এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • বিনয় মজুমদার - চেতনায় প্রকৃত সারসের আবাহন

    অমিত মজুমদার
    আলোচনা | বিবিধ | ১২ ডিসেম্বর ২০০৬ | ১৫৪৮ বার পঠিত
  • বস্তুত কবি বিনয় মজুমদারের মৃত্যু হয়েছে বহু বছর আগে। স্বেচ্ছা নির্বাসনে যাওয়ার পর "ফিরে এসো চাকা''র কবি আর আসেননি ফিরে। কতিপয় পতঙ্গশিকারী ফুলের কথা শিশুকাল থেকে শুনে এলেও বহু অনুসন্ধানেও তাদের দেখা পাননি - সারা গায়ে সেই পতঙ্গ শিকারী ফুলেদের রেখে যাওয়া চিহ্ন নিয়ে এমন বিদ্রূপ যিনি করতে পারেন তিনি এও জানেন যে পায়রা ছাড়া অন্য কোন ওড়ার ক্ষমতাবতী পাখি বর্তমান যুগে আর মানুষের নিকটে আসে না। কারণ মানুষ নিকটে গেলে প্রকৃত সারস উড়ে যায়! বাস্তবিক ভাবেই জীবন তাঁকে আঘাত করেছে বারবার। শিবপুর বি.ই. কলেজের এই ছাত্র সমাজের অনমনীয় মনোভাব, ভগ্ন স্বাস্থ্য আর হয়তো বা নিজের মুদ্রাদোষে ক্রমশ একা, আলাদা হয়ে গেলেন। কথিত আছে এই বি.ই. কলেজেই তিনি তাঁর বহুল পরিচিত কাব্যের নায়িকার সাক্ষাৎ লাভ করেন। কোনদিন ই বনিবনা হল না চাকরির সাথে। ফড়িঙের মত কাঁপতে থাকা আঙুল, ঈষৎ অসংলগ্ন কথা বলা কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে - এসবের মধ্যে লুকিয়ে থাকা এক পরম অস্ত্রসম্ভার - তাঁর কবিতা। এখন সকলে বোঝে মেঘমালা ভিতরে জটিল পুঞ্জীভূত বাষ্পময়, তবুও দৃশ্যত শান্ত, শ্বেত, বৃষ্টির নিমিত্ত ছিল, এখনো রয়েছে, চিরকাল রয়ে যাবে; সংগোপনে লিপ্সাময়ী, কম্পিত প্রেমিকা - তোমার কবিতা, কাব্য; সংশয় সন্দেহে দুলে দুলে তুমি নিজে ঝরে গেছ, হরিতকী ফলের মতন।

    হৃদয়ে ঢুকেছে সরাসরি, এ কবিতা পথপ্রান্তে ভণিতা হারালো। সাজগোজ সরাতে সরাতে অনর্থক ক্লান্তি নেই, অপনোদনের আকাঙ্খাও তাই প্রশ্নাতীত। অনায়াস লিখে দিতে পারি,- "কি উৎফুল্ল আশা নিয়ে সকালে জেগেছি সবিনয়ে / কৌটোর মাংসের মতো সুরক্ষিত তোমার প্রতিভা / উদ্ভাসিত করেছিল ভবিষ্যৎ, দিকচক্রবাল"- অত:পর জেগে থাকে বাক্যবন্ধ, পাঠক ও তোমার কবিতা, লিখনে কি ঘটে! কখন কবিতা যেন আমাদের অজান্তেই ঈশ্বরী হয়ে ওঠে নিজস্ব মুদ্রায়, মালা গাঁথি, ছিঁড়ে ফেলি, এক জীবনের নশ্বরতা বিলিয়ে দিই দুহাত ভরে তাকে আমার ঈশ্বরীকে। শুধু "মাঝে মাঝে অগোচরে বালকের ঘুমের ভিতরে / প্রস্রাব করার মত অস্থানে বেদনা ঝরে যাবে।" এভাবে পেতে থাকি অহেতুক আনন্দ, যেরকম "কোনোদিন একবার উদ্যানে বেড়াতে গেলে পরে / পরিচিতা বাঘিনীর শব পেয়ে অজ্ঞ, চমৎকৃত / একটি মশক বেশ সুনিবিড় প্রেমে পড়েছিল"। ক্রমশ এই শব আয়তনে বাড়তে থাকে, ঢেকে ফেলে চরাচর, ভয় হতে থাকে, অনায়াস নৌ-উন্মীলনে বাধা দিতে প্রয়াসী হয় অভিজ্ঞতা - "অধ্যবসায়ের ফল ব্যথিত ব্যর্থতাময়, কালো।" ধীরে ধীরে জেনে নিতে থাকি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে, কাকে বলে নীল - আকাশের হৃদয়ের; কাকে বলে নির্বিকার পাখি। এইখান থেকে আজ ডাক ভেসে যায় ডানা মেলে বাতাসের আশ্রয়ে আশ্রয়ে - ফিরে এসো, ফিরে এসো, চাকা, রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো - আর কোন সুদূর থেকে ভেসে আসে অনিবর্য প্রশ্ন - "ভালোবাস দিতে পারি, তোমরা কি গ্রহণে সক্ষম?"

    এভাবেই ক্রমশ ঢুকে যেতে থাকি নির্দ্বিধায়, অন্দরমহলে সটান। উপস্থিত হই চোরাবালি ঠেলে, দুহাত পাখনা হয়ে যায়, প্রবল আলোড়ন শেষে উপনীত হই প্রিয় সন্নিকটে। "দুরত্ব নিকটে আসে, আমি তার শরীরের বিচ্ছুরিত আলো / পান করি প্রাণপণে নদিরার মতো ক'রে ক্রমশ নেশায়"। শরীরের মধ্যে ঢুকে যায় নোনাজল, চুপচাপ শুয়ে থাকি সকলের অগোচরে মনোনীত স্থানে। এ সকল শুধুমাত্র সৃষ্টি নয়, পূর্বতন সৃষ্টির প্রকাশ। হাতে হাত রাখি, ভালো করে চেয়ে দেখার আগেই সারা শরীরে অনুভূত হয় এক পরম সত্য, অতি সাধারণভাবে - "বোঝা যায় এ-সকল প্রতিবিম্বে প্রাণ আছে, বিম্বগুলি জীবন্তই হয়,/ তারা সব চিন্তা করে, নিজেদের নিরিবিলি চিন্তাগুলি চুপচাপ করে।" নিতান্ত কাঁচা হাতের লেখা মনে হওয়ার ভ্রম থেকে কয়েকটি অনিবার্য লাইনকে ছাড়পত্র দিয়ে পৌঁছে যেতে থাকি, পৌঁছাতে চাই কোন এক শাশ্বতর দিকে। চেতনায় ঘটে যায় তুমুল বিস্ফোরণ। খন্ড, খন্ড হয়ে উড়ে যেতে যেতে, বিলীন হয়ে যেতে যেতে চেয়ে দেখি - "পৃথিবীর সব জল এইভাবে মিলেমিশে আসলে জগৎজোড়া হয়ে / একটি অখন্ড দেহ - একটি অখন্ড জল হয়ে আছে গোপনে গোপনে।"

    জীবনানন্দের যোগ্য উত্তরসূরী এই বাহাত্তর বছরের জীবন, কবিতা। সব কিছু এ পাহাড়, গাছপালা, আলোছায়া, পরিষ্কার প্রকাশ্যে এসেছে। কোন গোপনতা নেই, গোপন থাকার কোন বাসনার লেশমাত্র নেই। এ সমস্তই ঘটে যায় নীরবে। "পৃথিবীতে, পৃথিবীর অধিবাসীদের মাঝে ঘটে, ঘটে যায় / কয়েকদিনের মধ্যে - কয়েক মুহূর্ত মাত্র রাত্রির শিশির / বকুলের পাপড়ির মধ্যে গোলাকার ফাঁক দিয়ে চলে যায় নীচে,/ চাঁদ চুপে ডুবে যায় - দ্বাদশীর হতে পারে, কোথায় কোটরে / প্যাঁচা ডেকে ওঠে যেন একা একা ডেকে ওঠে আমাদের ঘোরে।' এ সব নিছক কল্পকথা নয়, নেমে আসা এই জমিনেই, বস্তুত আজীবন পারাপার এক। "দুপাশের অভ্যর্থনাকারীদের মাঝ দিয়ে হেঁটে বিদেশী ব্যক্তির মতো কে জানে কোথায় যেতে হবে।' সুনিশ্চিত এই প্রস্থান, নাকি ফিরে আসা বারবার স্বল্পবাক ঢেওয়ের ঢাক্কায় ত্রস্ত হয়ে! " সব চুপচাপ হয়ে সকলি নিস্তেজ হয়- সকলি নিস্তেজ হয়ে পড়ে / তার চেয়ে ঢের পরে চূড়ার লোকের কাছে, চূড়ার বাড়ির অধিবাসী / লোকের নিকটে সন্ধ্যা এসে থাকে প্রতিদিন এরকম দেরি করে আসে।' এভাবে রচিত হতে থাকেন বিনয় মজুমদার, এক জীব পরান্মুখ বেচে থাকা, কবিতা ও কবি উভয়ত। চাবিকাঠিটিও তিনিই ধরিয়ে দিয়ে গেছেন হাতে। " আমার সচেতনতা যেন অতিচেতনার সমপরিমান হয়ে যায় / উভয় চেতনা যেন সমান কুশলী হয় সমান সক্ষম হয়ে যায় / দুই চেতনার মাঝে যোগাযোগ ব্যবস্থাটি যেন খুব স্বচ্ছলতা পায়।' খেলা শেষ হলে পর ধীরে ধীরে সব কিছু মিলিয়ে যেতে থাকে, ফুটে উঠতে থাকে এক অনাবিল আবিষ্কারের আনন্দ, তীব্র রমণের চেয়ে ঢের বেশ সুখকর, কবিতা - তাঁর পরিচয়।

    দেহাবসান হল এই মৃত কবির। নিরর্থক বেঁচে থাকার গ্লানি থেকে মুক্তি পেলেন তিনি, যিনি জীবনের শেষ দীর্ঘকাল কাটিয়ে দিলেন শুধুমাত্র জ্যামিতির চর্চা করে। মানসিক অসুস্থতা, সময় সময় লম্পট পিতার মত নিজ কবিতার স্বত্ত্ব পর্যন্ত অস্বীকার করা, জীবৎকালেই মিথ এইঅ কবির মৃত্যু বোধহয় তাঁকে পুনারায় বাঁচিয়ে তুলল বইমেলার প্রাক্কালে।

    তোমার কবিতা বোঝে শুধু তারা - এইসব নভোচরী ধবল বলাকা।
    এদের রটনা শুনে শালিকের দায় পড়ে মেনে নেয় তুমি এক কবি।
    কে না জানে পৃথিবীকে খুব বেশী দূর থেকে অন্য গ্রহ থেকে দেখলেই
    একটি নক্ষত্র বলে মনে হয়, এই সত্য চিরদিন মনে করে রেখে
    কী যেন করেছ তুমি - এই বলে শালিকেরা আরো দূরে সরে যেতে যেতে!

    অত্যন্ত স্বাভাবিক ভাবেই আশঙ্কা হয়,- রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশ্যে লেখা এই লাইনগুলি পুনর্বার তাঁর নিজের ক্ষেত্রেই সত্য হয়ে না দাঁড়ায়!
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১২ ডিসেম্বর ২০০৬ | ১৫৪৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন