এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • একটি ঐশ্বরিক অবিমৃশ্যকারিতা

    Anindya Rakshit লেখকের গ্রাহক হোন
    ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৮৫ বার পঠিত


  • ... তদনন্তর, ঈশ্বর মনুষ্য সৃষ্টির বাসনা করিলেন এবং মনুষ্যগণ সৃষ্ট হইল। কিছুকাল অতিবাহিত হইবার পর, ঈশ্বর লক্ষ করিলেন মনুষ্যগণ ক্রমে ক্রমে খাদ্যের নিমিত্ত পশু শিকার শিখিল, পুষ্টিকর ফলমূলাদির চয়ন রপ্ত করিল ; বসবাসের নিমিত্ত কন্দরকে ব্যবহার করিতে শিখিল, পশুচর্ম এবং বল্কলের সাহায্যে আপন অঙ্গ আবরিত করিতেও শিখিল, কিন্তু তাহাদিগের সৃষ্টিকর্তা ঈশ্বরের বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান অর্জন করিতে পারিল না।

    ঈশ্বর চিন্তিত হইলেন। ঐ জ্ঞান ব্যতিরেকে তাহাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, মনুষ্যগণ, কোনওপ্রকার মনুষ্যসুলভ গুণাবলী অর্জন করিতে পারিবে না। ফলতঃ, উহারা প্রাণীজগতে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনেও সক্ষম হইবে না। সুতরাং, অবিলম্বে উহাদিগকে উক্ত জ্ঞান দান করা উচিৎI নচেৎ তাঁহার সৃষ্ট ‘ব্রহ্মান্ড’ নামক ‘ওয়ার্ক-অফ্-আর্ট’ টি পূর্ণতা পাইবে না।

    অনন্তর, তিনি ‘ধর্ম’ নামক এক প্রকার বোধের সৃষ্টি করিলেন, এবং মনুষ্যগণকে তাঁহার স্বরূপ উপলব্ধি করাইবার উদ্দেশ্যে তাহাদিগের অন্তরে উহা প্রোথিত করিলেন।

    উক্ত বোধটিকে সক্রিয় করিবার পূর্বমুহুর্তে, ঈশ্বরের অন্তরে এক সংশয় উদিত হইল। তিনি মনস্থ করিয়াছেন, মনুষ্যগণের অভ্যন্তরে স্বয়ং অবস্থান করিয়া আপনার সৃষ্টির রসাস্বাদন করিবেন। সেই ক্ষেত্রে, ধর্মবোধও যদি একই সঙ্গে উহাদিগের অন্তরে থাকে তবে তো উহারা ধর্মবোধকে ব্যবহার করিয়া অতি সহজেই ঈশ্বরের স্বরূপ জানিয়া ফেলিবে এবং সর্বদা তাঁহার ধ্যানে মগ্ন থাকিবে। ইহার ফলে সৃষ্টি পন্ড হইবে। অপরপক্ষে, ধর্মবোধ ব্যতীতও মনুষ্যগণের অন্তরে ঈশ্বরবোধ জন্মাইবে না। তাহাঁর সৃষ্টি অপূর্ণ রহিয়া যাইবে।

    অতএব, বিষয়টিকে অত সরল করিলে চলিবে না। মনুষ্যগণ এই ‘ধর্ম’ নামক বোধটিকে সম্যকরূপে ব্যবহারপূর্বক বহির্জগত হইতে ঈশ্বরবিষয়ক তথ্য় আপন অন্তর্জগতে গ্রহণ করিয়া, আপন আপন অন্তরে ঈশ্বরকে উপলব্ধি ও দর্শন করিতে পারে কি না, এবং তাঁহার সান্নিধ্য় লাভে আগ্রহী হইয়া উঠে কি না তাহা প্রত্যক্ষ করিতে হইবে। এবং তজ্জন্য অন্যরূপ কোনও ব্যবস্থার কথা ভাবিতে হইবে।

    এই পরিকল্পনাটি কীরূপে বাস্তবায়িত করা যায়, তদ্বিষয়ে ঈশ্বর প্রভূত পরিমাণে মস্তিষ্ক-প্রভঞ্জন করিলেন, কিন্তু কোনওরূপ সমাধান তাঁহার ভাবনে উদিত হইল না। অনন্যোপায় হইয়া তখন তিনি শয়তানকে আহ্বান করিলেন কারণ তিনি সম্যকরূপে জ্ঞাত ছিলেন যে অশিব শক্তির মূলাধার হইলেও, এইরূপ জটিল সমস্যার সমাধানে এবং এইরূপ দুরূহ কার্য সম্পাদনে কেবলমাত্র শয়তানই তাঁহার যোগ্য সহায়ক হইতে পারেন।

    শয়তান, সেইকালে, এক গুপ্ত গুহায় বসিয়া বিবিধপ্রকার মারণাস্ত্রের উন্নতিসাধনের গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। সহসা ঈশ্বরেরে আহ্বান শ্রবণ করিয়া, নিজকর্ম স্থগিত রাখিয়া তৎক্ষণাৎ ঈশ্বরসমীপে আবির্ভূত হইলেন এবং করজোড়ে কহিলেন – হে প্রভু ! আজ্ঞা করুন, কীরূপে আপনার সেবায় রত হইয়া এই অধম দাসানুদাস কৃতকৃতার্থ হইতে পারে ?

    ঈশ্বর কহিলেন – ও হে তমোধিপতি শয়তান, তোমার অবগতির উদ্দেশ্যে জ্ঞাপন করি ; আমার বহুকালের বাসনা এই যে, আমি আমার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মনুষ্যগণের অভ্যন্তরে স্বয়ং অবস্থান করিয়া নিজ সৃষ্টির রসাস্বাদন করি। কিন্তু উহাদিগকে ‘ধর্ম’ নামক বোধ দান করিবার পর হইতে এই বিষয়ে কিঞ্চিৎ জটিলতার উদ্ভব হইয়াছে কারণ ধর্মবোধ এবং আমি একই আধারে অবস্থান করিলে উহাদিগের পক্ষে ধর্মবোধের সাহায্যে আমার সান্নিধ্য় লাভ অতীব সরল কার্য হইয়া যাইবে যাহা আমি চাহি না কারণ উহা হইলে সংসার ও সৃষ্টি অচল হইয়া যাইবে। আমি চাহি যে মনুষ্যগণ যেন সহজে উহাদিগের অন্তর্জগতে আমার অবস্থান নির্ণয় করিতে না পারে। কেবলমাত্র বহির্জগতে আমার অস্তিত্ব বিষয়ে উহারা যেন অবগত থাকে। উহারা আমা-প্রদত্ত ‘ধর্ম’ নামক বোধটিকে সম্যকরূপে ব্যবহার করিতে পারিলে তবেই নিজ নিজ অন্তরে আমাকে উপলব্ধি ও দর্শন করিতে পারিবে, এইরূপ ব্যবস্থাই আমি বাঞ্ছা করি। কিন্তু এই প্রকল্পটি কীদৃশ পন্থায় নিষ্পন্ন করিব তাহা স্থির করিতে পারিতেছি না। প্রকৃতপ্রস্তাবে, এইরূপ দুরূহ সমস্যাসকলের সমাধান নিরূপণে তোমা অপেক্ষা যোগ্য় আর কেই বা থাকিতে পারে … তজ্জন্য আমি তোমার সহায়তা বাসনা করিয়াছি।

    শয়তান ঈশ্বরের নিকট হইতে এইরূপ একটি আশাতীত প্রস্তাব শ্রবণ করিয়া অতীব উল্লসিত হইয়া উঠিলেন কারণ তিনি উপলব্ধি করিলেন, ঈশ্বরের কৃপায় তাঁহার এতদিনের শ্রমসাধ্য গবেষণার প্রকৃত ফল এক্ষণে লাভ করিবার সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে। আকর্ণবিস্তারি হাস্য় প্রদর্শন করিয়া তিনি করজোড়ে কহিলেন – ইহা আর এইরূপ কী কঠিন কর্ম, প্রভু … আপনার আদেশ ও আশীর্বাদ পাইলে আমি এক্ষণেই আপনার বাসনা চরিতার্থ করিবার উপযোগী ব্যবস্থার আয়োজন আরম্ভ করিয়া দিতে পারি।

    ঈশ্বর জিজ্ঞাসিলেন – কিন্তু কীরূপে তুমি এইরূপ জটিল ও দুরূহ কর্ম সম্পন্ন করিবে তাহা আমার নিকট ব্যাখ্যা করিতে পার ?

    শয়তান যথারীতি দন্তবিকাশ সহযোগে করজোড়ে কহিলেন – আপনার আদিষ্ট এই কর্ম সম্পাদনার্থে কিঞ্চিন্মাত্র কৃৎকৌশল প্রয়োগ করিতে হইবে, প্রভু। আমি শুধুমাত্র, মনুষ্যগণের অন্তরে, ধর্মবোধের চতুষ্পার্শ বেষ্টন করিয়া একটি প্রাচীর নির্মাণ করিয়া দিব। তদনন্তর, আপনি উহাদিগের অভ্যন্তরে যদৃচ্ছাপূর্বক অবস্থান করিতে পারিবেন।

    ঈশ্বর কহিলেন – কিন্তু প্রাচীর থাকিলে উহারা তো কখনই উহাদিগের অন্তরে আমার অস্তিত্ব বিষয়ে অবগত হইতে পারিবে না। আপন অন্তরে আমাকে দর্শনই বা করিবে কীরূপে ?

    শয়তান সস্মিত আননে উত্তর করিলেন – দয়া করিয়া দুশ্চিন্তা হইতে বিরত হউন, প্রভু। উক্ত প্রাচীরটি স্বচ্ছ হইবে। ফলতঃ, মনুষ্যগণ ধর্মবোধের মাধ্যমে নিজ নিজ অন্তরে আপনার অস্তিত্ব অনুভব করিতে পারিবে। সাধনবলে নিজ নিজ অন্তরে আপনাকে দর্শনও করিতে পারিবে। পরন্তু , ঐ প্রাচীর বিদীর্ণ করিতে না পারিলে আপনার সান্নিধ্য় লাভে সক্ষম হইবে না। এবং ঐ কর্মটি সম্পাদন করা উহাদিগের অসাধ্য় হইবে। ফলে, সংসার ও সৃষ্টি অচল হইয়া যাইবার কোনওরূপ সম্ভাবনাই থাকিবে না।

    ঈশ্বর, শয়তান-প্রদত্ত এই পরিকল্পনা শ্রবণ করিয়া সাতিশয় প্রসন্ন হইলেন, এবং উৎফুল্ল হইয়া কহিলেন – সাধু , সাধু ! হে তমোধীশ, আমি বারংবার প্রতক্ষ্য় করিয়াছি , জটিলতম সমস্যাগুলির সরলতম সমাধান একমাত্র তোমা দ্বারাই সম্ভবে ! তথাস্তু … তুমি যেইরূপ বর্ণনা করিলে সেইরূপ ব্যবস্থাই তবে হউক। ইহাই যথোপযুক্ত ব্যবস্থা বলিয়া আমারও ধারণা। তুমি যথাসত্বর সম্ভব, এই কার্যটি সম্পন্ন করিবার আয়োজন কর।

    শয়তান মস্তক অবনত করিয়া করজোড়ে ঈশ্বরকে প্রণাম জানাইয়া কহিলেন – যথা আজ্ঞা, প্রভু। এবং তৎসঙ্গে, নীরবে, একটি অর্থপূর্ণ হাস্য় হাসিলেন যাহা ইশ্বরের গোচরে আসিল না।



    উক্ত স্বচ্ছ প্রাচীরটির নির্মাণকালে শয়তান কথঞ্চিৎ কৌশল প্রয়োগ করিলেন যাহার সম্পর্কে তিনি ঈশ্বরকে ঘুণাক্ষরেও অবগত হইতে দেন নাই। তিনি ঐ প্রাচীরগুলিকে এইরূপে নির্মাণ করিলেন যে একবার স্থাপিত হইবার পর সেইগুলি মনুষ্যভেদে, আপনা হইতেই পৃথক পৃথক বর্ণে পরিবর্তিত হইয়া যাইবে। এইরূপ কৌশলে তিনি কর্মটি করিলেন যে প্রারম্ভে প্রাচীরগুলিকে পানীয় জলের ন্যায় স্বচ্ছ দেখাইবে, পরন্তু, কাল যতই অতিবাহিত হইতে থাকিবে, প্রাচীরগুলির বর্ণের ঘনত্ব ততই অধিক রূপে প্রকাশমান হইয়া উঠিবে। এইরূপে, বর্ণের ঘনত্বের ক্রমবর্ধমানতা হেতু , আপাতস্বচ্ছ প্রাচীরগুলি স্বচ্ছ হইতে ক্রমশঃ ষদচ্ছ , এবং পরিশেষে অস্বচ্ছ অবস্থা প্রাপ্ত হইবে।

    শুধুমাত্র এই কার্যটি করিয়াই শয়তান নিরস্ত হইলেন না। তৎসঙ্গে তিনি, ঈশ্বরসৃষ্ট ‘ধর্ম’ নামক বোধের সহিত, ‘একমাত্র নিজধর্মই শ্রেষ্ঠ’, এইরূপ একখানি অপবোধ, অতি সংগোপনে, এ হেন নিপুণতার সহিত যুক্ত করিয়া দিলেন যে উহা ধর্ম নামক বোধের সহিত সম্পূর্ণ একাত্মরূপে মিশ্রিত হইয়া গেল। উহাকে পৃথকরূপে চিহ্নিত করিবার আর কোনও অবকাশ রহিল না। ইহার পর, শয়তান সেই আপাতস্বচ্ছ প্রাচীরগুলিকে, মনুষ্যগণের অন্তরে, ‘ধর্ম’ নামক বোধের চতুর্দিক এবং উপরিতলকে বেষ্টন করিয়া দৃঢ়রূপে প্রোথিত করিলেন। কুত্রাপি কোনওরূপ ছিদ্র রহিল না।

    তদনন্তর, ঈশ্বরসমীপে উপস্থিত হইয়া তমোধীশ করজোড়ে কহিলেন – হে প্রভু , আপনার আদেশ অনুযায়ী এই দাসানুদাস মনুষ্যগণের অভ্যন্তরে আপনার বাসোপযোগী ব্যবস্থা সম্পন্ন করিয়াছে। এক্ষণে আপনি উহাদিগের অভ্যন্তরে নির্বিঘ্নে অবস্থান করিয়া, স্বসৃষ্ট ‘ওয়ার্ক-অফ্-আর্ট’-এর আনন্দ উপভোগ করিতে পারিবেন।

    ঈশ্বর তমোধীপকৃত ব্যবস্থাদি পরিদর্শন করিয়া যার পর নাই সন্তুষ্ট হইয়া শয়তানকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও সকল কর্মে সফলতা লাভের আশীর্বচন উচ্চারণ করিলেন, এবং মনুষ্যগণকে প্রদত্ত ‘ধর্ম’ নামক বোধটি কে সক্রিয় করিয়া, আপনার আদিঅন্তহীন অস্তিত্বের কিয়দংশ করিয়া মনুষ্যসকলের অভ্যন্তরে স্থাপনা করিলেন।



    অতঃপর, মানবজাতি ঈশ্বরদত্ত ধর্মবোধের মাধ্যমে বহির্জগত হইতে আপন আপন অন্তর্জগতে ঈশ্বর সম্বন্ধীয় তথ্যাদি লাভ করিয়া ব্রহ্মাণ্ডস্রষ্টা, অসীম শক্তিমান ঈশ্বরের অস্তিত্ব বিষয়ে জ্ঞাত হইল; তৎসহিত, ‘ধর্ম’ নামক বোধের বিষয়েও। এবং এই স্থলেই এক প্রবল সমস্যার উদ্ভব হইল। বলা বাহুল্য, শয়তানের প্রাচীর নির্মাণের কৌশলের নিমিত্তেই এই সমস্যা সৃষ্ট হইল। সমস্যাটির সম্পর্কে যদ্যপি ব্যক্তিমাত্রেই ধারণা করিতে পারেন তথাপি এই স্থলে উহার উল্লেখ অতিকথন হয় না I

