এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  ইস্পেশাল  উৎসব  ইস্পেশাল

  • আশির আমি, আশির তুমি

    অন্তরা মুখার্জী
    ইস্পেশাল | উৎসব | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮৪ বার পঠিত
  • অলংকরণ: রমিত



    সম্প্রতি সমাজ মাধ্যমের আয়নায় দেখছি চেনা-অচেনা মানুষদের আশি-আসক্তি। পোশাকের বাহারে, চুলের বাঁধনে, রোদ-চশমায়, অলংকারে এমনকি চোখের চাউনিতে ভাসে এক ফেলে আসা সময়ে ফিরে যাওয়ার নেশা। যে অতীত কে চেটে-পুটে খাওয়া হয়নি নানা কারণে, সেই অতীতে দু’দণ্ড জিরিয়ে নিচ্ছে আপামর জনতা।সাধারণ মানুষ থেকে অসাধারণরা, নেতা থেকে অভিনেতা, ‘জেনারেশন জি’ থেকে ‘মিলেনিয়ালস’ - সবাই এখন ‘চ্যাট জিপিটি৮০’-র ‘ট্রেন্ড’-এ 'ভাইভিং'; বর্তমানের বর্বরতার থেকে এ এক সাময়িক মুক্তি, নাকি এক নিছকই ছোঁয়া-ছুঁয়ি খেলা তা নিয়ে বিস্তর বিতর্ক হতেই পারে। আবার এটাও হতে পারে যে যান্ত্রিক কারসাজিকে অকপট মেনে নিয়ে আমাদের ক্রম বর্ধমান যান্ত্রিক নির্ভরতা এমন ভাবে অসাড় করে দিচ্ছে যে অবচেতনের স্তর ভেদ করে সচেতন ভাবে তা প্রকাশ পাচ্ছে। আচ্ছা, আমি মাত্রাধিক ভাবছি নাতো? এই ব্যস্ততার জীবনে এতো ভাবার সময় আছে আমাদের? আমরা তো ‘স্ক্রল’ করেই দিন কাটাই - তারই মাঝে একটু না হয় ‘ট্রেন্ড’- এ যাওয়া-আসা এবং স্রোতে ভাসা ! সবই মজা, আনন্দ আর খেলা ! খেলা তো নিশ্চিত। প্রযুক্তির পুতুল নাচ। আমরা এক অদৃশ্য বাঁশিবাজানিয়ার মোহে ছায়া মাড়িয়ে মাড়িয়ে গন্তব্যহীন যাত্রায় পাড়ি দিয়েছি। কখন যে এক অন্ধকূপে প্রবেশ করে যাবো তা কি নিজেরা বুঝি? তবে আশ্চর্য ভাবে লক্ষণীয় যে আশির হুল্লোড়ে চাপা পরে যায় মধ্যবিত্তের দিনলিপি, বিগত দিনের ক্ষত, এবং সভ্যতার সংকট; সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ইতিহাসকে অজ্ঞানের বড়ি খাইয়ে নিস্তেজ করে রেখে যে মৌরি লজেন্স বিতরণ করা হচ্ছে সামাজিক এপ্লিকেশনের মাধ্যমে তাতে দেখছি আশিতে প্রায় সবাই খুশি - শিশু থেকে যীশু।

    আশির আমি, আশির তুমি, ছবি দিয়ে যায় বোঝা ?


    আশির দশকের প্রথমার্ধে আমি তখন টেপজামা, আমি তখন ঝাঁকড়া চুল। কচি বয়েসে মায়ের কোলে দোল খেতে খেতে এক বুড়ো দাদুর গল্প শুনি; তারপর তার গান শুনে কাল্পনিক ঘোড়া ছুটিয়ে, ঝিলমিল নিশান উড়িয়ে, দৈত্য-দানবদের কুপোকাত করার ‘ট্রেন্ড’ এখনো মনে আছে। বাড়ির উঠোনে ব্যাঙ্গমা-ব্যাঙ্গমী, লালকমল-নীলকমল, সোনার কাঠি-রুপোর কাঠিতে তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে স্বপ্ন রেখে আসত। পুরনো অ্যালবামের সাদা কাগজর বিভাজনে আজও চিটে আছে সেইসব দিন। অবলীলায় মনে হতো অন্তরা চৌধুরীর গানের বুলবুল, ময়না, টিয়া পাখি গুলো ঢাকের বাদ্য বাজিয়ে সতিই ফুটপাতে শোয়া ভিখিরিদের মন খারাপ ঘুচিয়ে দেবার ক্ষমতা রাখে। বড়দের চোখের চাউনিতে কোথাও হারিয়ে যাবার বারণ ছিল না। মৃদু ছন্দে, শিশু-কিশোরীরা এক নির্ভেজাল, চিন্তামুক্ত শৈশব কাটিয়েছিল। ধীর গতিতে, গড়িয়ে গড়িয়ে যেত শৈশবের রেল গাড়িরা। অম্লান বদনে এর-ওর বাড়ি খেয়ে, নেচে বেড়ানোর ডানপিটেরা আজকের ' জেন জি’ - দের সঙ্গে কতটা পাল্লা দিতে পারত কে জানে!

    আশিতে আমাদের গায়ে প্রি-স্কুলের গন্ধ ছিল না। সরষের তেলে ডুবানো মাথায়, মোটা করে কাজল লেপা চোখে, ‘জনসন পাউডার’ বেশ দমে যেত। শিশুশ্রেণি মানে ক্যাচ ক্যাচ শব্দ করা খাঁচা গাড়ি; বিলু মামা প্যাডেলে চাপ দিলেই ছোট ছোট হাতে চোখের জল নাকের জল একাকার হয়ে যেত। বাবা-কাকারা কি সব বলে কয়ে ইস্কুলে চালান করে দিত। অর্ধনির্মিত আমার সেই প্রথম স্কুলের হাতি স্লিপ, জং-ধরা দোলনা, লোহার পাটাতনের বাঁকাচোরা ওঠানামাই প্রথম খেলতে শিখিয়েছিল চোর পুলিশ, ছোঁয়াছুঁয়ি, রুমালচোর।মনে পড়ে, ফেলে আসা দ্বিধাহীন কৈশোরে, রবিবারের লুচি মাংসের বিলাসিতায়, পুজোর ছুটির আনন্দমেলায় কতই না শুকতারা দেখা হত! কোন জালের মধ্যে না জড়িয়ে দুই মলাটের বন্ধনীতে নন্টে-ফন্টে, হাঁদা-ভোঁদাদের দেশ পেরিয়ে দুর্ধর্ষ অভিযানে জয়ী হয়ে, চাচা চৌধুরীর পাশে সাবুর উচ্চতা মেপে, নিরলস আনন্দে, নিশ্চিন্তে কেটেছে কৈশোর জীবন। দুশ্চিন্তার ভাঁজ জন্মায়নি সেরকম ভাবে। অবশ্য বিকেলে, মাঠে গড়াগড়ির পর, হাত-পা না ধুলে আমার মা ভীষণ বকাবকি করতেন।তবে পড়তে বসার আগে দুধ-মুড়ি-কলার সুবাসে সে সব বকাঝকা প্রাধান্য পায়নি।

    আশির দ্বিতীয়ার্ধে - আমি তখন পাঁচ কি ছয় - দেখেছিলাম বাড়ির গ্যারেজে অপেক্ষা করা আমাদের সাদা অ্যাম্বাসেডর কে। কিন্তু তাতে চড়ে এদিক সেদিক যাওয়ার চল ছিল না। বরঞ্চ বড়দার সাইকেলের দিকে লোভী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকেছি। রিক্সা চড়ে বাবা বাজার আনলে বাজারের থলি দিয়ে উঁকি দিত শীতের মটরশুঁটি, পালং আর সাদা বেগুন।‘ব্রকলি’, লাল-হলুদ ‘বেলপেপার’, লেটুস ইত্যাদি সব সাহেবি সবজি আমাদের চৌহদ্দি পেরোতে পারেনি।বড়দার ডাক্তারিতে ভর্তি হওয়া দুর্গোৎসবের চেয়ে কম কিছু ছিল না। তখন অল্পেই সন্তুষ্ট ছিলাম, প্রাচুর্যের বিড়ম্বনা ছিল না ; বাবার ‘অপারেশন থিয়েটার’ থেকে ভেসে আসা রবীন্দ্রসংগীত আর মায়ের রান্না ঘরের শুক্তোর সুবাসের মাঝে আমার আশির দশক পার হতে লাগলো। প্রায়শই বাবা মা আমাদের আর সস্তা বিছানার চাদর এবং ফোলানো বালিশ নিয়ে বেরিয়ে পড়তো। আমরা স্লীপার ট্রেনে কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী নির্দ্বিধায় বেড়িয়েছি। মফস্সলের শেষ প্রান্তে, যেখানে শুধুই পাকা ধানের খেতে নির্ভয়ে মৌসুমী বায়ুর আনাগোনা, সেখানে আমার আদরের সাহেবি স্কুলে নাচ- গান- নাটকের বাড়াবাড়িতে পড়াশোনার দাপাদাপি পাত্তা পেতো না। বড়দার সবুজ ভেসপা চড়ে কখনো নাচের স্কুল তো কখনো আঁকার স্কুলে যাওয়া আমাদের ভাই - বোনের ছোটোখাটো 'আউটিং' ছিল ; লাল টেলিফোন মাঝে মাঝে বেজে উঠতো, মুঠোফোন কি আমরা জানতাম না। পূজা -পার্বনে সিন্নি, মালপোয়া, নাড়ু, গ্রীষ্মে আম -কুলের আচার, রবিরারে পাতলা খাসির ঝোল, আর দাদাদের হোস্টেলে চার টিফিন বাক্স ভর্তি লুচি, ঘুগনি, পোলাও, ছানার কালিয়ায় ধীরে ধীরে পেরোতে লাগলো আমার আবদারের আশি।

    ফুচকার ঠেলা গাড়িতে যেদিন আমি বাড়ির বারান্দা থেকে দেখেছিলাম পাড়ার এক কাকু কাকে যেন শুইয়ে নিয়ে দৌড়াচ্ছে ফাঁকা রাস্তায়, তার অসাড় মাথার চারপাশে লাল সূর্যের বেষ্টনী, সেদিন বুঝিনি যে দেশের প্রধানমন্ত্রীর হত্যা হলে আমার মফস্সলে তার আঁচ এসে পড়তে পারে। অবশ্য পাঁচ - ছয় বছরের মেয়ে কী ভাবেই বুঝবে যে আশির দশক ছিল উত্তপ্ত বাংলার ডাকনাম! পরে মায়ের কাছে শুনেছিলাম যে আমার তখন তিন মাস বয়েস- আমার খেলা-পাগল বাবা এবং দাদা কলকাতায় খেলা দেখতে গিয়ে প্রায় পদপৃষ্ট হয়ে চলেই যেত; বাঙালির ফুটবল প্রেম আর ইস্ট বেঙ্গল মোহনবাগানের ডার্বি ম্যাচ - না গিয়ে পারে ! আশির দশক বেশ কড়া নেড়েই এসেছিল বাংলায়।

    আমার শৈশবের দার্জিলিঙটা বেশ ভয়ের ছিল কি ? কিছুতেই বাবা আমাদের ওখানে বেড়াতে নিয়ে যেতে চাইতো না। আশির শুরুতেই রাজনৈতিক পালাবদলের পর শুরু হয় ‘গোর্খাল্যান্ড মুভমেন্ট’। যতক্ষণ না ‘দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল’ গঠন হয়, খানিক স্থিতাবস্থায় ফেরে পাহাড়, ততদিন আমার কাঞ্চনজংঘা দেখা হয়নি। আশির এই এক নাপাওয়া আজও স্মৃতিতে রয়ে গেছে ! বাবার সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার আরো এক স্থান ছিল তাঁর বন্ধুদের চালের কল। এমনিতেই বর্ধমান ধান - চালের ভাণ্ডার। তার উপর কাকুদের মিলে বিশাল খেলার জায়গা, সময়ে সময়ে পিকনিক - সেকি আনন্দ আমাদের ! আমরা জানতামই না 'রাইস বুম' কি ! খায় না মাথায় দেয় ! আশ্চর্য ধানের গন্ধেই বিভোর আমি ধীরে ধীরে দেখলাম আমাদের খেলার উঠান বন্ধ হল। মালিক-কর্মচারী ঝামেলায় মিলের গেটে তালা পড়লো। হরতাল, বিক্ষোভ, চেঁচামেচি শুরু করলো।একটার পর একটা মিল বন্ধ হয়ে গেল। দেখতাম বাবা কারখানায় কাজ করা কাকু-দাদাদের ‘ব্যাণ্ডেজ’ করছে, ‘ইনজেকশন’ লাগাচ্ছে, জিজ্ঞেস করলে বলে “মা, ওরা মারামারি করেছে, ‘স্ট্রাইক’ চলছে” ; আমি আবার কি বুঝি ওসব ! আমি শুধু অপেক্ষা করতাম কবে বাবা ঐসব ঝামেলা শেষে পুজোর জামা কিনতে কলকাতায় নিয়ে যাবে! যেদিন আমায় প্রথম সালোয়ার কিনে দেওয়া হলো- মেরুন আর ঘিয়ে রঙের - সে আমার কী বাঁধভাঙা আনন্দ! তারপর জীবনে প্রথমবার মাটির তলায় রেলগাড়ি চড়ার আনন্দ পেলাম।এস্প্লানেডে থেকে ভবানীপুর - প্রতিটি স্টেশনের নাম বাবা উচ্চারণ করতে করতে তার দশ বছরের মেয়েকে নিয়ে গেছিল। মনে হয়েছিল এর চেয়ে বড় আবিষ্কার কী হতে পারে ? আসলে আশির দশক জানতোনা যে একদিন মেট্রো রেল গঙ্গার তলা দিয়ে হাওড়া যাবে! লোডশেডিঙের ঘনঘটায় জর্জরিত আশির দশক এতো সুখ কল্পনা করতে পারেনি। চাদিহা ছিল কম, প্রাচুর্যের বর্বরতা এবং প্রযুক্তির তাণ্ডব নৃত্য কোনোটাই ভাবতে পারেনি আশির মাছে-ভাতে বাঙালিরা। মায়াজালেই আমরা ধরা দিতাম, অন্তর্জালের বিড়ম্বনা তখনও টের পাইনি।


    “ঘরে বসে সারা দুনিয়ার সাথে
    যোগাযোগ আজ হাতের মুঠোতে
    ঘুচে গেছে দেশ কাল সীমানার গন্ডি…”


    আশি যখন সরে দাঁড়িয়ে নব্বুইকে জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে তখন স্যাটেলাইট আর কেবলের যুগ;খামের ওপর ডাকটিকিট লাগানো আমাদের ছোটবেলা তখন ইঁদুর কলে জলছবি এঁটে দিতে শিখে নিয়েছিল। ‘ইনল্যান্ড’, ‘পোস্টকার্ড’, ‘এয়ার্মেল’, দম দেওয়া ঘড়ি ইত্যাদি প্রায় উধাও; আমাদের ছাপোষা জীবন আলো করে ঘরে এলো ‘ইমেইল’, ‘সিডি’, ‘ফ্লপি’, ‘নোকিয়া ৩৩১০’। যখন বিশ্বায়নের ডাকে, রুপোলি পর্দায়, আজ সুইৎজারল্যান্ডের পাহাড়ে তো কাল সদ্য গজিয়ে ওঠা ‘শপিংমল’-এ রকমারি সামগ্রী তল্লাশিতে ব্যস্ত মধ্যবিত্ত বাঙালি তখন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়েরা ‘ক্যাসেট’-এর দোকানে ‘এম.পি.থ্রি.’ নামক বস্তুটিকে মাপামাপি শুরু করেছে। নব্বই টাকায় একশো নব্বইটি গানের রাজকীয় সুখ বেকারদের ভাগে আগে কখনো জোটেনি। চিরকাল চপ, কাটলেট, সিঙ্গারা, কবিরাজি খাওয়া বাঙালি পাকাপাকিভাবে ধোসা, ইডলি, ‘চাওমিন’ আর ‘রোল’- এর দিকে ঢলে পড়ছিল।আর তারপরে ‘অর্কুট’-এর কল্যাণে শিখলো 'অনলাইন চ্যাটিং'; চ্যাটাং চ্যাটাং কথা বলা, সোজা-সাপ্টা, লড়াকু বাঙালি সবার দেখাদেখি শুরু করলো মৃদু ভাষী, মেপে গল্প করা - 'চ্যাট' ; এই উত্তরণ অথবা অবতরণ বাঙালিকে ভার্চুয়াল চক্রব্যূহ তে প্রবেশ করালো, আজও সেখান থেকে নিস্তার নেই। সেই যে আমাদের বালি-ঘড়ি বিকল হল, আজও সেরে উঠলো না। ঘন্টার পর ঘন্টা আমরা এখন 'অনলাইন' এ হাজিরা দি। এটাই আমাদের বাস্তব আর এই বাস্তবই আমাদের চালনা করে, খেলা দেখায়, খেলা করায়।

    বাংলা ব্যান্ড 'চন্দ্রবিন্দু', তাদের গানের অ্যালবাম 'চ'-এর 'দুনিয়া ডট কম' গানে 'বেবি', 'বাউন্ডুলে ছেলে পিলে ', 'গুবলু গাবলু' থেকে শুরু করে 'বোকা', 'খোকা', 'পোয়া পাকা' সকলকেই 'কম্পু' জেনারেশনের 'ডাবলু ডাবলু আইডিয়া' দিয়ে আমাদের ভবিষৎবাণী করে দিয়েছিল। এর পর নতুন শতাব্দীতে মহামান্য মহামারি এসে অবকাশ আর একাকিত্বের সংজ্ঞা বদলে দিল। সকাল বিকেল দাঁত মাজার মতন শুরু হল আমাদের দিন রাত ফোনে থাকা - এর ওর দেখে টোকা, অন্ধের মতন ‘ট্রেন্ড’ ফলো করা, এবং সর্বোপরি তথ্যের সত্য -মিথ্যা যাচাই না করেই পিঠে ঝোলা নিয়ে খাদের ধারে বেড়াতে যাওয়া। চাঁদের পাহাড়ে যে রত্নের খোঁজে আমরা বেড়িয়েছি সেখানে যে আছে বুনিপ ও আমরা তা সচেনতন ভাবেই ভুলে যাই।এই ভুলে যাওয়া কে ভুলে থাকার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত না। ঐচ্ছিক ভুলে থাকার মধ্যে এক নান্দনিক আনন্দ আছে যা কখনোই চিরস্থায়ী নয় অথবা পথ ভুলিয়ে দেয়না। ইংরেজ কবি কোলরিজ বলেছেন “উইলিং সাসপেনশন অফ ডিস্-বিলিফ ফর দা মোমেন্ট”-এর কথা; অথাৎ সাময়িক ভাবে বিচক্ষণতা সরিয়ে রেখে, কাব্যের প্রতি আস্থা রেখে, সাহিত্যের এক অনাবিল আনন্দ উপভোগ করা। এ এমন এক নির্বাক চুক্তি যেখানে পাঠক অথবা দর্শক জানেন যে যা কিছু উদ্ভট বা আজগুবি পড়ানো অথবা দেখানো হচ্ছে সেসব বাস্তবে সত্যি নয়;কাব্য রসাস্বাদন এর তাগিদ থেকে তাই জেনে বুঝে বিচক্ষণতা সরিয়ে রেখে কাব্যের দুনিয়ায় সাময়িক বাসিন্দা হয়ে ওঠা।

    আশির দশকে 'ট্রেন্ডিং' ছবিগুলি দেখলে অনুধাবন করা যাবে যে সেখানে একপেশে আশিকে দেখানো হচ্ছে। আশির ইতিহাস এবং সমাজের অবস্থানের কোন উল্লেখযোগ্য চিত্রণ নেই; যে ছবি দর্শকরা ‘প্রম্প্ট’ হিসেবে দিচ্ছেন সেখানে শুধুই আত্মকেন্দ্রিকতা! সামাজিক দায়বদ্ধতা অথবা ইতিহাসকে ফিরে দেখার তাগিদ নেই; এ যেন এক আত্মরতির উন্মাদনা! এই ‘ট্রেন্ড’ টাইম মেশিন কেও হার মানিয়ে,‘সাইন্স ফিক্শন’ কে বিকৃত ভাবে পেশ করে, কল্পনায় গরু কে গাছে ওঠাতে গিয়ে নিজেদের কবর যে নিজেরা খুঁড়ছে সেটাও বুঝে উঠরে পারছে না। প্রযুক্তির কাছে সচেতন দাসত্ব স্বীকার বোধয় এমনই পরিস্থিকে আজ আমাদের স্বাভাবিক বাস্তব করে তুলছে। আমাদের ইচ্ছাশক্তির কোনো জায়গা নেই। সোশ্যাল মিডিয়ার দীর্ঘস্থায়ী বাসিন্দারা ভুলেই গেছে আসল, অবাস্তব, অতিবাস্তবের তফাৎ; এমন ভাবে প্রতিচ্ছবির দ্বারা তারা বুঁদ হয়ে থাকছে যে সেখানে আসলের কোনো অস্তিত্ব নেই; নকল ই আসল, আসল ই নকল - যেন মস্তিষ্কে আজীবনের অবসম্ভাবী কারফিউ জারি হয়েছে!



    “…সময়-ঘড়ি বন্ধ হয়ে যায়
    ঘিরে ধরে কুয়াশা যখন…”


    অত্যধিক এবং স্বয়ংসর্বস্ব যান্ত্রিকতার ঠেলায় মানসিক অসাড়তা হওয়ার ভবিষৎবাণী বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে উত্তর-আধুনিক তাত্ত্বিকেরা করেছিলেন; গণমাধ্যম নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বলেছেন গণমাধ্যমের পৌনঃপুনিকতার নিরন্তর অভ্যাস ধীরে ধীরে মূলের গুরুত্ব কমিয়ে দিতে বাধ্য; লিয়োতার অচিরেই প্রযুক্তি-নির্ভর ডিজিটাল ডেটাই একমাত্র জ্ঞানের আকর হিসাবে গণ্য করা হবে; ব্যোদরিয়ার লিখেছেন টেলিভিশন, সিনেমা, কম্পিউটারের এই উত্তর-আধুনিক যুগে মূলের থেকে জীবনে প্রতিলিপির গুরুত্বই বেশি; এ প্রকৃতপক্ষে অতিবাস্তবতার যুগ, যাকে অবাস্তবের সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না। এই অতিবাস্তবতা হলো এমন এক অমোঘ আকর্ষণ যা আমাদের ‘আসল’- এর সংজ্ঞা বদলে দিচ্ছে, যেখানে যেটা বাস্তবে ঘটেছে, সেটা দেখায় না; অথচ এমন এক জগতের সৃষ্টি করে, এক চিহ্ন-নির্মিত, ‘সিমুলেটেড’ জগৎ, যেখানে আমরা বার বার ‘আসল’কে ভুলে যাই।

    ইদানিং আশির 'রেট্রো লুক'-এ নিজেদের আকর্ষণীয় করে তোলার যে হিড়িক চলছে সমাজ মাধ্যমে তা আমাদের ' আসল' আশিকে ভুলিয়ে দিয়ে প্রকট ভাবে প্রযুক্তি-নির্ভর করে তুলছে। অবাক হচ্ছি দেখে যে এই প্রক্রিয়া কোনো উদ্বেগের সৃষ্টি করছে না; বরঞ্চ আমাকে বার বার সমাজ মাধ্যমে আশিস্নাত প্রতিচ্ছবিরা বুঝিয়ে দিচ্ছে আপামর জনতার আনন্দ, উৎফুল্লতা; তাহলে আমরা নিছক খেলায় মত্ত ?তালে তাল মেলাচ্ছি? আসলে আমরা প্রযুক্তির ভার্চুয়াল জ্বরে কাবু হয়ে গেছি। উঠে ওষুধ খাওয়ার ও ক্ষমতা নেই। শুয়ে শুয়ে গোঙাচ্ছি, তবু নরম আলোয় যেন নিজেকে অপ্সরা বা অবতার লাগে তার চেষ্টা করে যাচ্ছি;মানব সভ্যতা একদিন যে যন্ত্রের দ্বারা চালিত হবে এ আমরা কম বেশি জানতামই; তবে আমাদের কোথাও একটা স্বস্তি ছিল এই ধারণায় যে মানুষের বিলুপ্তি ঘটবে না, কারণ যন্ত্র নিজে নিজে চালিত হতে পারেনা; আজকাল ‘এ আই’ আর ‘চ্যাট জিপিটি’ এসে আমাদের সেই নিশ্চয়তাকেও নাড়িয়ে দিয়েছে।

