এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  কূটকচালি

  • মানবিক হয়েই ম্‌ত্যু - বাঁদররা কী ভাবছে

    অরিন্দম চক্রবর্তী লেখকের গ্রাহক হোন
    কূটকচালি | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ | ১৯৫৮ বার পঠিত
  • রোজ রাতে পাঁচজন বাঁদরের সঙ্গে গল্প করি আমি। গল্প যেরকম হয় আর কি, হ - য- ব - র - ল টাইপের। যেমন ধরুন - পৃথিবীর সব জোকস সর্দারজীদের নিয়ে কেন হয়? বাঙালি মেয়েরা "মা" হয়ে গেলে কেমন একটা হয়ে যায়! চাকরিতে ছেলেদের "মেয়ে বস" আর মেয়েদের "ছেলে বস" কতটা জরুরী, ঘরে বাইরে শাশুড়ি আর বৌ-এর সর্ম্পকের সঙ্গে দিল্লী ও বঙ্গের রাজনীতিতে সি পি এম আর কংগ্রেসের কতখানি মিল ও আমিল, এবছর ইলিশের দামটা কেন এত চড়া, ইত্যাদি ইত্যাদি।

    গতকাল রাত্রে বাড়ির উল্টোদিকের কদমগাছে বসে পা দোলাচ্ছি আর সিগারেট ফুকছি এমন সময় ওরা সদলবলে এল। প্রথম থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম আজ ওদের মাথায় চড়তে দেবনা। রোজরোজ আমাকে ওরা খুব হ্যাটা দেয়। মনেমনে ঠিক করে রেখেছিলাম আজ আসল বিষয়ে যাওয়ার আগে ওদের বুঝতে দেবনা ঠিক কোন বিষয়ে আজ আলোচনা করব। ওরা এল। গাছের ডালে পা ঝুলিয়ে বসল। তবে ওরা হল আমার পূর্বপুরুষ, তাই ওদের চোখকে ফাঁকি দেওয়া আমার পক্ষে খুব কঠিন কাজ। যা ভেবেছি ঠিক তাই, হেসে জিজ্ঞেস করল - কি হে!
    চুপচাপ যে, মনটন খারাপ নাকী?
    একটু গম্ভীর মুখ করে বললাম, না।
    - তাহলে?
    - ভাবছি।
    - কী?
    একটু কায়দা মেরে হাতে ধরা সিগারেটটা দেখিয়ে বললাম, মানুষের জীবনটা অনেকটা সিগারেটের মতন। কীরকম দগ্ধ হতে হতে একসময় স্তব্ধ হয়ে যায়।
    - এই রে, আজ আবার মরণমুখী কেন? তুমি তো "জীবনমুখীর" দলে ছিলে!
    - না, আসলে ক"দিন ধরে মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
    - কেন বৌ-এর সঙ্গে গোল বাঁধিয়েছো নাকী?
    - কেন বৌ ছাড়া আর কি কোন বিষয় নেই, যত্তসব! খুব রাগ হল ব্যাটাদের ওপর। মনেমনে বললাম, ইডিয়েট। ভদ্দরলোকের গালাগাল।
    - তাহলে?
    - এই বিজয়ের ঘটনায় মনটা কেমন হয়ে গেছে। টি ভি তে দেখেছো তো?
    - হ্যাঁ, দেখেছি। খুউউব মর্মান্তিক ঘটনা।
    - মর্মান্তিকতো বটেই, তার চেয়েও যে জিনিসটা বেশী ভাবাচ্ছে, তা হল, আমরা কোথায় যাচ্ছি কে তা জানে ?
    - কলিকাল, তাই অন্ধকারে দেখা যায়না ভাল।
    - খুব রাগ হল। বললাম, ঠাট্টা করছো ?
    - না, না ঠাট্টা করবো কেন ?
    - তাহলে !
    - এমনি বললাম।
    - তাই বল। আসল ক্রাইসিসটা বুঝতে পারছ? আমরা কী আমানবিক হয়ে যাচ্ছি !
    - এটা ঠিক, তোমাদের সামাজিক দায়িত্বটা একটু কমে গেছে। দায়বদ্ধতা তলানিতে।
    - গুলি মারো দায়বদ্ধতা, একটু মানবিকতা থাকলেই যথেষ্ট।
    আগুনে ঘি পড়ল। লাফ মেরে একজন সামনে এসে আমার গাল টিপে বলল, দেখ দেখ, মুখময় কেমন একটা প্রতারক সরলতার ছাপ স্পষ্ট।
    - এ কথা বলছ কেন ?
    - কেন বলবনা বল ! তোমরা কখনও ভেবে দেখেছ একজন মানুষ মানবিক না হয়ে শুধুমাত্র ঠিকঠিক দায়-দায়িত্ব পালন করেই সমাজের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।
    অমি একটু রেগে গিয়ে বললাম কী বলছো তোমরা ? মানবিকতা হল মানুষের স্বাভাবিক ধর্ম।
    কথাটা শেষ হলনা ওরা সমস্বরে চেঁচিয়ে বলল, মানবিকতা হল ধামা যা দিয়ে তোমরা তোমাদের দায়বদ্ধতাকে চাপা দাও।
    - কীরকম ?
    - দাঁড়াও তোমাকে একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝাই - ধর দু"জন বন্ধু রাØতা দিয়ে যাচ্ছে। সামনে একজন মহিলা এল। হাতে তোবড়ানো বাটি, কোলে দুর্বল শিশু। ভিক্ষে চাইল। ওরা দিল। প্রথমজন, দ্বিতীয়জনকে জিজ্ঞেস করল, তুই কেন পয়সা দিলি ? দ্বিতীয়জনের চটজল্‌দি উত্তর, আহা ! গরীব মানুষ খেতে পায়না তাই দিলাম। তোমরা যেরকম বলে থাক আর কি !
    এবার দ্বিতীয়জন বলল আমি দিলাম কেন দেওয়া উচিৎ বলে। অভাবী মানুষকে সাহায্য করা উচিত। মানুষ হিসাবে আমি আমার সামাজিক দায়কে অস্বীকার করতে পারিনা। এরথেকে কী বুঝলে ?
    - কী আর বুঝব।
    - ওমা ! এর থেকেতো একটা জিনিস পরিষ্কার হল, প্রথমজনের কাছে "মানবিকতা" অহঙ্কারের অলঙ্কার আর দ্বিতীয়জনের কাছে দায়বদ্ধতা একটি মৌলিক ধর্ম। এইরকম আরো অনেক অনেক উদাহরণ দিতে পারি। আসল কথাটা কী জান ভায়া, বর্ণপরিচয়ে যেগুলোকে দায়বদ্ধতা বলা হয়েছে তাকে তোমরা মানবিকতা বলে ধরে নিয়েছ। তাই যুক্তিহীন শিক্ষা-সংস্ক্‌তি তোমাদের সামাজিক সঙ্কটের মুখে ফেলে দেয় বারবার। অবশ্যি অন্যভাবে দেখলে মানতেই হবে তোমরা মহা ঢ্যামনা !
    - একথা বলছ কেন ?
    - বলবনা ! মানবিকতাকে গ্লোরিফাই করতে করতে তোমরা এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেছ, যে এর প্রয়োগে নিজেকে মহামানব করে দেখানোর সহজতম রাস্তা আজ তোমাদের নখদর্পনে। আর মজাটা কী জান, যখন তুমি কোন বিষয়কে অযথা গ্লোরিফাই করবে তখন তাকে
    সুষ্ঠভাবে সম্পন্ন করার জন্য তোমাদের মধ্যে কোন তাগিদ কাজ করবেনা। নিজেদের দায়িত্বজ্ঞানহীন কর্ম্মকে চাপা দেওয়ার জন্য তখন ঠিক একটা অজুহাত খাড়া করে দেবে। এই যেমন বিজয়ের ম্‌ত্যুর পর একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক বললেন - উচ্চবিত্ত পাড়ায় বলে এইরকম ঘটনা ঘটল কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত পাড়ায় বা কলকাতার মধ্যে হলে এটা হতনা। কী করে ও এটা বলল বলোতো ! খোদ বৌবাজারেই দিনদুপুরে এক ভদ্রলোক গাড়ীতে হেলান দিয়ে মারা গিয়েছিলেন সে ঘটনা কী ভুলে গেল ব্যাটা।
    - এটা ঠিক বলেছ।
    - শুধু কী এটা ! অরো আছে। গাড়ীর সামনে পথচারী পড়ায় বিজয় ব্রেক কষেছিল, এটা কী কোন মানবিক কাজ, তুমিই বল ? অথচ বাঙালির নেকুপুষু মস্তিষ্কে তরঙ্গ উৎপন্নকারী পত্রিকাটি প্রথম পাতায় হেডিং দিল - মানবিক হয়েই ম্‌ত্যু ------। কী সব এলোঝেলো কনসেপ্ট।
    বিজয় কিন্তু জানত পথচারীকে বাঁচানো ওর কর্তব্য তাই ব্রেক চাপতে কসুর করেনি। বুঝেছিলেন সেই ভদ্রলোক তাই সল্টলেকের রাস্তা থেকে রক্তাক্ত শিশুটিকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন হাসপাতালে, বলেছিলেন, নাম ছাপবেননা কাগজে, কারণ এমনকিছু করিনি যাতে নাম ছাপাতে হবে। ওদের কাছে কিন্তু মানবিকতার থেকেও দায়বদ্ধতা বেশী মূল্যবান। তোমাদের কাছে নয়। তুমিও তো ২১শে সেপ্টেম্বরের কাগজ দেখে
    পুঁটিকে এসে বললে, পুঁটি তুমি কী ভাল কাজ করেছ। মহান কাজ।
    - কেন পুঁটি মহান কাজ করেনি ? (এই প্রসঙ্গে জানিয়ে রাখি, পুঁটি হল ওদের পাঁচজনের মধ্যে একমাত্র মহিলা)
    - না ! পুঁটি সেদিন হাওড়ার সাঁতরাগাছি গিয়েছিল। তারপর ফেরার পথে দেখে একটা বিড়াল ছানা পথে পড়ে আছে। ও ওকে বুকে তুলে নিল, দুধটুধ খাওয়াল। একটু কোলে করে এ ডালে সে ডালে ঘুরল। আমরা এগুলোকে কোন মহান কাজ হিসাবে দেখিনা, তোমরা দেখ। তাই তোমরা ২১ তারিখের কাগজে পুঁটির ছবি ছাপিয়ে দিলে। শোন, এগুলো আমরা করেই থাকি। এ নিয়ে আমাদের কোন গর্ববোধ নেই।
    বাঁদরদের দাপটে আমি তখন নাকানি-চোবানি খাচ্ছি, তবু একটা মরিয়া চেষ্টা করলাম। বললাম, তারমানে আমাদের অভিধানে "দায়বদ্ধতা" নেই ?
    এক্কেবারে ক্লীনবোল্ড করে দিল। বলে কী, আছে আছে, তোমাদেরও দায়বদ্ধতা আছে, তবে তা - সেতু প্রসঙ্গে।
    এরপর আর বসে থাকিনি, ডাল থেকে নেমে সোজা দৌড় দিলাম বেডরুমের দিকে। কারণ আমার মতন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত লোকেরতো আরও একটা দায়বদ্ধতা আছে। নাইট লাইফ। ১০ মিনিটের খেল। তবে সে অন্য গল্প। অন্য কোনদিন।
    --------------------------------------------------------
    পু:- ওপরে যে দু'একটি খিস্তি খেউড় আছে তা একান্তই বাঁদরেদের নিজস্ব ভাষা, কারণ ভদ্রলোকেদেরতো একটা দায়বদ্ধতা আছে। তাঁরা বেডরুমে ওসব ব্যবহার করেন কিন্তু খোলা পাতায় এবং প্রকাশ্যে ওসব করেননা।

    সেপ্টেম্বর ৩০, ২০০৭
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • কূটকচালি | ৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৭ | ১৯৫৮ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন