
আবার মাঠাবুরুতে ফিরে এলাম। সকালে পাহাড়ে ওঠার ঐ কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুপুরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু বিকেলে অপেক্ষা করছিল অন্য চমক - যার পোষাকী নাম - সেলফ কুকিং। মোদ্দা কথাটা হল, যেখানে কোন পরিকাঠামোই নেই, সেখানে পাথর-কাঠ-কুটো সাজিয়ে উনুন বানিয়ে পাতার জ্বালন দিয়ে ম্যাগি রান্না করতে হবে, নইলে উঁহু বিকেলের খাবার পাবেনা, কারণ আলাদা কিছু তৈরিই হয়নি। ... ...

ছেলেটির নাম নীল। সেও মুখিয়ে উঠে বলল, "সবই তো ঠিক ছিল। সংবিধান রয়েছে দেশে। মনুর কথা তুমিই তুললে ভাই। মনুসংহিতায় বলা হচ্ছে যে, ব্রহ্মা তার অণ্ডকে দুইভাগে বিভক্ত করে স্বর্গ ও পৃথিবী সৃষ্টি করলেন। মাঝখানে হল আকাশ, আটদিক ও সমুদ্র। আকাশ থেকে বায়ু এবং বায়ু থেকে আলো,তা থেকে হয় জল আর জল থেকে পৃথিবী সৃষ্টি করেন। জলকে তো ব্রহ্মার আগে সৃষ্টি হতে দেখা গিয়েছে ওই মনুসংহিতাতেই। জলের অপর নাম নারা। কারন সে প্রথমে নর বা মানুষের আশ্রয়ে ছিল। তাহলে ব্রহ্মার সৃষ্টিকর্তা কি মানুষ ছিলেন ?" ... ...

সংক্ষেপে, আইনি দিক থেকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার বিকল্প প্রস্তাবগুলোর চেয়ে কর্পোরেট খনি লিজের চুক্তিগত অধিকার এবং সরকারের উন্নয়ন নীতিই আইনি আদালতগুলোতে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। যেমন 'লেমরু হাতি রিজার্ভ'’এর কাগজ কলমে অস্তিত্ব থাকলেও, এর সীমানা এমনভাবে আইনি মারপ্যাঁচে ছোট করা হয়েছে যাতে আদানি গ্রুপের মতো বড় কর্পোরেট খনি অপারেটরদের বাণিজ্যিক স্বার্থে কোনো বড় আইনি বাধা তৈরি না হয়। বর্তমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আইনি সমীকরণ বিবেচনা করলে, আন্দোলনকারীদের প্রস্তাবিত বিকল্প উপায়গুলো সরকারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়ার কোনো আশু বা নিকটবর্তী সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ... ...

নীচু ভলিউমের সেই সুর শরীরে জড়ো করতো রাজ্যের ক্লান্তি। ভাতঘুম। মেঝের পাটিতে জমে থাকা একপ্রস্ত শীতলতায় গা জুড়ানো আরাম। পাশে তন্দ্রাঘোর মায়ের চুল থেকে ভেসে আসা তিব্বত নারিকেল তেলের ভুরভুরে ঘ্রাণ। ... ...

কেন বেতোয়ার নদী সংযোগ প্রকল্পের কথায় ঢোকার আগে একটা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলি। মহারাষ্ট্রের পুণে শহরের জল সরবরাহ ব্যবস্থা মোটামুটি শহরের আশেপাশের কয়েকটি হ্রদে জমা বৃষ্টির জলের উপরে নির্ভরশীল। এই হ্রদগুলোর মধ্যে একটা ছাড়া বাকী সব কটাই মানুষের তৈরী। এর ফলে যে বছর বৃষ্টি খুব ভাল হয় সেবার পরের বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি অবধি মিউনিসিপালিটির নিত্য জল সরবরাহ ব্যবস্থা অক্ষুন্ন থাকে, তার পরে শুরু হয় অনিয়মিত সরবরাহ এবং ট্যাঙ্কাররাজ। ... ...

সেদিনের গোবিন্দবসান গ্রাম যেমন প্রাকৃতিক এবং কিছুটা প্রশাসনিক মিসম্যানেজমেন্টের জন্য হয়ে উঠেছিল ইকোলজিকাল ভিক্টিম, সেই একইভাবে, একই কারণে আজ দীঘা সংলগ্ন সমগ্র উপকূলটিই মরতে বসেছে। দীঘার সমুদ্র পঁচিশ বছর আগেও যথেষ্ট শান্ত ছিল, খুব ছোট ছোট ঢেউ আর বিস্তৃত মহাসাগরীয় সোপানের জন্য। গোবিন্দবসানের ঐ ঢেউ ছিল ব্যতিক্রম। কিন্তু এখন রোজ অন্তত একটা মানুষের প্রাণ যায় ঐ সাগরে। ... ...

সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ এডমান্ডের ফোন। কথা বোঝা যায় না প্রায়, পেছনে প্রচুর কলরব। অত্যন্ত জড়িত কণ্ঠে এডমান্ড বললে, হীরেন, ক্ল্যাপহ্যামের পাব থেকে ফোন করছি। পঁচাত্তর বছর বাদে মেয়ো কাউন্টি অল আয়ারল্যান্ড ফুটবল কাপ জিতেছে। দি কার্স ইজ ব্রোকেন। ... ...

ততদিনে আমরা শহরে থিতু হয়েছি। তবে উৎসব আয়োজনে বাড়িতে আসা চাই-ই। অবশ্য শহরের সঙ্গে কিন্তু একটা সখ্যতাও গড়ে উঠেছে ততদিনে। নয়তো ছুটিতে বাড়ি আসার দিন যখন বাস ধরার জন্য রিকশায় উঠেছিলাম তখন বানিয়াপট্টির বাতাসে ভেসে থাকা শিউলির ঘ্রাণটুকু আজও নিজের ভেতর পুষে চলতাম না নিশ্চয়ই। ... ...

"কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। আর কালো মেয়ের নাম ? কালো মেয়ে কালো ছেলের জন্ম দেবে। ভোট দেবেন কালো মেয়েকে?---" মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে গেছে এই কুৎসিত বক্তব্য। সমালোচনার ঝড় উঠেছে স্যোসাল মিডিয়ায়। রাস্তায় বাজারে পাড়ায় ঠেকে ঘরেও কম কথা হয়নি। ... ...

মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। ... ...

বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। ... ...

এক ঘুমে রাত কাবার। ভোর রাতে ওঠা। ছোট মাতাজী ভার নিয়েছেন সকলকে ঘুম থেকে ডেকে দেবেন। পড়ি কি মরি কি করে রেডি হয়ে বাইরে এসে দেখি - সেই আবছা কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরুর জঙ্গলের মাঝে ফাঁকা জায়গায় সারি বেঁধে প্রার্থনা শুরু করেছে মেয়েরা। আহা সেই ব্রহ্ম মুহূর্তে ওই সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ আর প্রার্থনা সঙ্গীত এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছিল। সে যে না দেখেছে, না শুনেছে তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। ... ...

ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ... ...

গল্প বদলে যাচ্ছিলো বাড়ির। বদলে যাচ্ছিলো বাড়ির সন্ধ্যা। মাটির কোলে, যদি কিছু মনে না করেন, এইসব দিনরাত্রি, ছায়াছন্দ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি, দ্যা বিল কসবি শো, মাটি ও মানুষ---আমরা বড়ঘরকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে অভ্যস্ত হচ্ছিলাম সেই অবাক সাদাকালো বাকশে। মেঝেয় পাতা পাটিকে একলা করে আমাদের চায়ের আড্ডা সীমিত হয়ে আসছিলো ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই। ... ...

ইংল্যান্ডে টাং ইন চিক হিউমর কথাটা খুব চালু, তার বাংলা কি হতে পারে জানি না, তবে জার্মানিতে সেটি অমিল। প্রথমেই বলে রাখি, মানফ্রেড রোমেলের হাস্যরস কখনো অত্যন্ত শুষ্ক, কখনো ছুরির মত ধারালো। যে কোন পরিস্থিতিতেই অবহেলায় অফ দি কাফ মন্তব্য করেন, সে কৌতুক আপনার পছন্দ হোক বা নাই হোক; কোন পপুলারিটি পোলের ধার ধারেন না। মানফ্রেড একটু তোতলা ছিলেন, মাঝে মাঝে কথা জড়িয়ে যেতো, কিন্তু এই আপাত দুর্বলতাকে তিনি তাঁর ব্র্যান্ডে পরিণত করেন – ‘আমার নাম মানফ্রেড রোমেল, আমি তোতলা এবং কখনো ফিস ফিস করে কথা বলে থাকি’ এমন একটা প্রস্তাবনার পরে শ্রোতার প্রতিরোধ ভেঙ্গে যেতে বাধ্য! ... ...

আমাদের একান্ন উঠোনকে মাঝখানে রেখে চারপাশের ঘরগুলোর মধ্যে বড়ঘরই ছিল আমাদের অঘোষিত বৈঠকখানা। কেতাবিয়ানা ছিল না তাতে মোটেও। ঘরের মেঝেয় নেহাতই পাটি পেতে সকাল-সন্ধ্যায় চা মুড়ি খাওয়া অথবা জরুরি কোনো আলোচনার আটপৌরে আয়োজনে সে ঘরই ছিল আমাদের অব্যর্থ গন্তব্য। একখানা কালো রঙের নকশি কাঠের খাট, খুব সাধারণ একখানা টেবিলক্লথে ঢাকা টেবিল আর মাত্র একটা চেয়ার। সেই চেয়ার অবশ্য বাড়ির যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একমাত্র দাদুর দখলে থাকতো দায়িত্বশীলতার একমাত্র বাহক হয়ে। ... ...


অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন তখন অনেক দূরে, বিপদে পড়লে দমকল ভরসা, তারা বিপন্ন মানুষকে বড়জোর হাসপাতাল নয় বাড়ি পৌঁছে দেয়, গাড়ি সারায় না। ক্লেয়ারমন্ট অবাক হয়ে দেখলেন হেনরির গাড়ি দিব্যি পৌঁছুল নুটসফোর্ডে, বাড়ির সামনে কৌতূহলী জনতার ভিড়! হেনরির নিজের হাতে বানানো গাড়ি থেমে যায়নি। নতুন কিছু তিনি আবিষ্কার করেননি, যা পেয়েছেন তারই ওপরে খোদকারি করে বানালেন এমন গাড়ি যা চলে মসৃণ ভাবে। যে আমলে গাড়ি ছিল খাটারা, যার বিকট শব্দে পথচারী সন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিতো সেই সময়ে হেনরির গাড়ি চলল, গাড়লের মতো না কেশে, লোককে জানান না দিয়ে! হেনরি আনলেন দশ হর্স পাওয়ার টু সিলিন্ডার সাইলেন্ট গাড়ি। ভবিষ্যতের রোলস-রয়েসের জন্ম হলো, সেদিন এপ্রিল ফুলস ডে, শুক্রবার, পয়লা এপ্রিল ১৯০৪। ... ...

ঝাড়বাগদায় ফিল্ড করার সময় আমরা ছিলাম মুকুটমণিপুর বাঁধ-এর কাছে। এই জায়গাটায় যতবার আসি, ততবারই নতুন করে ভালো লাগে, মন্দও লাগে। কংসাবতী নদীর ওপর তৈরি বিশাল জলাধারের নীলচে বিস্তার, দূরে মুকুটের মতো জেগে থাকা পরেশনাথ পাহাড়—সব মিলিয়ে যেন শান্ত সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ানোর অনুভূতি হয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাস্তবতা। গত শতকের পাঁচের দশকে জলাধার তৈরির সময় বিশাল বনভূমি, গ্রাম ও মানুষের বসতি জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল। ... ...

বন দেবতা আর দেবীর থান দেখা হল, এবারে গাইড বাবুর নেতৃত্বে পাহাড়ে চড়ার পালা। আমরা সরু লাইন করে একে একে সেই বন্ধুর জঙ্গলের পথে পা বাড়ালাম। শাল, সেগুন, মহুয়া গাছগুলো আমার আন্দাজে তিন সাড়ে তিন ফুট দূরত্বে রয়েছে। মানে চারা যখন লাগানো হয়েছিল তখন ছয় সাড়ে ছয় ফুট দূরে দূরে হয়তো পোঁতা হয়েছিল। এখন গাছ বড় হয়ে গুঁড়ির বেড়গুলো বেড়ে গেছে, তাই কাছে মনে হচ্ছে। আর লম্বা গাছের মাঝে নিজে থেকেই ঝোপ ঝাড় লতানে গাছ গজিয়ে উঠে বনটাকে বেশ গহন করে তুলেছে। আর একটা জিনিস নতুন দেখলাম... ... ...