এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • দেবতার মৃত্যু

    শমীক মুখোপাধ্যায়
    আলোচনা | বিবিধ | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ | ৯৭৭ বার পঠিত
  • তেত্রিশ কোটি দেবতার দেশ ভারতবর্ষ। মোট জনসংখ্যার ওয়ান থার্ড। কিন্তু আফটার অল তাঁরা ভারতীয় দেবতা। তাই বহু-প্রাচীন এই দেবশুমারির সংখ্যা যে আজ কতটা রিলায়েবল, তা দেবা ন জানন্তি, কুতো আমজনতা:। তবে এঁয়ারা কিনা আমাদের মতন করে বংশবৃদ্ধি করেন না, তাই এঁদের ঝাড় বংশের উতার চড়াও সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আমাদের ভক্তির বহর এবং প্রস্থের ওপর।

    প্রস্থ বললেই মনে পড়ে ইন্দ্রপ্রস্থের কথা। ইদানিংকালে যার নাম দিল্লি। সেই দিল্লির দোখ্‌নো দিক ঘেঁষে, বিপিনবাবু, আপনি যদি সরিতা বিহার হয়ে মথুরা রোড ধরে এগোতে থাকেন ফরিদাবাদের দিকে, তা হলে আপনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন দেবসমাজের লেটেস্ট এϾট্র বীরবাবাকে।

    সরিতা বিহারের ফ্লাইওভার থেকে নেমে প্রথম সিগ্‌ন্যালটা টপকালেই চওড়া মথুরা রোড আপনাকে আমন্ত্রণ জানাবে। সামনেই ভয়ঙ্কর বদরপুরের জ্যাম জেনেও নিশ্চিত আপনি ঐ পথে পা বাড়াবেন। একটু এগোতেই বাঁদিকে সরিতা বিহারের জনবহুল কলোনি শেষ হয়ে শুরু হবে মদনপুর খাদার। ফাঁকা, কম জনবসতিপূর্ণ, মূলত নিম্নবিত্ত মানুষের বসতি, বস্তি বলাই ভালো। রাস্তার ধারে কেবল ঢাবা, বা পেন্‌চের-এর দোকান। রাস্তার ঠিক উল্টোদিকেই কিন্তু অতুল বৈভবের সারি। ভিশাল মেগামার্টের সামনে ঝক্‌মকে রঙিন ফাইবারের নারকোলগাছ, এনআইআইটি টেকনোলজিস্‌-এর অফিস, অ্যামেরিকান এক্সপ্রেসের অফিস, আর স্কোডা অক্টাভিয়া শেভ্রলে অÃট্রাদের মনোহারি দোকান। একদিকে এই অতুল বৈভব আর অন্যদিকে অতুল দারিদ্র্যের মধ্যে বিভাজনরেখা মথুরা রোড ধরে আপনি চলেছেন। একটু এগোতেই দেখবেন আরেকটা সিগন্যাল।

    বছর তিনেক আগেও কিছু ছিল না। হঠাৎ একদিনেকটা মূর্তি দেখা গেল রাস্তার ধারের পেভমেন্টে। কিছুদিনের মধ্যেই তা সিঁদুরে তেলে মাখামাখি হয়ে গেল। কিসের মূর্তি, আগে যাঁরা খেয়াল করেন নি, আর চেষ্টা করেও বুঝতে পারলেন না।

    দিল্লি শহরে ভক্তি এবং ভক্তের অভাব নেই। পাপেরও কমতি নেই কিনা! মাস না ঘুরতেই জনসমাগম বাড়তে লাগল, স্টিলের রেকাবিতে পাদ্যঅর্ঘ্যসমেত ভক্তের ভিড় গতি কমাতে লাগল গাড়িঘোড়ার। আগে এখান দিয়ে অনায়াসে ফিফ্‌থ গিয়ারে গাড়ি বের করে নেওয়া যেত, এখন থার্ড গিয়ারে নামাতেই হবে।

    ক্রমে আপনি জানতে পারলেন, ভগবানের নাম বীরবাবা। রেজিস্ট্রেশন নাম্বার তেত্রিশ কোটি এক। বড় জাগ্রত দেবতা। তিনি স্বয়ম্ভূ। বীরবার মানে বেস্পতিবারে তাঁর পুজো করলে তিনি ভক্তের মনোবাঞ্ছা পুর্ণ করেন। এমন সম্মিলিত ভক্তির সামনে আপনি গাড়ির স্পিড বাড়ান কী সাহসে! বাবা বড় জাগ্রত, স্পিড বাড়ালেই জানবেন আপনি সামনের গাড়িতে ঠোক্কর খাচ্ছেন, কারণ সামনের গাড়ির চালক তখন স্টিয়ারিং ছেড়ে কানে হাত দিয়ে বাবার কাছে ফ্লায়িং প্রার্থনা ছুঁড়ে দিয়ে যাচ্ছেন অফিস যাবার মুখে। তাঁর ভক্তির চেয়ে আপনার অফিস যাবার তাড়া বড় হল? বাবা বড় জাগ্রত, আপনার গাড়ির বনেট তো তুবড়ে দেবেনই, সাথে পকেটও হাল্কা করে দিতে পারেন তাঁকে অশ্রদ্ধা করলে।

    গল্পটা চেনা চেনা লাগছে? অনেকদিন আগে সেই মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের চক্কোত্তিমশায় এ রকমই একটা আষাঢ়ে গপ্পো লিখে গেছিলেন না? তবে শোনো হে হোরাশিও, এ ঘটনা আজও ঘটে। সত্যই ঘটে। তোমার চোখের সামনেই ঘটে। দেবতার জন্ম এভাবেই হয়।

    স্বয়ম্ভূ বীরবাবা এভাবেই জন্ম নিলেন মথুরা রোডের ধারে। নিত্য পুজিত হতে থাকলেন। দু হাজার পাঁচের শেষাশেষি বীরবাবার জন্য পাকা মন্দির তৈরি হয়ে গেল। ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, ইল্লিগাল পজেশন হলেও কেবলমাত্র ভগবান হবার খাতিরে কোনও জায়গা দখল করে নিলেও তা ট্যাক্স ফ্রি হয়ে যায়, আর এ তো রাস্তার ধারে ফুটপাথে চার হাত বাই চার হাত জায়গা মাত্র।

    দিনে দিনে বীরবাবা স্টপেজে জ্যাম বাড়তে থাকল, বিশেষত বৃহস্পতিবারে। প্রথমদিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে থাকা আপনি যদি এতদিনেও ঐ জায়গা পাস করে যাবার সময়ে বীরবাবার উদ্দেশ্যে একটি অন্তত ফ্লায়িং নমস্কার ছুঁড়ে না দিয়ে থাকেন, তবে আপনি ভারতীয় কল্‌চর এবং ঐতিহ্যের পরিপন্থী, মায়ের দয়া না হোক, বাবার দয়া আপনার ওপর হবেই, জেনে রাখবেন।

    যাই হোক, বদরপুর বর্ডারের (দিল্লি ফরিদাবাদ সীমান্ত) জ্যামের ভগ্নাংশ ধীরে ধীরে ডেভেলপ করে গেল বীরবাবা স্টপেজে। প্রতি মুহুর্তে খালি পায়ে তপ্ত পিচ মাড়িয়ে ভক্তের দল রাস্তা পারাপার করে চলল বীরবাবার আশীর্বাদ পাবার আশায়। এবং যেহেতু এই জ্যামের কারণ দিল্লি পুলিশ বা পিডব্লিউডি নয়, ভগবান বীরবাবা নিজে, এর হাত থেকে কোনওদিন মুক্তি পাবার আশা আপনি চিরতরে ত্যাগ করে বসলেন।

    গল্পের দ্বিতীয় ভাগ শুরু এখান থেকে। ততদিনে আপনি অন্য রাস্তা বেছে নিয়েছেন অফিস যাবার জন্য। অনেকদিন আর বাবার দর্শন নেওয়া হয় না আপনার।

    দু হাজার ছয়ের শেষদিকে বিশেষ কারণে আপনি আবার পড়লেন মথুরা রোডে। এবার জায়গাটা পাস করার সময়ে আপনার চোখে পড়ল বেশ কিছু পরিবর্তন। দু ধার ধরে ফুটপাথ চওড়া হচ্ছে, চার ফুট উঁচু রেলিং লাগছে রাস্তার ধার বরাবর। আর, সে সবের থেকেও অদ্ভুত ব্যাপার দেখলেন আপনি, বীরবাবার মন্দির কেমন ফাঁকা ফাঁকা। তবে কি, বাবার মাহাত্ম্য আর তেমন ছড়াচ্ছে না?

    এর পরের ঘটনাগুলো খুব চটপট হতে লাগল। হপ্তাখানেকের মধ্যেই মন্দিরের দেওয়ালে পড়ল হাতুড়ি শাবলের আঘাত। বর্বর বিধর্মী দিল্লি সরকারের প্রকাশ্য মদতে মাটিতে, থুড়ি, ফুটপাথে মিশে গেল বীরবাবার এতদিনের আশ্রয়স্থল। মুর্তির কী গতি হল, কেউ জানল না। মাসখানেকের মধ্যে সেখানে দাঁড়িয়ে গেল চার ফুট উঁচু রেলিং, ঝক্‌ঝকে ফুটপাথ আবার তিন বছর আগের মতই খালি, যেন কিছুই ছিল না এখানে। ভক্তরা যেমন উদয় হয়েছিল , তেমনি অদৃশ্যও হয়ে গেল রাতারাতি। এখন ঐ অংশ পার করতে আর আপনাকে গাড়ি স্লো করতে হয় না।

    কোনও বিক্ষোভ হল না, কম্যুনাল ভায়োলেন্স হল না, পথ অবরোধ কি দিল্লি বন্‌ধ, কিচ্ছুটি হল না। নীরবে আপনি প্রত্যক্ষ করলেন এক দেবতার উত্থান এবং পতন। একদিন চক্কোত্তি মশায় লিখে গেছিলেন দেবতার জন্মের কাহিনি, আজ আপনি সাক্ষী রইলেন, তার বিপরীতও ঘটে। এই ভারতবর্ষেই।

    বৃহত্তর জনগণেশের স্বার্থে, প্রয়োজনে, দেবতার মৃত্যুও ঘটে।
    ==============================================================
    কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সুমন মান্না
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ | ৯৭৭ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন