এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতি অয়ন মুখোপাধ্যায়

    Ayan Mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৮ বার পঠিত
  • বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা: ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতি
     
    অয়ন মুখোপাধ্যায়
     
    সংস্কৃতি নিরীহ নয়—এই কথাটা যতবার ভুলে যাওয়া হয়েছে, ততবারই রাজনীতি মানুষকে নীরবে গ্রাস করেছে। গান, কবিতা, নাটক, সিনেমা, উৎসব—সবই রাজনীতির অংশ। শুধু সংসদে আইন পাশ নয়, মানুষের কল্পনাজগৎ দখল করাও ক্ষমতার অন্যতম কৌশল। এই প্রেক্ষাপটে “বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা” কোনো রোমান্টিক শিল্পভাবনা নয়, বরং ক্ষমতার বিরুদ্ধে মানুষের সাংস্কৃতিক রাজনীতির এক অপরিহার্য লড়াই।
     
    মূলধারার সংস্কৃতি আজ রাষ্ট্র ও পুঁজির যৌথ উদ্যোগে নির্মিত। তার ভাষা মসৃণ, চেহারা ঝকঝকে, বক্তব্য আপাত-নিরপেক্ষ। কিন্তু এই নিরপেক্ষতাই আসলে তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক কৌশল। যে সংস্কৃতি প্রশ্ন করতে শেখায় না, যে সংস্কৃতি ভোগকেই জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে হাজির করে, যে সংস্কৃতি ধর্ম, জাতি ও জাতীয়তাকে আবেগের মোড়কে অমোঘ সত্যে পরিণত করে—সে সংস্কৃতি ক্ষমতারই সম্প্রসারণ। এই আধিপত্যশীল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েই জন্ম নেয় বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা।
     
    বিকল্প সংস্কৃতি বলতে বোঝায় এমন সাংস্কৃতিক অনুশীলন, যা রাষ্ট্র-অনুমোদিত বয়ানের বাইরে দাঁড়িয়ে সমাজের ভেতরের দ্বন্দ্ব, বৈষম্য ও শোষণকে উন্মোচিত করে। এটি ক্ষমতার ভাষায় কথা বলে না; বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে। গণনাট্য, পথনাটক, প্রতিবাদী কবিতা, শ্রমিক সংগীত, ছোট কাগজের সাহিত্য, স্বাধীন ডকুমেন্টারি—এসবই বিকল্প সংস্কৃতির ভিন্ন ভিন্ন রূপ। এরা সবাই মূলধারার আলোয় নয়, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কথা বলে; কিন্তু সেই অন্ধকারেই লুকিয়ে থাকে বাস্তব জীবনের সত্য।
     
    বিকল্প সংস্কৃতির প্রয়োজন কেন? কারণ মূলধারার সংস্কৃতি সমাজের সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে না। তা মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের স্বপ্ন, ভয় ও আকাঙ্ক্ষাকে সার্বজনীন করে তোলে। শ্রমিকের অনিশ্চয়তা, কৃষকের ঋণ, সংখ্যালঘুর আতঙ্ক, নারীর দৈনন্দিন হিংসা—এসব সেখানে প্রায় অনুপস্থিত বা রোমান্টিক আবরণে ঢেকে দেওয়া। বিকল্প সংস্কৃতি সেই অনুপস্থিত কণ্ঠকে দৃশ্যমান করে।
     
    আরও বড় কথা, বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা রাজনৈতিক সচেতনতার এক মৌলিক ক্ষেত্র। রাজনীতি কেবল ভোটের অঙ্ক নয়; রাজনীতি হলো মানুষ কীভাবে ভাবছে, কীভাবে অনুভব করছে, কীকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিচ্ছে। সংস্কৃতি এই “স্বাভাবিক”-কে তৈরি করে। যখন ধর্মীয় মিছিল উৎসব হয়ে ওঠে, যখন যুদ্ধ দেশপ্রেমের রূপ পায়, যখন বেকারত্ব ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে প্রচারিত হয়—তখন সংস্কৃতি সরাসরি রাজনীতির কাজটাই করে। বিকল্প সংস্কৃতি এই স্বাভাবিকীকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।
     
    বামপন্থী দৃষ্টিতে বিকল্প সংস্কৃতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর শ্রেণিসচেতনতা। এটি বোঝে—সমাজে দ্বন্দ্ব আছে, শ্রেণি আছে, এবং সেই দ্বন্দ্ব সংস্কৃতিতেও প্রতিফলিত। তাই বিকল্প সংস্কৃতি আপস করে না “সবাই এক” কথাটার সঙ্গে। বরং সে দেখায়—সবাই এক নয়, কারও হাতে ক্ষমতা বেশি, কারও হাতে শুধু শ্রম।
    আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর গণমুখী চরিত্র। বিকল্প সংস্কৃতিতে দর্শক কেবল ভোক্তা নয়, 
     
    অংশগ্রহণকারী। পথনাটকে দর্শক প্রশ্ন করে, গান গাইতে গাইতে মানুষ স্লোগান তোলে, কবিতা পাঠে ব্যক্তি অভিজ্ঞতা সমষ্টিগত হয়ে ওঠে। এখানে শিল্প মঞ্চ থেকে নেমে আসে রাস্তায়, পাড়ায়, কারখানার গেটে।
    বিকল্প সংস্কৃতি প্রায়শই আর্থিকভাবে দুর্বল—এটাই তার শক্তি। কারণ কর্পোরেট পুঁজির উপর নির্ভর না করায় সে তুলনামূলকভাবে স্বাধীন। তার ভাষা মুনাফার ভাষা নয়, তার লক্ষ্য বাজার নয়, মানুষ। এই কারণেই বিকল্প সংস্কৃতি প্রায়শই রাষ্ট্রের চোখে সন্দেহজনক, কখনও দেশদ্রোহী।
     
    আজকের সময়ে, যখন দক্ষিণপন্থী রাজনীতি সংস্কৃতিকে অস্ত্র বানিয়েছে—মিথ, ধর্মীয় প্রতীক, ইতিহাসের বিকৃতি দিয়ে—তখন বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা আরও জরুরি। এটি শুধু প্রতিবাদ নয়; এটি বিকল্প কল্পনার নির্মাণ। এমন এক সমাজের কল্পনা, যেখানে মানুষ ভোক্তা নয়, নাগরিক; যেখানে প্রশ্ন অপরাধ নয়, অধিকার।
     
    সবশেষে বলা যায়, বিকল্প সংস্কৃতি চর্চা কোনো অতিরিক্ত বিলাস নয়। এটি গণতন্ত্রের অক্সিজেন। যেখানে প্রশ্ন থেমে যায়, সেখানে ফ্যাসিবাদ শুরু হয়। আর যেখানে বিকল্প সংস্কৃতি বেঁচে থাকে, সেখানেই মানুষ এখনও ভাবতে শেখে, প্রতিবাদ করতে শেখে, এবং স্বপ্ন দেখতে শেখে—আর সেটাই বামপন্থী রাজনীতির সবচেয়ে মৌলিক শর্ত।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। আলোচনা করতে প্রতিক্রিয়া দিন