
পরীবন নামখানা সার্থক। পাইন আর দেওদার একদম ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে এমনভাবে মাথা তুলেছে যে আলো আর ছায়া কখনো কাটাকুটি খেলছে তো কখনো লুকোচুরি। পাইনের গাঢ় গন্ধ, দেওদারের ঘন বোতলসবুজ রঙ, আলোছায়ার চিকিমিকি আর হঠাৎ নেমে যাওয়া তাপমাত্রায় গায়ে শিরশিরানি ধরানো ঠান্ডায় ঘোর লাগে। মনে হয় ওই তো কুয়াশারঙা পরী ফুরুৎ করে ভেসে গেল। ওই ওওই যে পরীর ঝিকমিকে ডানাজোড়া নীচের আপেলবাগানের দিকে উড়াল দিল বুঝি বা। ... ...

পাইপ টপকে এগিয়ে দেখি মাটি আর বালি মেশানো রাস্তাগোছের কিছু একটা নদীগর্ভের দিকে নেমে গেছে। লোকজন ঘাড়ে পিঠে বোঁচকা বুঁচকি নিয়ে সেদিকে নেমে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। যাচ্চলে! এটা তো সিলেবাসে ছিল না! বাঁপাশে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একটা বেশ উঁচু মাটিলেপা চওড়া ধাপ, বাঁশের খুঁটি মাথায় টিনের চাল। ভেতরে একটা পাথরের বেঞ্চমতও আছে। বোধহয় চায়ের দোকান ছিল বা এমনিই বিশ্রামস্থল, আপাতত পরিত্যক্ত। ... ...

২০১৩ সালে কুম্ভলগড় কেল্লা UNESCO World Heritage Monument এর স্বীকৃতি পায়। তবে আমি ওখানে একাকী ভ্রমণে গেছিলাম তার দু’বছর আগে, ২০১১ সালের জানুয়ারিতে। ১৫ বছর আগে শীতের সুন্দর, শান্ত, নির্জন পরিবেশে ১৭ কিমি পদব্রজে কুম্ভলগড় ভ্রমণে অপূর্ব আনন্দ পেয়েছি। মনে হয় এখন ওখানে গেলে সেই নির্জনতার স্বাদ আর পাওয়া যাবে না। ... ...

আশেপাশে ঘোরার ব্যপারে প্রয়োজনীয় খবরাখবর নিয়ে বাইরে বেরোতেই আলো আর হাওয়া দুভাইবোন হইহই করে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। হাওয়া বলে তুমি না চালাল যাবে, চল চল শীগগির। বললাম দাঁড়া বাপু এককাপ কফি না খেয়ে কোথাও যেতে পারবো না। গুগল বলেছে হোস্টেলের কাছেই রিভারসাইড ক্যাফে। ম্যাপ ধরে পৌঁছে দেখি নদীর ধারের ছাউনিটা বন্ধ। ... ...

সৌমেন অন্যমনস্কভাবে মাথা নাড়ে। মনে তীব্র অপরাধবোধের কাঁটা খচখচ করে। হে ঈশ্বর, এতো আগ্ৰহ নিয়ে যে সম্পূর্ণ অচেনা কাউকে এভাবে আহ্বান জানায় তার সম্পর্কে এমন কুভাবনা কেন এলো মনে? ... ...

এই সিরিজের আগের দুটি পর্ব ছিল শিবের গাজন। এই পর্ব থেকে থাকবে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা। এই পর্বের ভ্রমণের সময়কাল - ৬ ও ৭ই অক্টোবর - ২০১২ - শনিবার ও রবিবার ... ...

"একা বেড়ানোর আনন্দে" - এই সিরিজে আসবে ভারতের কিছু জায়গায় একাকী ভ্রমণের অভিজ্ঞতা। এটি পর্ব - ৩৫। রাস্তায় আড্ডারত স্থানীয় তিন তরুণকে শুধোই, আউলিকা প্যায়দল মার্গ কিধর? ওরা বলে, মত যাইয়ে। আমি বলি, কিঁউ? বিজ্ঞের মতো ওরা জানায়, চড়াই বহুত হ্যায় আঙ্কল, থক জায়েঙ্গে। কথা না বাড়িয়ে একটু এগিয়ে অন্যজনকে শুধোই। তিনি রাস্তা বুঝিয়ে দেন। জিজ্ঞাসা করি, খুব চড়াই, পারবো না? তিনি বলেন, চড়াই ভালোই, তবে না পারার মতো কিছু নেই। আমরা স্থানীয়, তাই সোয়া ঘন্টা লাগে। আপনার না হয় দ্বিগুণ লাগবে। ইচ্ছে যখন হয়েছে, ঘুরে আসুন। অসুবিধে হলে ফিরে আসবেন। এই হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গির তফাৎ। ... ...

