এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • শেষের সেদিন আর ঠিক কতদূরে? 

    Mani Sankar Biswas লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ১০ জুলাই ২০২৪ | ১১২৫ বার পঠিত
  • >

    ২০১৮ সালের একটি ছবি। কার্যত বিলুপ্ত হয়ে গেল প্রজতিটি। ছবিটিতে যে মৃত গণ্ডারটিকে দেখা যাচ্ছে সেটি ছিল এই প্রজাতির শেষ পুরুষ গণ্ডার। এখন মাত্র দুটি শাদা গণ্ডার বেঁচে আছে। দুটিই স্ত্রী গণ্ডার। পুরুষ গণ্ডারটি মারা যাবার আগে কৃত্রিম প্রজননের সমস্ত প্রচেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু কোনো সাফল্য অর্জন করা যায়নি। শীঘ্রই প্রজাতিটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আক্ষরিক অর্থেই একটি যুগের পরিসমাপ্তি। দ্য নর্দার্ন হোয়াইট রাইনোসোরাস (উত্তরের শাদা গণ্ডার নামেও পরিচিত), ৫৫ মিলিয়ন বছর টিকে ছিল। কী দ্যাখেনি এরা? জলবায়ু ওলটপালট করে দেওয়া বরফ যুগ, ভূমিকম্প, ভয়ংকর অগ্নুৎপাত। সব প্রতিকূলতা জয় করতে পেরেছিল এই প্রাণীগুলি, শুধু জয় করতে পারল না 'মানুষ' নামের প্রতিকূলতা!

    শুধু নর্দার্ন হোয়াইট রাইনোসোরাসই নয়, গণহারে প্রজাতিগুলি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে, আমার আপনার চোখের সামনেই। হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন, আমরা এখন ষষ্ঠ ‘মাস এক্সটিংকশন’-এর একদম মাঝখানে আছি। এর আগের অর্থাৎ শেষ মাস এক্সটিংকশন বা গণ প্রজাতি বিলুপ্তি ঘটেছিল ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে। ওই যেটিতে ডাইনোসর যুগের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। তো এভাবেই আগের পাঁচটি মাস এক্সটিংকশন এসেছিল প্রকৃতি থেকে। এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল যা জলবায়ু, বাতাসে অক্সিজেনের পরিমাণ, বৃষ্টির পরিমাণ, সব আমূল বদলে দিয়েছিল। কিন্তু এবারেরটা ব্যতিক্রম। এবারেরটা এসেছে জীবজগতের মধ্যে থেকে, নিজেদেরকে সবচেয়ে বুদ্ধিমান, শ্রেষ্ঠ, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’ ভাবা, মানুষের থেকে। উল্কা নয়, অগ্ন্যুৎপাত নয়, প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগের কারণে বাতাসের বিভিন্ন উপাদানগুলির নাটকীয় পরিবর্তন নয়। মানুষই মুখ্যচরিত্র এই বিয়োগান্তক নাটকের। অথচ বুদ্ধিমান মানুষ, ভেবে দ্যাখে না যে, মৌমাছি তো বটেই, এমনকি তুলনামূলক ভাবে অকিঞ্চিৎকর কেঁচো বা পিঁপড়ের সব প্রজাতিগুলি বিলুপ্ত হয়ে গেলেও মানুষের ‘সভ্যতা’ আর টিকে থাকবে না। কাটিং এজ টেকনোলজি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, কিছুই বাঁচাতে পারবে না এই ইকো-সিস্টেমকে। মানুষের সভ্যতা শুধু জলবায়ুই নয়, অন্য সব প্রাণীদের স্বাভাবিক বাসস্থান কেড়ে নিচ্ছে, ছোট করে আনছে, ওদের আকাশ, জল, স্থল!

    একটা হিসেবে দেখা গেছে ২০০১ থেকে ২০১৪-এর মধ্যে পরিচিত এবং বায়োলজিস্টদের জানা ১৭৩ টা প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সংখ্যার হিসেবে এটা এমন কিছু না। তাছাড়া পৃথিবীতে এখন প্রায় ১০০ মিলিয়ন প্রজাতির প্রাণী আছে। বলাই বাহুল্য, প্রজাতির বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং এভাবে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়েই নতুন নতুন প্রাণীর উদ্ভব হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক হল, প্রাণীদের বিলুপ্তির এই হার! প্রায় ১০০০ থেকে ১০০০০ গুণ দ্রুতগতিতে বিভিন্ন পশু-পাখি-উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মানুষ বা মানুষের সভ্যতা যদি না থাকত, বিবর্তনের ইতিহাস অনুযায়ী, এই এতগুলি পরিচিত ও সংজ্ঞায়িত প্রজাতি বিলুপ্ত হতে ১০০০০ বছর লাগার কথা ছিল, কিন্তু এক্ষেত্রে সময় লাগল মাত্র দেড় দশক!
    খুব অল্প বয়সে আমরা সবাই সেই রূপকথার গল্পটা পড়েছি, যেখানে একটা রাক্ষস, প্রতিদিন একটা করে জানোয়ার ভক্ষণ করত। এইভাবে সে যে জঙ্গলে বাস করতো, সেটাতে আর একটিও জানোয়ার থাকল না। এরপর রাক্ষসটা দাবী করল আহারের জন্য প্রতিদিন তার একটি করে মানুষ চাই। নাহলে সে নিজে পাহাড়ের গুহা থেকে নেমে আসবে এবং নিজের ইচ্ছে মতো, যত ইচ্ছে মানুষকে বধ করবে এবং তাদেরকে ভক্ষণ করবে। গল্পের শেষে এক ছদ্মবেশী রাজপুত্র বা কোটাল পুত্র এসে রাক্ষসকে হত্যা করে। যদি রূপক অর্থে ভাবি, এই রাক্ষসটা মানুষ নিজেই নয় তো?

    মানুষই তো সব খেয়ে ফেলছে! বর্তমানে পৃথিবীর সমস্ত স্থলভূমির ৪০% খাদ্য উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয়। আবার পৃথিবীর মিষ্টি জলের ৭০ % ব্যবহৃত হয় চাষের কাজে। খাদ্য উৎপাদনের এই প্রাচুর্য একদিকে যেমন জন-বিস্ফোরণের জন্য দায়ী। তেমনি আবার এও সত্যি যে, এই বিপুল জনসংখ্যাকে খাইয়ে পরিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে গেলে, পরিবেশের উপর চাপ পড়বেই। যদিও সব মানুষ আবার কর্পোরেট দেবতার 'আশীর্বাদে' দু'বেলা দু'মুঠো খেতেও পাচ্ছে না। সে গল্প অন্য কোনোদিন।

    যাই হোক, এই চাপ পৃথিবী আর নিতে পারছে না। শুরু হয়ে গেছে মাস এক্সটিংকশন। তাই একজন ‘সভ্য’ ও ‘বুদ্ধিমান’ মানুষ হিসেবে সবাইকে স্বাগতম জানাচ্ছি এই গণ প্রজাতি বিলুপ্তির যুগে। ইন ফ্যাক্ট আমরা এখন, একদম এই মাস এক্সটিংকশনের মাঝখানে আছি। মানুষের এই মাস এক্সটিংকশনের আওতায় আসতে ঠিক কতদিন লাগবে, তার সঠিক দিনক্ষণ এখনো বিজ্ঞানীরা হিসেব করে বের করতে পারেনি। কেউ বলছেন আর বড় জোর ১০০ বছর, কেউ বলছেন খুব জোর আমাদের হাতে আছে আর কমবেশি ৫০ বছরের মতো সময়। বুদ্ধির দিক থেকে আমি অতি নিম্নমেধার, তবে আমার ধারণা আর খুব বেশি দিন নয়।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ১০ জুলাই ২০২৪ | ১১২৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • সুধাংশু শেখর | ১১ জুলাই ২০২৪ ০২:০৯534486
  • "কেউ বলছেন আর বড় জোর ১০০ বছর, কেউ বলছেন খুব জোর আমাদের হাতে আছে আর কমবেশি ৫০ বছরের মতো সময়।"

    ১০০ হলে ভালো, ৫০ হলেও টেনেটুনে চলে যায়, কিন্তু দাদা আর কমাবেন না প্লিজ লাগে।
  • Prabhas Sen | ১২ জুলাই ২০২৪ ১৬:৪৭534543
  • মানুষ নিশ্চিহ্ন হলেও পৃথিবী থাকবে। চাকা হয়ত আবার ঘুরবে।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভেবেচিন্তে মতামত দিন