এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  গপ্পো

  •  বড় মানুষ 

    Jeet Bhattachariya লেখকের গ্রাহক হোন
    গপ্পো | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩১৩৪ বার পঠিত | রেটিং ১.৫ (২ জন)
  • “হায়দ্রাবাদে বড় চাকরি করে ছেলে ", সোহমের মা ফোনে কথা বলতে বলতে কার কাছে বলে উঠল।


    সোহম অন্যদিক থেকে একটু বিরক্তি সুরেই বলল,” মা, সবার সামনে এতো বরাই করে বলার কি আছে ?”


    “এই তুই চুপ কর। বেশী কথা বলিসনা। ...আচ্ছা শোন টাকা তুলেছিস তো ?”


    “হ্যাঁ তুলেছি। "


    “আজকেই আসছে কি ?”


    “হ্যাঁ, আজকেই আসার কথা। "


    “আর ব্যাগ গোছানো হয়ে গেছে তো ?”


    “হ্যাঁ,”


    “ঠিক আছে। এখন রাখছি, ভাত বসাতে হবে "


    “ওকে", বলে ফোনটা রেখে দিল সোহম। বেশ ফুরফুরে লাগছে আজগে। পুজো এসে গেছে। আজ বাদে কাল মহালয়া। কি মজাই না লাগছে। সোহমের অফিসের কাজে একেবারে মন নেই। এখন যেন প্রতি মুহূর্ত সে গুনে যাচ্ছে। কখন পৌছবে নিজের বাড়িতে। তার উপর আমাজন থেকে নতুন মোবাইল আসবে, সব কিছু নিয়ে ভীষণ এক্সাইটেড। চাকরি পাওয়ার পর প্রথম পুজো । এবার গিয়ে ম্যাডক্সে খুব আড্ডা দেবে। সব ঠিক করে নিয়েছে।


    জাইদ এসে ওর চেয়ারের পিছনে একটা লাথি মেরে বলল, ” ভাই, বহুত এক্সাইটেড লাগ রহা হে "


    একটা খোস মেজাজে আড়মোড়া ভেঙ্গে সোহম বলল, ”ভাই ঘার যা রহা হু। "


    জাইদ একটু হেসে বলল, ”লাকি ইউ "


    জাইদ আর সোহম একই পি জি তে একই ঘরে থাকে। পাঞ্জাবের ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাশ করে সোহমের সাথে একই প্রোজেক্ট জয়েন করেছে। সোহমের হিন্দি খুব একটা ভালো না, কিন্তু কোনরকমে চলে যায়। অনেক যায়গায় ভুলভাল বলে হাসির পাত্র ও হয়েছে, কিন্তু তাতে ওর কিছু যায় আসেনা।


    বছরখানেকও হয় নি সোহম এই কম্পানিতে ঢুকেছে । জীবনের প্রথম চাকরি, প্রথম সব কিছু। হায়দ্রাবাদের মতো শহরে যখন পোস্টিং শুনেছিল তখুনি মনটা আবেগে ভরে গিয়েছিল। এই জীবনিই তো চেয়েছিল। একদিন প্লেনে করে যাতায়াত করবে, নতুন নতুন শহর দেখবে, বাড়ি থেকে বাইরে ছন্নছাড়া এক আলাদা জীবন কাটাবে। কিন্তু কিছুদিন পরেই তার স্বপ্নের চাদরে ভাঁজ পড়তে লাগলো। প্রোজেক্ট জয়েন করার এক মাস পর থেকেই বিশাল কাজের চাপে ডুবে গেল। সকাল আটটার সময় অফিসে ঢোকে রোজ, আর রাত নটা বেজে যায় বেরোতে ।


    ওর ম্যনেজার অভিজিৎ আর সিনিয়র ভিপিন সব সময় বলতো, ” তুম সাব জুনিয়ার হো, আভি তো টাইম হে কাম শিখনেকা। "


    কাজকে কোনদিন ভয় পায় না সোহম। কাজ করতেই তো এসেছে ঘর বাড়ি, বন্ধু বান্ধব সব কিছু ছেড়ে দিয়ে। কিন্তু মাঝে মধ্যে মনে হয়, এই কি ওর জীবন হয়ে দাঁড়ালো ? উইকেন্ড পাওয়া একটা যেন এচিভমেন্ট । কম্পানির লোকেরা পারলে হয়ত সমস্ত দিনই উইকডে করে দেয়। হাল্কা হাল্কা বিরক্তি জমছিল তার পকেটে। কিন্তু মাস শেষে মাইনে আসতেই সেগুলো বিয়ারের সাথে মিশে গিয়ে কোন এক অজানা বারের বাথ্রুমে ফ্লাস হয়ে যেত।


    জাইদ এর সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে ভিপিন এসে বলল, ” সোহম, আজ কোড রিলিস কারনা হে। "


    সোহমের সদ্য প্রাপ্ত আনন্দ সিগারেটের ধোঁওয়ার মতো উড়ে গেল। আজকেই পাঠাতে হবে মানে তো সারাদিন লেগে যাবে। কারন এই কদিনে পুজোর প্রিপারেসানের জন্য কাজে মন বসাতে পারেনি। অগত্যা আজকে যে করেই হোক শেষ করতে হবে। কালকের জন্য অপেক্ষা করা চলবে না।


    সারাদিন ধরে সোহম কাজ গোছাতে শুরু করলো। এইদিকে আমাজন থেকেও ডেলিভারির লোকটা কোন ফোন করলো না। একটু টেনসান লাগতে লাগলো। কাল দুপুরে ফ্লাইট, নতুন ফোনটা না এসে পৌছলে সব মাটি হয়ে যাবে।


    কাজের ফাঁকে একবার চট করে আমাজন খুলে দেখলো ফোন আজকে আর আসছেনা। কাল সকালে আসবে।


    মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কত আশা করেছিল যে নতুন ফোন নিয়ে বাড়ি যাবে, জীবনে প্রথমবার নিজের পয়সায় কেনা ফোন। এবার পুজোতে আবার সেই পুরানো ফোন নিয়েই বেরোতে হবে।


    মানি পার্সে টাকাটা কচকচ করছে। আর অন্যদিকে ম্যানেজার অভিজিৎ স্কাইপে পিং করে বলল,” সোহাম রাত তাক চাহিয়ে, নাহিতো ছুট্টি ক্যান্সেল "।


    সারা শরীর নবমীর সন্ধ্যে আরতির মতো দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। চাকরিতে ঢোকার পর প্রথমবার বাড়ি যাচ্ছে, তাও আবার পুজোর সময়। এরকম সময় যদি ছুটি ক্যান্সেল হয়ে যায় তাহলে আর মেজাজ ঠিক থাকবে না। ইমোশান বলে কি কিছুই নেই এই মানুষগুলোর মধ্যে ?


    আজ লাঞ্চে গেল না সোহম, কাজ শেষ করতেই হবে। বিকেলবেলায় সিগারেট খেতে গিয়েও চুপচাপ হয়ে ছিল। জাইদ ওর মনের অবস্থা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল।


    “সাব হো জায়েগা। তু টেনশান মাত লে। "


    কিন্তু টেনশান সে না নিয়ে পারলো না।


    সন্ধে সাতটা নাগাদ তার কাজ শেষ হল । একটা দীর্ঘ হাসি ফুটে উঠল ওর মুখে। বাড়ি ফেরার হাসি। এমন সময় আবার অভিজিৎ স্কাইপে পিং করে বলল,” ভেজ দে সারভার মে, আভি!"


    সোহমের কাজ শেষ হয়ে গেলেও অভিজিৎ যেখানে পাঠাতে বলছে সেই যায়গায় তার পারমিসান নেই। বস এতো তাড়াহুড়ো করছে যে কি বলবে আর কি না বলবে এই ভাবতে ভাবতেই স্কাইপে লিখে দিল, ” নাহি ভেজ সাকতা "


    সঙ্গে সঙ্গে ফোনটা বেজে উঠল। অভিজিৎ কল করেছে। ফোনটা ধরতেই একরাশ গালাগালি পাগলা হাতির মত তার কানের ভেতরে ঢুকে পড়লো।


    “তুই কি করে বললি যে পারবি না? ম্যনেজার কে না বলছিস তোর সাহস তো কম নয়"


    “কিন্তু...”


    “কিন্তু কি? দু দিনের ছেলে ম্যানেজার কে না করা?”


    “আপনি শুনুন আমার কথা একবার "


    “আর শোনার কিছু নেই। তোর ছুটি ক্যানসেল। "


    মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল সোহমের। এরকম ভাবে আজ পর্যন্ত কেউ তার সাথে কথা বলে নি। এমনকি স্কুল কলেজেও এরকম ঝাঁজালো কথা শুনতে হয় নি কখনও। তবুও সে যতটা পারলো নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,” স্যার, আমার কাছে এক্সেস নেই "


    “কি?”


    “হ্যাঁ স্যার, তাই আপনাকে বলেছিলাম "


    ফোনটা কেটে গেল। সোহমের আবার ঘুড়িয়ে ফোন করার ইচ্ছে হল না। ছুটি যখন ক্যানসেল হয়েই গেছে তো আজ আর সে করবে না কিছু।


    ইতিমধ্যে ভিপিন এসে তার পিছনে দাড়িয়েছে।


    “ওয়ে, বিয়ার পিয়েগা ?”


    সোহম চুপচাপ ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে বলল,”চালো "


    (২)


    অফিসের পাশেই একটা বারে বসে তিনজন রাত এগারোটা ওব্দি বিয়ার খেয়ে বেড়িয়েছে। ইতিমধ্যে বাড়ি থেকে তিনবার ফোন এসেছিল কিন্তু সোহম ধরে নি। ধরার ইচ্ছেও করছিল না। বার থেকে বেরতেই মনে হল ম্যাদক্স স্কয়ারে এসে গেছে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে ঝারবাতি। প্রচুর লোক, দূরে একটা রবীন্দ্রসঙ্গীত, সিগারেটের ধোঁওয়া, এগরোল ফুচকার দোকানে অসংখ্য মানুষের ভিড়।


    সত্যি কত আশা করেছিল পুজোর সময় বাড়িতে থাকবে। কাল মহালয়া, দেবী পক্ষের সূচনা। প্রত্যেকবারের মতো এবারও ভোর বেলায় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের কণ্ঠে মহালয়া শুনবে ভেবেছিল।


    কিন্তু হয়ত এবছর আর হবেনা।


    ইচ্ছা করছিল চাকরি ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে। কিন্তু চাকরির বাজার খুব খারাপ। ওর পাড়ার বন্ধুরাও সবাই চাকরি পায় নি। ভাবনা চিন্তা আর বেশী কিছু করার নেই।


    বাড়িতে যে কি করে বলবে তা নিয়েই ভাবছিল। মায়ের মুখটা মনে পরছিল বারবার। এবার আর মায়ের সাথে অঞ্জলি দিতে যাওয়া যাবে না। অষ্টমীর দিন রিমির সাথে উত্তর কলকাতায় ঠাকুর দেখতেও পারবেনা। সব কিছু মিথ্যে লাগছিল তার। জীবন টা কয়েক সেকেন্ডের কথা বাত্রায় বদলে গেল।


    তিনজন মিলে দাড়িয়ে রইল বারের সামনের রাস্তায়। কোন অটো নেই। উবার এক ঘণ্টা দেখাচ্ছে। রায়দুরগাম থেকে কন্দাপুর যাবে সোহম আর জাইদ। ভিপিন মাঝপথে হাইটেক সিটির জংশনে নেমে যাবে। একটা অটোতেই হয়ে যাবে।


    জাইদ আর ভিপিন নিজেদের মধ্যে এলো পাথারি কথা বলে যাচ্ছিল কিন্তু সোহমের মনটা তখন শরতের পেজা তুলোর উপরে করে ভেসে যাচ্ছিল যোজন খানেক দূরে ওদের বাড়ির ছাদের দিকে। ও দেখতে পারছিল এতক্ষণে বাড়ির সামনে লম্বা লম্বা লাইট বসে গেছে। কুমোরটুলিতে মায়ের চক্ষুদান হচ্ছে।


    কত কিছুই না পাল্টে যাবে এবার। এরকম ভাবেই হয়ত সব কিছু পাল্টে যায়। বছরের পর বছর ছেলে মেয়েরা ঘরে ফেরে না। বাড়ির দরজার সামনে বসে মা বাবারা অপেক্ষা করতে থাকে। অপেক্ষা করতে থাকে আলমারির ভেতরের তাকে পরে থাকা নতুন জামা কাপড় গুলো। আড়ালে হয়ত দু এক ফোঁটা জল ও ফেলে।


    আগে শুধু শুনেছিল চাকরির জন্য অনেক কিছু ত্যাগ করতে হয়। কথাটার মাহাত্ম তখন বোঝেনি। তবে এখন বুঝতে পারছে। সত্যিকারের বড় হয়ে উঠেছে। জীবন যুদ্ধে নেমে পরেছে এখন।


    প্রায় আধ ঘণ্টা দাড়িয়ে থাকার পর একটা সেয়ারিং অটো পেলো। তিনজনেই পিছনের সিটে।


    জাইদ সোহমের মনমরা অবস্থা দেখে ওর কাঁধে হাত রেখে বলল,” অল উইল বি ওকে, ডোন্ট ওয়ারী "


    মাঝ রাস্তায় অটোর ড্রাইভার আর একটা প্যাসেঞ্জার তুললো। মদ্যপ প্যাসেঞ্জার। একবার এদিকে টলছিল তো আর একবার ওদিকে। ড্রাইভার তেলেগু ভাষায় দু একটা কথা বলতে লাগলো। ঐদিকে প্যাসেঞ্জারটাও কিছু একটা জবাব দিতে থাকলো। কি কথা বাত্রা হচ্ছে সে দিকে সোহমের খেয়াল নেই। কিন্তু হঠাৎ করে খুব উত্তেজিত মনে হচ্ছিল দু জনকেই। কিছু একটা ঘটছে। ভিপিন একেবারে ধারের দিকে বসেছিল। জাইদের কানে কানে কিছু একটা বলল।


    ওমনি দুম করে দাড়িয়ে গেল অটোটা হাইটেক জংশনে। মদ্যপ প্যাসেঞ্জার নেমে গিয়ে হাটতে শুরু করলো। পিছনের ড্রাইভারও অটো থেকে বেড়িয়ে গেল।


    জাইদ বলে উঠল, ” ক্যায় হো ক্যায় রাহা হে ?”


    ভিপিন গাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেল। এক মিনিট দুরেই ওর বাড়ি। তবুও নেমে পড়লো দেখার জন্য কি হচ্ছে।


    সোহমও তাকিয়ে রইল সামনের কাঁচের মধ্যে দিয়ে। হঠাৎ করে ড্রাইভারটা আগের প্যাসেঞ্জারকে সাটিয়ে একটা চর মারল। মদ্যপ প্যাসেঞ্জার দু পাঁক ঘুরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ভিতরে জাইদ খুব ঘাবড়ে গিয়ে বলল,” ইয়ে ক্যায় হো গ্যায়া ?”


    সোহমের সেই দিকে ভ্রূক্ষেপ নেই। ড্রাইভারটা মাটিতে পরে থাকা অবচেতন লোকটার গায়ের থেকে কিছু একটা তুলে নিয়ে পকেটে পুড়ে নিলো।


    ভিপিন সমস্ত ব্যপারতা দেখে বলল, ” ভাই, তুম লোগ নিচে আজাও। ইস অটো মে নাহি জায়েঙ্গে। "


    জাইদ সোহমের দিকে তাকালো একবার। সোহম চুপচাপ শান্ত ভাবে বলল, ” ইস্কে বাদ অটো নাহি মিলেগা। মুঝে যানা হে"


    জাইদ কোন বাধা দিল না। সোহমের উপর অগাধ বিশ্বাস ওর। ড্রাইভার এসে চুপচাপ সিটে বসে পড়লো।


    ভিপিন একবার জাইদের দিকে তাকালো আর একবার অটো ড্রাইভারের দিকে।


    “মে নহি যা রহা। তুম লোগ ভি নিকাল আও, ভাইও "


    সোহম বেরোল না। ও ড্রাইভার কে বলল, ” চালিয়ে"


    ড্রাইভার গাড়ি স্টার্ট করে চলতে শুরু করলো। জাইদ চুপচাপ করে সোহমের দিকে তাকিয়ে রইল। একটা কাঁপা কাঁপা ভয় ওর ভেতরে ঢুকে গেছে। কিছু বলার চেষ্টা করছিল কিন্তু বলতে পারল না।


    সোহম বাড়ির কাছে অটো দাঁড় করিয়ে ভাড়া মিটিয়ে পিজিতে ঢুকে গেল। পিছন পিছন জাইদও। ঘরের ভেতরে ঢুকে মিনি ফ্রিজ থেকে একটা বিয়ার বার করে ঢক ঢক করে গলায় ঢেলে ফেলল।


    “থোরা ধীরে ইয়ার", জাইদ একটু চিন্তিত ভাবে বলল।


    সোহম একেবারে চুপচাপ। ঘড়িতে দেখল বারোটা বেজে গেছে। মহালয়া হয়ত আর ঘণ্টা চারেকের মধ্যে শুরু হয়ে যাবে, আর সে এই অজ্ঞাত নগরীতে বসে থাকবে। এবারের মতো আর বাড়ি যাওয়া হল না।


    জাইদ বাথ্রুমে ঢুকতেই হঠাৎ করে ফোনটা বেজে উঠল। ভিপিনের ফোন।


    “হা বোল। "


    উল্টোদিক থেকে ভিপিনের চিন্তিত কণ্ঠ ভেসে এলো, ” তুম লোগ ঠিক হো না ? “


    “হা"


    কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ভিপিন আবার বলে উঠল, ”ইয়ার অটো ওয়ালা ফোন চুড়া লিয়া উস আদমিকা "


    “হা!!!!?”


    “হা।"


    একটা অন্য মন খারাপ এসে জড়িয়ে ধরল সোহমকে। নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো। একটা চোর আজকে তাকে ঘরে ছেড়ে দিয়ে গেল ? ফোনটা রেখে দিল সোহম। কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না। সকালে মায়ের কথাটা ভেসে এলো কানে।


    “বড় চাকরি করে ছেলে "


    বড় চাকরি আছে ঠিকই, কিন্তু বড় মানুষ আর হয়ে উঠল না সোহম। নিজের খারাপ লাগা নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পরেছিল যে লোকের কথা একেবারে অবজ্ঞা করেছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছিল খুব। ছোটবেলায় শুনেছিল যে চুরি করে আর যে চোরের সাথ দেয়, দুজনেই সমান অপরাধী। এমন তে সে ছিল না কোনদিন। হঠাৎ করে কি হল তার ? কোন স্রোতে ভেসে বেড়াচ্ছে সে। অটোড্রাইভারের মুখ দেখেনি ভালো করে, গাড়ির নাম্বারও নোট করেনি। পুলিশের কাছে খবর দিয়েও লাভ হবে না।


    একেতে অভিজিৎ স্যারের অপমান তার উপর আবার এই কাণ্ড। নিজের দিকে তাকাতে পারছিলোনা।


    ঘর থেকে সোজা বেড়িয়ে গেল। না, আর যাই হোক এবার তাকে বড় মানুষ হতে হবে। সিঁড়ি দিয়ে তর তর করে নেমে পিজির বাইরে চলে এলো। মেন রাস্তায় উঠতেই দেখে একটা অটো দাড়িয়ে আছে।


    “চালো "


    “কাহা ?”


    “রায়দুরগাম"


    “ডাবল ভাড়া লাগেগা"


    “চালো"


    অটো ছুটতে শুরু করলো। আর সেই সঙ্গে তার বুকের ভেতরের হৃদয়টাও। এক ঘোর অপরাধের অন্ধকার থেকে। কোন এক দস্যু যেন তার আত্মাকে চেপে ধরেছে। এই ধরনের দস্যুর দমনের জন্যি দেবী দুর্গার আগমন হয়ে ছিল। আর আজ দেবীপক্ষের সূচনতেই সে নিজের বুকের ভেতরে জমে থাকা দস্যুর খোঁজ পেয়েছে। খোঁজ পেয়েছে লুকিয়ে থাকা পাপিষ্ঠ এক অবজ্ঞাকে।


    অটোটা হাইটেক সিটির জংশনে আসতেই সোহম বলে উঠল, ” ঘুমা লিজিয়ে। ইউ টার্ন"


    ড্রাইভার ঠিক সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো অটোটাকে ঘুড়িয়ে নিয়ে উলটো দিকের রাস্তায় চলে এলো। তারপর একটু যেতে না যেতেই সোহম দার করালো তাকে।


    গাঢ় অন্ধকারে চোখে কিছু দেখতে পারছেনা। সামনে কয়েকটা লোক যাচ্ছিল। সোহম পকেট থেকে মানি ব্যাগ টা বার করলো। আগে থেকেই ভেবে নিয়েছিল কি করবে। নিজের ফোনটা দিব্বি চলছে, নতুন ফোনের আর দরকার নেই। কিছু টাকা দেবে ভেবেছিল নতুন ফোন কেনার জন্য। তার পাপবোধের প্রায়শ্চিত্ত করবে।


    কিন্তু সামনের লোকগুলোকে জিজ্ঞেস করেও সেই প্যাসেঞ্জারকে খুঁজে পেল না। বুকের ভেতরে পাপবোধটার যেন আরও বেশী বড় শিকড় গজিয়েছে। এরকম যদি আরও দু এক ফোঁটা জল পরে তাহলে এক পুরনাঙ্গ দস্যু বেড়ে উঠবে ডালে ডালে।


    সোহম সেইরকম কিছু হতে দিতে চায় না। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো। আফসোসের নদী পাগলা ঝর্ণার মতো এবড়ো খেবড়ো পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে নেমে যাচ্ছে।


    অটোটাতে উঠে বলল,” চালো, যাহা সে লেকে আয়ে থে "


    ড্রাইভার কিছু না বলে অটো স্টার্ট দিল। "ঠরক, ঠক ঠক ঠক " করে জিবন্ত হয়ে উঠল অটোটা। আসতে আসতে এগিয়ে যেতে লাগলো, পেট্রোলের পোড়া গন্ধে কেমন গা গুলিয়ে উঠল সোহমের।


    মনে হচ্ছিল এখুনি পেট থেকে দুঃখগুলোকে উগ্রে দেবে। কিন্তু অনেক ধরনের দুঃখই জমে আছে তার ভেতরে। সন্ধেবেলা অব্দি এক ধরনের ছিল, আর এখন অন্য ধরনের।


    “ছেলে বড় চাকরি করে, কিন্তু বড় মানুষ হতে পারলো না", কানের কাছে কথাটা বাজছে। কে বলছে তাকে ? কোন গলার আওয়াজ নয়, খালি শুনতে পাচ্ছে। প্রতি ক্ষনে, ক্ষনে ।


    অটোটা গাচ্ছিবওলির ফ্লাইওভার এর তলা থেকে ডান দিকে বাঁক নিয়ে এগিয়ে গেল কন্দাপুরের দিকে। পিজির গলির সামনে এসে অটোটা দাঁড়ালো। বাইরে বেড়িয়ে এসে অটো দ্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলো, ” কিত্না হুয়া ?”


    ড্রাইভার তার দিকে তাকিয়ে বলল,” গালতি হো গ্যায়া ভাইয়া। গুসসে মে থা "।


    “মাতলাব?”


    “ফোন লৌটাকে হসপিটাল মে ডালকে আয়া উসকো "


    সোহম কি বলবে ভেবে উঠতে পারল না। এটা যে সেই ড্রাইভার তা আর বুঝতে অসুবিধা হলো না। অটোটা আবার কেঁপে উঠল, "ঠরক, ঠক ঠক ঠক "।


    সোহমের কথা শোনার অপেক্ষা না করেই সেটা চলল অন্যদিকে, একটা সাদা ধোঁওয়া বেড়িয়ে এলো তার পিছন থেকে। সোহমের মনে হল অটোটা হয়ত কলকাতার দিকে যাচ্ছে। দেবীর পায়ে কাশফুল ছড়াতে।


    পিজিতে ঢুকতে ঢুকতে দু একবার মনে হল কোথায় যেন ঢাক বাজছে। হয়ত তার মনের মন্দিরে তখন শুরু হয়ে গেছে দেবীর আগমন বার্তা।


    ঘরে ঢুকতেই দেখে জাইদ ফোন নিয়ে কার সাথে কথা বলছিল। সোহমকে দেখে রেখে দিয়ে বলল,” কাহা থা তু ?”


    “কুছ কাম থা", এর থেকে বেশী আর কি বা বলবে ?


    জাইদ একটু উদ্বিগ্ন ভরা চোখে সোহমের দিকে তাকিয়ে বলল, ” ফোন তো লেকে যায়া কার"


    সোহম পকেটে হাত দিয়ে বুঝতে পারলো ফোনটা সত্যি তার নিয়ে যাওয়া হয় নি। বিছানার এক কোনেই পরে আছে।


    “অভিজিৎ কা ফোন আয়া থা। দো বার"


    সোহম বিছানা থেকে ফোনটা তুলে দেখলো ছয়টা মিসকল। দুটো অভিজিতের, একটা জাইদের আর তিনটে মায়ের। সঙ্গে আবার একটা ম্যাসেজ, অভিজিৎ করেছে।


    মেসেজটা খুলে দেখল, ” সরি, গুসসে মে থা। কোড ওয়ার্কড রিয়ালি ওয়েল। গো আহেদ উইথ ইওর প্ল্যান। হলিদে এপ্রুভড "


    মেসেজ টা পড়ে সোহমের ভেতরটা ছলছল করে উঠল। কোথায় যেন শুনতে পাচ্ছিলো, ” জাগো, তুমি জাগো !!!!!!”


    সোহমের মুখের হাসি দেখে জাইদ জিজ্ঞেস করলো,” কিয়া হুয়া ? লুক্স লাইক অল ওকে ?”


    ফোনটা আবার বিছানায় রেখে বলল,” আই এম গোয়িং হোম, পার উসসে পেহলে একবার ..."। কথা শেষ না করেই ছুটে গেল বাথ্রুমের দিকে। দুঃখগুলোকে ফ্লাস করতে।


    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • গপ্পো | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ৩১৩৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নীল  - Jeet Bhattachariya
    আরও পড়ুন
    সবুজ - Jeet Bhattachariya
    আরও পড়ুন
    লাল - Jeet Bhattachariya
    আরও পড়ুন
    নো  - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৯:২৯97861
  • কি জঘন্য বানান। কয়েক প্যারাগ্রাফ খুব কষ্ট করে পড়লাম। এইরকম বেমালুম ভুল বানান ভর্তি লেখা দেখতেও অস্বস্তি হয়।


    আর হিন্দি না জানলে হিন্দিতে সংলাপ লেখারই বা কি দরকার?

  • জীৎ ভট্টাচার্য্য | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ২০:৫৫97864
  • ক্ষমা করবেন দিদি কারেক্টেড টা পোস্ট করা হয়নি @দ

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। না ঘাবড়ে মতামত দিন