পর্ব-৩
একটা শিষ্যকুল না থাকলে নামের শেষে আনন্দ বসিয়ে স্বঘোষিত স্বামীজী হওয়া যায় না। আমারও একটা পার্মানেন্ট শিষ্যকুল আছে, তবে তার সাইজ মেরেকেটে দুই – একজন শিষ্য, আরেকজন শিষ্যা, শিষ্যের নাম হিজিবিজি - দেখতে প্যাংলা মতন। প্যাংলা শব্দটা বাংলা অভিধানে আছে কিনা আমি কখনও চেক করিনি। আমাদের স্কুলে দেবু আমাকে বলেছিল প্যাংলা হল তারা, যাদের দেখবি কোন মেয়ে পছন্দ করে না। যদিবা কখনও করে, সে অন্য কোন সুবিধা নেওয়ার জন্য। যেমন দেখবি যারা প্যাংলা, কিন্তু পড়াশোনায় খুব মনযোগী, তাদের সঙ্গে মেয়েরা মিশতে চায়। কিন্তু ওই স্কুল জীবনেই। তারপরে যেই একটা সত্যিকারের ভাল ছেলে পেয়ে গেল অমনি প্যাংলা কে ল্যাং মেরে নতুনটার সাথে ঝুলে গেল। মেয়েদের কাছ থেকে ঘন ঘন ল্যাং খেতে হয় বলেই এদের কে বলে প্যাংলা। ল্যাং আর পা – এই দুটো শব্দ দ্যাখ কেমন জড়িয়ে পেঁচিয়ে আছে ‘প্যাংলা’-র মধ্যে। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, আরে তাই তো – ‘প্যাংলা’র মধ্যে যতগুলো স্বরবর্ণ আর ব্যঞ্জনবর্ণ আছে তার কোন না কোন পারমুটেশনে পা আর ল্যাং – দুটোই আছে। ফিজিক্সের সেই কঠিন প্রশ্নটার উত্তর অত সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার পর থেকে, আমি দেবুর ফ্যান। যে কোন কঠিন বিষয় সহজ করে বুঝিয়ে কনফিউশন দূর করার ব্যাপারে দেবুর সহজাত প্রতিভা ছিল। কোন কোন সময় প্রশ্ন যদি কঠিন হয়ে যায়, মানে দেবুর কাছে কোন সহজ উত্তর নেই, ও বলবে, “এই প্রশ্নের উওর জেনে তুই কি করবি?” ‘তুই’ শব্দটার পরে একটু বেশী ঝোঁক দিত। বলতে চাইত, যাদের জানার দরকার তাদের বুঝে নিতে দে। আমি কেন ওই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমার শান্তি বিঘ্নিত করব? এটা কিন্তু ঠিক, সব প্রশ্নের উওর জানা আমাদের জরুরী নয়, তাও আমরা প্রশ্ন করেই যাই। এটাকেই কি কৌতূহল বলে ? আমি জানিনা।
এই রকম এক অদ্ভুত কৌতূহলের গল্প শুনেছিলাম আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কাছ থেকে। গল্পটার মধ্যে একটু অশ্লীলতার গন্ধ আছে। আমি শ্লীলতাহানি না করে রেখে ঢেকেই গল্পটা বলছি। কারণ, গল্পটার শেষে একটা লার্নিং আছে – কৌতূহল একটা লোককে কতদূর নিয়ে যেতে পারে। মেডিকেল কলেজগুলোতে একটা ডিপার্ট্মেন্ট থাকে যার নাম হল VD, পুরো কথাটা হল Veneral Disease অর্থাৎ যৌন রোগ। সংক্রমণ (infection) থেকে শুরু করে না-উল্লম্বন (erectile dysfunction) - এই রোগ তালিকার ব্যাপ্তি বিশাল। একটা বয়সের পর থেকে পুরুষ মানুষের যৌন ক্ষমতা কমতে থাকে এটা ডায়াবিটিস বা হাইপারটেনসনের মতই বৈজ্ঞানিক সত্য। মেয়েদের মনোপজ হওয়ার মতই এটা একটা স্বাভাবিক ঘটনা। একদিন এক সত্তোরর্দ্ধ ব্যক্তি এসেছেন ভিডি তে। অনেক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর যখন তার ডাক এল, তিনি ডাক্তারের কানে ফিসফিস করে বললেন, “ডাক্তারবাবু, আমারটা দাঁড়ায় না।“ ভিডির ডাক্তারবাবুরা রোগীদের ফিসফিস থেকে বুঝে নিতে পারেন রোগটা আসলে কি। কারণ, এখানে কেউ আওয়াজ করে কিছু বলেন না – রোগীরাও না, ডাক্তারবাবুরাও না। আমার যে বন্ধুর মুখে এই গল্পটা শুনেছিলাম, সে সেদিন এপ্রেন্টিস হিসাবে ওপিডিতে উপস্থিত ছিল। রোগী দেখছিলেন তার এক সুরসিক সিনিয়র। তিনিও ফিসফিস স্বরে সেই বৃদ্ধের কানে কানে বললেন, ‘স্ত্রী খুব ডিস্টার্ব করেন, তাই না ?’ বলে একটু মুচকি হাসি দিলেন।
বৃদ্ধ (একটু হতাশ হয়ে) “না, সেরকম কিছু নয়, তিনি বছর পাঁচেক হল গত হয়েছেন।“
প্রেডিকশন মিলল না দেখে, ডাক্তারবাবুর মুচকি হাসিটা চলে গেল। একটু গম্ভীরভাবে বললেন, “তবে এই বয়সে আবার বান্ধবী বানিয়েছেন না কি? সাবধান, টাকা পয়সা হাতিয়ে চম্পট দেবে।“
বৃদ্ধঃ কি যে বলেন ? হাঁটুর ব্যাথার কারণে সকালবেলা হাঁটতে পর্যন্ত যেতে পারি না বছরখানেক হল। আসতো তখন কয়েকজন আমাদের বয়সী বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, ওদের সাথে গল্প করতে ভালই লাগত। তবে আপনি যা ইঙ্গিত করছেন সেরকম কিছু মাথাতে আসেনি।
ডাক্তারবাবুঃ বুঝলাম, তাহলে কাজের মেয়ের সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছেন না কি ? এরাও কিন্ত সাংঘাতিক হয়। একদিন দেখবেন পাড়ায় আপনার সম্মান ধুলোয় মিশিয়ে আপনার সব সম্পত্তি দাবি করে বসবে। আপনার বৌ তো গত হয়েছেন, কিন্তু ছেলেমেয়েরা আর তাদের ছেলেমেয়েরা তো আছে। তাদের সম্মানের কথা আপনি একবার ভাববেন না?
বৃদ্ধঃ আরে না না ডাক্তার বাবু, আমাদের বাড়ীতে কোন কাজের লোক নেই। আমি তো মেয়ের সাথে থাকি। আমার জামাই বড় সরকারী চাকুরে হলে কি হবে, স্বভাবচরিত্র ভাল নয়। মেয়ে তাই কাজের মেয়ে রাখে না। ঘরের যা কিছু কাজ, মেয়ে নিজেই করে। আর কি সব যন্ত্রপাতি আছে তাতেই রান্নাবান্না, ঘরদোর পরিষ্কার, কাপড় কাচা সব কিছু হয়ে যায়। মেয়ে যখন কাজে বেরোয়, বাইরে থেকে দরজা লক করে যায়, আমি তখন একাই ঘরে থাকি ।
ডাক্তারবাবুর ধৈর্য অসীম, একটা রোগীকে এতক্ষণ সময় দেওয়া – তাও আবার হাসপাতালের ওপিডিতে, এটা ব্যতিক্রম। আবার এমনও হতে পারে, সত্যিকারের কথোপকথনে এত সময় লাগে না, মনে করে করে লিখতে আমার বেশী সময় লেগে গেল। যাইহোক গল্পটা এখনও শেষ হয়নি, তবে আমরা শেষের কাছাকাছি চলে এসেছি।
ডাক্তারবাবুর সেই রসালো মনটা আবার ফিরে এলো। এত সময় গম্ভীরভাবে প্রশ্ন করছিলেন, মাঝে মাঝে বিজ্ঞ সমাজকর্মীর মত বৃদ্ধকে সচেতনও করে দিচ্ছিলেন। এবার সেই রসালো হাসিটা মুখে চাপিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “তা আপনার কাছেও তো একটা চাবি থাকে, বাইরে বেরোনোর জন্য।“
বৃদ্ধঃ তা থাকে, একলা ঘরে থাকলে কতরকেমের বিপদ আপদ হতে পারে। আমার কাছে একটা চাবি থাকে, যাতে এমার্জন্সী সিচুয়েশনে আমি লক খুলে বেরোতে পারি।
ডাক্তারবাবুঃ “তবে ………(একটু টেনে) এইবার বুঝতে পেরেছি, আপনি কখনসখনও তালাখুলে বেরিয়ে ওইসব নোংরা গলিতে যান। এইবার যদি সিফিলিস গনোরিয়া হয় তাহলে কি হবে ? পরেরদিন আপনি বাড়ীর কাউকে সঙ্গে নিয়ে আসবেন। আপনাকে এইসব কুঅভ্যাসগুলো আগে ছাড়তে হবে, তবে আপনার চিকিৎসা শুরু হবে।“
বৃদ্ধ এবার রেগে গেলেন, “আপনি মশাই আমাকে চরিত্রহীন ভাবছেন ? আমার ওসব কিস্যু হয় নি। আমি শুধু বলেছি, আমার টা শক্ত হয় না। আপনাদের আর কোন রোগ আমার নেই।“
ডাক্তারবাবু এবার সত্যি সত্যি বিমর্ষ হলেন, “আমি তো বুঝতে পারছি না আপানার শক্ত হওয়ার দরকার টা কি, আপনি ওখানে হ্যাঙ্গার ঝোলাবেন নাকি?”
এর পরবর্তী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আমার জানা নে ই, কেননা আমার সেই ডাক্তারবন্ধু এইখানেই গল্পটা শেষ করেছিল। আমাদের কলেজ জীবনে এই গল্পটা “হ্যাঙ্গার ঝোলানোর গল্প” হিসাবে অনেকদিন চালু ছিল । আমিও এটাকে একটা কৌতূহল-জনিত কনফিউসনের গল্প হিসাবে জমিয়ে রেখেছিলাম। তবে আমি এতদিন ধরে এই গল্পটাকে দেখে এসেছি ওই সত্তরোর্দ্ধ বৃদ্ধ মানুষটির দৃষ্টিকোণ থেকে । যে রোগ তার জীবনে সামান্যতম কোন প্রভাবও ফেলছে না, সেটাকে নিয়েও তিনি কতটা কনসার্নড্ । একই ভাবনা দিনের পর দিন ভাবতে ভাবতে তিনি হয়ত কোন মানসিক রোগ বাঁধিয়ে ফেলেছেন বা তাকে এন্টি-ডিপ্রেসাণ্ট ট্যাবলেট খেতে হচ্ছে। আজকে যখন ঘটনাটা লিখতে বসেছি, তখন মনে হচ্ছে অতিরিক্ত কৌতূহলটা ছিল ডাক্তারবাবুর তরফেই। তার বাপু অত খবরে দরকার কি? রোগী কোথায় যায় না যায়, কার সঙ্গে ফস্টিনষ্টি করে এটা জানা কি চিকিৎসা পদ্ধতির অঙ্গ? আমি ঠিক জানি না। ডাক্তারবাবুরা হয় তো এব্যাপারে কোন আলোকপাত করতে পারেন। চিকিৎসা শাস্ত্র যে কনফিউসন তৈরী করতে সবচেয়ে সিদ্ধহস্ত, এব্যাপারে একমাত্র ডাক্তারবাবুরা আর তাদের এলায়েড সার্ভিসগুলোর সাথে যুক্ত লোকজন ছাড়া সকলেই সহমত হবেন।
হিজিবিজির কথা বলতে গিয়ে কৌতূহলে ঢুকে পড়লাম। কারণ, তার কৌতূহল অসীম। এই অতিরিক্ত কৌতূহলের কারণেই সে জীবনে, আমরা আপামর জনতা যাদের সফল বলি, তা হতে পারল না। হিজিবিজি প্যাংলা। আর এলোমেলো - সকালে একজনের, তো বিকালে আরেকজনের মাথা খেলো। এলোমেলো সুন্দরী। তবে আপনারা যা ভাবছেন, ব্যাপারটা সেরকম নয়। দুজনের মধ্যে সেই অর্থে কোন প্রেম, প্রীতি ভালবাসার সম্পর্ক নেই। একটা আলগা বন্ধুত্ব আছে । আলগা বললাম এই কারণে যে তারা নিজেদের মধ্যে যত না কথা বলে, তার চেয়ে ঝগড়া করে বেশী। আর ঝগড়া করতে গেলেও দেখবেন একটা ন্যুনতম বন্ধুত্ব লাগে। তাদের মধ্যে বয়সের ফারাক, যেমন কথোপকথনের শুভঙ্কর আর নন্দিনী। দুজনেরই ভরা সংসার। যে যার নিজের কক্ষপথে ঘোরে। হিজিবিজি তার বৌ-এর ভয়ে ত্রস্ত। রাগ ভাঙাতে হয় অনেক হাতেপায়ে ধরে। এলোমেলোর বর, সে মোটামুটি স্বনির্ভর। এলোমেলোকে মাথা ঘামাতে হয় না তার বরের জন্য। বৌ ছাড়াও তার আছে এক জগৎ অন্য। কিন্তু এলোমেলোর শাশুড়ী, তিনি জাঁদরেল, আর তার বায়নাক্কা ঝুড়িঝুড়ি। সকালে ডিমের পোচ তো সন্ধ্যায় চাই বেগুনি-মুড়ি। আর সব আবদার তার এলোমেলোর কাছে। মেনেও নিয়েছে এলোমেলো, পিছন থেকে বাগড়া দিয়ে পাছে, তার সময় নষ্ট করে আরও। এলোমেলো বাস্তববাদী। আগে থেকে বুঝে নেয়, কোথায় হালকা, আর কোথায় দিতে হবে মনযোগ গাঢ়।
হিজিবিজি আর এলোমেলো – এই দুজনকে আনতেই হল এই গল্পে, কারণ বেশীর ভাগ কনফিউশনের গল্প তারাই যোগাড় করে আনে। দুজনে গলা ফাটিয়ে তর্ক করে, মীমাংসায় না পৌঁছাতে পারলে আমার কাছে আসে। আমাকে তারা দুজনেই মানে। হিজিবিজি ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হতে না পেরে সাইন্স পড়েছে, আর এলোমেলো পড়েছে আর্টস। যেমন হয় আর কি – হিজিবিজি ভাবে সকলের সাইন্সই পড়া উচিৎ। আর এলোমেলো ভাবে আর্টস ও কম জরুরী নয়। ভাল রেসাল্ট করলে আর্টসের ছেলেমেয়েরাও ভাল চাকরী পেতে পারে। প্রসঙ্গতঃ বলে রাখি হিজিবিজি আর এলোমেলো দুজনে এক পাড়াতেই থাকে, আর তাদের পাড়ারই এক ধনী মুসলমান তার চার বছরের নাতিকে পাঠাতে চান মাদ্রাসায়। সেই বাচ্চার বাবা আবার আধুনিকমনস্ক, সে চায় তার ছেলেকে ইংরেজী মিডিয়ামে পড়াতে। কিন্তু বাবার মুখের পরে কথা বলা তাদের পরিবারের রীতি নয়। তাই সে এসে ধরেছে এলোমেলোকে যদি সে তার বাবাকে কনভিন্স করাতে পারে। একা যেতে ভরসা পায়নি বলে এলোমেলো আবার হিজিবিজি কে সঙ্গে নিয়ে গেছে। দুজনে সেই বাচ্চাটির ঠাকুর্দাকে কিছুটা হলেও কনভিন্স করতে পেরেছে বলে মনে হল। তিনি শেষমেষ বলেছেন – আচ্ছা, ভেবে দেখব। কিন্তু হিজিবিজি আর এলোমেলো তখনও একমত হতে পারেনি।
আমি আমার দোতলার ঘর থেকে শুনতে পেলাম, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে হিজিবিজি বলছে মাদ্রাসাতে পড়লে যে বড় কিছু হওয়া যায় না, এই কথাটা ঠিক নয়। তুই কি জানিস, ওমর খৈয়াম যে কিনা একাধারে কবি এবং গণিতজ্ঞ সেও তার দেশের মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছে ? তুই আল-খারিজমি’র নাম শুনেছিস। তার হত ধরেই আমাদের বীজগণিতের শুরু। এই আল-খারিজমি’র পড়াশোনাও মাদ্রাসাতে। তুই নেপিয়ারের নাম জানিস ? সে যখন লগারিদ্ম্ আবিষ্কার করে, সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা তাকে ভগবান বলে মানতো। সে চার্চের স্কুলে পড়াশোনা করেছে। আর অতদূর বিদেশেই বা যেতে হবে কেন? আমাদের ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায় – এরাও তো হিন্দু মাদ্রাসায় মানে সংস্কৃত টোলে লেখাপড়া করেছেন। এবার এলোমেলো বলতে শুরু করল – তুই থাম্ তো। ধর্মীয় স্কুলে পড়লে শুধু ধর্মকর্ম শিখবে। তারপর চাকরী বাকরি কি করবে শুনি? সে কি ইমাম হবে ? ততক্ষণে তারা আমার মুখোমুখি। আমি বললামঃ তোরা এত ধর্ম ধর্ম করছিস কেন? ধর্ম ব্যাপারটা ঠিক কি ?
এলোমেলো বললঃ ধর্ম আবার কি ? ধর্ম হল যেমন হিন্দু, মুসলমান, খৃষ্টান।
হিজিবিজিঃ ধর্ম হল বিশ্বাস। হিন্দুরা শিব-দুর্গাকে বিশ্বাস করে, মুসলিম রা আল্লাহ কে মানে, খৃষ্টান রা জেসাস কে মানে।
আমিঃ একদম ঠিক। ধর্ম কথাটার মানে হল ধরে রাখা বা বেঁধে রাখা। ইংরেজীতেও religion কথাটা এসেছে religare থেকে যার মানে হল bind বা বেঁধে রাখা। কিন্তু এই বেঁধে রাখার মানে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা নয়। এই বেঁধে রাখা হল বিশ্বাস দিয়ে বেঁধে রাখা। আর বিজ্ঞান কি ?
হিজিবিজিঃ বিজ্ঞান হল যুক্তি। বিজ্ঞান আমাদের প্রশ্ন করতে শেখায়।
আমিঃ ঠিক। আর আর্টস্ ?
এলোমেলোঃ আর্টস্ হল সৌন্দর্য, expression of emotions, যারা আর্টস্ বোঝে, তারা সৌন্দর্যকে উপভোগ করতে পারে। যারা সেই সৌন্দর্যকে সকলের সামনে প্রকাশ করতে পারে তারা হল আর্টিস্ট। আর তার জন্য লাগে আবেগ বা emotion. যাদের emotion আছে তারা সুন্দরকে দেখতে পায় আর প্রকাশ করতে প্যাঁরে।
হিজিবিজি দেখলাম মুগ্ধ হয়ে এলোমেলোর দিকে তাকিয়ে আছে। “তুই কিন্তু খুব সুন্দর কথা বলতে পারিস, এলোমেলো।“
এলোমেলোঃ আরে সেটা আর্টস পড়েছি বলেই তো পারি। তুই তো আলফা বিটা এক্স ওয়াই ছাড়া কোন বাক্যই ঠিকমত বলতে পারিস না।
এই আবার দুজনের ঝগড়া শুরু হল। আমি তাড়াতাড়ি তাদের থামিয়ে দিলাম। “তাহলে, আমাদের জীবনে কি প্রয়োজন – রিলিজিয়ন, সাইন্স না আর্টস্?
হিজিবিজিঃ সাইন্স। মানুষের মনে যদি বৈজ্ঞানিক চেতনা জাগ্রত না থাকে, তাহলে সে কুসংস্কারাচ্ছন্ন হয়।
এলোমেলোঃ না শুধুই সাইন্স থাকলে আমাদের জীবনটা যন্ত্র হয়ে যাবে। আমরা টেকনোলজি চা ই, আবার কবিতা, গান এসবও চা ই। লজিকও চা ই, ইমোশন ও চা ই।
আমিঃ আর ধর্ম ? ধর্ম চাই না ?
এলোমেলোঃ না, ধর্ম চাই না ? ধর্ম মানেই হল মারামারি আর হানাহানি।
হিজিবিজি দেখলাম চুপ করে আছে। হিজিবিজির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলাম, হিজিবিজি, তোর কি মনে হয়? ধর্ম চাই না চাই না ?
হিজিবিজিঃ আমি একটু কন্ফিউস্ড্, ভুল্ভুলারা দা। একবার মনে হচ্ছে চাই , আরেক বার মনে হচ্ছে চাই না।
আমিঃ কখন মনে হচ্ছে চাই না?
হিজিবিজিঃ এই যখন দেখি ধর্মের নামে দেশ ভাগাভাগি হচ্ছে, মানুষ খুন হচ্ছে, তখন আমি এলোমেলোর সাথে একমত। আমি ধর্ম চাই না।
আমিঃ আর কখন মনে হচ্ছে ধর্ম চাই?
হিজিবিজিঃ ধর্ম হল বিশ্বাস। আমাদের কোন নিকট-আত্মীয়ের যদি জ্বর, পেটখারাপ হয় আমরা ডাক্তারের কাছে যাই। মন্দির মসজিদে দৌড়াই না। কিন্তু বড় কিছু হলে আমরা বাবাস্থানে হত্যে দিয়ে পড়ে থাকি। অর্থাৎ যখন আমাদের পার্থিব ব্যবস্থার ‘পরে আস্থা কমে যায়, আমরা ধর্মের আশ্রয় নিই। এটা ছাড়া আমাদের করণীয়ই বা কি ?
এলোমেলোঃ আপনি বলুন ভুলেভরা দা, আপনার মতামত টা কি ?
আমিঃ ধর্মের সংজ্ঞা যারা টিকি, পৈতে আর দাড়ি, বা পোশাকের রং দিয়ে ঠিক করে, আমি তাদের মানিনা। এইযে কিছুক্ষণ আগেই হিজিবিজি বলল, ধর্ম হল বিশ্বাস। আমি এইটাকে মানি। আমরা যুক্তি আর বিশ্বাসকে একে অন্যের শত্রু বলে ভাবি, আর এই ভুলভাবনাটাই যত কনফিউসনের জন্ম দেয়।
এলোমেলোঃ তবে কি বিশ্বাস আর যুক্তি পরস্পরের বন্ধু ?
আমিঃ অবশ্যই। আসলে বিশ্বাস, যুক্তি আর আবেগ – এক মায়ের তিন সন্তান।
হিজিবিজিঃ মা’ টা কে ?
আমিঃ সেটা আরেকদিন আলোচনা করা যাবে ‘খন। কিন্তু দেখবি যদি বিশ্বাস, যুক্তি আর আবেগ – এই তিনটে জিনিষ আমাদের জীবনে পরিমিত মাত্রায় না থাকে, তাহলে সে পূর্ণ হবে না। আমরা তো এমন মানুষ দেখি যারা বিশ্বাসের উপরেই বেঁচে থাকে। মনে কর একজন মানুষ যে যুক্তি জানে না, আবেগ বলেও তার কিছু নেই। সেই মানুষ কি ধরণের মানুষ হবে? তাকে যা বলা হবে সে তাই করবে। সে যার কথা মানে সে যদি একজন ভাল মানুষ হয়, তাহলে সে তার দেবতার কথা শুনে অনেক ভাল ভাল কাজ করবে। সাধুসন্ত পীর বাবা দের আখরায় আমরা এরকম মানুষ দেখতে পাই। কিন্তু তাদের গুরু যদি শয়তান হয়, তাহলে তাদেরকে দিয়ে অনেক খারাপ কাজও করানো যেতে পারে। গুণ্ডা বদমাস রাজনৈতিক নেতাদের চ্যালাচামুণ্ডারা দেখবি এই ধরেণের হয়।
এবার আরেকজন মানুষের কথা ভাব – যার মধ্যে বিশ্বাস আর আবেগ শুন্য। তার জীবনের একশ ভাগই যুক্তি।
এলোমেলোঃ যেমন, হিজিবিজি ?
হিজিবিজিঃ দেখেছেন তো ভুলেভরা দা, আপানার কথা শোনায় ওর মন নেই। আমার পিছনে লাগছে। আর শোন্, এই রকম প্রবল যুক্তিবাদী মানুষেরাই প্রথিতযশা বিজ্ঞানী হন। তারা যুক্তি দিয়ে আমাদের বস্তাপচা ধ্যানধারণাগুলো বদলে দেন।
এলোমেলোঃ মোটেই না। এরা পাগল হয়।
আমিঃ এলোমেলো কিন্তু একদম ঠিক বলেছে। এরা পাগল হয়। হিজিবিজি, তুই ভেবে দেখ, যার বিশ্বাস শূন্য, সে কোনকিছুই বিশ্বাস করে না, সে কোন কিছুই মানে না। সে কিন্তু অসুখ হলে ডাক্তারের কাছে যাবে না, কারণঃ সে বিশ্বাস করে না ডাক্তারের ওষুধ খেলে অসুখ সেরে যাবে।
হিজিবিজিঃ তাহলে সে এটা বিশ্বাস করে যে ডাক্তারের ওষুধ খেলে অসুখ সারবে না।
আমিঃ সেটা যদি হত তাহলেও তার একটা বিশ্বাস আছে। বিশ্বাস টা ঠিক না ভুল সেটা পরের প্রশ্ন। তোরা যারা সাইন্স পড়েছিস তারা কিন্তু গ্যালিলিও, কোপার্নিকাস, নিউটন, আইনস্টাইন বা বড় বড় বিজ্ঞানীদের কথা বিশ্বাস করিস। সেটাও কিন্তু বিশ্বাস। আর রিলিজিয়ন আমাদের শেখায় সবকিছু তুমি একা যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করতে পারবে না। তোমাকে বিশ্বাস করতে হবে। যার বিশ্বাস নেই তারা পেণ্ডুলামের মত একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে যায়। তারা সবসময় সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।
এলোমেলোঃ কিন্তু ধর্ম খারাপ জিনিষকেও বিশ্বাস করতে শেখায়। তাই না?
আমিঃ না, সেটা ধর্ম নিয়ে যারা ব্যবসা করে, বা ধর্মের মাধ্যমে নিজে লাভ করতে চায়, তারা করে। এটা ধর্মের অপব্যবহার। একই জিনিষ সাইন্স আর্ট্সেও আছে। ঘেঁটে দেখলে সেখানেও প্রচুর জালিয়াতির উদাহরণ পাবি। সাইন্স আর্টসের দুনিয়ায় যখন জাল জোচ্চুরি ধরা পড়েছে – সেগুলোকে ছেঁটে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে সাইন্স বা আর্টস পুরোটাই মিথ্যে।
হিজিবিজিঃ আর এমন মানুষ কেমন মানুষ হবে যার শুধুই আবেগ – বিশ্বাস শূন্য, যুক্তিও শূন্য।
আমিঃ এরা হতে পারতো খুব উঁচু মানের শিল্পী। কিন্তু যেটা আজ তার মনে হচ্ছে অনবদ্য, কাল সেটাকে মনে হতে পারে সবচেয়ে কুৎসিত। আর সেটা যখন তার মনে হবে, সে নিজের সৃষ্টিকেই ভেঙ্গে চুরমার করে দেবে। বাস্তবে আমরা এদের আমরা কি বলে ডাকি?
হিজিবিজিঃ এলোমেলো কে আমরা যে নামে ডাকি – পাগল।
আমিঃ ঠিক, তবে এলোমেলোকে পাগল বলে তুই কিন্তু ঠিক করছিস না। এই যে তিন প্রকারের মানুষের কথা আমরা আলোচনা করলাম, তেমন মানুষ পৃথিবীতে নেই। যদি থাকে তাহলে তারা হয় পাগল নাহলে অন্ধভক্ত। অন্ধভক্ত সে ভগবানেরও হতে পারে, আবার শয়তানেরও হতে পারে। তবে শয়তানের পাল্লায় পড়ার সম্ভাবনাই বেশী। ভগবান আর শয়তানের মধ্যে ফারাক করতে হলে কিন্তু যুক্তির ধার লাগে। আমরা যারা আমজনতা তাদের তিনটে জিনিষই কমবেশী থাকে। কারও এটা বেশী, তো আরেকজনের ওটা।
আমার পিছন থেকে যেন কোন দৈববাণী হল – “বিশ্বাস, যুক্তি আর আবেগ – এই তিনটে জিনিষ ত্রিভুজের তিন বাহুর মত – সবসময়ে একটা ব্যালান্স মেনে চলে। একেবারে সমবাহু ত্রিভুজ আর কজনে পায়। বেশীরভাগেরই ত্রিভুজ হল বিষমবাহু – একটা বাহু বড় তো আরেকটা বাহু ছোট। একজন মানুষকে আমরা তার ত্রিভুজের সবচেয়ে বড় বাহু দিয়ে বিচার করি। তাই হিজিবিজি বেশী logical, এলোমেলো বেশী emotional, আর তোমাদের ভুলেভরা দা, সে না হতে পারল লজিক্যাল, না ইমোশনাল, সে হল faith-based.”
কে বলল কথাটা ? আমিও ঠিক এই কথাগুলোই বলতে চাইছিলাম। সামনে দেখি হিজিবিজি আর এলোমেলো দুজনেই মিটিমিটি হাসছে। পিছনে তাকিয়ে দেখি দেবু।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।