    সমস্যাটি হইল, মানবজাতি নিজ নিজ ধর্মবোধের দ্বারা বহির্জগত হইতে আপন আপন অন্তর্জগতে ঈশ্বর সম্বন্ধীয় যেসকল তথ্য় ও বোধ অর্জন করিতে লাগিল সেই সকলই উক্ত প্রাচীরগুলির বর্ণে রঞ্জিত হইয়া উহাদিগের অন্তরে প্রবেশ করিতে লাগিল। ফলতঃ, মনুষ্যগণ ঈশ্বর সম্পর্কিত ধারণাটিকে পৃথক পৃথক রূপে উপলব্ধি করিল। যাহারা সাধনবলে আপন অন্তর্জগতে স্থিত ঈশ্বরকে প্রতক্ষ্য় করিতে সক্ষম হইল তাহারাও আপন আপন ধর্মবোধের চতুষ্পার্শে বেষ্টিত, শয়তান-নির্মিত সেই প্রাচীরের বর্ণের প্রভাবে কেহ ঈশ্বরকে শ্বেতবর্ণ, কেহ বা পীতবর্ণ, কেহ নীলবর্ণ, আবার কেহ ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, ইত্যাদি বিভিন্ন রূপে দর্শন করিল। কেহ বা প্রাচীরের কৌশলগত কারণে ঈশ্বরেরে অস্তিত্ব আপন অন্তরে অনুভব করিল, কিন্তু কিছুই দর্শন করিল না। কেহ কেহ আবার ঈশ্বর, ধর্ম, ইত্যাদি কিছুই অনুভব করিতে পারিল না। ফলকথা, কেহই ঈশ্বরের প্রকৃত রূপ দর্শনে সক্ষম হইল না। এইরূপে, ধর্ম, ঈশ্বর, ইত্যাদি বোধগুলি মনুষ্যসকলের অন্তরে বিবিধ পৃথক পৃথক বর্ণে রঞ্জিত হইয়া প্রকাশমান হইল, এবং মানবজাতির মধ্যে বিবিধ ধর্মবোধের উৎপত্তি হইল।

    নামকরণে পটু মানবজাতি অতঃপর, স্বয়ং ঈশ্বরের এবং ঈশ্বরদত্ত ধর্মের বিবিধ নামকরণ করিয়া ফেলিল, এবং শয়তান-প্রদত্ত প্রাগুক্ত অপবোধের প্রভাবে সকলেই আপন আপন ধর্মকে শ্রেষ্ঠ এবং অন্যের ধর্মকে নিকৃষ্ট জ্ঞান করিতে লাগিল। ফলতঃ, কাহার ধর্ম এবং কাহার ঈশ্বর শ্রেষ্ঠ, ইহা লইয়া মনুষ্যগণমধ্যে এক বিষম বিবাদের সূচনা হইল।



    কাল যতই অতিবাহিত হইতে লাগিল, উক্ত, তথাকথিত স্বচ্ছ প্রাচীরগুলির গাত্রবর্ণও ততই গাঢ়তর হইতে লাগিল। প্রাচীরগুলি ক্রমশঃ স্বচ্ছ হইতে ষদচ্ছ , এবং পরিশেষে অনচ্ছ অবস্থা প্রাপ্ত হইল। ধর্ম ও ঈশ্বর সম্পর্কে মনুষ্যগণের দৃষ্টিভঙ্গিও তদনুযায়ী পরিবর্তিত হইতে লাগিল। ইতোমধ্যে, ক্রমে, ‘ধর্ম’ নামক বোধকে অতিক্রম করিয়া শয়তান-প্রদত্ত প্রাগুক্ত অপবোধটিই মনুষ্যগণের অন্তরে দৃঢ়রূপে প্রোথিত হইয়া গেল। ফলে, ধর্ম অপেক্ষা ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব বিষয়ে মনুষ্যসকল অধিক আগ্রহী হইয়া উঠিল এবং স্ব স্ব ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের নিমিত্ত নানাবিধ আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানাদির উদ্ভব করিল। ইহা ব্যতীত, ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানবগণকে ‘বিধর্মী’ জ্ঞান করিয়া পরস্পরকে হত্যা করিতেও উহারা কিঞ্চিন্মাত্র কুন্ঠা বোধ করিল না।

    ক্রমে ক্রমে, মানবজাতি, ‘ধর্ম’-কে যথাক্রমে মূলধন ও অস্ত্র রূপে ব্যবহার করিয়া, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠা করিল এবং ক্ষমতা দখলে লিপ্ত হইল।

    তাহার পর, একদিন, মানবজাতির বিচারে, ‘ধর্ম’-ই ‘ঈশ্বর’-এ পরিণত হইল।

    ঈশ্বর ও তাঁহার স্বরূপ উপলব্ধি বিষয়ে কাহারও বড় একটা আগ্রহ রহিল না।

    স্বয়ং ঈশ্বর, মনুষ্যগণের অভ্যন্তরে, পাংশু আননে, ভারাক্রান্ত চিত্তে, এক অনাহূত অভাজনের ন্যায় আপন সৃষ্টির রসাস্বাদন করিতে লাগিলেন, ধর্মবোধকে বেষ্টন করিয়া থাকা, শয়তান-নির্মিত প্রাচীরের অপর পার্শ্বে অবস্থান করিয়া।

    মনুষ্যগণমধ্যে বিশেষ কেহই আর আপন অন্তরে ঈশ্বরের অবস্থান বিষয়ে অবগত হইবার অথবা তাহাঁর সান্ন্যিধ্যলাভে উৎসাহী হইবার প্রয়োজন বোধ করিল না।

    এক্ষণে, অনন্তশক্তিময়ের হৃদয়ঙ্গম হইল যে এই বিষয়ে তিনি ভয়ানক অবিমৃশ্যকারীর ন্যায় সিদ্ধান্ত লইয়া ফেলিয়াছিলেন। কিন্তু ইহার জন্য় শয়তানকে তিনি দোষারোপ করিতে পারিবেন না কারণ এই কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রে, অশিব শক্তির উৎস, তমোধিপতির উপরে পূর্ণ আস্থা জ্ঞাপন করা তাঁহার কদাপি উচিৎ হয় নাই। একটি দীর্ঘশ্বাসের সহিত, কেবলমাত্র এই বলিয়া তিনি আপনাকে প্রবোধ দিলেন, “যাহাই হউক ; ‘আর্ট’ তো হইল…”



    যেহেতু ঈশ্বরের নিজ ইচ্ছা ও আদেশ অনুসারে শয়তান এই ব্যবস্থাটিকে চিরস্থায়ী রূপে নির্মাণ করিয়াছিলেন সেইহেতু উহার কোনওরূপ পরিবর্তনসাধন আর সম্ভব হইল না।



    অনন্তর, শয়তান সেই গোপন গুহায় প্রত্যাবর্তন করিয়া পুনরায় মারণাস্ত্রের উন্নতিসাধনের গবেষণায় মনোনিবেশ করিলেন কারণ তিনি যথার্থ অবগত ছিলেন যে অচিরেই মনুষ্যগণমধ্যে ঐ বস্তুসকলের ডিম্যান্ড প্রবল হইবে।

    (এলিয়েনদের একটি উপকথা অবলম্বনে)
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • albert banerjee | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১১:৩৪738552
  • এটা সস্তা নাস্তিকতা নয়। এটা অদ্বৈত ব্যঙ্গ 
  • Anindya Rakshit | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:৩০738555
  • albert banerjee
    আমার ভালোবাসা নেবেন। 
  • albert banerjee | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:০৪738556
  • নিলাম কিন্তু আপনার কলামের আঁচড় গুলো আগে নিলাম।  ওই আঁচড় গুলোকে জোরালো শ্রদ্ধা। 
  • Anindya Rakshit | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৩738558
  • albert banerjee 
    এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। ধন্যবাদ। 
  • albert banerjee | ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৪:২১738560
  • আপনি নিজেরমনের সত্যি তা লিখেছেন তাই আচঁড়ের দাগনক দিনথেকে যাবে 
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। লাজুক না হয়ে প্রতিক্রিয়া দিন