আজ ২৯ আগস্ট, বাংলা সাহিত্যের বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের (১৮৯৯–১৯৭৬) ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। কবি, সংগীতজ্ঞ, নাট্যকার, সাংবাদিক ও স্বাধীনতা সংগ্রামী—সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন এক বহুমাত্রিক প্রতিভা, যিনি বাঙালি জাতির কণ্ঠস্বর ও আত্মার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
নজরুলের কবিতা ছিল অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অগ্নিবাণ। তাঁর “বিদ্রোহী” কবিতা ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে বাঙালির আত্মবিশ্বাসের প্রতীক। একই সঙ্গে প্রেম, প্রকৃতি, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার গানও তিনি লিখেছেন অসংখ্য। বাংলা ভাষার প্রতি তাঁর অবদান স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও স্বীকার করেছেন। নজরুল যখন জেলে বন্দী,তখন রবীন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলেন”ভেঙে পড়ো না, বাংলা ভাষার তোমাকে প্রয়োজন আছে”। যদিও পরবর্তী সময়ে তাঁর সঙ্গে রবি ঠাকুরের দুরত্ব তৈরি হয়,”খুন” কে রক্ত হিসেবে বাংলা ভাষায় ব্যবহারের বিরুদ্ধে ছিলেন রবি ঠাকুর, কিন্তু অন্যান্য অনেক ফার্সি আরবী ইত্যাদি শব্দের মত কাজী নজরুল খুনকে বাংলা বলেই মনে করতেন।
সংগীতে তাঁর অবদান আরও অনন্য। প্রায় চার হাজার গান—নজরুল সঙ্গীত—বাংলা সংগীতকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। রাগ-রাগিণী, কীর্তন, ইসলামী কাওয়ালি, গজল, লোকসংগীত—সব ধারার সংমিশ্রণে তিনি তৈরি করেছিলেন এক অনন্য ঐশ্বর্য। কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না যে বাংলা গজলের সৃষ্টিকর্তা তিনি। শুধু ইসলামী গজল নয় , অনেক প্রেমের গজল ও তিনি লিখেছেন ও সুর দিয়েছেন। যা বাংলা গানের অমর সৃষ্টি।
“ধূমকেতু” পত্রিকার মাধ্যমে নজরুল উপনিবেশবাদ বিরোধী ও সামাজিক সাম্যের পক্ষে সরব হন। তাঁর লেখনী হিন্দু-মুসলিম ঐক্য এবং ধর্মনিরপেক্ষ মানবতার পক্ষে ছিল প্রবল উচ্চারণ। পত্রিকা সম্পাদনা ও লেখার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর আধুনিক ও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি ভাবনার ছাপ রেখে গেছেন। ঐক্যবদ্ধ বাঙালি জাতি গঠনের চেষ্টা তাঁর সফল হয়নি। কিন্ত যতদিন তিনি সক্রিয় ছিলেন ,এই লক্ষ্যই তিনি পত্রিকা প্রকাশ করেছেন।তিনি বাংলা ভাষায় সাংবাদিকতার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। নজরুলের সাহিত্য ও রাজনৈতিক জীবনে মুজফ্ফর আহমেদ ছিলেন এক গুররুত্বপূর্ণ সঙ্গী। তাঁরা একসঙ্গে ১৯২০ সালে “নবযুগ” পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পরে নজরুলের “ধূমকেতু” পত্রিকায়ও মুজফ্ফর লেখক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।
মুজফ্ফরের সমাজতান্ত্রিক, সাম্যবাদী ও ধর্মনিরপেক্ষ ভাবনা নজরুলকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এক চিঠিতে নজরুল লিখেছিলেন—
“আপনি যদি আমাকে এভাবে অনুপ্রাণিত করতে থাকেন, তবে আমি সত্যিই একদিন বড় কবি ও লেখক হয়ে উঠব।”
এই উক্তিই তাঁদের আন্তরিক বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক প্রভাবের প্রমাণ।
১৯৪২ সালে অসুস্থ হয়ে নজরুল বাকরুদ্ধ ও কর্মক্ষমতা হারান। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমন্ত্রণে তিনি ঢাকায় আসেন। বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। তবে পশ্চিমবঙ্গে এর ফলে এক ধরনের বিতর্ক জন্ম নেয়—অনেকে মনে করেন, নজরুলকে কলকাতা থেকে “ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।”
১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট নজরুল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়। আজও তাঁর সমাধি কবিপ্রেমীদের তীর্থস্থান।
কাজী নজরুল ইসলাম শুধু বিদ্রোহী কবি নন, তিনি ছিলেন ন্যায়, সাম্য ও মানবতার চিরন্তন কণ্ঠস্বর। তাঁর বন্ধু ও সহযোদ্ধা মুজফ্ফর আহমেদের সঙ্গে সাহিত্য-রাজনীতির পথচলা তাঁর সৃষ্টিকে করেছে আরও বৈপ্লবিক ও মানবিক। তিনি আজও সমাজ বদলের স্বপ্ন দেখা বাঙালি মানসের প্রেরণার উৎস।
আজ তাঁর ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি—
“যতদিন অন্যায় থাকবে, ততদিন নজরুল আমাদের প্রেরণা হয়ে থাকবেন।”
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।