
সংসদীয় গণতন্ত্রের মহান উৎসব, অর্থাৎ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই মুহূর্তে। ভোট দেওয়ার পর্ব প্রায় শেষ, সোশ্যাল মিডিয়া, প্রাচীন মিডিয়া, না মিডিয়া ইত্যাদি নানা প্ল্যাটফর্মে বিবিধ কাজিয়া অবশ্য অব্যাহত। পশ্চিমবঙ্গ সামনের পাঁচ বছর কী পেতে চলেছে এখনও পরিষ্কার নয়, এবং সত্তর আশি নব্বইয়ের কলকাতায় ফুটবলের দলবদলের মরসুমের মতই দেখাচ্ছে পরিস্থিতি। সুমনের গান থেকে ধার করে বলা যায়, আজকে যে শিস দিয়ে তৃণমূল, বিজেপিও হতে পারে কাল সে। আদর্শ বড়ো না টিঁকে থাকার প্রয়োজন, বাম জোটের নির্বাচনী কৌশলে এই প্রশ্ন উঠে এসেছে।
সব মিলিয়ে আগে যা হয়ে গেছে, বা আগে যা ঘটেনি, এইসব সবই পাওয়া যাচ্ছে। আবার। প্রচারের চমক। প্রতিশ্রুতি। ঝুড়ি ঝুড়ি মিথ্যে। সবশেষে নির্বাচন নিয়ে ছোটখাটো বা বড়োসড়ো হিংসায় কিছু মানুষের মৃত্যু। বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের উৎসবে খুন হওয়া কিছু নাগরিক। এখন, প্রশ্ন হলো, এই যে কোল্যাটেরাল ড্যামেজ বলে কয়েকজন ফস করে মরে গেলেন, এর বিনিময়ে আমরা কী কী পেতে চলেছি, বা অতীতেও পেয়েছি ---- সেটা খতিয়ে দেখা। বাইরে থেকে কী বুঝছি বা দেখছি, এই প্রশ্নের উত্তরে আমার এইসব ভাবতে ইচ্ছে হলো।
কাজেই এই লেখায় আমি ধরতে চাইছি সেইসব খতিয়ানের একটা বা খুব বেশি হলে দুটো দিক। হাতির সামগ্রিক রূপ কী আমি জানিনা, আপাতত আমার হাতে উঠে আসছে যে অংশটুকু তা লেজ না শুঁড় না দাঁত তার নিষ্পত্তি হলেই আমি খুশি।
ইতিমধ্যেই গুরুচন্ডালী ও অন্যত্র নির্বাচনী প্রচারে জনজীবনের গুরুত্ব আলোচিত হয়েছে। আলোচিত হয়েছে সংখ্যাগরিষ্ঠের মদতপুষ্ট দলের আওতায় থাকা নানাবিধ মেশিনারি। অর্থ ও লোকবলের সুবিধাভোগী রাজ্য ও কেন্দ্র সরকার যে যেখানে রাজা সেখানে কীভাবে অন্যদের, প্রান্তিকদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। তারই কিনে রাখে মিডিয়া, মানুষ, তাদের হাতেই থাকে ন্যারেটিভ নির্মাণের চাবি। ফলে একজন প্রার্থী চোর না দাঙ্গাবাজ না উন্নয়ণের নতুন মুখ, নাকি সে নবীন প্রজন্ম --- এসব ঠিক হয়ে যায় আমার আপনার স্বাধীন মতামত ছাড়াই। ফলে প্রবল পরাক্রান্ত গুন্ডা এবং/ অথবা দূর্নীতিপরায়ণ নেতা / নেত্রীর দল ফি ভোটে দরজায় দরজায় অকুতোভয়ে আসেন, ভোট চান, জিতে বা না জিতে আরো কয়েক বছর চুরি ডাকাতি জালিয়াতি ইত্যাদি করে টাকা জমিয়ে নিয়ে আবার আসরে নামেন। এমন নয় যে এঁরা কেউ কোন কাজ করেন না বা কারুর উপকারে আসেন না। লটারির মত কেউ কেউ সেসবও দিয়ে থাকেন। বছরের পর বছর এই দেখে দেখে আমার ধারণা হয়েছে যে ভোট আসলে যে কারণে হয় আর যেজন্যে হওয়ার কথা এইদুটো এক না। এমনকী এই প্রশ্ন উঠে যাওয়াও অস্বাভাবিক না যে আদৌ এই প্রহসনের কোন প্রয়োজন আছে কিনা। গণতন্ত্রের এই বিশিষ্ট ফিচারটিকে অপ্রয়োজনীয় বলতে বাধে। যদিও আদতে যা হচ্ছে সেটা ভাবলে প্রশ্নটা আরো অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে, মিলিয়ে যায়না।
কিন্তু এবারের ভোটে নতুন করে আমার সামনে এলো ভোটকর্মীদের কথা। সরকারি কর্মচারীদের যে ভোটে কাজ করতে যেতে হয়, সে তো আমরা জানিই। ইশকুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে সরকারি ইন্জিনিয়ার সবাই দিকে দিকে ভোটের "ডিউটি"দিতে যান। আমাদের অনেকের পরিবারেই এঁরা আছেন। কেমন ব্যবস্থাপনায় চলে এঁদের কাজ? প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার যা যা বিবরণ শুনেছি, মনে হলো লিখে রাখা ও সে সংক্রান্ত অব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা অন্যায় হবেনা। যা শুনলাম, এখনও যদি এই প্রহসন নিয়ে কোন অসন্তোষ বা প্রশ্ন না তৈরী হয়, তাহলে গণতন্ত্র অনেকদিন আগেই কোমায় চলে গেছে।
কলকাতা থেকে এক্স কিলোমিটার দূরের কোন গ্রামে ডিউটি পেয়েছেন ক। ক'য়ের প্রথম ডিউটি, কাজেই ক কে মন দিয়ে ট্রেনিং নিতে হবে, তারপর সব বুঝে নিয়ে দুদিন ধরে থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম এক্সে ভোট করাতে হবে। উপরি আপদ কোভিডের জন্য ক টীকা নেবেন, তার জন্যেও বাড়তি দুদিন যাতায়াত। এই দিনগুলো, যাতে ভারতের মত মহান কর্ম সংস্কৃতির দেশে কাজের ক্ষতি না হয়, তাই সপ্তাহান্তে। অর্থাৎ ভোটের জন্য ক পাঁচদিন ব্যয় করলেন। এরপর ক গেলেন ট্রেনিং এ, নিলেন টীকার প্রথম ডোজ এবং আবিষ্কার করলেন যে টীকা নেওয়ার যতদিন পরে তাঁর লোকজনের মধ্যে কাজ করার কথা তার আগেই তাঁকে ভোট করাতে যেতে হচ্ছে। খেয়াল রাখুন, ভোটের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেছে ও অপরিবর্তনীয়, সতত পরিবর্তনশীল ভ্যাকসিন রুটিন, বিজ্ঞানীদের ধন্দ, মানুষ কখন ও কতটা নিরাপদে বেরোতে পারবেন সেই নিয়ে অমীমাংসিত প্রশ্নের মধ্যেও ---- ভোটের দিন ও কর্মপদ্ধতি কিন্তু অনড়।
যাই হোক, কয়ের কথায় আসি। অসমাপ্ত টীকাকরণের পর, ক যথাবিধি প্রিসাইডিং অফিসার হয়ে, আরো চারজন সঙ্গী নিয়ে গেলেন এক্স গ্রামে। ইভিএম নিয়ে, ব্যাগ ব্যাগ জিনিস নিয়ে পৌঁছে তাঁদের প্রথম দায়িত্ব যে ইশকুলে পরের দিন "খেলা হবে" তার তদারক। ক দেখলেন আলো নেই, পাখা নেই, এপ্রিল মাসের গরমে সেই প্রাইমারি স্কুলের ভোটকেন্দ্রে শুধু ফুটফুটে একটি সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো। বাথরুম আছে কিন্তু জানলায় পাল্লা নেই। দরজায় পাল্লা আছে কিন্তু ছিটকিনি নেই। ক এবং তাঁর দলের মোট পাঁচজনকে একটি ঘরে, প্রথমে দীর্ঘদিনের জমা ধুলো বিদেয় করে, দুটো করে বেঞ্চ জড়ো করে তার ওপর নিজেদেরই বয়ে আনা চাদর বিছিয়ে শুতে হবে। ক ধুলো ঝাঁট দিইয়ে, আলো পাখার ব্যবস্থা করে, জল তুলিয়ে সবার জন্য ড্রামে ভরে জলের "ব্যবস্থা"করে, জানলায় নিজেদেরই বয়ে আনা খবরের কাগজ সেঁটে, পরের দিনের "খেলা"র পেপারওয়ার্ক করে দেখলেন রাত একটা বেজে গেছে। আড়াই ঘন্টা শুলেন। যদিও সবারই মনে উৎকন্ঠা, গরমের দিন, সাপ ও পোকামাকড় রয়েছে সম্ভবত। তিনটের পর থেকে শুরু হলো মক ভোট, খেলার আগে যেমন নেট প্র্যাক্টিস হয়, অনেকটা সেরকম। আরো কিছুক্ষণ পরেই শুরু হবে যজ্ঞ, যার একটা মোটের ওপর ছবি আপনারা অনেকেই ইন্টারনেটে প্রাপ্ত "নিউটন " নামের হিন্দি ছবিতে দেখে ফেলেছেন।
অতঃপর, ভোট অথবা খেলা, শুরু হলো। জনগণের কাছে আইপিএলের তৃপ্তি দিলেও ভোটকর্মীদের কাছে টেস্ট ম্যাচের মত এই খেলা। ভোটকর্মীদের কোন রিলিফের ব্যবস্থা নেই, বিশেষ করে প্রিসাইডিং অফিসার চেয়ার থেকে নড়বেন না। বিবিধ রাজনৈতিক দলের এজেন্ট রা বাচ্চার ওভারপ্রোটেক্টিভ অভিভাবকের মত উৎকর্ণ হয়ে রয়েছেন, ঘনঘন হিসেব চাওয়া চলছে। এর ফাঁকে খেয়ে সময় নষ্ট করার বিলাসিতা ক’য়ের নেই। জনগণ পাঁচ বছরের সেরা (বা একমাত্র) রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ নিতে এসেছেন। এসে, নিউটন ফিল্মের মতই ইভিএম খায় না মাথায় মাখে ভাবছেন। প্রিসাইডিং অফিসার ও ভোটকর্মীরা তটস্থ, এই বুঝি নীলকমলের একটা ভোট লালকমলের ঘরে চলে গেল, বা এই বুঝি কমলাবনের ভোটার বোতাম টিপতে ভুল করায় এ ভোট রেজিস্টার্ড হলো না। অতএব, এপ্রিল মাসের গরমে, ভোর তিনটে থেকে, জল ও লজ্জা নিবারণের যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় চান না করে, (খাওয়ার কথা জিগ্যেস করে লজ্জা দেবেন না ), প্রিসাইডিং অফিসার রেফারিগিরি করতে থাকলেন --- খেলা চলতে থাকলো। যে খেলা নিয়ে এই লগান - সুলভ টেনশন, সে খেলার প্রার্থীরা একই পরিবারের সাতটি নাম। তাঁরাই বিভিন্ন দলের টিকিটে দাঁড়িয়েছেন। যে দলই জিতুক, অঞ্চলের পরিচালন ব্যবস্থার যে তারতম্য হবেনা সেকথা বলার জন্য কোন ডিগ্রি লাগেনা। ভোটের ফল বেরোনোর পর এই প্রার্থীরা কে যে কোন দলের হবেন সেটা বলার জন্য অবশ্য কোন ডিগ্রিই যথেষ্ট নয়।
সব ভালো জিনিসই এক সময় শেষ হয়। ভোটদান শেষ হলো। আবারো নানাবিধ হিসাবনিকাশ ও কাগজপত্রের পর, এবার ফেরার পালা। সব পাখী ঘরে ফেরে, কবি এরকম অযৌক্তিক দাবি করে থাকলেও, সব ভোটকর্মী ঘরে ফিরবেন এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। ফেরার সময় হলে দেখা যায়, সোনার তরীর মত ট্রেকারের স্থান অকুলান। আসার সময় একটা ট্রিপে পাঁচজনকে নিয়ে এসেছে ট্রেকার, ফেরার সময় পাঁচজন এবং খেলার ফল সমেত ইভিএম ---সবার জায়গা নেই। ট্রেকারের কাছে একটা ট্রিপের কড়ার, কাজেই দুটো ট্রিপ করতে নারাজ। খেলার নিয়মে এদিকে আছে সবাইকে একসাথে ফিরতে হবে, কাউকে রেখে আসা যাবেনা। কাজেই আধুনিক ভারতের পৃথিবীকে দেওয়া সেরা উপহার, "জুগাড় " প্রয়োজন হয়। আরো একটি গাড়ি পাওয়া যায়, পুলিশেরই জিপ, যাঁর চালক অফ ডিউটি অবস্থাতেও পরিবহণে সাহায্য করতে সম্মত হন। এই বৈপ্লবিক প্রস্তাবে রাজি হওয়ার জন্য তাঁর চাকরি থাকে কিনা তা সময়ই বলবে। ততক্ষণে আক্ষরিক অর্থেই কলির সন্ধে। সাতটা বেজে গেছে। এক্স গ্রামের সাত সাতজন হেভিওয়েট প্রার্থীরা একই বাড়ির হওয়া সত্ত্বেও জওয়ানেরা গভীর অন্ধকার গ্রামের রাস্তায় টহল দিচ্ছেন। যেকোন মুহূর্তে রেফারি বা আম্পায়ার যাই বলুন, তাঁদের প্রাণসংশয় হওয়া আশ্চর্য্য নয়। ইভিএম মেশিন বাঘের মত পাহারা দিচ্ছেন সেনারা, অবিকল হীরক রাজার কোষাগারের ভিতর ও বাইরের পরিবেশ। হীরা পেলেই নতুন সরকার হবে।
এক্সের মত আরো অনেক গ্রামের ভোট যেখানে এসে জমা হবে, সেই ওয়াই কেন্দ্রের সামনে ততক্ষণে কুম্ভমেলার মত ভিড়। দু কিলোমিটার আগে থেকেই সারি সারি গাড়ি এসে যানজট লাগিয়ে ফেলেছে, পরিবেশ উৎসবেরই বটে, তবে আমাদের বন্ধু ক অ্যান্ড কোম্পানী ততক্ষণে ধীরে ধীরে অসুস্থ বোধ করছেন। জওয়ানেরা উত্তর পূর্ব সীমান্তের মানুষ, তাঁরা বাংলা দূরস্থান হিন্দিই ভালো জানেন না। মূকাভিনয় করে ভাবপ্রকাশ হচ্ছে। যানজট সহজে মিটবেনা। কেন সহজে মেটার নয় সেটা জানার জন্য ঐ শেষের দু কিলোমিটার হেঁটে আসতে হচ্ছে ইভিএম বয়ে। এসে জানা যাচ্ছে কারণ। আগের দিন দেওয়া প্রত্যেকটি "ক্রীড়াসরঞ্জাম " গুছিয়ে ফেরত নিচ্ছে অধিকারী। ফুটফুটে সিসিটিভির ব্যবসায়ী এসে অভিযোগ করছে যে একঘন্টার মধ্যেই ক্যামেরা উধাও হয়েছে খেলার মাঠ থেকে। তাকে আলো পাখার কথা বলায় অবশ্য সে অন্যদিকে চলে যাচ্ছে, সম্ভবত তার আরো অনেক সিসিটিভি ফুটে ছিলো অন্য কেন্দ্রেও। ভোট করতে অনেক জিনিস লাগে, সেসবের দাম কিছু কমও নয়। শুধু মানুষের শ্রমের দাম নেই। তবে খেলা শেষ পুরোপুরি হয়ও নি। মনে রাখবেন, আমরা সবে ওয়াই তে এসেছি। পরবর্তী স্টেশান অনিশ্চিত। প্ল্যাটফর্ম নাই। প্রসঙ্গত ওয়াই তেও বাথরুম আছে কিন্তু জল নেই। ব্রিগেডে মানুষের ঢল নামলে ডিমভাতের প্যাকেট নিয়ে কোন হিসেবের ভুল হয়েছে শুনিনি, কিন্তু প্রতিটি আয়োজনেই দেখা যাচ্ছে জলের এস্টিমেট ভুল।
ওয়াই থেকে ট্রেন ছাড়বে। স্পেশাল ট্রেন, যাতে করে ঐ লাইনের সব রেফারিরা ফিরবেন। ছোট থেকেই আমি স্পেশাল জিনিস সন্দেহজনক দৃষ্টিতে দেখি। স্পেশাল মিষ্টি, স্পেশাল ডিশ, স্পেশাল ক্যান্ডিডেট --- এইসবের মতই স্পেশাল ট্রেনের স্পেশালিটিও আসলে তার সমস্যায়। যে সময়ে ট্রেন ছাড়বে তাতে বাড়ি পৌঁছতে মাঝরাত হওয়ার কথা। যথার্থ ভালো রেফারির মতই ক ঠিক করে নেন পথে কোন স্টেশনের কাছে কোন বন্ধু বা আত্মীয় আছে। একজন পাওয়া যায় যেখানে রাতের কয়েক ঘন্টা থেকে যাওয়া যাবে। কিন্তু সমস্ত জায়গায় থেমে থেমে ইচ্ছুক রেফারিদের নিয়ে ফিরতে ফিরতে হয়ে যায় ভোররাত। স্নিগ্ধ ও নিরাপদ সকালে প্রসন্নচিত্তে ক বাড়ি ফেরেন। ফেরার পথের অনিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা নিয়ে সন্দেহ থাকায় কিছু রেফারি পরের দিন ফিরবেন। অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা, বিশেষ করে "খেলা"র সময় এতই বেশি, যে ওঁরা সাপ-পোকা পরিবৃত, বাথরুম বিহীন, কাঠের বেঞ্চে শুয়ে আরো একটা রাত কাটানো শ্রেয় মনে করলেন।
এই ধারাবিবরণী তাই আমার লিখতে ইচ্ছে হলো। ২০২১ সালের একটা দোতলা প্রাইমারি স্কুলের ভোটকেন্দ্রে আলো পাখা হীন, জল হীন, শৌচালয়ের ব্যবস্থা নেই, এরকম জায়গায় সমস্ত লিঙ্গের মানুষকে তিনদিন ধরে এই অমানুষিক যন্ত্রণা কেন নিতে হবে --- এই প্রশ্নটা আমাদের করা উচিত। যে রাজ্যে পাড়ার ক্লাবে, ধর্মীয় হুজুগে টাকা ওড়ে সেখানে পাঁচটা লোককে শোয়ার জন্য একটা করে শতরঞ্চিও পর্যন্ত দেওয়া যায়না কেন? আমার পরিচিত বৃত্তে যাঁদের সামান্য রাজনৈতিক প্রভাব আছে তাঁদের কারুরই পয়সার অভাব নেই। তৃণমূলের, এমনকি ছোটখাট নেতারও বাড়ির অনুষ্ঠানে টাকা ওড়ে এ আমার নিজেরই জানা। তাহলে এই নির্বাচন, যা কিনা সুষ্ঠুভাবে হওয়া রাজনীতি যাঁদের কেরিয়ার তাঁদের মঙ্গলের জন্যই দরকার, সেখানে এই কার্পণ্য কেন? আমি জানি এই তিনদিনের যন্ত্রণা বাবদ ক এবং তাঁর দল মাথাপিছু কত করে টাকা পেলেন, রাহাখরচের হিসাবে তা যথাযথ একথা গণতন্ত্রের পরম শত্রুও বলবেন না।
মে মাসে খেলার স্কোর বেরোবে। এখন থেকে কয়েকটি দিন ও রাত আমরা আইপিএলের মত সেই স্কোরে নিমজ্জিত থাকব। পরবর্তী কয়েক দিন, কয়েক মাস, কয়েক বছর একে একে কেটে যাবে হিসেব মেলানো, হিসেব বুঝে নেওয়া, নতুন স্কোর বানাতে বানাতেই। আপনাদের থেকেই টাকা চুরি করে তার এক শতাংশ হয়ত ভিক্ষের মত করে বা চমকে "ইনভেস্ট" করে ভোট কিনতে আসবে একই মুখ বা মুখোশেরা। এই প্রশ্নটা থেকেই যাবে, যারা বছরের পর বছর সময় পেয়েও অন্তত তিনদিনের জন্য ঐ কটি মানুষের জন্য ঠিকঠাক বন্দোবস্ত করতে পারেন না, তাঁরা এই কোটি কোটি লোকের কী ভালো করবেন? আর যদি সমস্ত প্রশ্নের উত্তরই এটা বলে যে গণতন্ত্রের নামে এই ভড়ং এর আসল উদ্দেশ্য মানুষের কাজ করা না, স্রেফ আরো একটি ফর্মালিটি, বা নেহাতই একটা বিনোদন, তাহলে এই অপচয়ের অনুষ্ঠানে আমাদের কাজ কী?
শক্তি | ২০ এপ্রিল ২০২১ ১১:১৭104946মিঠুন ভৌমিকের লেখা সর্বদাই সরস এবং বাস্তব সত্য সন্ধানী।এইলেখাও ভোটকর্মীদের বাস্তব যন্ত্রণার নিখুঁত ছবি ফুটিয়ে তুলে ভোটকর্মীদের ধন্যবাদার্হ হবেন।
সময়োচিত লেখা।
উত্তর বিহারে বেশ কয়েকবার 'ম্যাজিস্ট্রেট' হয়ে ভোট করানোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা আছে আমার। প্রতিটি জায়গাই ছিলো 'অতি-সংকটপূর্ণ'। মিঠুন এখানে যে বর্ণনা দিয়েছেন, তার থেকে শত গুণ বেশি প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। তখন ব্যালটের যুগ ছিলো। দূরান্তের প্রত্যন্ত গ্রামে ম্যাজিস্ট্রেটকে মেরে ব্যালট হাতিয়ে নেওয়া ছিলো নিয়মিত ঘটনা। কয়েকবার নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে পাওয়া গিয়েছিলো 'চটিপরা' হোমগার্ড। যাদের কাঁধে থাকতো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার থ্রি-নট-থ্রি, যেগুলি বিশ বছর পরীক্ষা করে দেখা হয়নি। অনেক গল্প।
মনে পড়ে গেলো ...
উ সব কহানী-কিসসা কব সুনাইবেন দাদা? একগো দুগো?
চন্দ্রানী চক্রবর্তী | ২১ এপ্রিল ২০২১ ১৪:১৩104980উপরিউক্ত প্রত্যেকটি বর্ণনা সঠিক। তার সাথে আরেকটি বিষয়ে উৎকন্ঠা জাগে যে, মহিলাদের যেখানে ঠিক একইভাবে ভোট নিতে পাঠানো হচ্ছে তখন তাঁরা তাঁদের আব্রুটুকু বজায় রেখে ফিরতে পারবেন কিনা সেদিকটা কারো ভেবে দেখার সময় নেই! সিসিটিভি লাগানো বন্ধ ঘরে পাঁচজন ভদ্রমহিলাকে রাত কাটাতে বাধ্য করা হবে। তাঁদের পোশাক বদলানো, ঘুমোনো সবটাই সিসিটিভির দৃষ্টির আওতায় হবে এ কেমন অবিচার!
hu | ২১ এপ্রিল ২০২১ ১৯:১২104994মিঠুন ভৌমিক যদিও আলাদা করে লেখেন নি, তবে আমার জানা আছে এই কাহিনীতে বর্ণিত "ক" এবং তাঁর দলের সদস্যরা সকলেই মহিলা। যদিও লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের আব্রুরক্ষার সাংবিধানিক অধিকার আছে, বাথরুমে জলের অভাব মহিলাদের জন্য একটু অতিরিক্ত অসুবিধা নিয়ে আসে।
MB | ২১ এপ্রিল ২০২১ ২০:২৬104998সবাইকে পড়ার ও মতামত দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
হ্যাঁ, আমি আলাদা করে লিখিনি কারণ এই অসুবিধাগুলো সমস্ত লিঙ্গের মানুষের জন্যই প্রাসঙ্গিক বলে আমার মনে হয়। শিবাংশুদার কাছে অভিজ্ঞতা গুলো নিয়ে লেখার অনুরোধ রইলো।
জীবন ও সম্পদের সুরক্ষার প্রশ্নে আমরা তুলনায় অনেক বেশি সাবধানী, নিরাপত্তার প্রশ্নে এই তর্কটা প্রায় হয়ই না যে সেটা দরকার কিনা। তুলনায় প্রাইভেসি, ঠিকঠাক শৌচব্যবস্থা, বিশ্রামের ব্যবস্থা, এইসব নিয়ে আমাদের ট্রিভিয়ালাইজেশন আছে। যেসব ছেলেরা যত্রতত্র বাথরুম করতে পারেনা তাদের নিয়ে তো রীতিমত হাসাহাসি করা হতে দেখেছি। যেমন খুশি জায়গায় ঘুমিয়ে পড়তে না পারলেও। আমি তাই সমস্ত লিঙ্গের কথা মাথায় রেখেই ওভাবে লিখেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমিও স্বচ্ছন্দ নই, কোনদিন ছিলাম না এইরকম অব্যবস্থার মধ্যে কাজ করতে।