এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • একটি ভয় জনিত রোগ

    অরিন্দম চক্রবর্তী
    আলোচনা | বিবিধ | ২৯ জুলাই ২০০৭ | ১২৯৪ বার পঠিত
  • ভয়। সর্বজনবিদিত একটি ভয়ংকর ভাইরাস। জন্মের পূণ্যলগ্নে (মানুষের, কারণ পুণ্যের আবছা ঠিকাণা একমাত্র তাদেরই আছে) "হবে" কী "হবে না" এই আশঙ্কার পিঠে চেপে এটি মানবদেহে প্রবেশ করে। এরপর এক দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় একটু একটু করে নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিস্তার করতে থাকে এবং অবশেষে একসময় তা পূর্ণমাত্রায় প্রকাশিত হয়। এই ভাইরাস সামাজিক ও দৈহিক সমস্ত রোগ্‌প্রতিরোধক ক্ষমতাকে দূর্বল করে দেয় এবং তার ফল স্বরুপ মানব দেহে বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যায়। তিনশ তেত্রিশ কোটী ভয়রোগ আছে। তবে জনপ্রিয়তার নিরিখে সবচেয়ে এগিয়ে আছে ম্‌ত্যু, যা কিনা সব সময়, সব কালে, সব প্রানীদের মধ্যেই দেখা যায়। আর দ্বিতীয়টি বউ-এর ভয়। তবে র‌্যাঙ্কিং-এ এটি দ্বিতীয়, কারণ এই রোগটি কেবলমাত্র বিবাহিত পুরুষদের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। খুব সম্প্রতি না হলেও অরো একটি রোগ এই মূহুর্তে ভয়াবহ আকার ধারন করেছে - তা হল লেখা ও পড়ার ভয়। এ বিষয়ে দু'একটা উদাহরণ না দিলে রোগটির ভয়াবহতা আপনারা ঠিক আঁচ করতে পারবেননা ।
    একবার বড় একজন ইলাস্ট্রেটার আমাকে বলেছিলেন পুজো আসেলেই তাঁর কান্না পায়, কারণ তাঁকে একগাদা লেখার ইলাস্ট্রেশান করতে হবে। সে যে কী ভয়ংকর ব্যাপার যাঁরা অল্প বিস্তর ইলাস্ট্রেশান করেছেন তারাই জানেন। প্রথমে পুরোটা পড়তে হবে, তারপর চরিত্রে আকৃতি ও প্রকৃতি সম্পর্কে একটা ধারনা তৈরী করে তাকে সেই উপন্যাসের পটভূমিতে ফেলে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই করে ছবির আকারে পরিবেশন করতে হবে। আর এই দীর্ঘ ক্লান্তিকর ( অধিকাংশ সময়ই ) প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে হবে রিডিং চার্জ ছাড়াই। তাই অনেক ইলাস্ট্রেটারই এই সময় প্রকাশকদের দেখলে পালিয়ে বেড়ান। "পড়ার ভয়" যে কত মারাত্মক হতে পারে তা এক ইলাস্ট্রেটার এবং এক লেখকের কথোপকথোন থেকে বুঝতে পারবেন।

    (বিধিবদ্ধ সর্তকতা :- সমস্ত চরিত্রই কাল্পনিক , ইহার সাথে বাস্তবের কোন মিল থাকলে তা সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত)

    ক (জনৈক ইলাস্ট্রেটার) - দাদা! এত বড় লেখা কি করে পড়ব? অনেকগুলো ছবি আঁকতে হবে যে। যদি অন্য কাউকে দেখেন।
    খ (জনৈক লেখক) - আরে নানা, অন্য কাউকে দিয়ে হবে না, তোমাকেই করতে হবে। পড়ার দরকার নেই ।
    ক - মানে? একটু ঝেড়ে কাশুন দাদা।
    খ - আমি তোমায় ব্রিফ করে দিচ্ছি যাতে তোমার অসুবিধা না হয়। আমার নায়িকার বয়স ৩২। পরনে তার স্ফটিকের ন্যায় স্বচ্ছ, নির্ভার, উজ্জ্বলতম পোষাক।
    ক - মল্লিকা সেরওয়াত টাইপের?
    খ - আরে না না, পিওর বাঙালি।
    ক - তাহলে আটপৌরে করে আঁকি?
    খ - না হে, পেলব বাঙালি শরীর, কিন্তু চোখে মুখে কামোত্তজনার আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। আর নায়কের সঙ্গে মিলনের দ্‌শ্যে একটু ঢাকা-না ঢাকার খেলা রেখেছি। আঁকার সময় সেইদিকে একটু নজর রেখো।
    ক - তাহলে একটু অবস্ট্রাক্টের সাহায্য নিই, কী বলেন?
    খ - অবশ্যই যেকোন বিমূর্ত ছবিই আমার এই গল্পের সঙ্গে মানিয়ে যাবে।
    ক - কিন্তু ভাবছি, বিমূর্ততার সঙ্গে জড়িয়ে আছে না বোঝার ব্যাপারটাও
    খ - আরে ভায়া, না বোঝার মধ্যেও একটা আনন্দ আছে। যত কম বোঝা যাবে তত তার উৎকর্ষ বৃদ্ধি পাবে।

    আশাকরি এই কথা চালাচালি থেকে বুঝতে পারছেন "পড়ার ভয়" কত ভয়ংকর রূপ ধারন করেছে ।
    এক সময় বুকার প্রাইজের জন্য ১৪১টা উপন্যাস পড়তে হয়েছিল বিচারকদের, আর তাতেই চরাচর খ্যাত পড়ুয়া ইংরেজ জাতের আর্তনাদ শুনতে পেরেছিলাম আমরা। তারা বলেছিলেন দয়া করে এত বই পাঠাবেন না বুকার প্রাইজের জন্য।
    যাঁরা খবরের কাগজের অফিসে সম্পাদক, সহ-সম্পাদক বা প্রুফ রিডারের কাজ করেন তাদের অবস্থা আরো শোচনীয়। রোজ অসংখ্য অপাঠ্য, অপ্রকাশিতব্য লেখা, যথা - মাথায় ডিম আর পেটে থানকুনি পাতার রস বেটে সু-স্বাস্থ্য ও উজ্জ্বল ত্বকের গুণকীর্তনের গল্প, "দিদি"র কবিতা, দাদার গল্প ইত্যাদি ইত্যাদি অর্বাচীন লেখাকে মানুষ করার দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁদের। আর এই প্রক্রিয়ায় ঘুরতে ঘুরতে, লাট খেতে খেতে তারা একসময় অক্ষরাতঙ্কে (যা জলাতঙ্কের চেয়েও ভয়ংকর) ভোগেন। অক্ষমালার বিষক্রিয়ায় তাঁদের স্ম্‌তিলোপ পায়। দুর্গা অথবা পুজার - "উ" দীর্ঘ না হ্রস্ব অথবা "শূন্য" মুর্ধন্য না দন্ত "ন" তারা ভুলে যায়। এখন আবার বাজারে খুব খাচ্ছে এক্সপিরিমেন্টাল লেখা, এইসব লেখার শব্দ নির্বাচন, বাক্য গঠন ও অনুচ্ছেদ বিভাজনের চোরাপথে লুকিয়ে থাকে জ্ঞান মাইন। তাই এইসব লেখা পড়ার পরে সাধারনের চোখেমুখে একধরনের ভয় ও অসহায়তা ফুটে ওঠে। নির্বাক অসহায়তার, সবাক উপলবদ্ধি - পড়লে হবে, খরচা আছে।
    এই বাধ্যতামূলক পড়ার উল্টোপিঠে রয়েছে বাধ্যতামূলক লেখা। যিনি যত বড় লেখক (তকমাটা বাজারের সেটে দেওয়া) তাকে তত বেশী লিখতে হবে। আর একথাটা সবাই জানে যিনি যত বেশী উৎপাদনক্ষম, তিনি তত বেশী উপার্জনক্ষম। উপার্জনের মোহিনী মায়ায় বাঁধা পড়ে এবং লেখক লেবেলকে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের দেশের লেখকদের লিখে যেতে হয়। ভাবনা চিন্তার সময় নেই তাঁদের হাতে। সারাবছর তাঁদের চোখেমুখে আতঙ্কের বলিরেখায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি অক্ষরমালা - ছেঁড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি। কিন্তু বাজার ছাড়লে তবেতো কাঁদবে, তাই কাঁদা হয়না তাঁদের। বরং টুক করে কোন কিছু না ভেবেই উপন্যাসের নাম "মার্জারিন-স্যাকারিন-কালমেঘ" , "ব্রা" অথবা "পেটিকোট" দিয়ে পাঠিয়ে দেন দপ্তরে। ভেবে চিন্তে লেখার বদলে শুধুমাত্র নামের দিকে খেয়াল রাখলেই তাঁদের চলে।

    আপনারা যাঁরা লেখাটি পড়তে পড়তে ভাবছেন এবং বিড়বিড় করে বলছেন - আ মোলো যা! কোথাকার কোন হরিদাস পাল এলেন জ্ঞান ঝাড়তে। তুমিওতো বাপু সেই অপাঠ্য লেখাই লিখছো। তাঁদের উদ্দেশ্যে বলি, এই যে সমস্ত কাজকম্ম তা সবই দায়ে পড়ে, চাপে পড়ে, চাকরি বাঁচাবার জন্য এবং অবশ্যই ফোকটে পাওয়া তকমাটাকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে।
    আর এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে যতদিন না পাঠকেরা শক্তি অর্জন করে বলবেন - এত লেখা কেন? জনগনই একমাত্র এই ব্যাধিটির ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারেন।
    অবশ্য সেই সুদিন কবে আসবে কে জানে, কারণ পাঠকেরাও তো অষ্টপ্রহর জপে চলেছেন সেই বুদ্ধিজীবী গায়ত্রী মন্ত্র - পড়তে হয় নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়।

    জুলাই ২৯, ২০০৭
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২৯ জুলাই ২০০৭ | ১২৯৪ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন