এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • শিখার কথকতা

    তরুণ বসু লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১১ মার্চ ২০১২ | ৮৯৮ বার পঠিত
  • শিখার কথকতা
    তরুণ বসু


    পূর্ণিমা চ্যাটার্জি। নামটা নিগের দেয়া। পদবিটা পৈতৃক। আগের নাম শিখা। এখনও অতীব সুন্দরী পূর্ণিমার কাছে চক্ষুলজ্জার মাথা খেয়ে জানতে চেয়েছিলাম, "কত বয়েস আপনার?" দুটো সুত্র দিয়েছিলেন। যে বার হিন্দুস্থান-পাকিস্থান যুদ্ধ বেধেছিল তখন আমরা মামার বাড়ী নবদ্বীপ থেকে চলে এসেছিলাম এই কলকাতায়। শোভাবাজারের কাছে। এসেই শুরু হল দু:সময়। বাবার চাকরি চলে গেল। মা লোকের বাড়ি বাড়ি কাজ করতে নেমেছেন। ব্রাহ্মণ হবার সুবাদে রান্নার কাজটা জুটতে অসুবিধে হতো না। দশ-এগারো বছর বয়স তখন আমার। আর আমি যখন এই পেশায় আসি তখন নকশাল আন্দোলন শুরু হয়েছে। আমার বয়স তখন পনেরো ষোলো। গৃহস্থ ঘরের মেয়ে হয়েও অর্থাভাবে লেখাপড়া শিখতে পারিনি। আমার এক জ্যাঠামশাই ছিলেন আমেরিকাবাসী। তিনি মাঝে মাঝে সাহায্য পাঠাতেন। তাতেও সংসার চলতনা। আরো তিনটে ভইবোন ততদিনে হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে মা-র টি বি হল। ধরা পড়ার পর কাজগুলো সব রাতারাতি চলে গেল। বাবার কাজ নেই। মা অসুস্থ। ছোটো ছোটো ভাইবোন। কোনো পথ সামনে নেই, যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু অন্ধকার।

    সমাজের সুস্থতা বলে যা এতকাল বিবেচিত হয়ে এসেছে তাকে বিসর্জন দিলেই সমাজ-সংসার হাঁ হাঁ করে তেড়ে আসবে আর অসুবিধেয় পড়ে দয়াভিক্ষা চাইলে পেছন ঘুরে বসবে। এই নিয়মের তো ব্যত্যয় নেই। এটাই দস্তুর। পঞ্চাশোর্ধ্ব পূর্ণিমা চ্যাটার্জি নিজের জীবন থেকে নেওয়া শিক্ষায় এরকমই বুঝেছেন, আর অকপটে যা বলেছিলেন তার অর্থও এরকমই।

    সেদিন অনেক কথা পূর্ণিমা বলেছিলেন। তাঁর ফেলে আসা জীবন, তাঁর বাবা মা ভাই বোনেদের মানসিকতা, সমাজের ভ্রুকূটি, পেশাগত নানান দু:খ কষ্ট অমনকী তার সংসারের সাধ। বললেন, আমার যে বাবু ছিল সে অনেক দিন ধরে আমায় বোঝাচ্ছিল "এ পেশা আর দরকার নেই। চল ঘর বাঁধব,' শুনতে শুনতে একদিন রাজিও হয়ে গেলাম । স্ত্রীর পরিচয়ে আমায় নিয়ে গেল বিহারের ভাগলপুরে, তার বাড়িতে। সেখানে কদিন বাদেই জানাজানি হল আমার পূর্ব-পরিচয়। তাতেও কিছু না। কিন্তু কি কারণে জানিনা, এর পর থেকে শুরু হল অত্যাচার। সে বড় ভয়ংকর অত্যাচার। পালাবার পথ পাইনা তখন। তারপ্র প্রায় বছরখানেক অত্যাচার সহ্য করে বিহার থেকে পালিয়ে এলাম। পালালাম ওরই এক বোনের সঙ্গে ষড় করে । ভাগলপুর থেকে আবার কলকাতা। তখন ট্রেন ভাড়া ছিল ষোলো টাকা চার আনা। বললেন পূর্ণিমা, আবার কলকাতায় এসে বাবা মাকে খুঁজে বার করলাম। আবার শুরু করলাম পেশা। আর, সমাজের কথা কি বলব, আমার বাবাই তো আমার নামে পুলিশে মিথ্যে অভিযোগ করে দিতেন। একবার এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। এর পর যা বললেন তা সত্যিই চমকপ্রদ।

    অভিযোগ পেয়ে সে বার থানা থেকে আমার কাছে নাম জিজ্ঞাসা করায় বল্লাম পূর্ণিমা। থানার বড়বাবু আমায় বললেন "তাহলে শিখা কে'? আমি বললাম জানিনা। সেই বড়বাবু সব খুঁ জে একটা ডাক্তারের প্রেসকিপশন দেখে বললেন "এই তো শিখা!' কী মনে হতে আমি তখন বললাম, 'শিখা ছিলাম এখন পূর্ণিমা।' মজা হল এই যে, সেই বড়বাবুই শেষে একদিন আমার বাবু হয়ে গেল।

    অনেক কিছু দেখেছেন শিখেছেন শিখা। জীবনের জটিলতা পঙ্কিলতা--সবকিছু দেখেও জীবন তার কাছে জীবনই!

    জানতে চেয়েছিলাম পূর্ণিমার কাছে, "কখনও কি খেদ হয় আপনার এই জীবনের জন্য'? খুবই তৎপর উত্তর দিয়েছিলেন, "না। কেন ক্ষোভ হবে? খুব বেশি হলে একটা বিয়ে হত। কিন্তু কী হত আমার বাবা মায়ের? কে বিয়ে দিত আমার বোনের? আমি যা করেছি তা সংসারের জন্যে। কোনো ছেলে তার বাবা মা ভাইবোনের জন্যে এতটা করে নাকি? আপনার কি মনে হয়??'

    আমি অবাক হলেও বুঝতে পারি, এই স্পষ্ট স্বীকারোক্তি অনেক অস্পষ্ট ধারণার ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। কেননা আমরা ভাবতে অভ্যস্ত, যৌনকর্মীরা তদের জীবন জীবিকা নিয়ে সারা জীবন আক্ষেপ করে। মনে রাখতে হবে, একথা আমরা ভাবতে অভ্যস্ত, দেখতে বা শুনতে অভ্যস্ত নই। যে সমাজ এঁদেরকে নারী হিসেবেই মর্য্যাদা দিতে চায় না সেই সমাজের লোকের উপকারে ওঁদের যেমন একটা তৃপ্তি হয় তেমনি আঘাত করতেও।

    বলছিলেন, পূর্ণিমা, "আমরা যখন পেশায় এসেছি তখন তো দুর্বার ছিল না। থাকলে আর একটু ভাল হত। কারণ পেশার স্বীকৃতি না হলেও অন্তত আন্দোলন তো হচ্ছে।'

    পূর্ণিমা বা শিখা যে নামেই ডাকা হোক, ওদের জীবন এরকমই। নীলকন্ঠের মত সমাজের অনেক ক্লেদ ধারণ করে ওরা সমাজের অবহেলা, অত্যাচার এত দিন মেনে নিয়েছে। ওরা বুঝেছে, সমাজ যাকে আবিলতা বলতে শিখিয়েছে, তা আসলে নিরস্ত্র জীবনের 'পরে ক্ষমতাবানের দম্ভ। তাই, ওদের সামাজিক মানসিক অর্থনৈতিক সব অত্যাচার মেনে নেয়ার দিন শেষ হোক, সেটাও ওরা সর্বান্তকরণেই চায়। তবে তার বিনিময়ে, যে পেশা ওদের পায়ের তলার মাটিটুকু ফিরিয়ে দিয়েছে তাকে ওরা আর খারাপ বলতে রাজি নয় কোনো ভাবেই। আসলে পূর্ণিমা শিখারা বাঁচতে চায়, বাঁচাতে চায়।

    সুখী জ্যোৎস্নায় যখন প্রান্তর ভেসে যায় তখন পূর্ণিমাদের প্রাণেও ঢল নামে। সেই অনুভুতির বাহ্য প্রকাশটুকুর ভেতরে কোনো মলিনতা নেই। অন্তরের এই অমলিন আনন্দ অনুভুতিই ঋজু মানসিকতার চারণ ক্ষেত্রে পৌঁছাবার একমাত্র পাথেয়, হ্রস্বতম পথ। আমরা ভুলে যাই, ওরাও আমাদের মতন সমস্ত উন্নতি প্রগতি উন্নয়নের অংশীদার। তঙ্কÄ-তথ্য এ কথাই বলে। কারণ সহজভাবে দেখলে, আর পাঁচটা ভাইবোনের বেঁচে থাকার রসদ জুগিয়ে যে মসৃণ পথ ওরা তৈরি করে দেয়, তাকে কোন সাহসে আমরা নৈতিকতার দোহাই দিয়ে অসামাজিক আখ্যা দেওয়া জঞ্জালের স্তুপে নিক্ষেপ করি? কিম্বা কুৎসিত বলে ভাবি? সেই অধিকারই বা আমাদের কে দিল? মনকে চোখ ঠেরে ফাঁকিটুকু তো আমরা নিজেরাই নিজেদের দিই।


    "দুর্বার'এর "ভিন্ন নারী, অন্য স্বর' থেকে অনুমতিক্রমে সংগৃহীত
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১১ মার্চ ২০১২ | ৮৯৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    কবিতা  - Suvankar Gain
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত মতামত দিন