এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  উপন্যাস

  • ভ্রমণ কাহানি(৭ ) :উপল মুখোপাধ্যায়  

    upal mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | উপন্যাস | ২৩ জুন ২০২৪ | ৬৩৪ বার পঠিত
  • | | | | | | ৭  | ৮  |
    অনেক আশা নিয়ে নর্থ বেঙ্গল এসে বাবাইয়ের বড় মন খারাপ এ জানি বলে খুব সাবধানে কথা বলতে হবে। এখানে আসার পর থেকেই প্রদীপ বারবার বলছে, ” কিরে বাবাইকে ফোন করবি না।“ আমি না শোনার ভান করে গাড়ি চালাতে থাকি। তখন সবে বাগডোগরা পেরিয়ে লাইন দিয়ে চা বাগান শুরু হয়েছে রাস্তার পাশ দিয়ে। আমি বললাম, ” বিনোদ, এই চা বাগানটার নাম জান।“ বিনোদ বলল , ” আগে এসেছিলাম দাদা তবে রাস্তার দিকেই নজর ছিল। চা বাগানের নাম বলতে পারব না। “ আমি বললাম, ” আমিও বলতে পারব না। “ প্রদীপ বলল, ” বলতে পারবি না তো জিজ্ঞেস করলি কেন।‘’ বুবাই বলল, ” তাতে কী হয়েছে ?’’
    ------- তাতে কী হয়েছে মানে ?
    ------- তাতে কী হয়েছে মানে তাতে কী হয়েছে - ব্যাস মিটে গেল।
    ------- কাজের কথা কিছু হবে না খালি আট ভাট !
    ------- কাজের আর কী আছে। ভাট বকতেই তো আসা।
    ------ মোটেই নয় !
    ------ আচ্ছা তুই বল।
    ------ তখন থেকে বলছি বাবাইকে ফোন করতে।
    ------ করছি, কারশিয়াং থেকে বেরিয়েই ফোন করব।
    ------ ঢুকেছি এই খবরটাও দিবি না ?
    ------ সারপ্রাইস দেব।
    ------ মানে ?
    ------ হঠাৎ বলব আচমকা।
    ------ বোঝ !
    ------ সিরিয়াসলি বলছি।
    বুবাই আমার কথাটা ধরে নিয়ে বলেছিল, “ঠিকই তো বলছে, আচমকা বলতে হবে। এমন সময় বলতে হবে যে বুঝতেই পারবে না। “ প্রদীপ দেখল আর কথা বাড়িয়ে লাভ নেই, সে চুপ করে যায়। আমি মিছিমিছি বাবাইকে ফোন করার ভান করে বলি, ”যাঃ লাইনটাই পেলাম না। “ শুনে প্রদীপ কী বুঝল কে জানে আর কথা বলল না। হয়ত মনে মনে গজগজ করতে দেখা গেছে তাকে যা গাড়ি চালাচ্ছিলাম বলে আমার দেখার সুযোগ ছিল না। তখন রাস্তাই দেখলাম আর চা খেতে দাঁড়ালাম দার্জিলিং মোড়ের কাছে, এরপর থেকে বিনোদই চালাবে- পাহাড় শুরু হল বলে।

    কার্শিয়াং টুরিস্ট লজে সকালবেলা চা খেতে খেতে জানলার কোণ দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে আমার বাবাইয়ের কথা মনে পড়ে যায় আর তখনি শিলিগুড়ির হাতায় ঢুকতে না ঢুকতে ওকে খবর দেওয়ার জন্য প্রদীপের তাড়া আর আমাদের ওকে মুরগি বানানোর কথা ভাবছিলাম। কে ওকে বোঝাবে বাবাই থাকে জলপাইগুড়ি শহরে, সেটা খুব কাছে নয়। তাছাড়া ও কোথায় আছে কে জানে, যা খামখেয়ালি হয়ত কলকাতায় চলে গেছে বা অন্য কোথাও নর্থ বেঙ্গলেই বেড়াচ্ছে অথবা বাড়িতেই বসে আছে। ওর নানা জায়গায় থাকার সম্ভাবনার কথা ভেবে লাভ নেই এখন জানলা দিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাক, মানে যতটুকু দেখা যায় এই জানলার চিলতে দিয়ে ততটুকুই আমরা দেখতে থাকি চা খেতে খেতে। প্রদীপ বলল, " ওই জন্য বলে স্লিপিং বুদ্ধ। " আমি বললাম, " ঠিক কী জন্য বলে বলত ?" প্রদীপ খুব একটা কিছু বলতে পারেনি আর বুবাই বলল, " সে বলা বড় মুশকিল- কেন যে বলে। " ও চা খেয়ে আবার বিছানায় লেটকে যাবার তাল করছে দেখে প্রদীপ উঠে পড়ে জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করতে করতে বলেছিল।, " ল্যাদ খাস না বুবাই। আমরা কটায় চেকআউট করছি রে? " বুবাই বলে, ‘’এগারোটা।“ আমি বললাম, " কমপ্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট করে নটার মধ্যে হলে ভালো হয়। " প্রদীপ বলল, " তাড়াতাড়ি পটি -চান করে নে, আমি ঢুকছি। " বুবাই বলল, " গিজারটা চালিয়ে দে, আর এক কাপ চা হলে ভালো হতো। " আমি ফোন করে চা অর্ডার করতে করতে বিনোদ এসেছে কাঁধে গামছা, ওকে বললাম, " কী গো রাতে ঘুম হয়েছিল ?" ও বলে, " ভালোই হল ঘুম, চেনা জায়গায় ঘুমের কোন অসুবিধে হয়নি দাদা। " আমি বললাম, " কোনটা চেনা জায়গা ? রাস্তার ওপর তো ছিলে ঠাণ্ডায়। " ও হেসে বলল, " তাতে কী হয়েছে গাড়ি তো অচেনা নয় যে একলা লাগবে। গাড়ির ভেতর আস্তে আস্তে গরম হয়ে গিয়েছিল। " আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, " টেম্পারেচার বাড়িয়ে, এসি ওন করেছিলে নাকি সারারাত ? " ও বলল, “মাথা খারাপ ব্যাটারি ডাউন হয়ে যাবে না। এমনিই গরম হয়ে যায় রাতে। " মাথামুন্ডু বুঝতে না পেরে আমরা ওর দিকে আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। কখনই চা দিয়ে গেল। বুবাই বলল, " বিনোদ চা খাও। " ও বলল, " না দাদা সকালে বাইরে খেয়েছি। আপনারা চা খান আমি চান টান সেরে নিই ?" প্রদীপ বলল, " ভালোই হল তুমি আগে সেরে নাও। পরপর চারজনে ঢুকতে হবে। একটা বাথরুম। " চা খেতে খেতে বুবাই বলে, " যদি পটি পেয়ে যায়? " প্রদীপ বলেছিল, " প্যান্টে করে দিবি। "
    এভাবে নানান গোলতাল হট্টমেলার মধ্যে সব সেরে আমরা কার্শিয়াং ট্যুরিস্ট লজের রেস্তরাঁয় কম্প্লিমেটারি ব্রেক ফাস্ট খেতে ঢুকেছি, বিনোদের জন্য আলাদা খাবারের অর্ডার দিতে হয়েছিল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, " কী খাবে বিনোদ ?" প্রদীপ বলেছে, "কী আবার, আমরা যা খাচ্ছি। "
    খেয়েদেয়ে , বিল মিটিয়ে পরের ডেস্টিনেশন মংপংয়ের দিকে রওনা দিয়েছিলাম। কাল রাতে জ্যোতিদার খোঁজে বুবাইয়ের কার্শিয়াংয়ে স্কুলে স্কুলে যাওয়া বা আমার দার্জিলিঙে দাদুর জমি খুঁজতে যাওয়ার কোন দরকারই পড়েনি। আমি দেখেছি, বরাবর দেখেছি কিছু কথা রাতেই মনে পড়ে, কথার পিঠে কথা হয়ে হয়ে তারা আসতে থাকে। রাস্তায় বেরলে, গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে বসলে ওই সব অজানা অজানা গন্তব্যের কথা মাথায় আসবে না কিছুতেই। তখন জানা পথে চোখ আর কান অথবা অজানা পথে জিপিএস আমাদের টেনে নিয়ে যাবে। সেদিনও সেরকমই হয়েছিল দার্জিলিঙের পথে খানিকটা গিয়ে ডান দিকে পেশক রোডের রাস্তা ধরে আমরা মংপংয়ের পথে রওনা দিলাম।রাস্তায় যেতে যেতে পাহাড় দেখতে দেখতে, লামাহাট্টার ওখানে আরো বড় রূপে পাহাড় দেখেও তবু রাতের কথারা পেছু ছাড়ে নি। ভাবছিলাম মদের সঙ্গে কি তারা এসেছিল ? মনের কথারা মদের সঙ্গে সঙ্গে আসতে থাকে আর অধিকার করতে থাকে ? কিন্তু বাবা তো মদ খেতো না। সে কেন তবে দার্জিলিঙের জমির কথা, জমি ধ্বসে যাওয়ার কথা বারবার বলে যেত ? লুকিয়ে লুকিয়ে কি বরাবর মদ খেয়ে এসেছে বাবা ? তা কী করে সম্ভব ? বুবাইয়েরই বা হঠাৎ জ্যোতিদার কথা, কার্শিয়াংয়ে জ্যোতিদার স্কুলে পড়ানোর কথা সব কথা এতো নিখুঁতভাবে মনে পড়তে থাকে কী করে ? নেহাতই মদ খেয়ে এরকম হয় নাকি ? বুবাইকে জিজ্ঞেস করব ? তখনই প্রদীপ বলেছে, "করিস না। " আমি বললাম, " তুই কী করে জানলি ?" প্রদীপ বলল, " কিসের কথা বলছিস, কী জানব ? আমি বলছিলাম জানলা বন্ধ না করতে। " আমি চুপ করে থাকি। বুবাই প্রদীপকে বলে, " তোকে বলেছিলাম না ?"
    ------- কী ?
    ------- মনে নেই ?
    ------- কী ?
    ------- মনে করে দেখ।
    ------- কী দেখব ?
    ------- আরে দেখ না।
    ----- কী বলবি তো ?
    ------- মনে কর, মনে কর।
    ------- কী মনে করার কথা বলছিস ?
    ----- প্লেনের লোকেরা পাহাড়ে এলে এক রকমের রোগ হয়।
    ----- রোগ ?
    ------- ওর তাই হয়েছে। রোগ।
    ------- আবার ! বুবাই !
    ------- ওই জন্য এসব বকছে।

    পেশক চাবাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। বাবাইয়ের ফোন এলো, " তোমরা এসেছ ?'' আমি বললাম, " এসেছি। " আর কিছু বলিনি, বাবাইও হুঁ হাঁ করে কেটে দিয়েছে ফলে আবার চাবাগানের দিকে চোখ তো চলে যাবেই। বাবাই মনে হচ্ছে খুব ব্যস্ত, হয়ত রাস্তায় তবে আমি ফোনের সময় কোন আওয়াজ শুনতে ফেলাম না কেন ? রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে ফোন করলেও অবশ্য কখনো কখনো রাস্তা নিস্তব্ধই থাকে। আমাদের সামনের রাস্তাও নিস্তব্ধ পাহাড়ি রাস্তা।প্রদীপকে বললাম, " বাবাই ফোন করেছে। " কি আশ্চর্য প্রদীপও কোন উত্তর দিল না বাবাইয়ের মতো। তাহলে দুজনই কি আমার কথা শুনতে পেল না ? কে জানে।

    একটু পরে আমরা নামতে শুরু করে দিয়েছি। তিস্তাবাজারে গাড়ি দাঁড় করিয়ে চাও খেলাম। পাহাড় থেকে নেমে এলে পাহাড়ের ভাবটা থেকে যেতে পারে আবার নাও থাকতে পারে। তখন সমতলে নেমে আসতে আসতে ঘাড় ঘুরিয়ে লোকে পাহাড়ের দিকে শেষবারের মতো দেখল যে পাহাড়ও তাকিয়ে রয়েছে অনন্তকাল।বহু দূর গিয়ে শেষ পর্যন্ত যখন পাখিদের আওয়াজ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা যাচ্ছিল না — একটা দুটো তিনটে চারটে পাঁচটা পাখির আওয়াজ, যত নিস্তব্ধতা ততো পাখির আওয়াজ, যত সময় ততো পাখির আওয়াজ - দেখা গেল সামনের মহানন্দা অভয়ারণ্যের ওপরের টিলা থেকে আমরা দেখছি তিস্তা নদীকে, বোঝা গেল যাত্রা শেষ হয়েছে। বুবাই বলল,“ আমি তিনটে পাখির আওয়াজ শুনেছি।” প্রদীপ বলল,“ কথা বলিস না তাহলে বুঝতেই পারবি না কত রকম ডাক আসছে।” বিনোদ আমাকে বলেছে,“ আমার একটা ছবি তুলে দেবেন।” ছবি তুলতে গিয়ে দেখলাম প্রদীপের হাতে একটা ক্যামেরা সে তার মধ্যে পটাপট ছবি ভরছে ক্লাশশ্ ক্লাশশ্ ক্লাশশ্। জিজ্ঞেস করেছি, ” ক্যামেরাটা কবে নিলি ?” ও বলেছে, “ সারপ্রাইস!” বুবাই ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে কোথায় গেল কে জানে ? ঘরে গিয়ে দোর দিল কি? বুঝলাম চান করে আসেনি চানের দরকার। করুক গে এই তালে পুরো ইকো কটেজের এলাকাটা ঘুরে আসি। তার আগে পোশাকটা বদলাতে হবে। দরজা ঠেললাম বুবাই খুলে দিল। চান করে ওকে অনেক ফ্রেশ লাগছে।
    বাইরের জামা ছেড়ে হাতমুখ ধুয়ে পোশাক বদলে দেখি বুবাই শুয়ে পড়েছে। ওকে বললাম,“ বেরবি না?” ও কিছু বলল না। ঘরের ভেতরটায় খুব আলো আসে, বড় বড় কাচের জানলা তাতে আব্রু রাখার জন্য পর্দা ঝোলান। আমি পর্দা তুলে দিতে ঘরের ভেতর প্রচুর আলোর কিছু একটা হয় আর চারপাশ থেকে যে সব শব্দেরা আছে তাদের দেখতে পেতে থাকি। কিছু কিছু এরকম জায়গা আছে যেখানের আলোরা সব দেখাতে থাকে। ওই আলোদের থেকে কারুর মুক্তি নেই এমনকি শব্দেরাও বাদ পড়ে না। তাদের দেখতে দেখতে পোশাক বদলে ফেললাম, দেখি বুবাইয়ের হাল্কা নাক ডাকার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। ঘুমিয়ে পড়েছে বুবাই আর আলোরা ওর ওপর চা দরের মতো ছেয়ে আছে। কী রকম যেন আশ্চর্য হতে আরম্ভ করলাম। আর আস্তে আস্তে দারজা বন্ধ করে বাইরে চলে আসতে শুরু করেছি। খেয়াল রাখতে হবে যাতে ওর ঘুম না ভাঙ্গে আর আলোর জগতে ঢুকতে শুরু করেছি, বাইরে এলাম। এসে দেখেছি শব্দেরা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে তবে তাদের শুনতে চাইলে চোখ বন্ধ করে বসে থাকতে হয়। এখন হাওয়া দেবে না। হাওয়া দেবে রাতে। রাতের কিছু হাওয়া নিয়ে বসে রইলাম সিমেন্টের বসার জায়গায়। অনেকগুলো বসার জায়গা বানিয়েছে তাদের মাথায় সিমেন্টের ছাতা লাগানো আর সামনেটা সুন্দর করে বাগান করেছে। সেখানে যে ফুল ফুটছে তাতে মানুষের খুব আনন্দ। গাছের প্রাণে কী রকম আনন্দ আনা যায়, কিসে উদ্ভিদের আহ্লাদ সেসব ভাববোই বা কেন ?
    কটেজগুলো একটা টিলার ওপর। সরু রাস্তা নেমে গেছে টিলা থেকে। সামনে একদম কাছে রেল লাইন চলে গেছে আর দূরে তিস্তা নদী পড়ে আছে। নদীর জল চলাচল করলেও তা দেখা যায় না, একটা হালকা কুয়াশার চাদর ঢেকে রেখেছে। টিলার ওপর থেকে সূর্যাস্ত বা সূর্যোদয় দেখার জন্য মোটেই আসিনি - এসেছি কুয়াশার ভেতর দিয়ে শব্দ শুনতে। এখন বেশির ভাগ শব্দ পাখির। তারা টিলার তলা থেকে উঠে আসছে। সেখানে কি মহানন্দার জঙ্গল ? এতো কাছেই জঙ্গল থাকতে পারে ? টিলার তলায় যাবার সরু রাস্তা বেয়ে প্রদীপ আর বিনোদ উঠে এলো। ওদের বেশ ঘামতে দেখে বললাম, “ খুব খাড়াই। “ প্রদীপ বলেছে, ‘’ বেশি না। এমন কিছু না। “ আমি বললাম, “ নামব।‘’ প্রদীপ বলেছে, ” এতক্ষণ কী করছিলি ?” আমি বলেছি ” ড্রেস চেঞ্জ করছিলাম। ” ও বলল, “ যত গেঁতো! আর বুবাই ?”
    ------ ঘুমচ্ছে।
    ------ ঘুমচ্ছে !
    ------ হ্যাঁ।
    -------- বলার নেই কিছু !
    -------- কেন ?
    -------- কী বলব ?
    -------- বল কিছু। না বলতেও পারিস।
    -------- খাওয়া -ঘুম - মাল খেয়ে । থাক।
    -------- পাখির ছবি পেলি ?
    -------- দারুণ দারুণ সব পেয়েছি।
    -------- তাই !
    -------- এই দেখ।
    —— আমি পাখির ডাক শুনছিলাম। টিলার ওপর থেকে, দেখছিলাম।
    —— পাখির ডাক শোনা যায় কিন্তু দেখছিলি কী করে গাছের জঙ্গল সব নিচেতে ?
    —— যায়।
    ------ কী যায় ?
    ---- - দেখা যায়।
    ----- কী ?
    ----- শব্দ। পাখির ডাক।
    ----- দেখা যায় !
    ----- যায়।
    ----- কী সব বলছিস !
    —— আমি তো শব্দ দেখতে পাচ্ছি।
    —— দেখছিস?
    —— হ্যাঁ।
    —— কিসের?
    —— পাখির, হাওয়ার।
    —— হাওয়ার শব্দ?
    —— হ্যাঁ, দেখছি হাওয়ারা শব্দ করছে। রাতে আরো শব্দ করবে।
    —— কী করে জানলি ?
    —— আগে এসেছিলাম তো।
    —— এসেছিলি ?
    —— তখন শব্দ শুনেছি। হাওয়ার।
    —— আমরাও অনেক পাখির শব্দ শুনছিলাম।
    —— টিলার তলায় কি অন্ধকার ?
    —— না।
    —— তবে?
    ——টিলার তলায় সব দেখা যাচ্ছিল।
    —— আর?
    প্রদীপ বলল,“ আর একটু কুয়াশা ছিল ছিল ওখানে, নাকি বেশিই ছিল কুয়াশা?” বিনোদ বলল,“ তবু সব দেখা যাচ্ছিল।” প্রদীপ বলল,“ তা ঠিক তবে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল এটা বলা যাবে না।” আমি বললাম, “ ওই জন্য তোরা শব্দ দেখতে পাস নি।” প্রদীপ বলল,“ দেখতে পেলে কি শুনতে পেতাম না?” আমি বলেছিলাম,“ কী জানি। ”
    মংপংয়ের বাংলোয় দুপুরের লাঞ্চ না খেয়ে আপার ফাগু অবধি ঘুরে এসেছিলাম যেমনটা বাবাই বলল। তারপর খেতে গেলাম বাপিদার হোটেলে মাল বাজারে। গিয়ে দেখি সেখানে খুব ভিড় হয়ে আছে –গিজগিজ করছে লোক। আমাকে দেখে বাপিদা বলল, ”আসুন আসুন। একটু বসতে হবে কিন্তু। “ আমি বললাম, ” আচ্ছা ঠিক আছে। “ তখন প্রায় তিনটে, বুবাইকে জোর করে ঘুম ভাঙ্গিয়ে তুলে আনায় বেদম খচে রয়েছে ভেতর ভেতর বলল,” তোদের খালি ছোটাছুটি। কত সুন্দর কটেজটা ওখানেই লাঞ্চ করলে হত।“ প্রদীপ বলল, ” তুই তো কটেজের বাইরে বেরলিই না।‘’
    ----- তাতে কি ?
    ----- দেখলিই না টিলার তলায় গিয়ে।
    ----- না গেলেও বোঝা যায়।
    ----- কি ভাবে ?
    ----- ছবি দেখে।
    ----- কিসের ছবি ?
    ----- কোন কটেজের ?
    ----- কটেজের মংপং ইকো কটেজের, ফরেস্ট ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ওয়েব সাইটে সব ছবি দেওয়া আছে।
    ----- খালি বাতেলা !
    ----- বাতেলা নয় সত্যি, এই দেখ।
    এদের ঠোকা ঠুকি ছোটবেলা থেকে শুরু হয়ে এই মাঝ বয়েস অবধি পৌঁছেছে যেভাবে এগোচ্ছে তাতে কবে শেষ বোঝা যাচ্ছে না। এটা নির্ভর করছে কে কেমন করে, কত দিন, কতটা বাঁচব তার ওপর। আমি আগে টেঁসে গেলে এই ছোটখাটো ঠোকা ঠুকির শেষ দেখতে পাবই না এই আফসোস। ভবিষ্যতের আফসোস নিয়ে ভাবার সময় দিল না বাপিদার হোটেল।জায়গা খালি হতে আমরা খেতে বসে গেলাম আরকি।
    চারটে নাগাদ মংপং ফিরে প্রদীপ যথারীতি বিনোদকে নিয়ে তার কটেজে ঢুকল আমি আর বিনোদ অন্যটায়। একটু ঘুমিয়েই পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙ্গল যখন অন্ধকার নেমে এসেছে। বাইরে গিয়ে দেখি বাতাস বইছে।বুবাইকে ডাকলাম আর আমি বারান্দায় বসে চা খাচ্ছিলাম। প্রদীপ দেখি মরা আলোয় ক্যামেরা নিয়ে কিছু করছে। সেই দেখে বুবাই নড়েচড়ে উঠল। আমি বললাম, ” ডাকিস না। “ ডাকতে হল না প্রদীপ নিজেই এসে বলেছিল,’তুই ঠিকই বলেছিলি। ”
    ------ কি ?
    ------ আলো পড়ে আসতেই একটা হাওয়া দিতে আরম্ভ করল। কখন শুরু হবে তার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু আমার অজান্তেই শুরু হল যে কখন।
    ----- ওই রকমই হয় আরকি।
    ----- সবসময় ?
    ----- তাই তো মনে হয়। আস্তে আস্তে হাওয়া বাড়বে দেখিস আর একটা শোঁশোঁ করে শব্দ হবে।
    ----- মহানন্দা ফরেস্ট রেঞ্চ থেকে আসে।
    ----- কি ?
    ----- হাওয়া।
    ----- রাতে কি খাবি ?
    ----- হাওয়া।
    ----- কি ?
    ----- হাওয়া খাব।
    ----- শব্দ শুনবি না ?
    ----- কিসের ?
    ------ হাওয়ার।
    ------ হবে ?
    ------ নিশ্চয়ই, হাওয়ার শব্দ বাড়তেই থাকবে।
    ------ খুব হাওয়া ?
    ------ দেবে।
    বাতাস কেন বইছে তার কারণ হিসেবে সামনে জঙ্গল আছে আর আছে তিস্তা যার জল একটু ওপর থেকে দেখেছি আর টর্চ অতো বড় কিছু আনি নি যে বালির ওপর ফেলে তার চিকচিক দেখতে পাব।আরও রাতে কটেজের সামনে সেই বনের হাওয়ার ঝড়ের মধ্যে আড়াল করে আগুন ঘিরে কিছু লোক বসেছিল ঠাণ্ডা আটকাতে । দেখলাম তারা উঠতে পারছে না কারণ উঠলেই আগুন নিভে যাবে হাওয়ায় তখন আর তাপ পাবে না, আলোও না। বুঝলাম ওই লোকগুলো চাঁদও লক্ষ্য করেনি। সে যে কখন উঠে পূর্ণিমা হয়ে, অমাবস্যার দিকে চলে যায় সে সব না বুঝে শুধু আগুনকে হাওয়া থেকে আর হাওয়াকে আগুন থেকে আড়াল করতে করতে চলে যাচ্ছিল সময়। কিছুক্ষণ পর লক্ষ্য করলে বোঝা যাবে আর সময় বলে কিছু নেই শুধু হাওয়ার আওয়াজ হচ্ছে, সেখানে জঙ্গলের কিছু কথাবার্তা মিশেমিশে যাচ্ছে পূর্ণিমায়। আমরা মদ খেতে খেতে সেসব শুনতে চাইছিলাম নিজের কথা থামিয়ে দিয়ে।

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    | | | | | | ৭  | ৮  |
  • ধারাবাহিক | ২৩ জুন ২০২৪ | ৬৩৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    নো  - albert banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। সুচিন্তিত প্রতিক্রিয়া দিন