
তারপর আর কী? কীভাবে সেদিন রক্ষা পেলাম, ট্রেন ধরলাম সে এক কান্ড, তবে কখনোই চাইবোনা যে ঐ ধরণের ঘটনার কোনোভাবে পুনরাবৃত্তি হোক। এই ফিল্ডের শুরুতে একটা ঘটনা ঘটেছিল। দার্জিলিংয়ে তখন হামেশাই বন্ধ ডাকা হত বলে সিকিমে ওঠার সময়ে বিদ্যুৎ বাবু সিকিম থেকেই জিপ বুক করেছিলেন। কথা ছিল তারা শিলিগুড়ি থেকে আমাদের নিয়ে যাবে। কিন্তু আন্দোলনের আবহে স্থানীয় গাড়ি চালক সঙ্ঘ আমাদের গাড়িগুলো রাস্তায় অবরোধ করে রেখেছিল। ... ...

পরীক্ষা শেষ। ফিরছি। কলেজ গেট থেকে রিক্সা ধরলে ছয় টাকা। আর নেদেরপাড়ার মোড় থেকে ধরলে শেয়ারে মেলে। দেড় টাকা করে তিন টাকা। কম বেতন। হাজার আষ্টেক টাকা। তার উপর 'ভাষা ও চেতনা সমিতি' করি। সংগঠনের খরচ চালিয়ে মাসের শেষে পকেটে কিছু থাকে না। তখন কৃষ্ণনগরে শেয়ারে রিক্সা চাপা যেতো। এ-নিয়ে বাংলা চলচ্চিত্রে একটা বিখ্যাত গান আছে। রিক্সায় ফিরছি। দেখি একদল ছেলে আমাকে দেখে খুব গাল দিচ্ছে। তাকিয়ে দেখি, সেই ছেলেটি মধ্যমণি। তা স্টেশনে এসে পিছনের দোকানের কাছে দাঁড়িয়েছি। ছেলেটি দলবল নিয়ে হাজির। আমাকে খুব গালাগাল চললো। বললো, ওদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দিয়েছি টুকতে না দিয়ে। কয়েকজন ওদের সমর্থন করলেন। ছি ছি টুকতে দেয় নি, ছেলেগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে। আমি প্রতিবাদ করলাম, কী বলছেন, এভাবে পরীক্ষা হয়। আমরা টুকছি তোর বাপের কী? বাকিরা তো কিছু বলে না, তোর কেন এতো-- বলে মারতে শুরু করলো দলবল মিললে। কিছুদিন আগেও ছাত্র রাজনীতি করেছি, সাংবাদিকতা পেশা ছেড়েছি, কিন্তু করছি, আমিও রুখে দাঁড়ালাম। দু এক ঘা পাল্টা দিলাম। সবাই বিপক্ষে। শুধু এক গরিব মহিলার কন্ঠস্বর শোনা গেল, কলেজের মাস্টারকে মারছে। আর তুমরা দেঁড়িয়ে দেঁড়িয়ে দেখছো। ... ...

কয়েক বছর ধরেই কখনও উড়িষ্যার দার্জিলিং, আবার কখনও উড়িষ্যার কাশ্মীর নামে দারিংবাড়ি নামটা শুনছিলাম। হঠাৎ একদিন আমাদের প্রাক্তন ছাত্র প্রদীপ এসে বলল, বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ থেকে ও ফিল্ডে গিয়েছিল দারিংবাড়ি। প্রদীপ এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে রিসার্চ স্কলার। জায়গাটার যা বর্ণনা ও দিল, ঠিক করলাম এবারে যেতেই হবে। চারমাস আগে রেলের বুকিং শুরু হয়ে যায়। ... ...

বর্ধমান স্টেশনের সামনের দেওয়ালে লেখা ছিল সবচেয়ে কঠিন। পায়খানা আর পেচ্ছাপে ভর্তি। একটা দিনের কথা মনে আছে ৩১ অক্টোবর ১৯৮৪। মোবারক বিল্ডিং পার্টি অফিস থেকে ১০ টাকা দিয়েছে টিফিন চা ইত্যাদির জন্য। মেহেদি বাগান বলে একটা কুখ্যাত জায়গা ছিল। কংগ্রেসের ঘাঁটি। সেখানে অসাধারণ সর টোস্ট বানাতো। ডিম টোস্ট আট আনা হল টোস্টও তাই। চা বোধহয় চার আনা করে ছিল। পাঁউরুটি চার আনা। স্লাইস রুটি তখনও আধিপত্য বিস্তার করে নি। তা পোস্টার লেখা চলছে। একটু বাকি। হঠাৎ সাইকেল একজন এসে বললো, এক্ষুণি পার্টি অফিস চলে যেতে। স্বৈরাচারী ইন্দিরা গান্ধী লেখা হয়ে গিয়েছিল, জবাব চাই, লেখা বাকি ছিল। কোনোক্রমে লিখে ছুটলাম সাইকেল নিয়ে। ... ...

মারতেও পারি না। মারার অভ্যাস আমার ছিল না। দুটোকে টেনে আলাদা করি। বিরাট কঠিন কাজ। কিন্তু পাঁচ ছটা টিউশন পড়িয়ে যা পাই, একজায়গায় তার সমান পাবো, থেকে গেলাম। টিফিন ভালো। নুডলস, চিঁড়ের পোলাও ইত্যাদি। তবে নিরামিষ। আমিষ নিরামিষ ব্যাপারটাই তখন ভাবা ছিল না। খাবার খাবার। তার আবার আমিষ নিরামিষ। মাছ ডিম দৈনিক খুব কম বাড়িতেই হতো। সরকারি ভালো চাকুরে আর ঠিকাদার ছাড়া হতো বলে মনেও হ্য না। যা পেত বা পেতাম হাসিমুখে সবাই খেতো। খালি হোস্টেলে গেরান্ড/গ্রান্ড ফিস্টের দিন--একটু মাংস নিয়ে আদিখ্যেতা ছিল। পিস ছোট কেন? আরেকটু ঝোল দাও। একটা আলু হবে? এইসব আবদার ছিল। ছিল রঙ্গরসিকতা। ব্যাটা তোর পিসটা একটু বড় মনে হলো। ... ...

রাধিকা এসেছে 'রাধা' শব্দ থেকে। রাধার আগমন আবেস্তা 'রাধ' থেকে। রাধ মানে প্রেমিক। প্রথম ব্যবহার কাশ্মীরে। বাংলায় রাধ-এর সঙ্গে আ যোগ করে রাধা। রাধা, রাধিকা, রাই-- কত কত আদরের নৌকা ভাসানো নাম। সায়ন মনে করিয়ে দিলেন কাদামাটির দিনগুলোতে কেষ্টযাত্রায় রাধা আর কৃষ্ণের প্রেম। কানু বিনে গীত নাই-- কিন্তু কৃষ্ণকে যাত্রা খুব কম হতো গ্রাম বাংলায়। রাধার সঙ্গে যে কৃষ্ণের বিবাহ হয়েছিল, সেটা একটা মাত্র নাটকে দেখানো হয়েছে, পণ্ডিত প্রবর রূপ গোস্বামীর নাটকে। ললিত মাধব। ... ...

আজ খারাপ লাগে, ভুলোকে ছেড়ে এলাম কী করে? ভুলো আমাকে পাগলের মতো ভালবাসতো। সেহারাবাজারে নবম দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার সঙ্গে সাড়ে ছয় কিলোমিটার দূরের স্কুলে হেঁটে হেঁটে চলে যেত। বিডিআর ট্রেনে চাপলে ট্রেনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াত। সারাদিন স্কুলের গেটে বসে থাকতো। সহপাঠীরা আওয়াজ দিত, তোর বন্ধু বসে আছে। বর্ধমান শহরে পড়তে আসার সময় তাই সতর্ক থাকতাম। চুপিসারে আসতাম যাতে ভুলো টের না পায়। কিন্তু ভুলো সন্ধ্যায় ফেরার সময় নুরপুর ক্যানেল ধারে বসে থাকতো। আমাকে নিয়ে ফিরবে! বর্ধমান শহরে আসার সময় ভুলোকে ছেড়ে আসা কঠিন ছিল। তবু তো পেরেছি। আজ আর পারি না। আমার সিরো এবং পাড়ার পাঁচটি কুকুরকে ছেড়ে এখন বাইরে রাত কাটাতে খুব কষ্ট পাই। ... ...

তবে গুহা দেখার আগে আরও কিছু অত্যাশ্চর্য জিনিসের কথা বলে নিই। মৌলিন্নং থেকে বেরিয়ে খুব সকালে প্রথমে আমরা সেখানেই গিয়েছিলাম। জিনিসটা হল জীবন্ত সেতু। মানে বনের গাছ কেটে তার কাঠ দিয়ে বানানো সেতু নয়। নদীর ওপরে রীতিমত জ্যান্ত গাছের ঝুরি পাকিয়ে বানানো ঝুলন্ত সেতু। যদিও অনেকটা হেঁটে যেতে হয়, সিঁড়িও প্রচুর। তবে কষ্ট না করলে কী আর কেষ্ট মেলে? ... ...

এখানে চারপাশে পাইস হোটেল থাকায় খাওয়া-দাওয়ার ভারি সুবিধা হয়ে গেল। শুধু মাছ নয়, মাঝে মাঝে ঝোলের সঙ্গে দু-এক টুকরো মাংসও থাকত। সে-সব খেতে খেতে মাখন একদিন ননীকে 'বাহবা' দিয়ে বললেন, ব্যবস্থা তোর ভালই, তো পাস কোথা থেকে। দু-পয়সা এক পয়সার বেশি তো বরাদ্দ নেই। ননী বললেন, ধুর এতে পয়সা লাগে নাকি। খাওয়া থামিয়ে মাখনবাবু বললেন, তোকে বলতেই হবে। পয়সা না দিয়ে খাবার তুই পাস কোথা থেকে। ননীবাবুর জবাব, আগে খেয়ে নে...। তারপর বলব। খাওয়ার পর মাখনবাবুর সেই একই জিজ্ঞাসা। ননীবাবুর অকপট স্বীকারোক্তি: ঝোলটুকু হোটেল থেকেই দিয়ে দেয়। বাকিটুকু সব পাতকুড়ানো। এই কৃচ্ছসাধনের কাহিনী মাখন পালের কাছেই শোনা। নোয়াখালির বেগমগঞ্জ থানার সোনাইমুড়ি গ্রামের জমিদার পরিবারের সন্তান, কৃতী ছাত্র মাখন পালের জবানবন্দি: ননীর মুখে মাছ-মাংসের এই ইতিহাস শুনে মনে হল বমি করে দিই। প্রশ্ন রাখলাম, বমি কি শেষ পর্যন্ত করেছিলেন? মাখনবাবুর জবাব: নারে ভাই, তখন আমাদের চালচুলো নেই। পার্টির অনেক কাজ। পয়সা-কড়ি কিছুই ছিল না। ফলে, বাধ্য হয়ে জেনেশুনে পাতকুড়ানো খেয়ে কাটিয়ে দিলাম। ... ...


আরাবল্লী আছে ওখানে, তবে কিনা বাতাসের অভিমুখের সঙ্গে সে পাহাড় সমান্তরাল। তাই একশো শতাংশ জলীয় বাষ্পে টাপুটুপু বাতাস বয়ে গেলেও, পাহাড়ের সঙ্গে ঠোকাঠুকি হল কই? ধাক্কাধাক্কি হবে , ঢাল পেরোতে না পেরে পাহাড়ের গা বরাবর হাওয়াটা ওপরে উঠবে, ঠান্ডা হবে , বাষ্প ঠান্ডায় ঘন হয়ে বড় বড় জলের ফোঁটা বানাবে, তবে না বৃষ্টি হবে! ... ...

পাহাড়ীয়া খাসি শিশুর দল ধুলোয় গড়াগড়ি দিয়ে খেলা করছে, তাদের পরনের সামান্য পোশাকগুলি ধুলোবালি লেগে মলিন, তবে মুখের হাসিটি বড় উজ্জ্বল। বেশিরভাগই আমাদের টাটা করছে। এক দুজন হাঁ করে ভয়ও দেখাচ্ছে। মনটা বেশ ভালো লাগছিল। ... ...


বাস এগিয়ে চলে বিশাল এক হ্রদের পাশ দিয়ে ঘুরে ঘুরে। নাম বড়াপানি বা উমিয়াম। এবারে কিছুক্ষণের বিরতি, ভালোই হল, বাস থেকে নেমে হাত পা ছাড়িয়ে লেকটা ভালো করে দেখার সুযোগ পেয়ে গেলাম। ইংরেজি ইউ আকৃতির মতো এক বিশাল হ্রদ। আমরা দেখছি পাহাড়ের অনেক উঁচু থেকে। নিচে জলের কাছে গেলে নৌকা বিহারেরও সুযোগ আছে দেখলাম। ইউ এর মাঝখানে দ্বীপের মতো উঁচু হয়ে আছে। দুপাশের পাহাড় আর মাঝখানের দ্বীপ বড় ঘন সবুজ। ... ...

বিচ্ছিন্ন ভাবে লন্ডনে প্রায়শই বর্ণ বৈষম্য প্রণোদিত হত্যা ও জীবনহানি হত। কিন্তু একটা হত্যা সারা দেশকে স্তম্ভিত করেছিল এবং আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করেছিল। স্টিফেন লরেন্স নামে এক কালো কিশোর নৃশংসভাবে দিনের আলোয় নিহত হয়েছিল। এই কেস বহুদিন চলেছিল এবং কখনো নিঃসন্দেহভাবে এর নিষ্পত্তি হয় নি, যদিও কুড়ি বছর পর দুজন হত্যাকারীর শাস্তি হয়েছিল। স্টিফেন লরেন্সের মা, ডোরীন লরেন্স এতকাল ধরে ন্যায্য বিচারের জন্য যুদ্ধ করে গিয়েছিল। সাধারণের চোখে মেট্রোপলিটন পুলিশ বর্ণ পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট বলে বিবেচিত হয়েছিল। ডোরীন লরেন্স এখন ব্যারোনেস ডোরীন লরেন্স, হাউস অফ লর্ডসের সভ্যা। ... ...


অধ্যাপক জ্যোতির্ময় ভট্টাচার্য আমার দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ মানুষ। তাঁর সঙ্গ আমাকে ঋদ্ধ করেছে। এখনও বর্ধমান গেলে তাঁকে প্রণাম না করে ফিরি না। তাঁর দাদা কল্যাণ ভট্টাচার্যও একজন গুণী অধ্যাপক। বড় মনের মানুষ। বাইরেটা কঠিন। ভিতর নরম। সিপিএমকে ভোট দিতেন কিন্তু কট্টর সমালোচক ছিলেন। পণ্ডিত ধ্রুবতারা যোশীর খুব কাছের মানুষ। দু ভাইই ভালো ধ্রুপদী সঙ্গীত জানতেন। তেমন চর্চা আর করেননি। কল্যাণ ভট্টাচার্যের ছিল বিপুল ক্যাসেট সংগ্রহ। তাঁর সংগ্রহ দেখে আমার স্বল্প আয়ের ইচ্ছে ফলবতী হয়। ... ...

শক্তি: এবার আমার গল্পটা বলি। বিয়ের আগের দিন রাত্রিবেলা আমি হাজতে ছিলাম। (ঘরের মধ্যে হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল)। আমি অলিম্পিয়ায় মদ খেয়ে ফিরছি। রাত দেড়টা। তার পরের দিন আমার বিয়ে। আমি সকলকে বললাম, অলিম্পিয়ায় চলে এস। তখন অলিম্পিয়ায় আমার ঠেক। বেরিয়ে এসে রাস্তায় চাঁদ দেখছি। চাঁদটা একটু ভাল ভাবে দেখা দরকার। চাঁদ পড়ে আছে ... চাঁদ না দেখলে তো বিয়ে হয় না। পুলিশ আমাকে তুলে নিয়ে গেল। তার আগের দিন থানার ও-সিকে রাতে জড়িয়ে ধরে চুমু-টুমু খেয়েছি। ব্যাটা ছেলের চুমু ওর পছন্দ হয়নি। মেয়েছেলের চুমু খেতে অভ্যস্ত। ... ...

ভূগোলের কথা বলতে গেলেই কেবল বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজ আর স্যার ম্যাডামদের কথা মনে পড়ে যায়। ওঁদের দেখানো পথেই তো হেঁটে চলেছি এতদিন। যা হোক এবারে একটু বাংলার বাইরে আরও খানিকটা পূর্ব দিকে ঘুরে আসা যাক। সেবার বল্লরীদি বলল যে আমাদের ব্রহ্মপুত্র নদ দেখাবে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের মনটাও বেশ ডগমগ হয়ে উঠলো। ‘কবে আসবে দিনটা ম্যাডাম’ ... ...

সুনীল-শক্তি-ভাস্করদের আরো একটা আড্ডা ছিল। তার নাম, ‘বুধসন্ধ্যা’। প্রায়ই বুধবার সন্ধ্যায় কোন এক বন্ধুর বাড়ি পালা করে আড্ডা বসত। আমি কলকাতায় থাকতাম না। সুতরাং আমার কোন দিন যাওয়া হয়নি সেই আড্ডায়। একবার ভাস্কর বলল, “ অমলেন্দু, এবার শীতে কলকাতায় আসছ কি ?” আমি বললাম, “ হ্যাঁ, আমরা যাব।” ভাস্কর : তা হলে ভালই হল। আমার বাড়িতে ‘বুধসন্ধ্যার’ আড্ডা হবে। তুমি আর অরুন্ধতী আসবে। ... ...