নামের ইতিহাস (এটা ফেসবুকেও ছিল সেখান থেকে কপি করে দিলাম)
আমার পোশাকী নাম ভুরভুরা। ভুরভুরা যে কিভাবে ভুলেভরা হয়ে গেল, সে এক কাহিনী। তবে আগে বলে নিই, আমি কিন্তু বাঙ্গালী, নিছকই মাছভাত খাওয়া পিওর বাঙ্গালী। আমার নাম ভুরভুরা কপাট। ছোটবেলায় মুখ দিয়ে ভুর্ রর ভুর্ রর…শব্দ করে আমি নাকি অন্যদের প্রভূত আনন্দ দিতাম। তাই আমার ডাকনাম হয়ে গেল ভুরভুরা। মুখেভাতের সময় নামকরণের চল তখনো চালু হয় নি। পোশাকী নামের প্রথম প্রয়োজন পড়ত স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময়। আমার স্কুলে ভর্তি হওয়ার দিন, বাবা গেলেন অফিসে। হেডস্যারের সামনে যাওয়ার সাহস আমার মায়ের ছিল না। অগত্যা ঠাকুর্দার হাত ধরেই প্রথম দিন স্কুলে গেলাম। হেড স্যার ঠাকুর্দার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেনঃ ডাক্তারবাবু, (আমার দাদু ছিলেন ডাক্তার), নাতির নাম কি রাখা হল? আমি তখনও (সম্ভবতঃ গম্ভীর-মুখ হেডমাস্টারমশাই এর মনে পুলক জাগানোর উদ্দেশ্যে) মুখ দিয়ে ভুর্ রর ভুর্ রর…শব্দ করে যাচ্ছিলাম। ঠাকুর্দা আমার দিকে একবার তাকিয়ে বললেনঃ ওর নাম হল ভুরভুরা, ভুরভুরা কপাট। ব্যাস সেই আমার নাম হয়ে গেল ভুরভুরা। নামটা যে অদ্ভুত সেটা কখনও টের পাইনি। এরকম অদ্ভুত নাম তখন দেওয়া হত। আমার এক বন্ধুর নাম ছিল কংগ্রেস। আমাদের সঙ্গে পড়ত একটি মেয়ের নাম ছিল কুড়ানি। কতবার যে সে তার নামের বানান লিখেছে কুরাণী। আমাদের হেডস্যার তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেনঃ তুই কেন খারাপ রাণী হবি, তুই তো সুরাণী। তোর বাবা মা তোকে কুড়িয়ে পেয়েছিল তো, তাই তোর নাম রেখেছে কুড়ানি, ওটা ব-এ শূণ্য র নয় রে মা, ওটা ড-এ শূণ্য র। নাম নিয়ে কুড়ানির কোন অভিমান ছিল না। কিন্তু সে যে তার নিজের মায়ের পেট থেকে বেরোয়নি এটা সে কিছুতেই মানতে পারত না।ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলতঃ আমি তবে কোন মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছি তার কাছে নিয়ে চল। হেডস্যার কুড়ানিকে নিজের বৌএর কাছে নিয়ে বলত এই দেখ তোর আসল মা। তোকে হাসপাতাল থেকে যে ব্যাগে করে নিয়ে আসা হচ্ছিল, সেই ব্যাগে ছিল একটা ফুটো। সেই ফুটো দিয়ে তুই পড়ে গিয়েছিলি রাস্তায়। তোর এখনকার মা তোকে কুড়িয়ে পেয়ে আর ফেরৎ দেয়নি। কুড়ানির মা পাশের বাড়ি (হেডস্যারের বাড়ীর পাশের বাড়িই ছিল কুড়ানিদের বাড়ী) থেকে চেঁচিয়ে বলতঃ নিয়ে নাও মা ঠাকুরণ, নিয়ে নাও, দিয়ে দিলুম তোমাদের কুড়ানিকে। তবে মেয়ে আমার আহ্লাদী। আদর করে খেতে পরতে দিতে হবে কিন্তু। তা কুড়ানি শেষ পর্যন্ত রয়ে গেল হেডস্যারের বাড়ীতেই। হেডস্যারের ছেলে বিলু, তার সাথে বিয়ে হল কুড়ানির, না থুড়ি, শুধু রাণীর। ম্যাট্রিক পরীক্ষার সময় হেডস্যার কুড়ানির নাম পাল্টিয়ে করে দিয়েছিলেন রাণী। তবে বিলুর ধন্ধ এখনো কেটেছে কিনা জানিনা। বিলু ওর বিয়ের কয়েক দিন আগে আমার বাড়ী এসেছিল। আমাকে ছাদে ডেকে নিয়ে ফিসফিস করে বললঃ আচ্ছা ভুরভুরা, কুড়ানি যদি সত্যি সত্যি আমার মায়ের পেটের মেয়ে হয়, তাহলে তো ও আমার বোন। ওর সঙ্গে কি আমার বিয়ে হতে পারে? আমি বললামঃ সে কি রে ? তুই একথা বিশ্বাস করিস নাকি ? বিলু একটু লজ্জা পেল - না, তা ঠিক নয়। সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমার মা আমার থেকেও বেশী ভালবাসে কুড়ানিকে। আমি ওকে আশ্বস্ত করলামঃ ওটা স্নেহ।
একা বিলু শুধু নয়, আমাদের সকলের জীবন আসলে ধন্ধে ভরা। ধন্ধ মানে ধাঁধা, কনফিউসন। গরীব, বড়লোক, বিদ্বান, মূর্খ, ধার্মিক, অধার্মিক আপনি যেমনই হোন না কেন, আপনার জীবনে কোন কনফিউসান নেই - এমনটা হতে পারে না। কারো হয়তো কম, কারো বেশী, কিন্তু শূন্য হতে পারেনা । খেয়াল করে দেখবেন আমি যে ছ’টা প্রজাতির কথা উপরে বললাম (গরীব, বড়লোক, বিদ্বান, মূর্খ, ধার্মিক, অধার্মিক), তাদের মধ্যে বড়লোক, বিদ্বান এবং ধার্মিক - এই তিন প্রজাতির মানুষদের মধ্যে কনফিউসানের হার অপেক্ষাকৃত বেশী তাদের বিপরীত প্রজাতির মানুষদের চেয়ে। লোকে যখন কোন সমস্যা নিয়ে সাধু সন্ন্যাসীদের কাছে সমাধান খুজঁতে আসে, তখন তারা যেটাকে সমস্যা বলেন সেটা আসলে কনফিউসান। কনফিউসনটা যে আসলে কনফিউসনই - সেটা বিলুই আমার কাছে প্রথম প্রতিভাত করে। তখন অবশ্য জানতাম না, তাই বিলুর কনফিউসনকে কনফিউসন হিসাবে চিনতে পারিনি। আমি ভেবেছিলাম যে ওটা একটা প্রশ্ন, তাই প্রশ্নের উত্তর দেওয়াটাই কাজ বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু তাতে বিলুর আসল সমস্যার সমাধান কিছু হয়নি। কনফিউসন ব্যাপারটা যে কি তা নিয়ে পরবর্তীকালে অনেক ভেবে ভেবে একটা উত্তর পেয়েছি। সবাই তারসাথে একমত নাও হতে পারেন, তাতে ক্ষতি কিছু নেই, আলোচনা হতেই পারে। কনফিউসন নিরসন করার একটাই রাস্তা - ভাবতে থাকা এবং অনেক ভাবার পরেও যদি স্থিতাবস্থাই বজায় থাকে, তাহলে আলোচনা করা। আমি আমার ভাবনার কথাটা এখানে জানাইঃ আমাদের প্রত্যেকেরই একটা বিশ্বাসের জগৎ আছে, যাকে আমরা বলি আমাদের ফেইথ সিস্টেম (faith system)। সেই বিশ্বাসের জগৎ যখন ধাক্কা খায়, তখনই তৈরী হয় কনফিউসন। প্রত্যেকের বিশ্বাসের জগৎ বা ফেইথ সিস্টেম কিন্তু আলাদা আলাদা। দুটো মানুষের বিশ্বাসের জগৎ-এর মধ্যে কম বেশী ওভারল্যাপিং থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু একদম এক হতে পারেনা। বিলুর বিশ্বাসের জগতে ছিল কুড়ানি ওর বোন। সেটা ধাক্কা খেল যখন সে জানল কুড়ানির সাথে ওর বিয়ে হবে।
হেডস্যার কংগ্রেসের নাম পালটে করে দিলেন সংগ্রাম। ম্যাট্রিকের আগে যখন নামের বানান, জন্ম তারিখ ঠিকঠাক করা হচ্ছে একদিন কংগ্রেসকে ডেকে বললেনঃ এখন তো সিপিএম এসে গেছে। কংগ্রেসদের জেলে পোরা হচ্ছে। তোর কিন্তু ঘোর বিপদ। কংগ্রেস করুণ মুখ করে বললঃ তাহলে স্যার আমার কি হবে? হেডস্যার বললেন তোর নাম বদলাতে হবে। তোর নাম করে দিলাম সংগ্রাম। গ, স আর অনুস্বর তিনটে বর্ণ একই রইল। শুধু ক-এর বদলে এল ম। সিপিএমের সাথে আর তোর কোন সমস্যা হবে না। হেডস্যারের কথা একেবারে ফলে গিয়েছিল। কংগ্রেস আমাদের জেলায় সিপিএমের বেশ প্রভাবশালী নেতা ছিল। অনেক মন্ত্রী এমএলএ র রাজনৈতিক উত্থানের পিছনে আসল অবদান ছিল সংগ্রামের অর্থাৎ কংগ্রেসের। কিন্তু কংগ্রেস কখনো ভোটে দাঁড়ায় নি। কারণ ওর নাম। নাম বদলালে কি হবে সংগ্রামকে লোকে কংগ্রেস বলেই চিনত। ওকে ভোটে দাঁড় করালে সিপিএম কে দেওয়ালে দেওয়ালে লিখতে হবে কংগ্রেস কে ভোট দিন। সেটা কি করে সম্ভব?
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।