়‚ রবীন্দ্রনাথের গান হয়ে উঠতে পারেনা। এই ঘটনাটি আমার বিস্ময় উদ্রেক করে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতশিক্ষার ভিত্তি চারতুকের ধ্রুপদ ফরম্যাটে। সামান্য কিছু ব্যতিরেকে তাঁর প্রায় সব গানই চারতুকের রচনা। অর্থাৎ ধ্রুপদের পরিমার্জিত অনুশাসন কখনও রোদের মতো‚ কখনও ছায়ার মতো‚ তাঁর গানকে অনুসরন করে চলে। কিন্তু প্রথাগত ধ্রুপদ বা অন্য আঙ্গিকে শিক্ষিত শাস্ত্রীয় কণ্ঠশিল্পীরা যখন তাঁর গান গাওয়ার প্রয়াস করেন‚ সেখানে রবীন্দ্রসৃষ্টির পরিমার্জনা প্রকৃত প্রস্তাবে সঞ্চারিত হয়না। সে‚ শিল্পী রমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় হো'ন বা অজয় চক্রবর্তী‚ ঘটনাটি একই থাকে।

    মোহনদা'ই এখনও একমাত্র ব্যতিক্রম। তাঁর শাস্ত্রীয় শিক্ষার গভীরতা ও রবীন্দ্রনাথে একান্ত সমর্পণ এবং তার সঙ্গে কণ্ঠসম্পদ‚ তাঁর গীত রবীন্দ্রসঙ্গীতকে এক অন্যতর মাত্রা দেয়। তিনি একাধারে শান্তিদেবের স্ফূর্তি‚ সুবিনয়ের নিষ্ঠা এবং পঙ্কজকুমারের ঔদাত্ত আত্মস্থ করেছেন। এই গরিমাটি আমরা অন্য কোনও শিল্পীর মধ্যে পাইনি। রবীন্দ্রসঙ্গীতে'ম্যাজেস্টিক' শব্দটির প্রয়োগ কীভাবে হয়‚ তিনি নিজে তার মূর্ত উদাহরণ।
    ------------------------------------------------------
    পন্ডিত ধ্রুবতারা যোশি এক বিরল প্রতিভা। এনায়ত খানের প্রিয় শিষ্য ছিলেন। তাঁর কাছ থেকে সেতারের তালিম হাসিল করে ছিলেন বহুদূর। কিন্তু হঠাৎ তাঁর শরীর বিশ্বাসঘাতকতা করে। অতিদ্রুত ঝালা তানতোড়া করার সময় তাঁর আঙুলগুলি অবশ হয়ে যায়। অনেক চিকিৎসা করেও আরোগ্য হননা তিনি। নিরাশ শিষ্যকে এনায়ত কণ্ঠসঙ্গীতে তালিম নিতে বলেন। তখন তাঁর গুরু হ'ন এনায়তের ঘনিষ্ট সুহৃদ ফ্যয়েজ খান। অকালপ্রয়াত প্রাণের বন্ধুর অনুরোধে অফতাব-এ-মৌসিকি যোশিজিকে তাঁর শ্রেষ্ঠকোটির তালিম দেন। যোশিজি সম্ভবত ভারতবর্ষে একমাত্র শিল্পী‚ যাঁর এটওয়া ঘরানার যন্ত্রের তালিম আর আগ্রা ঘরাণার কণ্ঠসঙ্গীতের তালিম হাসিল হয়েছিলো। বাল্যকালে পিতৃহারা উস্তাদ বিলায়তকে সহি ঘরানার তালিম দিয়েছিলেন যোশিজি। বিলায়ত শিক্ষার্থী থাকার সময় লখনউতে যোশিজির বাড়িতেই থাকতেন। দুজনে দুজনকে খলিফা বলে স্বীকার করতেন। মোহনদার কণ্ঠসঙ্গীতে তালিম এহেন যোশিজির কাছে। তার সঙ্গে পন্ডিত অশেষ বন্দোপাধ্যায় আর পন্ডিত ওয়াঝেলওয়ারের শিক্ষা। এটওয়া‚ আগ্রা‚ বিষ্ণুপুর‚ সমস্ত ঘরানার মণিমুক্তো সংগ্রহ করে তিনি তাঁর ভান্ডার পূর্ণ করেছিলেন।

    রবীন্দ্রসঙ্গীতে তাঁর অভিষেক অনেক পরে ়
    -----------------------------------------------------

    আড্ডা দিতে দিতে প্রশ্ন করলুম‚ কীভাবে তিনি গানের নেশায় পড়লেন?

    তিনি পিছিয়ে যান অনেকদূর। বহুদিন আগে রাজস্থানের এক ব্রাহ্মণ পরিবার জীবিকার সূত্রে পঞ্জাবে এসে বসতি করেন। লুধিয়ানা থেকে অল্পদূরে লটালা গ্রামে স্থিত হয়ে তাঁরা পরবর্তীকালে শিখধর্মে দীক্ষিত হন। সেই পরিবারেই স্বাধীনতার কিছুদিন পরে মোহনদার জন্ম। তাঁর পিতৃদেব ছিলেন সঙ্গীতরসিক। মোহনদা চন্ডীগড়ে ইশকুলের পাঠ সাঙ্গ করার পর গানের তালিম নিতে ব্যগ্র হয়ে পড়েন। তাঁর পরিবারের এক গুরুজন একসময় শান্তিনিকেতনে এসে থেকেছিলেন কিছুদিন। কিশোর মোহনদার আগ্রহ দেখে তিনি তাঁকে শান্তিনিকেতনে গিয়ে তালিম নিতে অনুপ্রেরিত করেন। সতেরো বছরের কিশোর তখন থেকেই শান্তিনিকেতনের অচ্ছেদ্য অঙ্গ। সঙ্গীতভবনে শিক্ষার্থী‚ তার পর সেখানেই অধ্যাপনা। সঙ্গে পাওয়া অগণিত গুণ মুগ্ধ ছাত্রছাত্রী‚ শ্রোতৃদল আর শান্তিনিকেতনী সঙ্গীতের এক নতুন ধারা।
    -----------------------------------------------------

    শান্তিনিকেতনে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীতের অনুপ্রেরণা তথা গুরু ছিলেন দুজন‚ শান্তিদেব ঘোষ ও কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়। 'শান্তিদা' আর'মোহরদি'র কাছে তাঁর কৃতজ্ঞতা জানান অকপটে। টিভি'তে ঐ সময় একটা অনুষ্ঠান হচ্ছিলো। কলকাতায় অনুষ্ঠিত স্বামীজি সংক্রান্ত একটি আলেখ্যের পুনঃপ্রচার। অনুষ্ঠানটিতে মোহনদা বেশ কটি গান গেয়েছিলেন। যখন সেই গানগুলি পর্দায় আসছিলো‚ তখন আমরা শিল্পীর সঙ্গে একযোগে শুনছিলুম। আমাদের রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আলোচনাও চলছিলো তার ফাঁকে ফাঁকে । আমি তাঁকে প্রশ্ন করি‚ এই মূহুর্তে রবীন্দ্রসঙ্গীতে যে ধরনের পরিবেশন আমরা দেখছি‚ সেখানে তাঁর মতে কীসের অভাব আছে ? বিষয়টি নিয়ে অনেক ভেবেছেন‚ তাঁর কথায় তা স্পষ্ট। তিনি তাঁর অনুভূতিটি প্রকাশ করলেন সেই শব্দটি দিয়ে‚ যার উল্লেখ আমি ইতোমধ্যে করেছি। রবীন্দ্রসঙ্গীতের প্রকাশভঙ্গির মধ্যে একটা ম্যাজেস্টিক মাত্রা থাকা দরকার‚ রাজকীয় গরিমা। সেটা না থাকলে পরিবেশনটি বৃথা। এখন তাই হচ্ছে। হাটের ধূলা‚ প্রাণে সয়না একেবারে।
    ------------------------------------------------------

    যে ব্যাপারটা বহুদিন আগেই জেনেছি যে কবির কাঙালও যখন বলে‚ আমায় ভিখারি করেছো‚ আরো কী তোমার চাই ? এই ভিখারি তো আসলে কপিলাবাস্তুর রাজকুমারের মতো। আমাদের ঐতিহ্যে প্রথম মানুষ‚ যিনি ভিক্ষাবৃত্তির মধ্যেও রাজকীয় সম্ভ্রমের সঞ্চার করেছিলেন। যিনি তাঁর ভুবন শূণ্য করে ফেলেন আরেক কাঙালের আশ মেটাতে। এভাবে সর্বহারারও এক রাজসিক পরিচয় গড়ে ওঠে। রবীন্দ্রসঙ্গীত আমাদের সেই রাজসিক উত্তরাধিকার। সন্ধ্যাকাশে ঊর্দ্ধকর হয়ে দাঁড়ালে থরে থরে ঝরে পড়া আপন প্রাণের ধন। তাকে তো ম্যাজেস্টিক হতেই হবে।
    -----------------------------------------------------
    একটা অস্বস্তিকর প্রশ্ন করি‚ কার গান এই মূহুর্তে ভালো লাগে ? তিনি নাম করেন অদিতি মহসিনের। এই শিল্পী আমারও খুব প্রিয়। বলি‚ মান্না দে যদি রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়মিতভাবে রেকর্ড করতেন‚ তবে একটা অন্যরকম গায়কীর প্রচলন হতে পারতো। কারণ তিনি ভারতবর্ষের সামগ্রিক সঙ্গীতবৃত্তের সঙ্গে গভীরভাবে ওতোপ্রোত ছিলেন। গানের ভিতর দিয়ে 'সীমাহীন' শ্রোতাসমাজের কাছে পৌঁছোনোর জাদু তাঁর জানা ছিলো। তাঁর সূত্রে রবীন্দ্রসঙ্গীত বৃহত্তর শ্রোতৃমন্ডলীর কাছে সহজে আদৃত হতো। না‚ আমি তাঁর 'স্টার' আবেদনের প্রসঙ্গে যেতে চাইনা। তাতো আশাজির মধ্যেও ছিলো। মান্নাদা ছিলেন একজন আদ্যন্ত বাঙালি। 'রবীন্দ্রনাথে'র পরিভাষা কী‚ সে সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা ছিলো তাঁর। তার সঙ্গে ছিলো আপোসহীন পেশাদারি উৎকর্ষ। শুনেছি‚ বাড়িতে সর্বক্ষণ রবীন্দ্রসঙ্গীতই গাইতেন‚ গুনগুন করে। মোহনদা জানান‚ মান্নাদার সঙ্গে তাঁর রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর ভদ্রতাবোধ‚ শালীনতা ছিলো প্রশ্নের ঊর্দ্ধে, অনুকরনীয়।

    ভাবি‚ শান্তিনিকেতনী অনুশাসনের বেড়াজাল এইভাবে একজন সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি গায়ককে রবীন্দ্রসঙ্গীত শ্রোতাদের কাছে অলভ্য করে রেখে দিলো।
    -----------------------------------------------------
    মোহনদার কাছে জানতে চাই‚ এতো দীর্ঘদিন শান্তিনিকেতন বাসের পর তাঁর মাতৃভাষার সঙ্গে যোগাযোগটি এখন কী রকম রয়েছে ? তিনি জানান‚ একসময় তিনি নিয়মিত পঞ্জাবিতে কবিতা লিখেছেন। এখন হয়তো তার স্রোত একটু স্তিমিত‚ কিন্তু তা রয়েছে পুরোমাত্রায়। পঞ্জাবিভাষা‚ সাহিত্যচর্চা তিনি নিয়মিত করে থাকেন। শরীরের অসহযোগ‚ শোকসন্তাপের আগুন উপেক্ষা করে একজন সৃষ্টিশীল মানুষ যেভাবে একটি পূর্ণতাময় যাপন আমাদের সামনে রেখে যান‚ আমরা শুধু তার সাক্ষী থাকতে পারি।

    সন্ধে কখন রাত হয়ে গেছে‚ বোঝা যায়নি। প্রণাম করে বেরিয়ে আসি সবাই।
    -----------------------
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১৩ এপ্রিল ২০১৪ | ১৪৫১ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • এমেম | unknown.*** | ১৫ এপ্রিল ২০১৪ ১১:৩৬72606
  • ইতিহাস ও ভুগোল সুন্দর মিশেছে। আরও অনেক কিছুই ভালো লেগেছে। একটা প্রশ্ন ছিল -- মাঠঘাট পাঁচিলে পাঁচিলে ঘিরে ফেলা হলেও, আশ্রমপ্রাঙ্গন ভালোই মেইন্টেন করা হচ্ছে বলে মনে হল।
  • এমেম | unknown.*** | ১৫ এপ্রিল ২০১৪ ১১:৩৮72607
  • এহে প্রশ্ন হল না। প্রশ্ন --- আশ্রমপ্রাঙ্গন ভালো মেইন্টেন করা হচ্ছে কি?
  • শিবাংশু | unknown.*** | ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ০৪:২৬72612
  • @এমেম,

    সত্যি...? :-)
  • শিবাংশু | unknown.*** | ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ০৬:৪৫72608
  • @ এমেম,

    ব্যক্তিগতভাবে আশ্রম প্রাঙ্গন দেখছি শৈশব থেকে, প্রায় বছর চল্লিশ হবে। আশি শতকের প্রথমদিক পর্যন্ত সেখানে দেখা যেতো একধরনের গ্রামীণ অগোছালো ল্যান্ডস্কেপ। অর্থাৎ, যাঁরা শান্তিনিকেতনের স্থাপত্য ও ভূপ্রকৃতির মূল পরিকল্পনা করেছিলেন, প্রধান একজন ধরা যায় সুরেন্দ্রনাথ কর মশায়, তাঁদের চিন্তায় যে শান্তিনিকেতনের ছবি ধরা ছিলো সেখানে নিসর্গই ছিলো নায়ক। মানুষের গড়ে তোলা নির্মাণ, নিসর্গের সঙ্গেই মিশে থাকবে এবং তাদের অস্তিত্ত্বটি কোনও অবস্থাতেই নিসর্গের প্রাকৃত রুক্ষতা বা কমনীয়তাকে ছাপিয়ে যাবেনা। আজকের উত্তরায়ণ প্রাঙ্গনে যে বড়ো পাকা বাড়িগুলি আমরা দেখি, সেগুলির নির্মাণ হয়ে ছিলো মূলতঃ শান্তিনিকেতনের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে প্রতিষ্ঠা করার তাগিদে। তবু সেখানেও অত্যন্ত সংযম অবলম্বন করা হয়েছিলো। নিসর্গকে চ্যালেঞ্জ জানানো নৈব নৈব চ। খড়ের চালের মাটির বাড়ি এবং বন্ধহীন লালমাটি আর ক্লোরোফিল হলো শান্তিনিকেতনের অভিজ্ঞান।

    এখন যা দেখি, তাহলো জমি বাঁচাতে সারি সারি পাঁচিল আর বাগান বাঁচাতে লোহার শিকের সাজানো বেড়া। বাড়িঘর নিয়মিত রং করা হয়। মূল রাস্তাগুলি মোটামুটি ভালোভাবে রয়েছে। আবর্জনা নেই, ঝরাপাতা পরিষ্কার করা হয়। অতএব যে কোনও নগরনিগম নির্দেশিত মানকগুলি এখানে অনুপালিত হয়। নাগরিক বা পর্যটকদের সুবিধের প্রশ্নগুলি নজরে রাখা হয়। কিন্তু প্রশ্নটি থাকে চারিত্র্যে। শান্তিনিকেতন শুধু একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় বা পর্যটককেন্দ্র নয়। শুরু থেকেই তার একটি ভিন্ন নান্দনিক মাত্রা রয়েছে। জে-এন-ইউ বা সাবরমতী আশ্রমের বিধিনির্দেশ দিয়ে শান্তিনিকেতনকে 'সাজানো'র সরকারি প্রয়াস হয়তো মূল ধারণাটিকে ধরতে পারেনা। সারি সারি কাঁটা তার, লোহার শিক আর ইঁটসুরকির সীমান্ত, শান্তিনিকেতনের নান্দনিক সত্ত্বাটিকে আঘাত করে।

    আশ্রমপ্রাঙ্গন রক্ষণাবেক্ষণের গুণগত মান বিচারের ক্ষেত্রে মনে হয় এই বিষয়টিও প্রাসঙ্গিক।
  • এমেম | unknown.*** | ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ০৮:১৭72609
  • শিবাংশু, বুঝলাম। পুরো লেখায় আমার মনে যে ভাবটি ফূটল -- আসন দিয়েছি পাতি মালিকা রেখেছি গাঁথি, বিফল হল কি তাহা ভাবি মনে মনে।
  • এমেম | unknown.*** | ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ০৯:৫৮72613
  • হ্যাঁ। গান নিয়ে আলোচনা তখনও পড়া হয়নি। 'আমি যাবো না গো অমনি চলে ...' এই অবধি পড়েছিলাম। বাকিটুকু আজ পড়েছি। গাঁয়ের লোক হবার প্রিভিলেজ অ্যাপ্রিশিয়েট করেছি।
  • শিবাংশু | unknown.*** | ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ১০:১৩72610
  • @এমেম,
    একেবারে ঠিক... :-)
  • এমেম | unknown.*** | ১৬ এপ্রিল ২০১৪ ১০:৩৯72611
  • লেখাটা পড়তে পড়তে কালকে কত যে গান গাইলাম নিজের মনে। সব লেখায় তো এমন হয়না। এমনকি গান শুনলেও সবসময় হয়না।
  • এমেম | unknown.*** | ১৯ এপ্রিল ২০১৪ ০১:৫৮72614
  • এটি একটি অনবদ্য লেখা হয়ে উঠছে। নিজের খেয়ালে আপন মনে চলেছে।
  • sosen | unknown.*** | ১৯ এপ্রিল ২০১৪ ০৫:২৮72615
  • পড়ে যাই, শিবাংশুদা। হারিয়ে যাই পড়তে পড়তে।
  • sumit roy | unknown.*** | ২২ এপ্রিল ২০১৪ ০২:৩৭72616
  • Vintage Shibangsu!
  • de | unknown.*** | ০৯ মে ২০১৪ ০৯:২১72617
  • কি অপূর্ব লেখা! যেন ঘোরের মধ্যে পড়ছি!
  • Rit | unknown.*** | ২৮ জুলাই ২০১৪ ০৮:৪৫72618
  • পড়লাম। সেই একই মুগ্ধতা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন