গত কয়েকদিনে ইন্টারনেট এবং তাকে কেন্দ্র করে দুটি খবর দেখে মন উদ্বিগ্ন হল যে মানুষের মুক্তচিন্তার প্রকাশের বিপরীতে কত রকমের সরকারী বেসরকারী উদ্যোগ চলছে। আজকে একটি সামাজিক মাধ্যমে খবর পড়লাম যে দিল্লিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া আরশোলা পার্টির আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ইনস্টাগ্রাম এর ওপর বিধিনিষেধ আনতে চলেছেন, বিশেষ করে তাদের algorithm এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যাতে সরকারবিরোধী বা সমালোচনামূলক পোস্ট বিশেষভাবে এই মাধ্যমের গ্রাহকদের কাছে না পৌঁছয়। ব্যাপারটি আমার কাছে উদ্বেগজনক মনে হয়েছে কারণ লোকে কি পড়বে বা কার লেখা পড়তে পারবে তার নিয়ন্ত্রক কেন দেশের কেন্দ্রীয় হবে? দ্বিতীয় ঘটনাটি সাম্প্রতিক গুরুচণ্ডালীর সম্পাদক সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি লেখায় তিনি লিখেছিলেন কোন এক প্রভাবশালী সংবাদপত্র গোষ্ঠী তাঁকে সামাজিক মাধ্যম থেকে বার করে দেবার অপচেষ্টা করেছিল কারণ তিনি এদের সমালোচনা করে পোস্ট করেছিলেন।
এই ব্যাপারগুলো অনভিপ্রেতই নয়, স্বাধীন চিন্তা এবং মতামত প্রকাশ করার পরিপন্থীও বটে। তখন একটি প্রশ্ন ওঠে যে এমন কি কোন প্রকাশ মাধ্যম নেই যেখানে আমরা যা মনে আসে লিখতে পারি, সরকারের সমালোচনা স্বাধীন ভাবে করতে পারি, বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের সমালোচনাও করা যেতে পারে, এবং কেউই আমাদের লেখা সরিয়ে দিতে পারবে না, বা লেখা সরিয়ে দেবার চেষ্টা করে দেখতে পারে, তাতে কাজ হব না। এমন কি কোন সমাজ মাধ্যম নেই?
অবশ্যই আছে। গত এক দশক ধরে এই ধরণের অনভিপ্রেত আক্রমণের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে কেন্দ্রীভূত সমাজ মাধ্যম এবং কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিপরীতে একটি Alternative decentralised federated সামাজিক মাধ্যম গড়ে উঠেছে। এই মাধ্যমটি নানান দিক থেকে কেন্দ্রায়িত সমাজ মাধ্যম, বা বাণিজ্যিক সমাজ মাধ্যম, যাকে বাজারের ভয় দেখিয়ে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে, যার জন্য একে প্রথাগত কায়দায় নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। এই মাধ্যমটির নাম Fediverse এবং এর protocol বা সাদা বাংলায় নিয়ামক বলে যদি বলা যায়, তার নাম ActivityPub, এই প্রবন্ধে তাদের নিয়ে।
তো এই লেখা লিখতে গেলে আরেকটি বিষয়ের সূত্রপাত প্রয়োজন: ইন্টারনেট এবং World Wide Web বা সংক্ষেপে www। একে দিয়েই শুরু করি।
তখন নব্বইয়ের দশক। সুইজারল্যান্ডের সার্ন গবেষণাকেন্দ্রে কাজ করতে গিয়ে টিম বারনারস লি (পরবর্তীকালে স্যার টিম বারনারস লি) লক্ষ করলেন সার্ন এ এবং বহু গবেষক যাঁরা সার্ন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, তাঁদের লেখা পত্র গবেষণা তাঁদের কম্পিউটারে থেকে যাচ্ছে বটে, কিন্তু সে সব উদ্ধার করে সকলের কাছে পৌঁছচ্ছে না। বিভিন্ন কম্পিউটারে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত সেই সব গবেষণা একটি আরেকটিকে যুক্ত করে রাখার জন্য বারনারস লি একটি প্রোগ্রাম লিখলেন, তার নাম দিলেন HTTP বা hypertext transport protocol, এবং তার সঙ্গে একটি সার্ভার যুক্ত করলেন। যে কম্পিউটারে সার্ভারটিকে রেখেছিলেন, সেখানে একটি নোটিশ সেঁটে দিলেন যে "এই মেশিনটিকে কোন অবস্থায় বন্ধ করবেন না"। এবং এই কম্পিউটারটির সঙ্গে অন্যান্য কম্পিউটার সংযোজিত হয়ে নানান রকমের ডকুমেন্ট, তথ্য ইত্যাদি আদানপ্রদান করতে লাগল, এবং একটি পাতায় hypertext markup নামে একটি বাক্যাংশে মনে করুন নীল রঙের দাগ দেওয়া থাকত, এবং সেই দাগানো লেখাটিকে নির্বাচিত করে পাঠক অনায়াসে এক ডকুমেন্ট থেকে আরেক ডকুমেন্ট "টেনে আনতে" পারতেন। এ যখনকার কথা বলা হচ্ছে তখন personal computer আবিষ্কৃত হয়েছে বটে কিন্তু web browser যাতে করে লেখা ছবি ইত্যাদি সুন্দর ভাবে দেখা যায়, কখনো আবিষ্কৃত হয়নি। ১৯৯৪ সালে Marc Andreesen নামে ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র Mosaic নামে একটি ওয়েব ব্রাউজার প্রথম জনসমক্ষে আনেন, পরে এটির নাম হয় Netscape Navigator, আজকের Firefox তারই উত্তরসূরী।
যাই হোক, মূল বিষয় থেকে সরে আসছি, এ কাহিনি ওয়েব আবিষ্কার বা ব্রাউজার নিয়ে নয়, World Wide Web (ওয়েব) এর তাৎপর্য নিয়ে, কাজেই সে প্রসঙ্গে ফেরা যাক। টিম বারনারস লি ওয়েব প্রোটোকল কোন বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আবিষ্কার করেননি বরং সকলের উন্মুক্ত ব্যবহারের জন্য খুলে দিয়েছিলেন। এর ফল হল সুদূরপ্রসারী। বিশেষ করে ব্রাউজার সফটওয়ার আসার পর বহু মানুষ ইন্টারনেট পরিষেবার সুফল পেলেন। আজ যে আপনি যে কোন ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী কোম্পানির সঙ্গে নাম লিখিয়ে, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সেটুকুও করতে হয় না, যে কোন ডকুমেন্ট অন্তর্জালে তুলে নিজে দেখতে পান, বা কারো সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারেন, তার সূত্রপাত সেই সময়ে। এর ফলে আপনি যে কোন Internet service provider এর সঙ্গে চুক্তি করে (আপনার বাড়িতে যারা ফোনের পরিষেবা দেন অনেক ক্ষেত্রে তাঁরাও হতে পারেন), বাড়িতে কম্পিউটার ও মোডেম থাকলেই হল, আপনার লেখালিখি আপনি ইন্টারনেটে তুলে সকলের সঙ্গে সমানভাবে ভাগ করে নিতে পারবেন। অবশ্য আপনার বাড়িতে যে মোডেম থাকতে হবে তারও কোন মানে নেই, ইস্কুল কলেজ অফিস, কোথাও একটি সংযোগ করার যন্ত্র ও তাতে আপনার যুক্ত হবার অনুমতি থাকলেই হবে (এই লেখাটি আমি একটি গাড়ি সারাতে দেবার গ্যারেজে বসে লিখছি, এই রকম আর কি)।
মানে যে কারণে এতখানি লিখতে হচ্ছে, তার উদ্দেশ্য এই যে, একটি সময়, তথ্য এবং তার আদান প্রদান উন্মুক্ত এবং সহজ হয়ে গেল। এর হাত ধরে এল তথ্য খুঁজে বার করতে পারার টেকনোলজি। যেমন এক সময়, ১৯৯৪-১৯৯৫ সালেই, বড়জোর বছর তিরিশের কথা, ইয়াহু ওয়েবসাইটে কয়েক হাজার সাইটের hyperlink থাকত, অবশ্য কালক্রমে সে সব অন্যরকম হয়ে গেল, বিশেষ করে তথ্য অনুসন্ধানের ব্যাপারটি ওয়েব এবং আমাদের ওয়েব ব্যবহার করার সুলুক সন্ধানে আমূল পরিবর্তন নিয়ে এল। আসছি সে কথায়। আমাদের আলোচনায় এই ব্যাপারটি সবিশেষ প্রবিধান যোগ্য।
ওয়েব আবিষ্কারের প্রথম দিনগুলোতে ওয়েব সাইট থেকে সরাসরি অর্থোপার্জন বা influence ইত্যাদির কথা কেউ সেভাবে বলত না। ওয়েবসাইট তৈরী করে বা সার্ভার থেকে মানুষের বিস্তর আপত্তি হত, সে কথা এখানে হচ্ছে না। মানুষ ওয়েবসাইট দেখছে, তার ভিত্তিতে ব্যবসা বাণিজ্য, রাজনীতির ব্যাপারটি তখনও সেভাবে আসে নি। যদিও সাধারণ মানুষ তো বটেই, ছাত্র, অধ্যাপক, ব্যবসায়ীরা, গবেষণাকেন্দ্র, সর্বস্তরের মানুষ ব্যাপক ভাবে ওয়েবসাইট দেখতেন, এবং তার প্রায় সবটাই কম্পিউটারে ব্রাউজার কেন্দ্রিক। তখন মোবাইল ফোন মানে ইঁটের মতন ভারী ওয়াকি টকি সদৃশ এক বস্তু, পরবর্তীকালে নোকিয়া এবং ব্ল্যাকবেরী কোম্পানির সৌজন্যে ছোট সুন্দর মোবাইল বাজারে আসে, যদিও সে সব যন্ত্রে আজকের মতন ওয়েব সার্ফ করা যেতই না।
১৯৯৭ সাল নাগাদ, তথ্য প্রযুক্তির দুনিয়ায়, বিশেষ করে তথ্য অনুসন্ধানের দুনিয়ায়, একটি সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে, যে ব্যাপারটি আমাদের এখনকার আলোচনায় বিবেচ্য। ল্যারি পেজ এবং সার্জেই ব্রিন নামে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র একটি তত্ত্বের অবতারণা করেন, যার নাম দেন Page Rank Algorithm, যে ব্যাপারটি আমাদের আন্তর্জালে (ততদিনে ওয়েবে) তথ্য অনুসন্ধানের ব্যাপারটিকে বদলে দেন। এতদিন পর্যন্ত, অন্তর্জালে তথ্য বা পাতা খুঁজে পেতে গেলে আপনাকে keyword ব্যবহার করে খুঁজে পেতে হত ঠিকই, এবং পাতায় লিখিত বিষয়বস্তুর ওপর পাতা খুঁজে পাওয়া নির্ভর করত। সে সব সার্চ যন্ত্র যেমন Altavista ইত্যাদি এখন আর কেউ সেভাবে ব্যবহার করে না।
পেজ আর ব্রিন অন্যরকম একটি প্রস্তাবনা দিলেন। তারা দেখালেন যেহেতু ওয়েবের মূল সূত্রই একটি "পাতার" সঙ্গে আরেকটি পাতার "সংযোজন", মানে এক পাতা থেকে আরেক পাতায় "চলে যাওয়া যায়", অতএব যে পাতাকে যারা যতবার জুড়েছে বা link করেছে, তার গুরুত্ব তত বেশী, সেই পাতার reputation বা rank ও ততটাই বেশী। ধরুন "ক" পাতার লিঙ্ক "খ", "গ", ও "চ" পাতায় আছে, অথচ খ বা গ পাতায় অন্য পাতার লিঙ্ক ততটা নয়, অতএব তথ্য খুঁজে পাবার সারণীতে ক পাতা সবচেয়ে আগে থাকবে। এইরকম, যদিও আমি এখানে অতিসরলীকরণ করেছি, মূল algorithm সাংঘাতিক জটিল। এরা একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করে তার নাম দিল গুগল। গুগলের পেজ rank algorithm এতদিন হয়ে চলা প্রথায় একটি বিশাল পরিবর্তন নিয়ে এল। বিশাল এই কারণে যে, এইবার ইন্টারনেট তথা ওয়েবের বিপণীকরণের একটি পথ খুঁজে পাওয়া গেল। অস্যার্থ, আপনার কোম্পানি যদি কোন বস্তু তৈরী করে যাকে আপনি বেচতে চান, তাহলে জনতা আপনার বাণিজ্যিক বিষয়ের খোঁজ করলে যাতে সহজে খুঁজে পায়, তার একটি উপায় আপনি পেয়ে গেলেন, যত বেশী পাতা আপনার বাণিজ্যের বিষয় তাদের পাতায় চর্চা করবে, তত বেশী লোক আপনার পাতা খুঁজে পাবে। আজকের দিনে আমরা যাকে ইনফ্লুয়েনস বা ফলোয়ার কাউন্ট দিয়ে বিবেচনা করি, ধরে নিন তার প্রাথমিক সূত্রপাত গুগলের হাত ধরে, যদিও ১৯৯৭ সাল থেকে পরবর্তী সময় ঢের দেরী।
তবে শতাব্দীর মোড় ঘুরছে। এর আগে পরে হু হু করে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়েবে জুড়েছে, ব্যবসা তৈরী হচ্ছে, আবার ভাঙছেও, এই ইতিহাসের একটি অধ্যায় dot com burst, আপাতত তাকে পাশ কাটিয়ে আরেকটু এগোই, কারণ এ গল্প শুরু করলে আমাদের আপাতত আলোচনা থেকে সরে আসব।
এতদিনে একটি ব্যাপার আমরা দেখছি, আমরা যে কেউ, আমাদের মনে যা লিখতে ইচ্ছে করে, ওয়েবের পাতায় লিখে প্রকাশ করতে পারি। কোন প্রকাশককে ধরার ঝামেলা নেই, প্রিন্টিং প্রেসের ঝামেলা নেই, সবটাই অন্তর্জালের ম্যাজিক, আর খুব সামান্য খরচা, যে কেউ যা খুশী প্রকাশ করতে পারে, তর্ক বিতর্ক, চিন্তাভাবনার প্রকাশের মস্ত সুযোগ। যেহেতু কেন্দ্রীভূত নয়, কোন বিধিনিষেধ নেই। কে কাকে নিষেধ করবে? আপনার লেখা, গান, ছবি, চলচ্চিত্র, বক্তৃতা, কথা রয়ে গেল ইথারে, কোন সরকার, কোন সংবাদ মাধ্যম, কোন "কোম্পানির" এক্তিয়ার রইল না (যদি না আপনার কোম্পানি বা সরকারের হয়ে আপনি নিজে থেকে নিজেকে সংবরণ করেন, সে কথা এখানে হচ্ছে না)। কোন সরকারের নিয়ন্ত্রণে কে কি বলবে লিখবে এখানে খাটে না, কারণ ওয়েব মুক্ত, বিকেন্দ্রিকৃত, স্বাধীন। আপনি লিখতে চান, লিখুন, যদি কেউ ছাপতে চায় ছাপবে, না হলে আপনার স্বাধীন সার্ভার ভাড়া নিয়ে, মায় নিজের বাড়ির কম্পিউটারকে সার্ভার বানিয়ে জগৎকে জানান আপনার বাণী।
এই অবধি বেশ চলছিল। ২০০০ সময়নাগাদ, এই সময়টিতে আরেকটি পরিবর্তন এল। মেগ হুরিহান, এবং ইভ উইলিয়ামস Pyra Labs নামে একটি কোম্পানি মিলে ব্লগার নামে একটি সফটওয়্যার নিয়ে এলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল যে কেউ নিজের চিন্তাভাবনার একটি সময়সারণী বেয়ে লেখালিখি ধরে রাখতে পারবেন, সেই blogging এর সূত্রপাত, পরে Google blogger কোম্পানিকে কিনে নেয়। ব্লগ কথাটির জনক এভান উইলিয়ামস। এভান পরে মিডিয়াম নামে আরেকটি ব্লগ লেখার ও সামাজিক মাধ্যম প্রতিষ্ঠা করেন।
ব্লগ ব্যাপারটি দুটি বিষয়কে জনসমক্ষে নিয়ে এল। এক, আগে যেমন যে কেউ যা খুশী প্রকাশ করতে করতে পারতেন, এবারে তার সঙ্গে যোগ হল যে ব্লগ "প্রকাশনায়" নিজের নাম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে এবার খাতা খুলে লেখার ক্ষমতা। দুই, আপনার পাঠক এবার RSS বা Really Simple Feed বা ফিড জাতীয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে নিয়মিত আপনার লেখা পড়তে পারবেন। এই RSS নিয়ে দু একটি কথা এখানে প্রাসঙ্গিক। রামনাথন গুহ নামে এক ভারতীয় ইঞ্জিনিয়ার RSS ব্যাপারটিকে লেখেন, পরে ব্যাপারটিকে Dave Winer জনপ্রিয় করেন। ব্যাপারটি কি? ধরুন আপনি নিয়মিত লেখা লিখছেন ও আমি আপনার লেখা পড়তে চাই। আর এস এস করবে কি, আপনার প্রকাশিত লেখাগুলোকে ক্রমান্বয়ে আমার কাছে পাঠাতে থাকবে। আপনার ওয়েবসাইটে না গিয়েও আমার কম্পিউটারে আমি আমার মতন করে পড়তে পারব। এর বহু উদাহরণ আছে, যেমন একদম আদিযুগের NetNewsWire নামে একটি সফটওয়্যার খুব জনপ্রিয়। এছাড়াও আরো নানান RSS reader আছে। আমাদের আলোচনায় আরএসএস গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে এর মাধ্যমে মূল ওয়েবসাইটে নে গিয়ে, ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন না দেখেও আপনি যা পড়তে চান যা দেখতে চান নিজের মত করে দেখতে পারেন, পড়তে পারেন। আপনার লেখা লেখার স্বাধীনতা, আপনার লেখা পড়তে পারার ক্ষমতা ও স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রইল।
ওয়েব শুরু হয়েছিল গবেষণাগারে, আপামর মানুষের জানা, শোনা, শেখার জন্য সে ছিল মুক্ত এবং "মুফত", এই নবীন শতাব্দীর শুরুর দিকেও দিব্য চলছিল। সরকারী বেসরকারী বিধিনিষেধের তোয়াক্কা না করেও মুক্তভাবে ভাব প্রকাশ করাই যেত, যদিও তার মধ্যেও নানান রকমের গণ্ডগোল এবং ভাব প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ শুরু হয়ে গিয়েছিল।
মুক্তচিন্তা ভাবনা, ভাব প্রকাশ এবং তথ্য বিতরণের স্বাধীনতায় সরকার এবং প্রতিষ্ঠানের হস্তক্ষেপের আমার মতে অন্তত মর্মান্তিক উদাহরণ Aaron Schwartz, ২৬ বছরের যুবক ২০১৩ সালে তাঁর ব্রুকলিনের বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। অ্যারন সোয়ার্জ যাকে বলে ইন্টারনেটের মানসপুত্র, মানুষের মুক্ত, স্বচ্ছ তথ্য আহরণের অধিকারের আন্দোলনের তরুণ বলি। মাত্র ১৪ বছর বয়েসে সে RSS1.0 যার কথা আমি এর আগে লিখেছি, সে সেই সফটওয়্যার লিখে ফেলেছিল। শুধু তাই নয়, জন গ্রুবারের সঙ্গে মিলে অ্যারন সোয়ার্জ মারকডাউন নামে একটি লেখার পদ্ধতি চালু করে, আজকে ইন্টারনেটে লেখার অন্যতম প্রচলিত পদ্ধতি। অ্যারন সোয়ারজের বিরুদ্ধে কি অভিযোগ ছিল? ২০১১ সালে MIT র ক্যামপাস পুলিশ তাকে JSTOR নামে একাডেমিক সাইট থেকে জার্নাল আর্টিকেল ডাউনলোডের অভিযোগে গ্রেফতার করে এবং পরবর্তী দু বছর বেচারা নিদারুণ অত্যাচার সহ্য করে। এই লেখাটি লিখতে গিয়ে অ্যারন সোয়ারজের কথা মনে হতে মন খারাপ হয়ে যায়। ভেবে দেখুন পাঠক, একই মুখে ইন্টারনেটকে মুক্ত চিন্তার ক্ষেত্র এবং ওয়েবের আবিষ্কারক টিম বারনারস লি কে যে কারণে আমরা অভিনন্দন জানাই, আবার আমাদের হাতেই খুন হন অ্যারন সোয়ার্জের মতন প্রতিভাবান যুবক, যার হাত ধরে, বিশেষ করে RSS আর Creative Commons আমরা পেয়েছি।
যাকগে সে কথা। কথায় কথায় ব্লগ আর RSS এর কথা উঠল। এর পর আসবে মাইক্রোব্লগের যুগ, মোবাইল ফোনের বিপ্লব, এবং তার সঙ্গে আমাদের তথ্য আদানপ্রদানের পরাধীনতার সূচনা, বরং বলা যাক স্বেচ্ছায় পরাধীনতা মেনে নেওয়া এবং স্বাধীন থাকার টানাপোড়েনের গল্প। সে গল্প এর পরের পর্বে। আপাতত এই খানে ইতি টানি।
পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।