একটা বেশ বড়সড় রাস্তার মাঝে দাঁড় করিয়ে ছোকরা বলে নামো, এসে গেছি। অ্যাঁ! হোটেল কই? (বোর্ড আছে কিন্তু তার পাশে তো গভীর শুন্য) এই তো নীচেই। কই কই? এই তো পাশের সিঁড়ি দিয়ে অল্প একটু নামলেই… অগত্যা সীমন্তিনী আর ইমনবাবুকে টা টা করে সেদিকে এগোলাম। তা দেখলাম MMTতে প্রায় ঠিকই লিখেছে। গাড়ি হোটেলের দরজা অবধিই যায় বটে তবে মাঝে সাতষট্টিটা সিঁড়ি আছে। মানে হোটেল আর রাস্তা একই তলে অবস্থান করলে সামনাসামনিই হত, ব্যপারটা 2D থেকে 3D হয়ে যাওয়াতেই একটু ইয়েমত হয়ে গেছে। ... ...

সলিলদার কথায়, সুরে ও অনুপদার অনুপম গায়কীতে শুনেছি - এমনি চিরদিন তো কভু যায় না। তবে সে গানে দিনগুলি ছিল সর্বনাশা নিরাশার। জামনগরে আমার আটটি বছর কেটেছিল তার বিপরীত - অতীব আনন্দময়। তবে তাও তো আর চিরকাল কপালে সয় না। তাই ঘটলো ছন্দপতন - দু মাসেই অনেকটা ঝরে গেল আট বছরের সঞ্চিত স্নেহ। ... ...

কর্মসূত্রে নভী মুম্বাইয়ের খারঘরে থাকার সময় ১০/১২ থেকে ০২/১৪ সময়কালের মধ্যে সহ্যাদ্রি অঞ্চলে স্থানীয় মারাঠি ট্রেকমেটদের সাথে ১৭টি হিল ফোর্ট ট্রেকিং করেছি। একটু তাড়াহুড়ো হয়েছিল কারণ জানতাম না কবে বদলি হয়ে যাবো। গেলামও হয়ে বদলি - হুবলী - ০৮/১৫। তবে যাওয়ার আগে বহুদিন ধরে লালিত আশার আশ মিটিয়ে নিয়েছি। ঐ অঞ্চলেই আমার গাড়িতে তিন পূর্বপরিচিত কলকাতার বঙ্গ-দাদা-বন্ধুর সাথে করেছিলাম ৮দিনের ১১০০কিমির এক স্বপ্নীল ভ্রমণ - যা আজও স্মৃতিতে অমলিন। একবার অধূনা মুম্বাইবাসী আদতে বিহারের নিবাসী এক ট্রেকমেটের সাথে দুজনে ওর গাড়িতে ঘুরে এলাম সুন্দর কোঙ্কন উপকূলের কিছু জায়গায়। মারাঠি ট্রেকমেটদের সাথে ১৫জনের দলে চারদিন ঘুরেছি অফবিট গোয়া। একাকী ভ্রমণের সিরিজ তো চলছে, তবে এই মিনি সিরিজে সেই অন্যরকম দলগত ভ্রমণের কিছু কথা আসবে ... ...

এঁর তীব্র প্রতিবাদে সঙ্গে সঙ্গে সরি বলে দুই কান ধরে মাথা নীচু করেছে। অন্যজনও গর্জে ওঠেন, আগে তাঁর কানে এসেছে সাধারণভাবে মেয়েদের সম্পর্কে কিছু ডেরোগেটরি মন্তব্য। খানিকটা বিরক্ত হয়েই তিনি দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই প্রতিবাদটাও বেরিয়ে আসে। দুজনের দাপটে উল্টোদিকের টয়লেটের লোকটি পায়ে পায়ে পিছিয়ে গেছে বেশ খানিকটা আর এ তো মাথা নীচু করে সরি বলে চলেছে। রাস্তায় নেমে দুজনে বলাবলি করেন প্রতিবাদের কোন বিকল্প নেই। এই লোক নিশ্চয়ই এটা করে অভ্যস্ত। আর অনেকেই রুখে উঠতে পারে না। এবার থেকে কিছুদিন অন্তত অপরিচিত মানুষের গায়ে হাত দেবার আগে দুবার ভাববে। ... ...

ভোর সাড়ে তিনটেয় অ্যালার্ম বাজলেই যাঁরা লাফিয়ে উঠে পড়েন তাঁরা নমস্য ব্যক্তি। অসসি ঘাটে যেতে হবে। তার জন্য বড়রাস্তা অবধি পৌঁছে অটো ধরতে হবে। যদিও সবাই ভরসা দিয়েছেন কাশীতে সারারাত অটো চলে, কিন্তু সে এই একটেরে গাইঘাটে পাওয়া যাবে কিনা কে জানে! এইসব সাতপাঁচ ভেবে দুজনে উঠেই পড়েন। তৈরী হয়ে বেরোতে চারটে পঁচিশ। আকাশ ঘোর অন্ধকার, গলিপথ শুনশান। এমনকি ষাঁড় বা কুকুরেরাও অনুপস্থিত। আর ঝকঝকে পরিস্কার, একফোঁটাও নোংরা, প্ল্যাস্টিক কিচ্ছু নেই। তার মানে রাত্রে এসে পরিস্কার করে যায় আর সকাল হতেই লোকে নোংরা করতে শুরু করে। ... ...

ইলিনয় টকাটক উঠতে শুরু করলে কোন্নগর হাঁচড় পাঁচড় করে তাঁর পেছনে ওঠেন। উঠেই সামনে রাখা দাগ কেটে বানানো অর্ধচন্দ্রাকৃতি সূর্যঘড়ি। রাত বারোটা থেকে দুপুর ১১.৫৯ অবধি প্রথমে। একটা পিলারের ওপাশে আবার দুপুর বারোটা থেকে রাত ১১.৫৯ অনুযায়ী দাগ কাটা। ছায়ার অবস্থান দেখে সময় নির্নয় করা যায়। গুণে দেখা গেল ছায়ার অবস্থান অনুযায়ী ১.৪০ বাজে, হাতঘড়ি বলছে ১.৫০। দশটা মিনিট কোথায় লুকালো রে ভাই? ... ...

ঘাটের ধার বরাবর হাঁটাহাঁটি ... ...

দশাশ্বমেধ ঘাট ... ...


গাড়ি পিছনে রেখে আমরা শুকনো ঘাসে ঢাকা মেঠো পথ দিয়ে এগিয়ে চললাম, সামনে সামান্য দূরে একটা বিরাট গাছ, যার নিচ থেকে নাকা আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। কাছে গিয়ে দেখলাম কিনারায় এসে গেছি, সামনে গভীর খাদ সোজা নেমে গেছে নিচের দিকে, আর তার ওপারে নীলাভ সবুজ পাহাড়ের সারি - ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়। শৃঙ্খলাপরায়ন সেনাবাহিনীর মত তারা যেন অপেক্ষা করছে আদেশের অপেক্ষায়। এইবার বোঝা গেল কেন এর নাম ব্লু মাউন্টেন। মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে বাংলার শরৎ কালের মত কয়েক টুকরো সাদা মেঘ, যদিও এখন ডিসেম্বর মাস। সামনে পাহাড়ের কিনারায় একটা প্রশস্ত পাথরের চাতাল, তার পাশেই একটা লোহার বেঞ্চ। চাতালে বা বেঞ্চে বসে সামনের পাহাড়ের শোভা দেখতে দেখতে কাটিয়ে দেওয়া যায় দীর্ঘ সময়। ... ...


সেখানেই দোতলার খোলা বারান্দায় বসে অলসচোখে রাস্তা দেখতে দেখতে খাওয়া সারা গেল। স্কুলফেরতা ছাত্রছাত্রীর দল, অফিসফেরতা মহিলা ফিরতিপথে এই রেস্টুরেন্টে ঢুকে হয় কিছু খেয়ে নিচ্ছেন নয়ত প্যাক করিয়ে। মোমো, থুকপা, চাউমিন খেয়ে পেট ঠান্ডা করে কল্পার দিকে ফেরা। দেখা যাক রওলা ক্লিফ হয় কিনা। আজকেই কল্পায় আমাদের শেষ দিন, যদি সূর্যাস্তের আগে হোটেল পৌঁছানো যায় তাহলে কৈলাসের উপরে অস্তগামী সূর্যের রঙের খেলাও দেখা হয়ে যাবে। আশায় আশায় আমনকে জিজ্ঞাসা করি, সেও আশ্বাস দেয় পৌঁছে যাবো। ... ...

মুরাঙের আগে থেকেই বরফে মোড়া পাহাড়চুড়ারা সঙ্গ নিয়েছে। কখনো ডানে কখনো বাঁয়ে কখনো সামনে হাতছানি দিয়ে চলেছে। দুইপাশ এখনো সবুজে সবুজ। কিছু পর্ণমোচি বৃক্ষের উপরের দিকের পাতায় রঙ ধরেছে। কোথাও কোথাও পাহাড়ের ঢাল বরাবর ধাপ কেটে জুমচাষ করা। কিছু ফসল পেকে হলুদ রঙ ধরে গোটা ঢালখানা নকশাদার আসন বানিয়ে রেখেছে। নাকো (১২০১৪ ফিট) কল্পার (৯৭১১ ফিট) থেকে প্রায় ৩০০০ ফুট উঁচু। ... ...