
এবারের বাংলার নির্বাচন একেবারে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় হবে। এমনটাই বলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের তরফে। বলা হচ্ছে নয়, দেখাও যাচ্ছে হাজার হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান আনা হয়েছে। গোদী মিডিয়ায় খবর পাওয়া গেছে যে ৩৬০ ডিগ্রি নজরদারি চলবে, ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হবে নির্বাচন কেন্দ্র থেকে গণনা কেন্দ্র। কেউ এতটুকু বেগরবাই করলেই, সঙ্গে সঙ্গে রিপোল, অর্থাৎ পুনরায় ভোট নেওয়া হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই যে এত প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে সেই সমস্ত করার জন্য নিশ্চয় বেশ কিছু ক্যামেরা, বেশ কিছু কম্পিউটার এবং অন্যান্য জিনিষপত্রের প্রয়োজন হচ্ছে। কখনো কি কোনও একজন ভোটারের এই বিষয়ে প্রশ্ন জেগেছে এই এত এত সরঞ্জাম কোথা থেকে আসছে? কেউ কি এইগুলো কিনছেন? তাহলে সেই কেনার জন্য সঠিক পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে? ঠিকঠাক দরপত্র আহ্বান করা হচ্ছে তো? না এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে নেই। এই প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে বসলে তো নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব দুর্নীতি বেরিয়ে আসতে পারে, কিন্তু বেশ কিছু মানুষের কাছে নির্বাচন কমিশন বা কেন্দ্রের সরকার তো দুর্নীতি করতেই পারে না। তাঁদের মতো সৎ স্বশাসিত সংস্থা তো ভূ ভারতে আর খুঁজেই পাওয়া যাওয়া সম্ভব নয়, কিন্তু এক্ষেত্রে যে বড় সড় দুর্নীতি হয়েছে, তা কিন্তু কলকাতা হাইকোর্ট চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সম্প্রতি। ... ...

বিজেপি শাসিত রাজ্যে বহুদিন ধরেই দেখা যায় যে দাঙ্গায় সরাসরি বা পরোক্ষ মদত দিয়েছে যে সব পুলিশ অফিসার, তাদের কপালে জুটেছে পুরস্কার। এই দুই গবেষক স্টেট ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর এফিডেভিট খুঁড়ে বের করে এনেছেন চাঞ্চল্যকর দুটি সংখ্যা। যে অঞ্চলে একটিও খুন হয়নি – সেখানে পদ হারানোর সম্ভাবনা ৪৩% আর উঁচু পদে যাওয়ার সম্ভাবনা মাত্র ৪%। অন্যদিকে যে অঞ্চলে প্রাণ গেছে মানুষের? আমেদাবাদ, যে শহর দাঙ্গায় খুনোখুনির বিচারে একদম উপরেই থাকা একটি শহর, সেখানে এটা ঠিক উল্টো। উঁচু পদে যাওয়ার সম্ভাবনা ৮৫% আর পদ হারানোর সম্ভাবনা মাত্র ১%! ... ...

ভোটার তালিকায় আগে চুরি ছিল আর এখন যে তালিকা হয়েছে তা রীতিমত পুকুরচুরি। দেশের অন্যতম একটি স্বশাসিত সংস্থা, কীভাবে প্রধান শাসকদলের হয়ে কাজ করলো, তা ইতিহাসে লেখা থাকবে। গুজরাটেই প্রায় ৯০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছে। ৩৪ লক্ষ মধ্যপ্রদেশে, ৩১ লক্ষ রাজস্থানে এবং ৩৪ লক্ষ ছত্তিশগড়ে। প্রাথমিকভাবে উত্তরপ্রদেশেই ২.৫ কোটি মানুষের নাম বাদ গিয়েছিল। এই রাজ্যগুলোর প্রত্যেকটিই বিজেপি শাসিত। বিরোধী শাসিত রাজ্য তামিলনাডুতে বাদ যাওয়া ভোটারের সংখ্যা ৭৪ লক্ষ। দেশের গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ বেশ কিছুদিন আগে বলেছিলেন যে তারা আরো ৫০ বছর রাজত্ব করবেন। এই এসআইআর প্রক্রিয়া তার বক্তব্যকেই সিলমোহর দিল। বাংলায় কি হবে জানা নেই কতজন বাদ যাবেন জানা নেই, কিন্তু সারাদেশে বিরোধী ভোটারদের বাদ দেওয়ার এই চক্রান্তে সম্পূর্ণভাবে দায়ী থাকলো নির্বাচন কমিশন এবং তাকে সর্বতোভাবে সহায়তা করল চোখ বুজে থেকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। ... ...

যখন দেশের নানান প্রান্তে বাংলায় কথা বলার জন্যে বাংলাদেশী বলে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, যখন বাংলার পার্শ্ববর্তী রাজ্যে বাঙালী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার চলছে, তখন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিস আরও বড় একটা ঘোষণা করেছেন, যা আরও ভয়ঙ্কর। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে নাকি এবার থেকে বাংলাদেশী চেনা হবে, সেইরকম প্রযুক্তি তাঁরা আনতে চলেছেন। বাংলায় কথা বললে, সেই ভাষার কথা এবং স্বর-নিক্ষেপকে বিশ্লেষণ করা হবে, তার মধ্যে দিয়েই নাকি চেনা যাবে কে ভারতীয় বাঙালি আর কে বাংলাদেশী। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে না গিয়েও বলা যায় প্রতিটি মানুষকে এই যে সন্দেহের তালিকায় রাখা, প্রতিটি মানুষকে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে ভাবা এবং সেই ভাবনাকে সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াই আসলে ফ্যাসিবাদের অন্যতম বৈশিষ্ট। ঠিক এই ভাবনাই জাড়িত করে দেওয়া হয়েছিল নাৎসি জার্মানিতে। ... ...

আজকের সময়টা রাজনীতিতে দৃশ্যকল্প তৈরী করার খেলা আর এই খেলাতে সবচেয়ে পারদর্শী যিনি, তিনি জানেন কী করে এই দৃশ্যকল্প তৈরী করতে হয়। বাংলার মূলধারার সংবাদমাধ্যম যতই দেখানোর চেষ্টা করুক, নির্বাচন কমিশন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরোধিতা করেছে এবং সেটা যুক্তি সহকারে, বাংলার অলিতে গলিতে মানুষের মোবাইল ফোনে যখন ঐ ভিডিও ক্লিপটি ভেসে আসবে, যেখানে মমতা ব্যানার্জী বলছেন, তিনি নিজের পার্টির জন্য নয়, বাংলার জন্য বাঙালির জন্য দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সওয়াল করছেন, তখন প্রধান বিরোধী দল বুঝতে পারবে যে ঐ SIR তাঁদের কতটা ক্ষতি করেছে। যখন একদিকে মানুষ শুনবে রাজ্যের বিরোধী দলনেতার বক্তব্য যে ১ কোটি কিংবা দেড় কোটি মানুষের নাম এই SIR করলে উড়ে যাবে ভোটার তালিকা থেকে আর যখন শুনানির সময়ে নিজের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠাকে মেলাবেন, তখন তিনি ভোট দেওয়ার সময়ে কী সিদ্ধান্ত নেবেন তা এখনই বলে দেওয়া যায়। ... ...

ভোদু শেখ আদালতে তাঁর আবেদনে উল্লেখ করেন যে, তাঁর নিজের নামে জমি আছে এবং বাবা হাতিমতাই শেখের নাম পুরনো ভোটার তালিকায় রয়েছে। আদালতের কার্যবিবরণী থেকে জানা যাচ্ছে যে, ২৩শে জুন কে এন কাটজু মার্গ থা র্গ নায় একজন সাব-ইন্সপেক্টর এই আটককৃ তদের জিজ্ঞাসাবাদ করেন। তাঁদের সব রেকর্ড এফআরআরও-তে পাঠানো হয়। এফআরআরও আবার এই আটককৃতদের একটি কমিউনিটি সেন্টারে পাঠায় ২৪ জুন। ২৬ তারিখ ডিপোর্টেশনের আদেশ জারি হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি মাত্র পাঁচ দিনে শেষ। তারপর ওই ছয়জনকে জোর করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ... ...

অনেকে বলতেই পারেন এগুলো সব হেরোদের যুক্তি, অনেকে বলতেই পারেন বিরোধী জোটের অপদার্থতাই এই ফলাফলের জন্য দায়ী, কিন্তু যে নির্বাচন কমিশনের প্রতিটি দলের জন্য সমান সুযোগ দেওয়ার কথা, তারা কি তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেছেন? নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার ৭ দিন আগে যখন বিহারের ১.৩০ কোটি ‘জীবিকা দিদি’দের জন্য ১০হাজার টাকা এককালীন অনুদান হিসেবে ঘোষিত হয়, তারপর সেই ‘জীবিকা দিদি’দেরই আবার নির্বাচনের কাজে নেওয়া হয়, তাহলে তাঁদের ভূমিকাকে কি নিরপেক্ষ বলা চলে? বহু মানুষ বলছেন, অন্য রাজ্যেও তো এই ধরনের প্রকল্প চলে, তাহলে সেটা নিয়েও তো প্রশ্ন তুলতে হয়। অবশ্যই প্রশ্ন করতে হবে, যদি কোনও ক্ষমতাসীন দল সারা বছর গরীবদের বিভিন্ন দাবী দাওয়াকে উপেক্ষা করে ভোট কেনার জন্য এই রকম কোনও অনুদান ঘোষণা করে, তাহলে তার অবশ্যই বিরোধিতা করা উচিৎ। সঙ্গে অবশ্যই বলতে হবে, নির্বাচন কমিশন কি অন্যান্য রাজ্যের ক্ষেত্রে এইরকম চোখ বুজে নির্বিবাদে সব কিছু মেনে নেয়? রাজস্থানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলটের স্মার্ট ফোন প্রকল্পটি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তেলেঙ্গানায়, ২০১৮ সাল থেকে চলমান রাইথু বন্ধু প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে নির্বাচনের আগে। অন্ধ্রপ্রদেশে, ওয়াইএসআর চেউথা ডিবিটি প্রকল্পটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এমনকি উড়িষ্যার নবীন পট্টনায়েকের প্রকল্পটি ২০১৮ সালে যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সেই উদাহরণ কিন্তু আছে। আগামী বছর বাংলার নির্বাচনের আগে চলতে থাকা লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পও যে বন্ধ করে দেওয়া হবে না, তার কোনও নিশ্চয়তা কি আছে? ... ...

অতি সম্প্রতি দিল্লীর মহামান্য উচ্চ আদালত উমর খালিদ, শারজিল ইমাম সহ নয়জনের জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। এই আবেদন খারিজের স্বপক্ষে আদালতের ডিভিশন বেঞ্চের যুক্তি ছিল ... “অভিযোগের প্রকৃতি এবং বিশেষত বিজ্ঞ সলিসিটর জেনারেলের বক্তব্য বিবেচনা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, বর্তমান মামলাটি নিয়মিত প্রতিবাদ বা দাঙ্গার মামলা নয়; বরং ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা এবং সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ বেআইনি কার্যকলাপ সংগঠিত করার ক্ষেত্রে একটি পূর্বপরিকল্পিত, সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। এই ধরনের পরিস্থিতিতে মানুষের ব্যক্তিগত অধিকার এবং জাতির স্বার্থের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি আদালতের কাছে কঠিন কাজ হয়ে পড়ে। সেহেতু, জামিনের এই আবেদন গৃহীত হল না।” ... ...

অনেকে ভাবতে পারেন, এই ক্ষুদ্র ঋণের বিষয়টি শুধুমাত্র বিহারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কিন্তু বিষয়টা একেবারেই তা নয়, বাংলার ক্ষেত্রেও এই সমস্যা আছে। হুগলী, বসিরহাট, মুর্শিদাবাদ, মালদা সহ নানান জেলায় এই ক্ষুদ্র ঋণের জালে জড়িয়ে আছেন বহু মহিলা। ২০২৯ – ২০ সালের সময়ে যখন কোভিডের প্রভাব বেড়েছিল, যে সময়ে মানুষের কাজ ছিল না, ঐ সময়েই এই টাকা ধার নেওয়ার প্রবণতা বেড়েছিল। তারপরে সেই টাকা শোধ করতে না পেরে আরো অন্যান্য সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছিল। ক্ষুদ্রঋণ দেওয়া সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে হুমকি এবং অত্যাচারও বেড়েছিল। বিহারে এর ফলে, বহু পরিবার ছন্নছাড়া হয়ে গেছে। ... ...

এবারও হয়তো পুরোপুরি সফল হবেন না। কিন্তু থামবেন না গ্রেটা থুনবার্গ ও তাঁর সহযোদ্ধারা। তবে বেদনার কথা মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ধ্বজাধারী সৌদি আরবের একজন প্রতিনিধিও নেই। একটা পয়সাও দেননি। গ্রেটা থুনবার্গ রা গেছেন মানবতার জন্য। মনুষ্যত্বের জন্য। ধর্মের অপধর্ম বন্ধ করার জন্য। ... ...

কথা বলতে বলতে পৌঁছে গেলাম গান্ধী ময়দানে। পুরো এলাকা আলোয় আলোকিত। চারিদিকে তাঁবু পড়েছে। বিভিন্ন মাপের ছাউনি। কোথাও মহিলারা বিশ্রাম নিচ্ছেন, কোথাও পুরুষেরা খাবার খাচ্ছেন। কথা হলো সার্বান পাসওয়ানের সঙ্গে। উনি দ্বারভাঙ্গা থেকে ভোটার অধিকার মিছিলে হাঁটছেন। পরদিন সকালে মিছিলের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। বললেন আপাতত হয়তো এই ভোটার অধিকার যাত্রা শেষ হবে, কিন্তু লড়াই চলবে। ভোট চুরির বিরুদ্ধে। দেখছিলাম উনি খাবার খাচ্ছেন, আরও কিছু মানুষদের সঙ্গে। জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কোন দল করেন? লাল পতাকাটা দেখিয়ে বললেন, ‘হাম লোগ মালে পার্টি করতে হ্যায়’। বিহারে সিপিআইএমএলকে মালে বলে সেটা আমরা জানতাম। প্রশ্ন করলাম, আর সঙ্গে যাঁরা খাচ্ছেন, তাঁদের হাতে তো লাল পতাকা নেই। তাঁরা কী করেন? উত্তর দিলেন রাজু যাদব, ‘হাম লোগ রাহুল গান্ধীকে সাথ হ্যায়’। প্রশ্ন করলাম, কেন? বললেন, ‘এক ও হি দেশ কো বাঁচা সাকতা হ্যায়, ও হি সাচ্চা ইমানদার নেতা হ্যায়, জো উনকা পোল খোল দেগা’। ... ...

সারা বিহার জুড়ে এখন প্লাবন চলছে। হ্যাঁ, আক্ষরিক অর্থেই প্লাবন চলছে। মানুষের প্লাবন নেমেছে। নির্বাচন কমিশন যেদিন থেকে ঘোষণা করেছিল, যে বিহারে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী করা হবে, সেদিন থেকে বিজেপি বিরোধী সমস্ত দল বলা শুরে করে, এই বিশেষ নিবিড় সংশোধনী আসলে ‘ভোটবন্দী’। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে আসলে মানুষকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত করছে বিজেপি, আর সেটাকেই আইনগত মান্যতা দিচ্ছে, তাঁদেরই পছন্দের নির্বাচন কমিশন। এই আইন করে পদ্ধতিগত ‘ভোট চুরি’র বিরুদ্ধে রাস্তায় নামার সিদ্ধান্ত নেয় বিহারের বিরোধী ইন্ডিয়া জোট, যার পোষাকী নাম ‘মহাগঠবন্ধন’। সেই রাস্তার লড়াইয়ের একটা আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়- ‘ভোটার অধিকার যাত্রা’। ... ...

হঠাৎ কেন এই নিষিদ্ধকরণ? এটা বোঝার জন্য প্রথমে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আরও কিছু বই দেখা যেতে পারে। যেমন অনুরাধা ভাসিনের আ ডিসমেনটেল্ড স্টেট (দ্য আনটোল্ড স্টোরি অফ কাশ্মীর আফটার আর্টিকেল ৩৭০) যেখানে আট নম্বর অধ্যায়ে মিডিয়াকে কী ভাবে স্তব্ধ করে দেওয়া আছে তার উল্লেখ আছে, এগারো নম্বরে কী চতুর ভাবে ধারা ৩৫এ বিলোপ করে ও ভুমি সংক্রান্ত আইন পরিবর্তন করে অকাশ্মীরি ধনকুবেরদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা খুলে দেওয়া হচ্ছে ও উপত্যকার জনবিন্যাস কী ভাবে পাল্টে দেওয়া হচ্ছে তার বর্ণনা আছে; হাফসা কানজয়ালের কলোনাইজিং কাশ্মীর যাতে উপত্যকার সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা আছে; অরুন্ধতি রায়ের আজাদি যেখানে তিনি লিখছেন কাশ্মীর এমন একটা নাট্যমঞ্চ যেখানে অবর্ণনীয় হিংসা ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটে চলেছে যা ভারত পাকিস্তানকে যে কোনও মুহূর্তে পারমাণবিক যুদ্ধে নিমজ্জিত করতে পারে; তারিক আলি, হিলাল ভাট এবং অন্যান্যদের কাশ্মীর দ্য কেস ফর ফ্রিডম আছে যেখানে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পরে হিলাল ভাট কী ভাবে কাশ্মীরি পন্ডিত হওয়ার ভান করে উন্মত্ত জনতার কবল থেকে মুক্তি পান তার রোমহর্ষক বর্ণনা আছে। ... ...

রাহুল গান্ধী বোমা ফাটিয়েছেন। দেশের অন্যতম একটি সাংবিধানিক সংস্থা, নির্বাচন কমিশন যার দায়িত্ব অবাধ ও সুষ্ঠ নির্বাচন করার, তাদের দিকেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তথ্য প্রমাণ সহ সাংবাদিক সম্মেলন করে দেখিয়েছেন যে গত লোকসভা নির্বাচন এবং তার পরবর্তী মহারাষ্ট্র ও হরিয়ানা বিধানসভা নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে পরিচালনা করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন। উল্টে রাহুল দেখিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের সহায়তাতেই বিভিন্ন রাজ্যে ভুয়ো ভোটারের নাম নথিভুক্ত করানো হয়েছে। একই ভোটার কার্ডের নম্বরে বিভিন্ন রাজ্যে নাম নথিভুক্ত করা হয়েছে, সেই তথ্যও দেখিয়েছেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা। তিনি যেটা বলেননি, তা হলো নতুন ভোটারদের নাম নথিভুক্ত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ভোটারদের নামও বাদ দেওয়া হয়েছিল। এই অভিযোগ দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের আগে দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং তাদের রাজ্যসভার সদস্য সঞ্জয় সিং করেছিলেন। রাহুল গান্ধী যে অভিযোগ করেছেন, তা জেনে নেওয়া জরুরি। ... ...

যারা খবর দেখেননি তাদের জন্য আজকের তাজা খবর এই যে রাজস্থানে আমির শেখ নামে এক ব্যক্তিকে, নাগরিকত্বের সচিত্র পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও, শুধুমাত্র বাংলা ভাষা বলার অপরাধে ডিটেইন করা হয়, এবং অভিযোগ এই যে, ডিটেনশন ক্যাম্পে কিছুদিন বন্দী থাকার পর তাকে বসিরহাট সীমান্তে এনে একটি পে-লোডার মেশিনের সাহায্যে কাঁটাতারের ওপারে ছুঁড়ে দেওয়া হয়। আমির শেখ মালদহের কালিয়াচকের বাসিন্দা, আমির শেখের সচিত্র পরিচয়পত্র ছিল, আমির শেখ কাজ করতেন অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে, দোষ বলতে এক তিনি বাঙালি, আর দুই তিনি শ্রমিক ছিলেন বিজেপি-শাসিত একটি রাজ্যে। ... ...

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় ঘটে যাওয়া নির্মম হত্যাকাণ্ড স্বাধীন ভারতের ইতিহাসের অন্যতম শোকার্ত কালো অধ্যায়। গত ২২শে এপ্রিল, ২০২৫ বৈসরন উপত্যকায় যে নৃশংসভাবে নিরীহ পর্যটকদের হত্যা করা হল, তা সমগ্র ভারতবাসীর হৃদয়ের প্রতিটি শিরা-উপশিরা তীব্র শোকার্ত তরঙ্গে প্লাবিত করেছে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই এই পৈশাচিক হত্যালীলার প্রতিক্রিয়ায় সমগ্র দেশবাসী একদিকে যেমন স্বজন হারানোর শোকে মুহ্যমান হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে এই বর্বরোচিত নৃশংসতার বিরুদ্ধে সমগ্র দেশ তীব্র প্রতিবাদে গর্জে উঠেছে। সোশ্যাল মিডিয়ার পাতা জুড়ে হতভাগ্য সহনাগরিকদের জন্য সমবেদনার হাহুতাশ এবং বদলার নেওয়ার উদ্বেল আহ্বান। রাষ্ট্র পরিচালকদের বক্তব্য জুড়ে যোগ্য জবাব দেওয়ার অঙ্গীকার। কোন সন্দেহ নেই যে, ঘটনার নারকীয়তার পরিপ্রেক্ষিতে এই সবই অত্যন্ত স্বাভাবিক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া। কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটা হল, বদলাটা কার বিরুদ্ধে? কোন পথে? যোগ্য জবাবই বা কোন অর্থে? ... ...

ঐ নির্বাচনে প্রচলিত গণমাধ্যম, যাঁদেরকে পরিভাষায় আমরা গোদী মিডিয়া বলে থাকি, তাঁরা এই সত্যিটা বুঝতে পারছে, যে তাঁদের প্রোপাগান্ডা আর মানুষকে আকৃষ্ট করছে না এবং এই ধরনের ইউটিউব চ্যানেলগুলো বন্ধ করার প্রয়োজন আছে। বিশেষ করে বেশী বেশী দর্শক যে আঞ্চলিক এবং হিন্দি ভাষার ইউটিউব চ্যানেলগুলো দেখছেন, তা যেনতেন প্রকারে বন্ধ করতে হবে। শুধুমাত্র সরকারি আইন দিয়ে যদি বন্ধ না করা যায়, তাহলে বিকল্প পদ্ধতি নিতে হবে। প্রয়োজনে ঐ ইউটিউবারদের চ্যানেলগুলোকেই উড়িয়ে দিতে হবে, এবং তার জন্য যদি ইউটিউবকেও কাজে লাগাতে হয়, বা অন্য যেকোনো পদ্ধতি নিতে হয়, নিতে হবে। এক্ষেত্রে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল বা এএনআই এবং প্রেস ট্রাষ্ট অফ ইন্ডিয়া বা পিটিআই মুখ্য ভূমিকা নিয়েছে বলে দেখা যাচ্ছে। এই দুটি সংবাদ সংস্থাই মূলত সরকারের সবরকম খবর করে থাকে, তাঁদের থেকেই অন্যান্য সংবাদমাধ্যম খবর সংগ্রহ করে থাকে। যাঁরাই ঐ খবর সংগ্রহ করেন, তাঁরা স্বত্ব বাবদ বেশ কিছু টাকা দিয়ে থাকেন এএনআই এবং পিটিআইকে। এটাই নিয়ম। অনেক ইউটিউবার যারা কারেন্ট অ্যাফেয়ার্সের বিষয়বস্তু তৈরি করেন তারা অভিযোগ করেছেন যে এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (এএনআই) অনুমতি ছাড়াই পরবর্তী ক্লিপগুলি ব্যবহার করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেছে। এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা যুক্তি এবং কপিরাইট আইনের উভয় দিকই দেখা প্রয়োজন। ... ...

হিমাংশু বলছেন এক হাড় হিম করা কাহিনি। না, গল্প কথা নয়। দেশে ঘটমান বাস্তবের কথা, হিমাংশু বর্ণনা করেছেন। আপাত নিরাবেগ, নির্লিপ্ত তাঁর কণ্ঠস্বর, যে নির্লিপ্তি আসলে এক ভিন্নতর প্রতিবাদের ভঙ্গী, যন্ত্রণাকে আড়ালে রেখে যন্ত্রণাকে তুলে ধরা। হামলা হচ্ছে আদিবাসীদের ওপর, দেশের নানা প্রান্তে, তার মধ্যে ছত্তিশগড়ের আদিবাসীরা বিশেষভাবে আক্রমণের লক্ষ্য । তাদের হত্যা করা হচ্ছে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ২০০৫ সালে ছত্তিসগড়ে বিজেপি সরকার আসার সঙ্গে সঙ্গেই একশটি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে, কর্পোরেটদের হাতে জমি হস্তান্তর করার জন্য। সালওয়া জুডুমের সময় যেমন লক্ষ লক্ষ আদিবাসিকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল, এ ঠিক তেমনি। সরকার বলছে, মাওবাদী এবং নকশালবাদীরা সংবিধান বিরোধী। তাই মাওবাদী দমন করার প্রক্রিয়া চলছে সাধারণ মানুষের শান্তির জন্য। হিমাংশু বলছেন, যেখানে নকশাল নেই, মাওবাদী নেই সেখানে কি জনসাধারণের ওপর হামলা হয় না? দেশের অন্য প্রান্তে যেখানে নকশালদের চিহ্নমাত্র নেই, সেখানে কী দমনপীড়ন হচ্ছে না? সিআরপিএফ, পুলিশ, বাকি যে আধা-সামরিক বাহিনী আছে, সেগুলি শুধু মাওবাদীদের জন্য বানানো হয়েছে? সারা দেশজুড়েই যেখানে রাষ্ট্রীয় হামলা জারি আছে আদিবাসীদের ওপর, সেখানে নকশালবাদীদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া কি অসততা নয়? বরং দেখা যাচ্ছে যে এলাকা মাওবাদী-শূন্য সেখানেও জনগণের ওপর রাষ্ট্রের হিংসার প্রভাব সমানভাবে প্রকট। ... ...

সাংঘাতিক ঘরকুনো হওয়ার সুবাদে মিছিল নগরীর বাসিন্দা হলেও মিছিলের পাশ দিয়ে হাঁটা এই প্রথম, তাও তালেগোলে ঘটে গেছে। খিদে টিদে ভুলে গেলাম। এদিক ওদিক করে গুচ্ছের ছবি, ভিডিও তুলতে তুলতে এলাম। এবং বুঝলাম দলবদ্ধ হওয়ার কি মহিমা! মিছিলের উন্মাদনার অনুভূতি নিয়ে বাংলায় গাদা গুচ্ছ লেখা আছে। লেখা পড়ে অনেকেই নিশ্চই বোঝে, অনুভব করে। স্পষ্টত, আমি একেবারেই বুঝিওনি, অনুভবও করিনি। ফলে, আজকেই আমি বুঝলাম খুব ধীরে হেঁটেও হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া কেমন করে ঘটে। হাঁটতে হাঁটতে দেখছিলাম হাসি মুখের মানুষদের। ভুভুজেলা, সেই ছেলেবেলার মেলার ঝুমঝুমি জাতীয় অনেক কিছুই বাজছে। স্লোগান নেই। কারণ প্রতিবাদ মুখে নয়, হাতে উঁচিয়ে ছিল। স্লোগান ব্যাপারটা আমি একটু কমই শুনেছি এখানে। বেশি দেখেছি মাইক নিয়ে গান, বাজনা বাজানো। ... ...

১৯৪৬ সাল। আমার মা তখন ভিক্টরিয়া ইনস্টিটিউশন এ প্রথম বর্ষের ছাত্রী। কলেজ ছাড়া বাইরের জগতের সঙ্গে সম্পর্ক অল্পই। তাও যাতায়াত পর্দা ঢাকা ঘোড়ার গাড়িতে। আগের বছর মেজ মামা বিয়ে করেছেন এক বাঙালি ক্রিশ্চিয়ান মহিলাকে। চিঠি মারফত শুধু ওই খবরটুকুই দিয়েছেন বাবা মাকে, এবং এ তরফ থেকে "বউ নিয়ে তুমি বাড়ি এসো" জাতীয় কোন চিঠি যায়নি। এর মধ্যে ১৯৪৬ এর আগস্ট মাসে নৌ সেনা মেজো মামার কন্যার জন্মের দশ দিনের মাথায় হঠাৎ যুদ্ধে ডাক পড়ল। স্থির করল কচি মেয়েকে নিয়ে খিদিরপুরে মেজ মামিমার বাপের বাড়িতে ওদের রেখে আসবে । কিন্তু হাওড়া স্টেশনে আসতেই সমস্ত ট্যাক্সি বলল লক্ষ টাকা দিলেও ওদিকে যাবে না। দাঙ্গাকারীরা শুধু ওদের নয়, দুধের শিশু, তার মা কাউকেই ছাড়বে না। মেজমামা তখন "আমার মা কিছুতেই ফেরাবেন না" দৃঢ় বিশ্বাসে শ্যামপুকুরে দাদুর বাড়িতে এসে মেয়ে বউকে রেখে গেলেন। নতুন বউ, নতুন নাতনি সবকিছুর আনন্দ খুবই ক্ষণস্থায়ী হলো, কারণ পরদিনই সকালে বাড়ির সামনে দেখা গেল পাড়ার ছেলেরা, যাদেরকে বড়জোর মস্তান বলা যায়, এতদিন পর্যন্ত গুন্ডা বলা যেত না, তারা একটা মুসলমান মজুর কে পিটিয়ে মারছে। বেচারি লুকিয়ে ছিল তিন দিন, পেটের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে খাবার খুঁজতে বেরিয়েছিল। এই বীভৎসতা সহ্য করতে না পেরে দাদু বললেন অন্তত আমার বাড়ির সামনে থেকে সরে যা তোরা। ... ...