
এই মুখোশ তৈরির উপাদান গুলি স্থানীয় ভাবেই সংগ্রহ করেন শিল্পীরা - যেমন পুরোনো সুতির কাপড়, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো, কলাপাতার মিহি ছাই, কাগজ, ময়দার আঠা, হলুদ আর খড়িমাটির রং, বার্নিশ ইত্যাদি। তবে খবরের কাগজ ব্যবহার করা হয় না। এই মুখোশ নির্মাণের পদ্ধতিটি বেশ চমকপ্রদ এবং কাজের অনেকগুলি ধাপ আছে। ... ...

দু’হাজার বছর আগে আলেকজান্দ্রিয়া প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলের পানে চেয়ে একদিন জুলিয়াস সিজার মিশরের রানি ক্লেওপাত্রাকে প্রেম নিবেদন করেছিলেন গ্রিক ভাষায়, ‘সে আ গা পো, তোমায় আমি ভালোবাসি’, ল্যাটিনে নয়। কোইনে গ্রিক ক্লেওপাত্রার প্রথম ভাষা এবং উচ্চ বর্গের রোমান সমাজ গ্রিকে আলাপ আলোচনা করতেন, এই যেমন আজকের শিক্ষিত বাঙালি পরস্পরের সঙ্গে বাংলা নয়, ইংরেজিতে বাক্যালাপ পছন্দ করেন। ... ...

একটা টিনের দোচালা, নেহাতই সাদামাটা একটা ঘর। তাতে কড়ে গুনে মানুষ মাত্র চারজন। কেউ হলুদ খামে সিল লাগায়, কেউ চিঠি বাছাই করে, কেউবা লাল ডাকবাক্সের তালা খোলে। তবে সকলেই বেশ আয়েসি ভঙ্গিতে ধীরেসুস্থে এসব কাজ করে। এসবের মধ্যে একজনই চেয়ার টেবিলে অসং্খ্য কাগজপত্রের ভেতর হাবুডুবু খায়। এই কাগজে কিছু লেখে তো ওই কাগজে কিছু পড়ে। নাকের ডগায় চশমা বসিয়ে সারাক্ষণ চোখ নিবন্ধ টেবিলের এলোমেলো নানা কাগজে। ... ...

দরিরামপুর থেকে গফরগাঁও কতদূর? কেউ কি আসবে না সম্মেলনে? দরিরামপুর হাই স্কুলের ছাত্র নজরুল ইসলাম এখন বঙ্গবিখ্যাত বিদ্রোহী কবি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত তেজোদ্দীপ্ত তার ভাষণ - সে খবর কি পৌঁছায়নি ত্রিশালের নামাপাড়ায়? বীররামপুরে? খিদির পন্ডিত স্যার কি না এসে থাকতে পারবেন? আর নূরজাহান? নিশ্চয় এতদিনে সে গৃহিণী হয়ে গিয়েছে। নূরের জ্যোতিতে ভরিয়ে তুলেছে কারো ঘর। তার কানে কি পৌঁছয়নি এই খবর? গফরগাঁওয়ে নজরুল আসছে শুনে সে কি থাকতে পারবে ঘরে? একবার দেখতে ইচ্ছে করবে না? কিন্তু আসবে কার সাথে? পন্ডিত স্যার কি তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হবেন? ... ...

নজরুল নিজে কোনদিনই অহিংস চরকা-পন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না সেকথা বিজয় লাল ভালোই জানে। ইতিমধ্যে হেমন্ত সরকার, মুজফফর আহমদ, কুতুবউদ্দিনদের সঙ্গে জোট বেঁধে কমিউনিস্টপন্থী দল গঠন করেছেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন --- এসব কথাও তাঁর অজানা নয়। তবু প্রকাশ্য সভা সমিতিত নজরুলকে নিয়ে তাঁর অকৃত্রিম উচ্ছাস নজরুলকে খুবই মুগ্ধ করে, বুকের মধ্যে একটা নিকটজনের ছোঁয়া লাগে। ... ...

আশিসবাবু চিৎকার করে বললেন, "এই কীভাবে কথা কোস তুই বামুনের সাথে? চুরি করবে। আর বলা যাবে না। মুখ টেনে ছিঁড়ে ফেলব একেবারে।" "আপনে যে আমারে চোর কইলেন, চড় মারলেন তার বিচের কী অইব?" "আমার আবার কী হবে ? তাছাড়া বামুনের লাথি খেলেই তোদের ভালো। সোজা স্বর্গে যাবি।" ... ...

বাংলার পশ্চিম পারে পুরুলিয়ার বাগমুন্ডিতে ছোট্ট গ্রাম চড়িদা। ছোট হলেও গ্রামটি জগদ্বিখ্যাত, কারণ এটি হল ছৌ শিল্পীদের গ্রাম। এখানে ছৌনাচের মুখোশ তৈরি হয়। আমি প্রথম চড়িদায় আসি খুব সম্ভবত ২০০৩ সালে। তখন পুরো গ্রামটাই ছিল অতি নির্জন - পাহাড়ি পথে কিছু কাঁচা আর আধ পাকা বাড়ি। সেবারে আমি বড় এক কার্টন মুখোশ কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম, সকলকে উপহার দেব বলে। ... ...

নজরুল বিস্ময়ের চোখে গিরিবালা দেবীকে দেখছিলেন। কী আশ্চর্য দক্ষতায় একদিনের মধ্যে উপরের বৌদি, তাঁর কাজের মেয়ে, আর শিবেনকে নিয়ে সংসারটিকে গুছিয়ে ফেলেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে আশপাশের মানুষজনের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতে পারা, তাদের দিয়ে সংসারের দরকারি টুকটাক কাজ করিয়ে নেবার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে মাসিমার। বিয়ের পর থেকে সংসারের যাবতীয় হাল তিনিই ধরে রেখেছেন। অভাব অনটন আর সংসারের পারিপার্শ্বিক ঝামেলার প্রায় পুরোটাই তিনি একা হাতে সামলেছেন - দোলনের গায়ে আঁচ লাগতে দেননি। ... ...

মনে আছে চেন্নাই এক্সপ্রেস সিনেমার সেই বিখ্যাত দৃশ্য যেখানে ট্রেন একটা রেলব্রিজের উপরে আচমকা থেমে যায়, শাহরুখ আর দীপিকা নেমে আসে, পিছনে সুবিশাল চার স্তরের এক জলপ্রপাত, যার জলের ধারা দেখে মনে হচ্ছে দুধের নহর গড়িয়ে আসছে। দুধসাগর ফলস। গোয়া আর কর্ণাটকের সীমানায় অবস্থিত এই মস্তবড় জলপ্রপাতের কাছাকাছি পৌঁছাতে গেলে যে এলাকার মধ্যে দিয়ে যেতে হয় সেটাই হল মোলেম জাতীয় উদ্যান ও ভগবান মহাবীর অভয়ারণ্য। এই অভয়ারণ্যের ভেতরেই একটি ছোট গ্রাম ও তৎসংলগ্ন রেল স্টেশান হল কুলেম। গোয়ার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, কর্ণাটক সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত মোলেম জাতীয় উদ্যান ও ভগবান মহাবীর বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য পশ্চিমঘাট পর্বতমালার অন্তর্গত ইউনেস্কো স্বীকৃত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ অঞ্চল। ... ...

বিস্ময়ে অবাক হচ্ছিলেন নজরুল। এতো কথা তো জেলে থাকার সময় বলেনি বিজয়। - তারপর আর কি বাবা। হাই স্ট্রীটের সেই স্কুলের ঘরেই থাকে ওরা। এতোদিন পার হয়ে গেল, প্রায় রোজই একবার করে আসে, গল্প করে, হৈচৈ করে - কিন্তু এক গ্লাস জল পর্যন্ত খায় না। একবার ভাবেন তো দিদি, আমি বাড়িতে রোজ রান্না করি। আমার ছেলেরা চোখের সামনে কিছু মুখে না দিয়ে চলে যায়, সে ভাত মুখে তুলতে আমার কেমন লাগে? ... ...

মাঠাবুরুকে টা টা করে আমরা চললাম ঝালদা। সেখানে আছেন জয়দেব মাহাতো। এই অদ্ভুত মানুষটি একজন সাধারণ লাক্ষাচাষী হিসেবে জীবন শুরু করে নিজের উদ্যম, কঠোর পরিশ্রম এবং অনুসন্ধিৎসা নিয়ে আজ এক বিরাট প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। অসংখ্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভরা তাঁর ঝুলি। অরণ্যচারী মানুষের সংগঠন তাঁর করায়ত্ত। বর্তমানে তিনি লাল মাটির জেলাগুলিতে প্রায় তিন হাজার লাক্ষাচাষীর মাস্টার ট্রেনার, ৩৫টি এমন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সহায়ক, যারা লাক্ষা দিয়ে অলঙ্কার, কলমদানি, মোমদানির মতো নানা হস্তশিল্প তৈরি এবং বিক্রি করে। ... ...

বিয়ের পর কলকাতায় মুসলমান পাড়ায় ঘর মেলেনি। সাহিত্যের বন্ধুরাও ছিল একরকম মুখ ফিরিয়ে। অভিমান হয়েছিল খুব। সেই অভিমান থেকেই বোধহয় স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি --- পুত্রের মধ্যে কৃষ্ণ আর মহম্মদ একসাথে বিকশিত হোক। কিন্তু অভাগা যেদিকে চায় --- চার মাস না পেরেতেই সে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হতো খুব। দোলনকে এরকম অবস্থায় রেখে বসিরহাটে না গেলেই বোধহয় ভালো ছিল। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? ... ...

এক শাস্ত্রীয় আলোচনায় লোকটা এই শুদ্ধিকরণ বিষয়ে শুনেছিল। গুরুদেব বলছিলেন যে, বিশেষ অন্যায় করলে মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ২১২ নং শ্লোকে কৃচ্ছ্র সান্তপন নামক এক বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান আছে। গোমূত্র, গোবর, দুধ, দই, ঘি এবং কুশোদক(কুশ ঘাস মিশ্রিত জল)—এই ছয়টি দ্রব্য মিশিয়ে একদিন পান করতে হবে এবং পরের দিন উপবাস করতে হবে। ... ...

এককালে ইমিগ্রেশন অফিসারের নাকের ডগায় ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেখিয়ে কয়েক সেকেন্ডে সীমানা পার হয়েছি, সব সময়ে সঠিক পাতা খুলে আত্ম পরিচয় প্রদর্শন করতে হয়নি, কখনো কোন স্ট্যাম্প পড়েনি পাসপোর্টে।এখন দিনকাল বদলেছে। স্বেচ্ছায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিত্যাগ করে আমরা হয়েছি ব্রাত্য, অবাঞ্ছিত। নানান দেশের ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পাসপোর্ট উলটে পালটে দেখেন, একান্ত অব্রিটিশ মুখচন্দ্রিমা অবলোকন করেন, সাত সতেরো প্রশ্ন তোলেন। হাসিমুখে তার জবাব দিতে হবে জানি, তবু আজ এই স্কিফোল এয়ারপোর্টে মনে হল এই তরুণ অফিসারকে কি বোঝাতে পারি ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসের এক শীতল সন্ধ্যায় কলকাতা হতে ফ্রাঙ্কফুর্ট যাবার পথে আকাশে কোথাও সুটকেস হারিয়ে এই আমস্টারডাম পৌঁছেছিলাম? ... ...

২০২৫ সালের হরিয়ানা প্রশাসনের সমীক্ষা অনুযায়ী আরাবল্লির হরিয়ানা অংশে প্রায় ৭,০০০ বেআইনি স্থাপনা আছে, প্রধানত গুরুগ্রাম, তারপর ফরিদাবাদ ও নূহতে। একজন সমালোচকের দাবি অনুযায়ী অধিকাংশ সম্পত্তি রাজ্য কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের মালিকানাধীন অথবা জমিমাফিয়াদের পৃষ্ঠপোষকতায় চলে। ডাউন টু আর্থের এক প্রতিবেদনে পরিবেশবিদ ভাটনগরের বক্তব্য হল ফরিদাবাদ ও গুরুগ্রামে জমির দাম বাড়তে থাকায় জমি-মাফিয়া ও রিয়েল এস্টেট কোম্পানিগুলো তা দখল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, আর রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও আমলাতন্ত্র তাদের সমর্থন দেয়। ... ...

পাঁচগুটি, চোরডাকাত আর কাটাকুটি খেলা। আফরোজা আপার হাজিরা খাতায় মোটে কয়েকটা টিক পড়তেই বৃষ্টির তোড় বেড়েছিলো আরোও সেদিন। অফিসরুমে যাবার আগে সরল অঙ্কের সময় বেঁধে দিলেও আষাঢ় পেরিয়ে সে জটিল সময়ের কাছে ফেরার ইচ্ছা কিংবা আগ্রহ কোনোটাই ছিল না আমাদের। ... ...

আবার মাঠাবুরুতে ফিরে এলাম। সকালে পাহাড়ে ওঠার ঐ কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুপুরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু বিকেলে অপেক্ষা করছিল অন্য চমক - যার পোষাকী নাম - সেলফ কুকিং। মোদ্দা কথাটা হল, যেখানে কোন পরিকাঠামোই নেই, সেখানে পাথর-কাঠ-কুটো সাজিয়ে উনুন বানিয়ে পাতার জ্বালন দিয়ে ম্যাগি রান্না করতে হবে, নইলে উঁহু বিকেলের খাবার পাবেনা, কারণ আলাদা কিছু তৈরিই হয়নি। ... ...

ছেলেটির নাম নীল। সেও মুখিয়ে উঠে বলল, "সবই তো ঠিক ছিল। সংবিধান রয়েছে দেশে। মনুর কথা তুমিই তুললে ভাই। মনুসংহিতায় বলা হচ্ছে যে, ব্রহ্মা তার অণ্ডকে দুইভাগে বিভক্ত করে স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। মাঝখানে হল আকাশ, আটদিক ও সমুদ্র। আকাশ থেকে বায়ু এবং বায়ু থেকে আলো,তা থেকে হয় জল আর জল থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেন। জলকে তো ব্রহ্মার আগে সৃষ্টি হতে দেখা গিয়েছে ওই মনুসংহিতাতেই। জলের অপর নাম নারা। কারন সে প্রথমে নর বা মানুষের আশ্রয়ে ছিল। তাহলে ব্রহ্মার সৃষ্টিকর্তা কি মানুষ ছিলেন ?" ... ...

সংক্ষেপে, আইনি দিক থেকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিকল্প প্রস্তাবগুলোর চেয়ে কর্পোরেট খনি লিজের চুক্তিগত অধিকার এবং সরকারের উন্নয়ন নীতিই আইনি আদালতগুলোতে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যেমন 'লেমরু হাতি রিজার্ভ'’এর কাগজ কলমে অস্তিত্ব থাকলেও, এর সীমানা এমনভাবে আইনি মারপ্যাঁচে ছোট করা হয়েছে যাতে আদানি গ্রুপের মতো বড় কর্পোরেট খনি অপারেটরদের বাণিজ্যিক স্বার্থে কোনো বড় আইনি বাধা তৈরি না হয়। বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনি সমীকরণ বিবেচনা করলে, আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবিত বিকল্প উপায়গুলো সরকারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়ার কোনো আশু বা নিকটবর্তী সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ... ...

নীচু ভলিউমের সেই সুর শরীরে জড়ো করতো রাজ্যের ক্লান্তি। ভাতঘুম। মেঝের পাটিতে জমে থাকা একপ্রস্ত শীতলতায় গা জুড়ানো আরাম। পাশে তন্দ্রাঘোর মায়ের চুল থেকে ভেসে আসা তিব্বত নারিকেল তেলের ভুরভুরে ঘ্রাণ। ... ...