
বহু বছর আগে ঝরিয়ার বাড়ির চিলে কোঠায় সঞ্চিত বাঁধানো মাসিক বসুমতীতে রিও দে ঝানেইরোর দুটি চমকপ্রদ সাদা কালো ছবি দেখেছিলাম- জল থেকে জেগে ওঠা কোণাকৃতি একটি পাহাড় এবং তার ঠিক উলটোদিকে প্রায় আকাশে দাঁড়িয়ে দু হাত বাড়ানো যিশুর মূর্তি- এক সরলরেখায়। পর্তুগিজ নাবিকেরা সেই পাহাড়ের নাম দিয়েছিলেন পাঁও দে আজুকার, চিনির রুটি, ইংরেজিতে যার হুবহু অনুবাদ সুগার লোফ, কিন্তু তার সঙ্গে ইংরেজ কোন বুদ্ধিবলে দেওঘরের ত্রিকূটের থেকেও ছোট এই সুগার লোফকে মাউনটেন আখ্যা দিয়েছে বুঝে ওঠা ভার। কলা গাছের মোচার মতো দেখতে এই মনোলিথের আকারের কোন রুটিও তো আজ অবধি কোথাও দেখিনি। তবে এ নাম এলো কোথা হতে? ... ...

যেমন ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিক: ব্রিটিশ অ্যাথলিট ডেরেক রেডমন্ড দৌড়ুচ্ছিলেন চারশ মিটার সেমি ফাইনালে, দুশো মিটারের মাথায় হ্যামস্ট্রিং ছিঁড়ে যায়। তবু থামলেন না, ফিনিশ লাইনে তাঁকে পৌঁছুতে হবেই, কোনমতে এক পায়ের ভরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চললেন, মেডিকাল সাপোর্ট ছুটে এলে তিনি তাঁদের নিরস্ত করেন। এমন সময় সিকিউরিটির রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করে তাঁর বাবা জিম রেডমণ্ড ছেলের পাশে দাঁড়ালেন, ছেলেকে ধরে ধরে হাঁটিয়ে নিয়ে চললেন, চারশ মিটারের রেসের শেষ টেপ পার হলে স্টেডিয়ামের সব মানুষ উঠে দাঁড়িয়ে তাঁদের সম্বর্ধনা জানান। অলিম্পিকের ইতিহাসে সেটি এক আইকনিক মুহূর্ত। জানতাম না রিওতেও এমনি কিছু অপেক্ষা করে আছে। ... ...

রিওর বিচে স্নান ও সঞ্চরণরতা সুন্দরীদের পানে চোখ মেলে থাকার বা দূর থেকে শিষ দেবার অধিকার কোন বয়সে সীমাবদ্ধ নয়, ছেড় ছাড় অবশ্যই অসামাজিক ও বেআইনি। যোবিম ও ভিনিসিউস ভেলোসো বারে বসে গল্প করেন, চাকাও (আখের রস, লেবু মেশানো ব্রাজিলের জাতীয় ড্রিংক যাকে আমরা কাইপিরিনিয়া নামেও জানি) পানীয় সেবন করে খোলা জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে থাকেন। একদিন বিকিনি পরিহিতা এক তন্বী শিখর দশনা তরুণীকে দেখে দু জন বাক্যিহারা হয়ে গেলেন; পরপর কয়েকদিন তাকে দেখলেন। সে কখনো বিচে যাচ্ছে কখনো বা দোকান বাজার করে ফিরছে। রুয়া মনতেনেগ্রো এবং প্রুদেন্তে দে মোরেসের ঠিক কোণায় এই বারে বসে তাঁরা দুজন মেয়েটির গতিবিধি লক্ষ করেন, কোনদিন শিষ দিলেন, মাঝে মধ্যে কথাও বললেন, তাঁদের সঙ্গে বসে এক পাত্তর পান করার আবেদন জানালেন। মেয়েটি সে দরখাস্ত নাকচ করে দেয়। ... ...

ব্রিজ বা মস্ত থেকে বসনিয়ার এক জনপদের নাম হয়েছে মস্তার, কালো পাহাড়ের দেশের নাম মনতেনেগ্রো; সেগুলি স্থানীয় নাম। কিন্তু পর্তুগিজ নাবিকরা তাদের যাত্রা পথে খেয়াল খুশি মতো যে সব নামের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে গেছে তাদের অনেকগুলি আজও বিদ্যমান- যেমন ক্রিসমাসের দিনে (পর্তুগিজ বড়দিন) আফ্রিকার এক বন্দরে তাদের জাহাজ ভিড়েছিল তাই নাটাল, ব্রাজিলের উত্তরে নাটাল শহরের পত্তন হয়েছিল এক বড়দিনে, প্রচুর চিংড়ি মাছ পাওয়া গেল অতএব সে দেশ খ্যাত হোক ক্যামেরুন নামে, দ্বীপটা সুন্দর তাই ফরমোসা (তাইপের পুরনো নাম), সাগর তীরের মেরিনা দেখে মনে হয়েছিল অনেকগুলি হ্রদের (পর্তুগিজ লাগো) সমন্বয়; সে হলো নাইজেরিয়ার লাগোস। ব্রিজ নয়, পাহাড় নয়, লেক অবধি নয়, নেই কোন নদী তবু জানুয়ারি মাসে ব্রাজিলের পূর্ব উপকূলে পাহাড় ঘেরা এক শান্ত জলরাশি দেখে তাকে কোন মোহানা ভেবে যে নাম দিয়েছিলেন পর্তুগিজ নাবিক তার অপভ্রংশটুকু আজ এক শহরের নাম, নদী, রিও! এমন নামটি আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। ... ...

এই আকস্মিকতার জন্য কেউ প্রস্তুত ছিল না। বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতার জনক, তিরিশ বছর যাবত প্রেসিডেন্ট জুল রিমে (Jules Rimet, যার নামে কাপের নাম) বিজয়ী ব্রাজিলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় যে স্পিচ লিখে এনেছিলেন, সেটি পড়া হল না, বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের হাতে কাপ তুলে দেওয়া হয়নি। বিজয়ী দলের জাতীয় সঙ্গীত বাজানোর জন্য যে ব্যান্ড স্টেজে ছিল, খেলা শেষ হওয়া মাত্র তারা অদৃশ্য হয়ে যায়। কোন ব্যান্ড বাজেনি, উরুগুয়ের পতাকা রিওর আকাশে ওঠেনি। ... ...

কিন্তু আজকের প্রজন্ম যখন ম্যাপ হাতে বা গুগল স্ক্রোল করে ইউরোপ ঘোরে, তাদের বোঝানো অসম্ভব যে মিউনিকের কার্লস প্লাতস, ওয়ারশ’র স্তারে মিয়াসতো, ড্রেসডেনের লিবফ্রাউয়েন, কলোনের জোড়া গিরজে, পুরো রটারডাম, ফ্রাঙ্কফুর্ট, ওয়েসেল এবং আরও অনেক শহর, প্রাসাদ, দুর্গ, ভজনা মন্দির মাটিতে মিশে গিয়েছিল। ১৯৪৫ সালের মে মাসে বার্লিনে কোন দেওয়াল খাড়া ছিল না; সে বছরের জুলাইতে তোলা একটি আমেরিকান ডকুমেনটারি ফিল্মে রিপোর্টারের অফ ভয়েসে (ইউ টিউবে লভ্য) শোনা যায়, ‘বার্লিন এক মহা শ্মশান; একটি ইটও দাঁড়িয়ে নেই। আজ থেকে পঞ্চাশ বছর পরেও এখানে বাস করবে না কোন মানুষ। ... ...

ফ্রান্সের মুক্তির ছ মাস বাদে কঁ থেকে অন্দ্রে আইন্তস এডিনবরা আসেন ফ্রেঞ্চ পড়াতে। তিনি লক্ষ করলেন একজন যুবক তাঁর ক্লাসে কিছুতেই মুখ তুলে কথা বলে না; একদিন অন্দ্রে এর কারণ জানতে চাইলেন। সেই যুবক বললেন, নরমানডি লড়াইয়ের সময়ে তার দায়িত্ব ছিল কঁ শহরের এরিয়াল ম্যাপ দেখে স্থির করা কোথায় কোথায় জার্মানরা নতুন রাস্তা বানাচ্ছে, সেই মত বোমা ফেলা হবে। অজস্র বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর জন্য সে নিজেকেই দায়ী মনে করে। অন্দ্রে তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন তবু আপনারা আরও অনেক কঠিন নিপীড়ন থেকে আমাদের মুক্ত করেছিলেন। ... ...

জলপথে ডোভার থেকে ক্যালের দূরত্ব তিরিশ কিলোমিটার। ফ্রান্সের বাড়ি যাবার সময়ে গাড়ি সহ চ্যানেল টানেল দিয়ে সাগর পার হতে লাগে ৩৫ মিনিট। কোন উজ্জ্বল দিনে ফ্রান্সের কাপ গ্রি নেজ থেকে ডোভারের ঝকঝকে হোয়াইট ক্লিফস দেখে ভেবেছি, এই তো এতো কাছে ! দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক দূরত্ব এখানে সবচেয়ে কম, রোমেল সহ অনেক জার্মান জেনারেল ধরে নিয়েছিলেন আক্রমণ আসবে অন্য কোথা নয়,এই পা দে ক্যালেতে। এরউইন রোমেল একদিন এইখানে দাঁড়িয়ে তাঁর বাইনোকুলার বাগিয়ে ইংল্যান্ডের দিকে চেয়েছিলেন – ভেবেছিলেন এই শান্ত সমুদ্রের ওপারে হয়তো তৈরি হচ্ছে কোন মারণ ফৌজ? তিনি বলেছিলেন, যেদিন শত্রু এই জলসীমা পার হয়ে তার হাওয়াই জাহাজ ও নৌ বহর নিয়ে ইউরোপীয় মূল ভূখণ্ডের কিনারায় আক্রমণ শুরু করবে, সেই দিন, সেই প্রথম চব্বিশ ঘণ্টা হবে আমাদের জার্মানদের ও শত্রু সৈন্যের পক্ষে সমান গুরুত্বপূর্ণ, নির্ণায়ক দিন, কেননা সেটাই হবে দীর্ঘতম দিন, দি লংগেস্ট ডে (ডের লেঙ্গস্টে টাগ, যা থেকে প্রযোজক ডারিল এফ জানুক তাঁর ছবির নাম রাখেন)। ... ...

রিমিনি থেকে ইমোলার ট্রেন নন স্টপ নয়, পঞ্চাশ মিনিটে আটটা স্টেশনে থামে। তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সাভিনানো সুল রুবিকোনে, এখানেই কোথাও সিজার সেই নদীটি পার হয়ে রোমান রিপাবলিকে তুলকালাম বাধিয়েছিলেন। ইমোলা স্টেশন দেখে হতাশ হলাম। বোলপুর তার তিনগুন বড়ো। টেলিভিশনে আহরিত তথ্য অনুযায়ী দিনো এ এনজো ফেরারি ইপোদ্রোমে প্রায় এক লক্ষ দর্শক বসতে পারেন তবে স্টেশন এত ছোট কেন? কারণ শহরটি খুবই ছোট, মাত্র সত্তর হাজার লোকের বাস; বছরে তিন দিন লোকে লোকারণ্য হয় মাত্র! ... ...

আজ রিমিনিতে যেখানে উত্তর-দক্ষিণ পথ (কারদো) আর পূর্ব-পশ্চিম পথ (দেকামেনুস) এসে মিলেছে, সেখানে ছিল আরিমিনুম শহরের রোমান ফোরাম। রুবিকন পেরিয়ে সিজার তাঁর ফৌজ সহ ঘণ্টা দেড়েক বাদে সেইখানে পৌঁছুলেন। তিনি জানতেন রোমের আইন তিনি একা ভাঙেননি, তাঁর সঙ্গে ছ-হাজার লিজিওনেয়ার রোমের চোখে সেই একই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হবে। রোমের শপথ নিয়ে তাঁরা সৈন্য বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন, এবার সিজারের সাথি হয়ে রোমের বিরুদ্ধেই বিশ্বাসঘাতকতা করবেন (আমাদের আজাদ হিন্দ ফৌজের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছিল)। সেদিন আরিমিনুম ফোরামে পৌঁছে একটি প্রস্তরখণ্ডের ওপরে দাঁড়িয়ে তাঁর লিজিয়নকে সম্বোধিত করে বলেছিলেন, আমাদের অভিযান রোমের পানে, গৃহ যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী কিন্তু আমরা বিজয়ী হবো। ... ...

হঠাৎ একদিন কিছু বদলাতে শুরু করল। ১৯৭৯ সালে জুলিয়ানো গ্রামের কিছু উদ্যোগী মানুষ একটি মেলার আয়োজন করলেন। কোনও খোলা মাঠে নয়, সেটি বসবে এই গ্রামের গলিতে, বাসিন্দারা তাঁদের ঘরের দুয়োর খুলে দেবেন। ভালোবাসা এবং সাদর অভ্যর্থনা ছাড়া দেওয়ার কিছু নেই, তবে হাতে হাতে বানাবেন পাস্তা, পিৎজা, গ্লাসে ভরে দেবেন কিয়ান্তি। একেই আজকাল স্ট্রিটফেয়ার বলে। রিমিনির সভ্য মানুষজন সেতু পেরিয়ে এই অবধি আসতে কুণ্ঠিত হয়েছিলেন; দিনে ডাকাতি না হোক পকেটমারের অভাব কি! সব দুশ্চিন্তা কাটিয়ে আগস্ট মাসের এক উজ্জ্বল দিনে দেখা গেল সান জুলিয়ানোর অলিতে গলিতে সুখী জনতার ভিড়, শিশুদের কলরব। গ্রামের লোকেরা যে যেখানে পেরেছেন দুটো চেয়ার পেতে দশজন মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যদি হও সুজন তেঁতুল পাতায় কত জন! ... ...

যাত্রার উদ্দেশ্য যাই হয়ে থাক না কেন, রিমিনি শুধু সান মারিনো পৌঁছানোর পথের হাওড়া স্টেশন নয়। তার ইতিহাস দু হাজার বছরের বেশি পুরনো, আদ্রিয়াতিকের কূলে রোমান সাম্রাজ্যের বাণিজ্য বন্দর। সাম্রাজ্যের উত্তরাপথ মিশে যায় দক্ষিণাপথের সঙ্গে। সেই সম্মানে তৈরি হয়েছিল সম্রাট আগাস্টাসের তোরণ, সেখান থেকে শহরের মাখখান দিয়ে চলে যায় করসো দা’ গুসটো, শেষ হয় টিবেরিয়াসের পাঁচ খিলানের সেতু পেরিয়ে। ... ...

চার দশক আগে প্রথমবার বার্সেলোনা আসি তার সত্তর কিলোমিটার উত্তরে কাতালুনিয়ার বিচ রিসর্ট ইওরেত দে মার হতে। ইংল্যান্ডে বুক করা স্প্যানিশ প্যাকেজ হলিডে - আহা কি দিন ছিলো, আমাদের টাকায় আসা যাওয়া দু সপ্তাহ থাকা খাওয়া সহ খরচ মাথা পিছু পাঁচ হাজার টাকা, তার সঙ্গে কিছু বাড়তি ব্যয়ে সাইট সিইং - যেমন বার্সেলোনার বাস ট্রিপ, সে অনেক রুক্ষ পাহাড় পেরিয়ে। ... ...

জাদুঘরে নয়, আন্তনি গাউদি প্রকৃতি, আলো এবং ঈশ্বরকে নিয়ে তাঁর খেলাঘর, তাঁর বৈঠকখানা সাজিয়ে রেখেছেন বার্সেলোনায়; দেখি তাঁর হাতে গড়া বাড়ি, তরঙ্গের মতন ব্যালকনি, ছাদে চীনেমাটির গোল চিমনি, বারান্দার ধাতব রেলিংকে মনে হয় নধর, পেলব, কোমল; যেন অবহেলে এক শিল্পীর আঙ্গুলের মোচড়ে টানা, সিঁড়ি আমাদের একতলা থেকে দোতলা নয়, নিয়ে যায় এক অলৌকিক উচ্চতায়, বসার ঘর অবারিত আলোকের ঝরনাধারায় ভেসে যায় না, আলোর বর্শা আসে কোনাকুনি বল্লমের ফলার মতো, আবিষ্কার করে গৃহকোণের গহন গৌরব। ... ...

লন্ডনের বিভিন্ন ব্যাঙ্কের আন্তর্জাতিক লোন সিন্ডিকেশন বিভাগের অধিপতিদের মাসে একবার সমবেত হয়ে গল্প-গুজব মতান্তরে পারস্পরিক এস্পিওনাজ করার জন্য একটি আনঅফিশিয়াল সংস্থান দীর্ঘদিন যাবত ধুনো জ্বালিয়ে রেখেছে, যার নাম সিন্ডিকেট ম্যানেজার’স ফোরাম। আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হতো পালা করে এ মাসে এক ব্যাঙ্কের অফিসে পরের মাসে আরেক ব্যাঙ্কের খাবার ঘরে। যে বার যাদের ব্যাঙ্কে মিটিং তারা সেদিন আমাদের বরযাত্রী সুলভ আদর আপ্যায়ন করতো, দেখে শুনে হাম ভি কম নহি বলে একাধিকবার আমাদের বোর্ড ডিরেক্টরদেরও হাজির করেছি! এই এ বাড়ি ও বাড়ি আসা যাওয়ার ব্যাপারটা ক্লান্তিকর হয়ে গেলে একবার স্থির হলো আমাদের একটা আউটিং হোক, দূরে কোথাও চলে যাই। স্যান্ট্যান্ডার ব্যাঙ্কের আউসিন্দে বললে, “চলো বার্সেলোনা!” গৌরি সেনের পয়সায় দু’দিন চুটিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে, সেই সঙ্গে শহর ঘুরে দেখা। ততদিনে আমার বার্সেলোনা বার তিনেক ঘোরা হয়ে গেছে। তাতে কি, এক গুনাহ আউর সহি! ... ...

মধ্যযুগীয় ডাবলিন দেওয়াল সীমার বাইরে, লিবার্টিজের প্রায় লাগোয়া ফিনিক্স পার্ক আয়তনে নিউ ইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্কের ডবল, কলকাতার ফুসফুস গড়ের মাঠের তিন গুণ, লন্ডন হাইড পার্কের পাঁচগুণ বড়ো। এগারো কিলোমিটারের দেওয়াল দিয়ে ঘেরা পরিসীমার ভেতরে এই ফিনিক্স পার্কের কোন তুলনা ইউরোপে নেই। কোথাও নাগরিক জীবনের মাঝখানে এমন সবুজের সৌরভ দেখিনি; এটি একাধারে নেচার পার্ক, বনস্থলী, এখানে দিগন্ত বিস্তৃত শান্তি, প্রসন্ন উদার। কোথাও ফুটবল রাগবির গোল পোস্ট দেখবেন না, হাঁটতে পারেন এ মুড়ো হতে ও মুড়ো (ঘণ্টা তিনেক লাগে) দিনে রাতে যখন খুশি। হরিণের আনাগোনা আছে, সাক্ষাৎ হবে পথে, লন্ডনের রিচমন্ড পার্কের মতো। এই শান্ত নিরিবিলি সবুজ প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে বোঝার উপায় নেই মাত্র দশ মিনিট দূরে রাজধানী ডাবলিনের জন ও যানযাত্রা চলছে অবিরাম। পার্ক মানে সবুজ উদ্যান, সেখানে কোন পাকা বাড়ি বানানো সাধারণত বারণ; যেমন আমাদের কলকাতা ময়দানে যত দূর জানি ইট পাথর গাঁথা যায় না (আমার সময়ে তাই ছিল), ইউরোপের পার্কেও মোটামুটি একই নিয়ম। লন্ডনের হাইড পার্কের ভেতরে পাকা বাড়ি নেই কিন্তু সেই একই ইংরেজ প্রভু তাদের উপনিবেশে অন্য আইন জারি করে ফিনিক্স পার্কের মাঝে বানিয়েছিল দুটি বিশাল বাস ভবন; একটি তাদের রাজশক্তির প্রতিভূ ব্রিটিশ লেফটেন্যান্টের স্থায়ী বসতবাড়ি অন্যটি ব্রিটিশ চিফ সেক্রেটারির। এই কলোনির দুই প্রধান পরিচালক শলা পরামর্শ করেছেন একত্রে। ব্রিটিশ লেফটেন্যান্টের বাড়িটি এখন আইরিশ রাষ্ট্রপতির সরকারি আবাস (যেমন আমাদের ময়দানের একধারে গভর্নর জেনারালের অট্টালিকা এখন রাজ্যপালের বাড়ি)। ব্রিটিশ চিফ সেক্রেটারির সাবেক বাসভবনটি বর্তমানে এ দেশের আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের আবাস। তার হয়তো একান্ত ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা আছে – আমেরিকার দু ডজন প্রেসিডেন্টের বাপ ঠাকুরদা বা ঊর্ধ্বতন কোন পুরুষ একদা আয়ারল্যান্ড থেকে ভাগ্যের সন্ধানে নতুন মহাদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। আইরিশ হেরিটেজ সম্বলিত রাষ্ট্রপতির তালিকাটি দীর্ঘ - যেমন ইউলিসিস গ্রান্ট, অ্যান্ড্রু জ্যাকসন, উড্রো উইলসন, হ্যারি ট্রুম্যান, জন কেনেডি, লিন্ডন জনসন, রিচার্ড নিক্সন, জেরাল্ড ফোর্ড, জিমি কার্টার, রোনাল্ড রেগান, বুশ পরিবার, জো বাইডেন। এই ছোট দ্বীপ থেকে গিয়ে আইরিশরা আমেরিকাকে দিয়েছে কেবল তাদের মুখের বুলি নয়, বহু রাষ্ট্রপতিও । ... ...

ডাবলিনের কেন্দ্রস্থল, স্টিফেন্স গ্রিনের অদূরে দেশের প্রাচীনতম বিদ্যায়তন ট্রিনিটি কলেজের ক্যাম্পাসটি বিশাল, সেখানে একটি কলেজ। আমার মতন মানুষের অহেতুক কৌতূহল মেটানোর জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ একটি সুবন্দোবস্ত করেছেন। জুন-জুলাই-আগস্ট এই তিন মাস কিছু দক্ষিণার বিনিময়ে ক্যাম্পাসের ভেতরে রাত্রিবাস করা যায়, রীতিমত বেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট, যার নামই হল ফুল আইরিশ ব্রেকফাস্ট (ডিম, সসেজ, মাশরুম, টমেটো, ব্ল্যাক পুডিং, প্রচুর আলু এমনকি আলুর পিঠে বা প্যানকেক)! জানলা খুললেই সবুজ লন, পাথর বাঁধানো চত্বর, ট্রিনিটি কলেজের নানান ফ্যাকাল্টির ঐতিহাসিক বাড়ি, বেল টাওয়ার (কাম্পানিলে)। মনে হয় এই বুঝি ঘণ্টা পড়বে, পণ্ডিত মশায়ের ক্লাস, নর, নরৌ, নরাঃ। ... ...

শনের সাহচর্যে ডাবলিনে গিয়ে দেখলাম দুশ বছর আগেই প্রখর আইরিশ মেধা এই সঙ্কটের সমাধান করে ফেলেছে; যেমন কোনো পাবের লম্বা বার একাধিক ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত, আপনার সামনে সুধাভাণ্ডের সমারোহ সমেত বারটেন্ডার, কিন্তু আপনার দু পাশে পাতলা কাঠের আবরণ, পেছনে স্বতন্ত্র দ্বার বা পর্দা; আপনাকে বা আপনার সহচর /সহচরীকে তাবৎ জনতা দেখতে পাচ্ছে না, আপনি তাদের কলকণ্ঠ শুনছেন। যে স্নাগের প্রশংসায় শন পঞ্চমুখ, সেটি বার থেকে এক পা দূরের ছোটখাটো কেবিন, যেখানে আপনি বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বসে সান্ধ্য আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, একপাশে একটি খোপের ভেতর দিয়ে বার টেন্ডার আপনার ইচ্ছা জানতে চাইবে এবং তদনুযায়ী বিয়ার পৌঁছে দেবে, কখনোই পর্দা ঠেলে আপনার আড্ডায় ঢুকে বলবে না, এই যে আর কি চাইলেন? ... ...

ইতালিয়ান বৈজ্ঞানিক আসকানিনো সবরেরো নাইট্রো গ্লিসারিন নামক বিস্ফোরক পদার্থের বিধ্বংসী শক্তির বিষয়ে অবগত ছিলেন কিন্তু একে পোষ মানিয়ে সঠিক ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে পারেননি। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং ততজনিত প্রাণহানির পরে আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল সেটিকে নিরাপদ প্রতিপন্ন করে তাকে সেটি বাক্স বন্দি ও দেশে দেশে রপ্তানি দ্বারা প্রভূত অর্থ উপার্জন করলেন – এর নাম ডিনামাইট। শেষ বয়েসে তিনি একদিন খবরের কাগজে পড়লেন কে বা কারা তাঁকে ‘মৃত্যুর ব্যবসায়ী’ আখ্যা দিয়েছে। নোবেল স্থির করলেন তাঁর অর্জিত বেশির ভাগ ধন সম্পত্তি (সাত মিলিয়ন ডলার,আজকের হিসেবে অনেক বিলিয়ন) তিনি তুলে দেবেন সুইডিশ নোবেল ইনসটিটিউটের হাতে। এই অর্থের সুদ হতে ইনসটিটিউট প্রতি বছর পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসা ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে সফল মানুষদের সম্মানে দান করবেন চারটি পুরষ্কার, তার চয়ন ও প্রদানের দায়িত্ব নেবে সুইডিশ নোবেল সংস্থা। কিন্তু এই সঙ্গে তিনি আরেকটি ক্লজ জুড়ে দিলেন- বিশ্বে যুদ্ধ বন্ধ করার এবং বিভিন্ন দেশের মধ্যে মৈত্রী গড়ে তুলে শান্তিকে নিশ্চিত করার জন্য কাজ করেছেন এমন মানুষকে সম্বর্ধিত করার জন্য দেওয়া হবে নোবেল শান্তি পুরষ্কার, তার প্রাপক নির্বাচন করবেন নরওয়ের পার্লামেন্ট দ্বারা বেছে নেওয়া পাঁচ জনের একটি কমিটি। মনে রাখা দরকার সময়টা উনবিংশ শতকের শেষ দশক, নরওয়ে তখন সুইডেনের অধীনে একটি অঙ্গরাজ্য মাত্র; তাঁদের পার্লামেন্ট আছে বটে কিন্তু সুইডেনের রাজা থাকেন তার মাথার ওপরে। কেন যে আলফ্রেড নোবেল তাঁর নামাঙ্কিত এবং ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত পুরস্কারের সঙ্গে অসলো তথা নরওয়েকে জুড়ে দিলেন তার কোন সঙ্গত ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। নরওয়ে সে সময়ে মাঝারি আয়ের ছোট দেশ, ইউরোপে তার স্থান অনেকেরই পিছনে, এমনকি ১৯৩৬ সালে রোমানিয়ার পেছনে। অসলোর জনসংখ্যা আমাদের শ্যামবাজার আর বরানগরের মাঝে গুঁজে দেওয়া যায়। ... ...

এরিক ফান রিবেকের ডাচ অনুগামীরা সিদ্ধান্ত নিলেন ওই দ্বীপে জেলখানা বানিয়ে শাস্তি প্রাপ্ত অপরাধী, অবাঞ্ছিত, পূর্ব এশিয়া, মাদাগাস্কার ও কেপ কলোনির রাজনৈতিক বন্দিদের যদি সেখানে নির্বাসন দেওয়া হয় তাহলে ডাঙ্গায় ইট গেথে কাঁটা তার ঘিরে জেলখানা বানানো ও ডজন ডজন প্রহরী পোষার খরচাটা বাঁচে। রোবেন আইল্যান্ড কেপ টাউন থেকে দূরে নয়, বাইনোকুলার দিয়ে নজর রাখা যায়, কিন্তু পথ দুর্গম; তার আশে পাশে অজস্র মগ্ন মৈনাক, ঝোড়ো হাওয়ায় আকস্মিক উচ্ছলিত আটলান্টিকের জলরাশি, পালাবার পথ নাই। অন্তত দু ডজন জাহাজ ডুবেছে এখানে নোঙর বাঁধতে গিয়ে। কারাগারে পাহারাদার লাগবে কম। ওই দ্বীপ থেকে কেউ সাঁতরে কেপ টাউন পৌঁছুতে তো পারবেই না বরং হাঙরের মেনুতে পরিণত হবে। চিন্তাটি সঠিক। তিনশো বছরে নৌকা যোগে মাত্র দুটি সফল পলায়নের কাহিনি জানা যায়, তবে কোন বন্দীর সাঁতরে কেপ টাউন পৌঁছুনোর রেকর্ড নেই। ... ...