
এই মুখোশ তৈরির উপাদান গুলি স্থানীয় ভাবেই সংগ্রহ করেন শিল্পীরা - যেমন পুরোনো সুতির কাপড়, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো, কলাপাতার মিহি ছাই, কাগজ, ময়দার আঠা, হলুদ আর খড়িমাটির রং, বার্নিশ ইত্যাদি। তবে খবরের কাগজ ব্যবহার করা হয় না। এই মুখোশ নির্মাণের পদ্ধতিটি বেশ চমকপ্রদ এবং কাজের অনেকগুলি ধাপ আছে। ... ...

বাংলার পশ্চিম পারে পুরুলিয়ার বাগমুন্ডিতে ছোট্ট গ্রাম চড়িদা। ছোট হলেও গ্রামটি জগদ্বিখ্যাত, কারণ এটি হল ছৌ শিল্পীদের গ্রাম। এখানে ছৌনাচের মুখোশ তৈরি হয়। আমি প্রথম চড়িদায় আসি খুব সম্ভবত ২০০৩ সালে। তখন পুরো গ্রামটাই ছিল অতি নির্জন - পাহাড়ি পথে কিছু কাঁচা আর আধ পাকা বাড়ি। সেবারে আমি বড় এক কার্টন মুখোশ কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম, সকলকে উপহার দেব বলে। ... ...

মাঠাবুরুকে টা টা করে আমরা চললাম ঝালদা। সেখানে আছেন জয়দেব মাহাতো। এই অদ্ভুত মানুষটি একজন সাধারণ লাক্ষাচাষী হিসেবে জীবন শুরু করে নিজের উদ্যম, কঠোর পরিশ্রম এবং অনুসন্ধিৎসা নিয়ে আজ এক বিরাট প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। অসংখ্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভরা তাঁর ঝুলি। অরণ্যচারী মানুষের সংগঠন তাঁর করায়ত্ত। বর্তমানে তিনি লাল মাটির জেলাগুলিতে প্রায় তিন হাজার লাক্ষাচাষীর মাস্টার ট্রেনার, ৩৫টি এমন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সহায়ক, যারা লাক্ষা দিয়ে অলঙ্কার, কলমদানি, মোমদানির মতো নানা হস্তশিল্প তৈরি এবং বিক্রি করে। ... ...

আবার মাঠাবুরুতে ফিরে এলাম। সকালে পাহাড়ে ওঠার ঐ কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুপুরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু বিকেলে অপেক্ষা করছিল অন্য চমক - যার পোষাকী নাম - সেলফ কুকিং। মোদ্দা কথাটা হল, যেখানে কোন পরিকাঠামোই নেই, সেখানে পাথর-কাঠ-কুটো সাজিয়ে উনুন বানিয়ে পাতার জ্বালন দিয়ে ম্যাগি রান্না করতে হবে, নইলে উঁহু বিকেলের খাবার পাবেনা, কারণ আলাদা কিছু তৈরিই হয়নি। ... ...

সেদিনের গোবিন্দবসান গ্রাম যেমন প্রাকৃতিক এবং কিছুটা প্রশাসনিক মিসম্যানেজমেন্টের জন্য হয়ে উঠেছিল ইকোলজিকাল ভিক্টিম, সেই একইভাবে, একই কারণে আজ দীঘা সংলগ্ন সমগ্র উপকূলটিই মরতে বসেছে। দীঘার সমুদ্র পঁচিশ বছর আগেও যথেষ্ট শান্ত ছিল, খুব ছোট ছোট ঢেউ আর বিস্তৃত মহাসাগরীয় সোপানের জন্য। গোবিন্দবসানের ঐ ঢেউ ছিল ব্যতিক্রম। কিন্তু এখন রোজ অন্তত একটা মানুষের প্রাণ যায় ঐ সাগরে। ... ...

মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। ... ...

এক ঘুমে রাত কাবার। ভোর রাতে ওঠা। ছোট মাতাজী ভার নিয়েছেন সকলকে ঘুম থেকে ডেকে দেবেন। পড়ি কি মরি কি করে রেডি হয়ে বাইরে এসে দেখি - সেই আবছা কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরুর জঙ্গলের মাঝে ফাঁকা জায়গায় সারি বেঁধে প্রার্থনা শুরু করেছে মেয়েরা। আহা সেই ব্রহ্ম মুহূর্তে ওই সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ আর প্রার্থনা সঙ্গীত এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছিল। সে যে না দেখেছে, না শুনেছে তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। ... ...

ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ... ...


ঝাড়বাগদায় ফিল্ড করার সময় আমরা ছিলাম মুকুটমণিপুর বাঁধ-এর কাছে। এই জায়গাটায় যতবার আসি, ততবারই নতুন করে ভালো লাগে, মন্দও লাগে। কংসাবতী নদীর ওপর তৈরি বিশাল জলাধারের নীলচে বিস্তার, দূরে মুকুটের মতো জেগে থাকা পরেশনাথ পাহাড়—সব মিলিয়ে যেন শান্ত সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ানোর অনুভূতি হয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাস্তবতা। গত শতকের পাঁচের দশকে জলাধার তৈরির সময় বিশাল বনভূমি, গ্রাম ও মানুষের বসতি জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল। ... ...

বন দেবতা আর দেবীর থান দেখা হল, এবারে গাইড বাবুর নেতৃত্বে পাহাড়ে চড়ার পালা। আমরা সরু লাইন করে একে একে সেই বন্ধুর জঙ্গলের পথে পা বাড়ালাম। শাল, সেগুন, মহুয়া গাছগুলো আমার আন্দাজে তিন সাড়ে তিন ফুট দূরত্বে রয়েছে। মানে চারা যখন লাগানো হয়েছিল তখন ছয় সাড়ে ছয় ফুট দূরে দূরে হয়তো পোঁতা হয়েছিল। এখন গাছ বড় হয়ে গুঁড়ির বেড়গুলো বেড়ে গেছে, তাই কাছে মনে হচ্ছে। আর লম্বা গাছের মাঝে নিজে থেকেই ঝোপ ঝাড় লতানে গাছ গজিয়ে উঠে বনটাকে বেশ গহন করে তুলেছে। আর একটা জিনিস নতুন দেখলাম... ... ...

আমরা সকলে মিলে টোটোতে চড়ে রওনা দিয়েছি বনভৈরবীর থানের উদ্দেশে। গাইড ভদ্রলোকও সঙ্গে আছেন। পাশাপাশি বাইক নিয়ে চলেছে সেই নতুন পাওয়া বন্ধুরা। পাহাড়ের কোল ঘেঁসে পথ। জঙ্গলের একটা অদ্ভুত তীক্ষ্ণ কিন্তু অনুচ্চ গন্ধ আছে। বনপথে সেই সুবাস বাতাসে ভাসে। মাটির গন্ধ, বুনো লতার গন্ধ, গাছের বাকল, পাতা, ফুল, ফল সব মিলিয়ে কেমন একটা যে গন্ধ, কোন সুগন্ধীর বোতলে তা ধরা যায়না। ... ...

সেবার মানবাজারে থাকতে পারলে খুবই ভালো হত, কিন্তু আমাদের পুরো টীমকে রাখার মত অতগুলো ঘরওলা হোটেল পাওয়া গেলনা। তাই বাধ্য হয়ে মুকুটমণিপুরে থেকে যাতায়াত করতে হচ্ছিল। অসুবিধে খুব একটা হয়নি। হোটেল খুব সাজানো গোছানো, বেশ সুন্দর। পঞ্চাশ কিলোমিটারের মত দূরত্ব। আমাদের সঙ্গে বাস ছিল, রোজ সওয়া ঘন্টা যেতে, আর ঐরকমই ফিরতে। ফাঁকা পথের দুপাশে পাহাড় আর জঙ্গল। ... ...

বন পাহাড়,পশু পাখির সঙ্গে তাদের আত্মিক যোগাযোগ নেই, ভালোবাসা নেই। তাই পর্যটকদের জন্য কোন ব্যবস্থাপনা দূরস্থান, পথ ঘাট থেকে শুরু করে হাসপাতালের শৌচাগার পর্যন্ত ভয়াবহ অপরিচ্ছন্ন। আমাদের মাঝারি দামী হোটেলের ফিল্টারের জলটুকু অবধি দূষিত ছিল। অবশ্য ভারতবর্ষে এ জিনিস তেমন অস্বাভাবিক নয়। ... ...

মিদুবান্দাকে পিছনে রেখে সেই বেহাল পথে নেচে নেচে বাস চললো পরের গন্তব্যে। কিছুটা পরে পাকা রাস্তা। চার পাঁচ কিলোমিটার যাওয়ার পরে, আবার বাঁদিকে লাল ধুলোয় ঢাকা পথ, তবে আগের বারের থেকে ঢাল কম, অনেকটা সোজা। একটু পরেই পাহাড়ের কোল ঘেঁষে হাঁটা শুরু হল। এখানে পাহাড়ের গা রুক্ষ, গাছপালা কম, আর বিশাল বিশাল বোল্ডার। আচ্ছা সামনে নদী আছে তাহলে। বোলপুরের কাছে মামা ভাগ্নে পাহাড়ের মতো বড় বড় পাথর রয়েছে ছড়িয়ে। ওমা সৌরভ কই? ... ...

মুস্কিল আসান অগ্নিশা তো আছেই। আমাদের আরতিও সুসম্পন্ন হল। উমম্ জলখাবারে আজ চাউমিন হয়েছে। ছেলেমেয়েদের পছন্দ, আর দুজনেরও খুব - কাদের আবার সৌরভ আর অগ্নিশা। খেতে খেতে গল্প হল। সারাদিনের ক্লান্তি আর নেই। ... ...

তারপর আর কী? কীভাবে সেদিন রক্ষা পেলাম, ট্রেন ধরলাম সে এক কান্ড, তবে কখনোই চাইবোনা যে ঐ ধরণের ঘটনার কোনোভাবে পুনরাবৃত্তি হোক। এই ফিল্ডের শুরুতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। দার্জিলিংয়ে তখন হামেশাই বন্ধ ডাকা হত বলে সিকিমে ওঠার সময়ে বিদ্যুৎ বাবু সিকিম থেকেই জিপ বুক করেছিলেন। কথা ছিল তারা শিলিগুড়ি থেকে আমাদের নিয়ে যাবে। কিন্তু আন্দোলনের আবহে স্থানীয় গাড়ি চালক সঙ্ঘ আমাদের গাড়িগুলো রাস্তায় অবরোধ করে রেখেছিল। ... ...

পরীক্ষা শেষ। ফিরছি। কলেজ গেট থেকে রিক্সা ধরলে ছয় টাকা। আর নেদেরপাড়ার মোড় থেকে ধরলে শেয়ারে মেলে। দেড় টাকা করে তিন টাকা। কম বেতন। হাজার আষ্টেক টাকা। তার উপর 'ভাষা ও চেতনা সমিতি' করি। সংগঠনের খরচ চালিয়ে মাসের শেষে পকেটে কিছু থাকে না। তখন কৃষ্ণনগরে শেয়ারে রিক্সা চাপা যেতো। এ-নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে একটা বিখ্যাত গান আছে। রিক্সায় ফিরছি। দেখি একদল ছেলে আমাকে দেখে খুব গাল দিচ্ছে। তাকিয়ে দেখি, সেই ছেলেটি মধ্যমণি। তা স্টেশনে এসে পিছনের দোকানের কাছে দাঁড়িয়েছি। ছেলেটি দলবল নিয়ে হাজির। আমাকে খুব গালাগাল চললো। বললো, ওদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিয়েছি টুকতে না দিয়ে। কয়েকজন ওদের সমর্থন করলেন। ছি ছি টুকতে দেয় নি, ছেলেগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে। আমি প্রতিবাদ করলাম, কী বলছেন, এভাবে পরীক্ষা হয়। আমরা টুকছি তোর বাপের কী? বাকিরা তো কিছু বলে না, তোর কেন এতো-- বলে মারতে শুরু করলো দলবল মিললে। কিছুদিন আগেও ছাত্র রাজনীতি করেছি, সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছি, কিন্তু করছি, আমিও রুখে দাঁড়ালাম। দু এক ঘা পাল্টা দিলাম। সবাই বিপক্ষে। শুধু এক গরিব মহিলার কন্ঠস্বর শোনা গেল, কলেজের মাস্টারকে মারছে। আর তুমরা দেঁড়িয়ে দেঁড়িয়ে দেখছো। ... ...

কয়েক বছর ধরেই কখনও উড়িষ্যার দার্জিলিং, আবার কখনও উড়িষ্যার কাশ্মীর নামে দারিংবাড়ি নামটা শুনছিলাম। হঠাৎ একদিন আমাদের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ এসে বলল, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে ও ফিল্ডে গিয়েছিল দারিংবাড়ি। প্রদীপ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ স্কলার। জায়গাটার যা বর্ণনা ও দিল, ঠিক করলাম এবারে যেতেই হবে। চারমাস আগে রেলের বুকিং শুরু হয়ে যায়। ... ...

বর্ধমান স্টেশনের সামনের দেওয়ালে লেখা ছিল সবচেয়ে কঠিন। পায়খানা আর পেচ্ছাপে ভর্তি। একটা দিনের কথা মনে আছে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪। মোবারক বিল্ডিং পার্টি অফিস থেকে ১০ টাকা দিয়েছে টিফিন চা ইত্যাদির জন্য। মেহেদি বাগান বলে একটা কুখ্যাত জায়গা ছিল। কংগ্রেসের ঘাঁটি। সেখানে অসাধারণ সর টোস্ট বানাতো। ডিম টোস্ট আট আনা হল টোস্টও তাই। চা বোধহয় চার আনা করে ছিল। পাঁউরুটি চার আনা। স্লাইস রুটি তখনও আধিপত্য বিস্তার করে নি। তা পোস্টার লেখা চলছে। একটু বাকি। হঠাৎ সাইকেল একজন এসে বললো, এক্ষুণি পার্টি অফিস চলে যেতে। স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধী লেখা হয়ে গিয়েছিল, জবাব চাই, লেখা বাকি ছিল। কোনোক্রমে লিখে ছুটলাম সাইকেল নিয়ে। ... ...