এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • পিঁপড়ের প্রেতাত্মা

    Mani Sankar Biswas লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ০৩ এপ্রিল ২০২২ | ১৭৯৬ বার পঠিত | রেটিং ৪ (২ জন)
  • এক প্রকারের ছত্রাক আছে, যা পিঁপড়ের দেহে সংক্রামিত হবার ৩/৪ দিনের ভিতর, পিঁপড়েটিকে নিজের ইচ্ছেমতো চালিত করে। সংক্রামিত প্রতিটি পিঁপড়ের শেষ পরিণতি একদম এক। ছত্রাক-জাতীয় সংক্রামক বীজানুর কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ! সংক্রামিত হবার ২/৩ দিনের মাথায় পিঁপড়েটি আত্মনিয়ন্ত্রণ হারাতে শুরু করে। চার/পাঁচ দিনের মাথায় পিঁপড়েটি, যা ইতিমধ্যে ওই ছত্রাকটির পার্সোনাল জোম্বি বা পোষা প্রেতাত্মায় পরিণত হয়েছে, গাছটির শীর্ষের দিকে যাত্রা শুরু করে। যতটা উপরে যাওয়া সম্ভব, পিঁপড়েটি যায়। আর তারপর? নিজেকে শক্ত করে আটকে ফেলে কোনো প্রশাখা বা পাতার সঙ্গে। বলা হয়নি, এদের গা থেকে তখন ছোট ছোট রোম বেরুনো শুরু হয়ে গেছে। কোনো ডালে বা পাতায় নিজেকে 'বেঁধে' ফেলবার পর, পিঁপড়েটি একদম 'স্ট্যাচু' হয়ে যায়। পিঁপড়েটির শরীর ভেদ করে, এরপর, পিঁপড়ের শরীরের অনুপাতে অনেক বড়ো একটা বা দুটো মাশরুম বেরিয়ে আসে। ততক্ষণে অবশ্য পিঁপড়েটির মৃত্যু ঘটেছে। এই যে পিঁপড়েটির গাছের একদম উপরে উঠে আসা, তারপর নিজেকে সেখানে স্থিরমূর্তি হয়ে আটকে ফেলা, এর তাৎপর্য কী? ওই যে মাশরুমটা পিঁপড়েটির শরীর ফাটিয়ে বেরিয়ে এলো, ওই মাশরুমটির ডিম্বাকৃতি অংশটি আসলে ওই ছত্রাকের রেণুতে ভর্তি। ছত্রাক-মাশরুমটি গাছের উপর থেকে যখন ফেটে নীচে গাছতলায় ছড়িয়ে পড়বে, তখন ওই রেণু বা ছত্রাকবীজ, গাছের তলায় ঘুরে বেড়ানো পিঁপড়েদের আবার সংক্রামিত করবে এবং যে পিঁপড়েগুলি সংক্রামিত হবে, তারাও আবার ওই সংক্রামক-ছত্রাকটির ব্যক্তিগত জোম্বি হয়ে গাছের মাথায় চড়তে শুরু করবে। বস্তুত ছত্রাকগুলিও পিঁপড়ের মতোই এক-একটা সুপার অর্গানিজম, পরিবেশ রক্ষায় এদের রীতিমতো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাও আছে। পিঁপড়ের সাহায্যে এরা যেমন বংশবিস্তার করে, অন্যদিকে পিঁপড়ের জন্মনিয়ন্ত্রণও করে। না-হলে পিঁপড়ের 'জনসংখ্যা' বাড়তে বাড়তে 'জঙ্গলের রাজত্ব' পুরোপুরি পিঁপড়ের অধিকারে চলে যেত। এই Zombie Ant Fungus-টির নাম Ophiocordyceps unilateralis।

    আজ যখন সর্বত্র মৌলবাদের দাপট দেখি, তখন আমার প্রায়ই মনে হয়, মৌলবাদের বিরুদ্ধে যাকে আমরা দাঁড় করাচ্ছি, তাও বোধহয় আরেক মৌলবাদ। মৌলবাদ কী? মৌলবাদ হল এই জোম্বি অ্যান্ট ফ্যাঙ্গাসের সংক্রমণ। না-হলে বাতাসে যখন চামড়া পোড়ার গন্ধ, কী করে আজও আমরা শাসকের সমর্থনে কথা বলছি! বলছি না আগে কখনো শাসকের প্রতি আনুগত্য দেখা যায়নি, কিন্তু তাই বলে এত নির্লজ্জতা! সরকারের হিডেন অ্যাজেন্ডা অনুসারে চিত্র-পরিচালক ছবি বানাবেন, গীতিকার গান লিখবেন, কবি চেয়ার মুছবেন, নাট্যকার বর্তমান থেকে চোখ ফিরিয়ে 'ইতিহাস'-এর পাতায় চোখ মেলে রাখবেন!
    এদিকে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার পাড়া-কাঁপানো মাস্তানেরা ইউক্রেনের ঘরছাড়া শিশুদের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দেব ইউক্রেন প্রেসিডেন্টের হঠকারী টুইট বা এসবের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন আফগান বা ফিলিস্তিনি শিশুদের অবর্ণনীয় যন্ত্রণাকে! নিপীড়িতের বর্ণ, ভাষা, জাত-ধর্ম, ভৌগলিক অবস্থান, রাজনৈতিক মতাদর্শ টেনে আনা হবে, নিপীড়িত হবার কারণ হিসেবে, আর সূক্ষ্ম ভাবে নিজের মতাদর্শের জয়গান করা হবে! কোনো অন্যায় নিয়ে হৈচৈ হলেই তাকে লঘু করে দেওয়া হবে, অতীতের বা সাম্প্রতিক অতীতের কোনো গুরুতর অন্যায়ের প্রসঙ্গ টেনে এনে! বস্তুত যে কোনো প্রতিবাদকে এখন প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়ে শুনতে হয়, "এখন কাঁদুনি গাইছেন, তখন কোথায় ছিলেন"? অপযুক্তির এই শৃঙ্খলায় আটকে পড়া যদি মৌলবাদ না হয়, তবে মৌলবাদ কী? প্রতিবাদ বা সিলেক্টিভ প্রতিবাদ, প্রতিবাদের প্রতিবাদ, তার প্রতিবাদ, এর শেষই-বা কোথায়?
    যাইহোক, আমার যা দৌড়, 'মনুষ্যত্বর' জীবজগত থেকে আরেকটা উদাহরণ দিই। পমফোরিঙ্কাস লিএভিস ( Pomphorhynchus laevis ) এক ধরণের কাঁঁটামাথা কৃমি (Spiny headed worm)। কুঁচো চিংড়ির মতো ছোট একপ্রকারের সামুদ্রিক সন্ধিপদ প্রাণী ( Gammarus lacustris ) এদের দ্বারা আক্রান্ত হয়। কিন্তু যেই এই কাঁঁটামাথা কৃমির দ্বারা এরা আক্রান্ত হয়, অমনি গভীর সমুদ্রে বসবাস করা এইসব জলচর প্রাণী, গভীর জল থেকে সমুদ্রের পাড়ের দিকে অল্প জলে বা জলের উপরিভাগে চলে আসে। সেখানে এরা সহজেই সিগাল ইত্যাদি জাতীয় পাখির শিকার হয়ে যায়। কেন এরকমটা ঘটে? কৃমিতে আক্রান্ত জলজ প্রাণীটির মাথায় সাঙ্ঘাতিক পরিমাণে সেরোটোনিন (Serotonin) ক্ষরণ হয় এবং সেরোটোনিনের প্রভাবে উন্মত্ত প্রাণীটি জলের উপরিভাগে এসে সাঁতার কাটতে শুরু করে! অদ্ভুত না? চক্রটা আরেকবার বলি। কাঁটামাথা কৃমির সংক্রমণ, সেখান থেকে মস্তিষ্কে ব্যাপক সেরোটোনিন ক্ষরণ এবং সবশেষে পাখির শিকার হয়ে যাওয়া! কিন্তু পাখির শিকার হওয়ার তাৎপর্য কী? এই কৃমিকীটগুলির দ্বারা সংক্রামিত ছোট ছোট জলজ প্রাণীগুলি, পাখির শিকার হলে, পাখির পেটে গিয়ে এই কৃমিগুলি আরও ভালো পুষ্টিকর খাবার ও বংশবিস্তারের জন্য আরও উপযুক্ত পরিবেশ পায়।
    মৌলবাদ এভাবেই অল্প-জলে টেনে নিয়ে যায়, যেখান থেকে পাখির খাদ্য হয়ে যাওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নয়। যাইহোক আরও সরাসরি বলা যেত। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রোফাইল রিচ দেখলাম খুবই কমে গেছে। যদিও তাতে খুব কিছু ছেঁড়া যায় না, তবে, অপ্রিয় হতে হতে কিছুটা কী ক্লান্তও হয়ে পড়লাম!! কী জানি!
    সবশেষে, এখানে ব্যবহৃত তথ্যগুলি খুব সহজেই অন্তর্জালে পাওয়া যায়। এই লেখাটার জন্য তবে কী আমাকে কুম্ভীলকবৃত্তির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হবে?

    সোর্স: https://www.theatlantic.com/science/archive/2017/11/how-the-zombie-fungus-takes-over-ants-bodies-to-control-their-minds/545864/
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ০৩ এপ্রিল ২০২২ | ১৭৯৬ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • হ্যাঁ মশাই | ০৩ এপ্রিল ২০২২ ২০:৩৩505978
  • সূত্র না দিলে প্লেগিয়ারিজমই বলা হয়। ইন্টারনেটে সহজলভ্য মানে লাইসেন্স ফী না দিয়ে ব্যবহার করা যায়। সূত্র গোপন করে ব্যবহার নয়। কারো বসার ঘরের দরজা খোলা থাকলেই যেমন টিভি তুলে এনে নিজের ঘরে সাজিয়ে বসা যায় না। অনুমতি নিয়ে সেখানে বসে দেখা যেতে পারে সেরকমই।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভ্যাবাচ্যাকা না খেয়ে প্রতিক্রিয়া দিন।