মুখ্যমন্ত্রীদের একটা ড্রিম প্রজেক্ট থাকে, যেটা আঁকড়ে ধরে, প্রচারে তুলে এনে তিনি পরবর্তী ভোটে জিততে চান। যেমন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ড্রিম প্রজেক্ট ছিল সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম। একসময় চন্দ্রবাবু নাইডুর ড্রিম প্রজেক্ট ছিল রাজধানী অমরাবতী। ওড়িশার নবীন পট্টনায়কের ড্রিম প্রজেক্ট ছিল টাটা আর পসকোর যৌথ উদ্যোগে ইস্পাত কারখানা। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই মুহূর্তে ড্রিম প্রজেক্ট দেউচা-পাচামি কয়লা খনি।
কিন্তু কী অদ্ভুত ব্যাপার দেখুন, এই প্রজেক্টগুলো অনেক সময়েই নানা কারণে রূপায়িত হয় না, বা হলেও আধা খেঁচড়া। কোটি কোটি টাকা জলে যায়। বুদ্ধবাবুর মতো মানুষের সরকারের পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। রাজধানী গড়তে গিয়ে আর্থিক দুর্নীতির কারণে চন্দ্রবাবুর মতো মানুষকে জেলে যেতে হয়। জ্যোতি বসুর ড্রিম প্রজেক্ট ছিল হলদিয়া পেট্রোকেম আর বক্রেশ্বর থার্মাল পাওয়ার। দুটিই কিন্তু হয়েছিল, সঙ্গে সল্টলেকের ইলেকট্রনিক্স কমপ্লেক্স আর রাজারহাট উপনগরী। বিধান চন্দ্র রায়ের ছিল দুর্গাপুর শিল্পনগরী, কল্যাণী আর সল্টলেক উপনগরী নির্মাণ। তিনটিই কিন্তু হয়েছে।
এবার সরাসরি দেউচার প্রসঙ্গে আসি।
সমীক্ষা বলছে, দেউচাতে ২০০ কোটি টনের বেশি কয়লা মজুদ আছে, যা এশিয়ার মধ্যে বৃহত্তম। তারপরেই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, ভারতে তো প্রায় আড়াইশ বছর ধরে কয়লা তোলা হচ্ছে। ১৭৭৪ সালে রাণীগঞ্জে প্রথম কয়লা তোলা হয়। বীরভূম থেকে তার দূরত্ব অনেক এমনটা নয়। তাহলে দেউচা নিয়ে এতদিন কেউ আগ্রহ দেখায়নি কেন? কারণ, এই কয়লার সবটা উন্নত মানের নয়। দ্বিতীয়ত, ভালো কয়লা রয়েছে ২২৫-২৪৫ মিটার চওড়া ব্যাসল্ট শিলার নিচে। এই শিলাস্তর ফাটিয়ে কয়লা উত্তোলন করে বাণিজ্যিকভাবে প্রজেক্টটি সফল করা সম্ভব নয় বলে কোল ইন্ডিয়া আগেই জানিয়েছে।
বস্তুত, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তিনি এই কয়লা তুলে রাঢ়বঙ্গের অর্থনীতি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। সেই উদ্দেশ্যেই রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে পোল্যান্ডের ওয়ারশ থেকে খনি বিশেষজ্ঞ আনা হয়েছিল। বিষয়টি দেখভালের দায়িত্বে ছিলেন মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু তাঁরাও বলেছেন, এইভাবে ব্যাসল্ট শিলার স্তর ফাটিয়ে কয়লা তুলে বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়া সম্ভব নয়।
কিন্তু মমতা চেষ্টা বন্ধ করেননি। তিনি আরও বিশেষজ্ঞ এবং শিল্প সংস্থার সঙ্গে কথা বলেন। অবশেষে ২০২১ সালে ভোটে জিতে মমতা সরকারি প্রজেক্টের জন্য পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা করেন। যাঁরা এই খোলা মুখ খনির জন্য উচ্ছেদ হবেন, তাঁদের কাজের সংস্থান এবং বাসস্থানের ব্যবস্থা করবে সরকার।
সুনির্দিষ্ট করে বললে এটি আসলে মহম্মদবাজারে হরিণসিঙ্গা কোল ব্লক। আপাতত বলা হচ্ছে, ৩,৪০০ একর জমির নিচে কয়লা আছে। তার মধ্যে মাত্র কয়েক একর সরকারি জমি। বাকিটা অধিগ্রহণ করতে হবে। মমতা জানেন, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণ এবং তার বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলন আজ থেকে ১৪ বছর আগে ২৩২-এ দাঁড়িয়ে থাকা রক-সলিড বামফ্রন্ট সরকারকে তাসের ঘরের মতো হুড়মুড় করে ফেলে দিয়েছিল।
যে তিনটি গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে মহম্মদবাজারের এই কয়লা খনি এলাকা ধরা হচ্ছে, সেখানে আদিবাসী, তফসিলি এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের বাস বেশি শুধু নয়, তারাই প্রায় ৯০ শতাংশ। দেওয়ানগঞ্জ, হরিণসিঙ্গা অঞ্চলের তিন হাজার পরিবারের প্রায় ২১ হাজার মানুষ প্রাথমিকভাবে এই প্রকল্পের জন্য নিজের এলাকা থেকে উৎখাত হবেন। যদিও তাঁরা বিকল্প বাসস্থান এবং খোলা মুখ খনিতে কাজের সুযোগ পাবেন বলে সরকার জানিয়েছে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আবার জুনিয়র কনস্টেবলের চাকরি পাবেন - সরকার এমনও ঘোষণা করেছে।
বিবাদ বেঁধেছে এখানেই। সরকারের এই প্রতিশ্রুতিতে গ্রামবাসীদের অধিকাংশের সায় নেই। তাঁরা কোমর বেঁধে নেমেছেন। খোলা মুখ খনিতে কতটা দূষণ হবে, কয়লা উত্তোলন ও পরিবহনের ফলে যে দূষণ হবে, তার জন্য কতটা জমির ফসল নষ্ট হবে, সে তো পরের কথা। মমতার সিঙ্গুর আন্দোলনের যে মূল কথা ছিল, মানুষ না চাইলে সরকার কোনও শিল্প প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করবে না, সেই আপ্তবাক্যই এখন মমতা সরকারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কয়েক লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ, বিকল্প বাসস্থান - কোনও কথাতেই চিঁড়ে ভিজছে না। মহিলারা সামনে এগিয়ে এসে পুলিশের সামনেই বলছেন, আমরা ভিটে জমি দেব না। তার জন্য দরকারে প্রাণ দেব। এটা আসলে আদিবাসী গাঁওতার সিদ্ধান্ত।
একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, বুদ্ধবাবুর আমলে মমতা সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম প্রজেক্টে বাধা দিয়েছিলেন। নীতিগত কারণে তিনি সেজ-এর বিরুদ্ধে ছিলেন। কিন্তু দক্ষিণপন্থী দল বিজেপি এই খোলা মুখ খনির কোনও বিরোধিতা তো দূর, বরং সমর্থন করছে। দলের নেতারা স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, তাঁরা কোনও বাধা দেবেন না। অর্থাৎ রাজ্যের একজন বিধায়কও নেই, যিনি এই প্রকল্পের আন্দোলনকারীদের সমর্থন করছেন। উল্টো দিকে, নীতিগত কারণেই কিছু নকশালপন্থী দল আদিবাসী, তফসিলি, মুসলিম জনতার পক্ষ নিয়েছেন। আর সরাসরি ঘোষণা না করলেও পিছন থেকে আন্দোলনকারীদের সমর্থন করছে সিপিএমের একাংশ।
এই প্রকল্প নিয়ে পরিবেশ কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের যে মতামত, স্বাভাবিকভাবেই তাকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিয়ে সবুজ ঝান্ডা দেখিয়েছে দিল্লির বিজেপি সরকার। জেলা সদর সিউড়িতে গড়ে উঠেছে প্রজেক্ট অফিস। প্রাথমিকভাবে ঠিক হয়েছে, রাজ্য সরকার নিজেই এই কয়লা তুলবে অন্য সংস্থার সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসের মধ্যে আগামী বিধানসভা ভোটের দিন ঘোষণা হয়ে যাবে। কিন্তু তার মধ্যে মমতা তাঁর ড্রিম প্রজেক্ট থেকে এক টন কয়লাও তুলতে পারবেন কিনা, সেটা কোটি টাকার প্রশ্ন। আন্দোলনের মাত্রা কোন দিকে যায়, সেইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তার উপরেই দেউচার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।