    প্রতিটা ছবির মধ্যেই আমি আমার চেনা শৈশবের এবং মেয়েবেলার আশি কে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে যাচ্ছি। কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছিনা। মানুষের গায়ে যে পাতার পোশাক আমি দেখছি সেখানে আমার আশির পৃথিবীর ছায়া পড়ছে না। মধ্যবিত্তের সাধারণ জীবনের গল্প, সামাজিক অবস্থান, দুর্ভিক্ষ, হরতাল, তালা পড়া কারখানার দরজা, ইডেনের মাঠে চাপা পড়া মানুষের আর্তনাদ, ধান চাষ, মেট্রো রেল - কিছুই নেই। এইসব যে অবাস্তব নয়, আশির ইতিহাস তার সাক্ষী দেবে। তবে আমাদের এই ‘মাস মিডিয়া’-র যুগে আশিতে আসলে কি হয়েছিল সেটি না দেখিয়ে এমন এক জীবনের প্রতিচ্ছবি দ্রব্য হিসেবে তৈরি করে দেওয়া হচ্ছে যেখানে আমরা কিছু চিহ্নের সাহায্যে, বাস্তবকে অবজ্ঞা করে, এক অতিবাস্তব অবস্থায় অবলীলায় বাস করে যাচ্ছি। সঙ্গী আমাদের আঙুলের ডগার সুড়সুড়ানি।সময় থাকতে সচেতন না হলে, কপি পেস্টের জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে না এলে, শুধু যে ইতিহাসের উপর অর্ধ-সত্যের পলি পড়বে তা নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের বিস্তর ব্যাঘাত ঘটবে; মাথার কুয়াশায় মজে থাকা আপামর জনতাকে যেদিন প্রযুক্তি বুড়ো আঙ্গুল দেখাবে সেদিন অদৃশ্য শেকলের নিটোল বন্ধনে আমরা পাক খেতে খেতে প্রযুক্তির মেঘে ঢাকা পরে যাবো – পরে থাকবে আমাদের 'ট্রেন্ডিং' ছবির স্তুপ।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • ইস্পেশাল | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | ১৮৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Somnath Dhali | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:১৬743259
  • আপনার সমাজ সচেতনতা মনোগ্রাহী পূর্বক পাঠকের মনে জায়গা করে নেবে নিশ্চিত
  • অর্পিতা দত্ত | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:২৬743260
  • লেখিকা অন্তরা মুখার্জীর লেখাটি আমার অত্যন্ত মনোগ্রাহী লেগেছে। এর অন্যতম কারণ বোধহয় এই যে আমিও আশির দশকের মানুষ। আমার সত্যিই মনে হয: "আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম"। সেই দিনগুলোর অনুভূতি কি আর AI দিয়ে এডিট করে ফিরে পাওয়া যায়?
  • Smriti Mondal | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:২৯743261
  • সুন্দর..
     
    বাস্তবিকই, "আশি"-তে গা ভাসালাম।
    ❣️
     
     
  • Amitabha Mukherjee | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২০:৪৯743262
  • নির্মেদ গদ্য। স্মৃতি শুধু বেদনার নয়, সুখেরও। অথবা দুয়ের মিশ্র ণ এবং দুই এর অতীত। লেখার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য, চার্লস ল্যামব এর হিউমার আর সত্যজিতের সিনেমাটিক ডিটেলস এর মেলবন্ধন। লেখিকা থেকে আরো লেখা পাওয়ার লোভ রয়ে গেল।
  • Amit Kumar | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২১:০৮743263
  • পড়লাম। চমৎকার।
    দ্রুতিহীন অথচ গতিসর্বস্ব এই সময়ের কথা খাসা ধরেছেন লেখক।
     
  • Boddhayan | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২২:৫০743265
  • খুব ভালো লেখা, পড়ে মন ভালো হয়ে গেলো
  • অরিন | ১৪ অক্টোবর ২০২৬ ২৩:৫৪743266
  • সুন্দর লেখা। নোকিয়া ৩৩১০ নব্বইয়ের দশকে নয়, নতুন শতাব্দীর প্রথম বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বাজারে আসে। ২০০৪-৫ অবধি একরকম ছিল, আইফোন বাজারে আসার পর প্রযুক্তির দুনিয়া অনেকটাই বদলে গেল।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন।