
দরিরামপুর থেকে গফরগাঁও কতদূর? কেউ কি আসবে না সম্মেলনে? দরিরামপুর হাই স্কুলের ছাত্র নজরুল ইসলাম এখন বঙ্গবিখ্যাত বিদ্রোহী কবি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত তেজোদ্দীপ্ত তার ভাষণ - সে খবর কি পৌঁছায়নি ত্রিশালের নামাপাড়ায়? বীররামপুরে? খিদির পন্ডিত স্যার কি না এসে থাকতে পারবেন? আর নূরজাহান? নিশ্চয় এতদিনে সে গৃহিণী হয়ে গিয়েছে। নূরের জ্যোতিতে ভরিয়ে তুলেছে কারো ঘর। তার কানে কি পৌঁছয়নি এই খবর? গফরগাঁওয়ে নজরুল আসছে শুনে সে কি থাকতে পারবে ঘরে? একবার দেখতে ইচ্ছে করবে না? কিন্তু আসবে কার সাথে? পন্ডিত স্যার কি তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হবেন? ... ...

নজরুল নিজে কোনদিনই অহিংস চরকা-পন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না সেকথা বিজয় লাল ভালোই জানে। ইতিমধ্যে হেমন্ত সরকার, মুজফফর আহমদ, কুতুবউদ্দিনদের সঙ্গে জোট বেঁধে কমিউনিস্টপন্থী দল গঠন করেছেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন --- এসব কথাও তাঁর অজানা নয়। তবু প্রকাশ্য সভা সমিতিত নজরুলকে নিয়ে তাঁর অকৃত্রিম উচ্ছাস নজরুলকে খুবই মুগ্ধ করে, বুকের মধ্যে একটা নিকটজনের ছোঁয়া লাগে। ... ...

রহিমার তখনও গোয়ালঘর, মাঠকোঠা ঘরে আলো দেখান বাকি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে আলো দেখানো এ রীতি গ্রামের সব মানুষের। চক্কোত্তি বাড়ির বড় বউয়ের শাঁখ বাজলেই হিন্দু মুসলমান সবাই বুঝে যায় ঘরে আলো দেখানোর সময় হয়েছে। চক্কোতি বাড়ির বড় বউ বড় নিষ্ঠাবতী। গ্রামে ঘড়ি আর কটা? এ গ্রামে মসজিদ নাই মন্দিরও তেমন নাই। শিবের মন্দির একটা আছে। তবে চৈত মাসে সেখানে বড় ধুম। গাজন হবে। বাকিসময় হিন্দু মুসলমান সব ছেলে ছোকরার আড্ডা। চার পাড়া মিলে গোটা তিনেক পীরতলা আছে। আগে অনেকেই যেত। এখন যাঁদের বাড়ির কাছে তাঁরা এবং আর কেউ বিশেষ ব্যাপার থাকলে মাটির দীপ জ্বালায়, ধুপ ধুনো দেয়। হিন্দু মুসলমান সবাই কম বেশি পীরকে মানে। তবে ইদানীং পশ্চিমপাড়ার পীরের প্রভাব খুব বেড়েছে। সেখানে লোকে বেশি মানত করে মঙ্গল শনিবারে। ... ...

নজরুল বিস্ময়ের চোখে গিরিবালা দেবীকে দেখছিলেন। কী আশ্চর্য দক্ষতায় একদিনের মধ্যে উপরের বৌদি, তাঁর কাজের মেয়ে, আর শিবেনকে নিয়ে সংসারটিকে গুছিয়ে ফেলেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে আশপাশের মানুষজনের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতে পারা, তাদের দিয়ে সংসারের দরকারি টুকটাক কাজ করিয়ে নেবার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে মাসিমার। বিয়ের পর থেকে সংসারের যাবতীয় হাল তিনিই ধরে রেখেছেন। অভাব অনটন আর সংসারের পারিপার্শ্বিক ঝামেলার প্রায় পুরোটাই তিনি একা হাতে সামলেছেন - দোলনের গায়ে আঁচ লাগতে দেননি। ... ...

বিস্ময়ে অবাক হচ্ছিলেন নজরুল। এতো কথা তো জেলে থাকার সময় বলেনি বিজয়। - তারপর আর কি বাবা। হাই স্ট্রীটের সেই স্কুলের ঘরেই থাকে ওরা। এতোদিন পার হয়ে গেল, প্রায় রোজই একবার করে আসে, গল্প করে, হৈচৈ করে - কিন্তু এক গ্লাস জল পর্যন্ত খায় না। একবার ভাবেন তো দিদি, আমি বাড়িতে রোজ রান্না করি। আমার ছেলেরা চোখের সামনে কিছু মুখে না দিয়ে চলে যায়, সে ভাত মুখে তুলতে আমার কেমন লাগে? ... ...

তিনি বলে রেখেছেন মামুনের বউকে, বাড়িতে কেউ এলে যা থাকবে তাই দেবে। যদি খাবার না থাকে নিজের খাবার দেবে। দরকারে দুধভাত দেবে। এমনকী রান্না করেও দেবে, কিন্তু ভিখারি হোক আর সন্ন্যাসী হোক বা ভিনদেশি, শুকনো মুখে কেউ যেন না ফেরে। ফলে ঘরে রাবণের চিতার মতো একটা উনুন জ্বলতেই থাকে। রহিমাকে বললেন, আলির বন্ধুর জন্য পরোটা বানা। ঘরে ছোলার হালুয়া আছে তার সঙ্গে ডিম নিংড়ি করে দে আর চিনির সিরা বানা। আর রহমতকে বল একটা মোরগ ধরে জবাই করতে। মামুন কি ফিরেছে? ... ...

বিয়ের পর কলকাতায় মুসলমান পাড়ায় ঘর মেলেনি। সাহিত্যের বন্ধুরাও ছিল একরকম মুখ ফিরিয়ে। অভিমান হয়েছিল খুব। সেই অভিমান থেকেই বোধহয় স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি --- পুত্রের মধ্যে কৃষ্ণ আর মহম্মদ একসাথে বিকশিত হোক। কিন্তু অভাগা যেদিকে চায় --- চার মাস না পেরেতেই সে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হতো খুব। দোলনকে এরকম অবস্থায় রেখে বসিরহাটে না গেলেই বোধহয় ভালো ছিল। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? ... ...

আমার বাপ-মা ছিল না। মেদিনীপুরের বানের জলে ভেসে যায়। এক গানের আসরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওর বাবা তুলে নিয়ে এসে মানুষ করেন। পড়াশোনা শেখান। গান শেখান। বাঁশিও। কত জায়গায় গেছি গাইতে। সম্বিতি, ওর বাবা। আমি। ওর মা। ওর বাবা খুব গুণী মানুষ। দার্শনিক কথাবার্তা। বামুনদের খুব বিরোধী। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের সাক্ষাৎ শিষ্য। কত অনুরাগী যে আসতো। আমি পরে বুঝতে পারি, তারা যত না বাবাঠাকুরের জন্য আসছে, আসছে সম্বিতির জন্য। সম্বিতি আর আমি পাশাপাশি বড় হয়েছি। সম্বিতি আমাকে মানুষ বলে গণ্যই করতো না। ... ...

আগের দিন মামুন বাজারে গিয়ে বৃষ্টিতে পড়েছিল। সাইকেল রাখা ছিল তাঁর মিল মালিক বন্ধু হরিপ্রসন্নের বাজারের দোকানে। সেখান থেকে সাইকেল নিয়ে সে বিডিআর রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে স্টেশন মাস্টারের বারান্দায় রেখে এসেছে চেন তালা দিয়ে। স্টেশনের জমাদার ভুলুয়া গোপনে পার্টির সমর্থক। তাঁর ছিল চুল্লুর নেশা। বহু কষ্টে ছাড়িয়েছে মামুন আর নবাব। সেজন্য ভুলুয়ার বউ রামি খুব খুশি। মামুন আর নবাব এলে সে খুব খুশি হয়। কিছু না কছু খাওয়ায়। এরা নাকি কমুনিস। ছোঁইয়াছুঁইয়ি মানে না। ভুলুয়ারা যাতে চামার। সেজন্য ঘেন্নাপত্তি নাই। কমুনিস কেমন জাত বা ধম্ম? সবাই যদি কমুনিস জাতে জম্মাত? ... ...

ইমু ভাবছিল, মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে এই দিলীপদার সঙ্গে যদি ফিরত সে—তাহলে কি এড়ানো যেত দুর্ঘটনাটা। এমনিতে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়লেও দূরপাল্লার যাত্রায় চালকের পাশে বসে সে। নিজেও ঘুমোয় না, চালককেও অসতর্ক হতে দেয় না। ইমু হাহাকার করছিল মনে মনে। চূর্ণী সেটাই বুঝে বলল—সব ব্যাপারে নিজেকে দোষ দেবেন না তো। ... ...

হাসির বর গ্যাঁড়া। গ্যাঁড়া আলসে কুড়ে লোক। তাকে দিয়ে নিড়ানির কাজ হবে না। ফলে হাসিকে সংসার টানতে হয়। নতুন বউ আসার পর হাসির মাইনে বাড়েনি। কিন্তু ভাত তরকারি বেশি মিলছে। নতুন বউয়ের রান্নার হাত বেশি ভালো। বাংলাদেশে কিছু আত্মীয় আছে। দেশভাগের সময় চলে যান। পরে কিছুজপ্ন বিয়ে শাদিও করেছেন। সেখান থেকে বেশ কিছু ভালোমন্দ, নবাবি খানা শিখেছে। মাঝে মাঝেই সেসব রান্না করে। খেয়ে শ্বশুরমশাই খুব খুশি। খুশির আরেকটা কারণ, নতুন বউ আসার পর আয় বেড়েছে। চালকলটা ভালো চলছে। ... ...

বাউলানি গান গাইছিল সিরাজ মঞ্চে। সিরাজ সাঁইয়ের নামে মঞ্চ ভেবেছিল ইমু। লালন মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা অধ্যাপক দিলীপ জানালেন, শুধু সিরাজ সাঁই নয়, আমরা স্মরণ করতে চেয়েছি সিরাজ-উদ-দৌলাকেও। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। সিরাজ লড়েছিলেন ইংরেজের অবাধ বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে। পনেরো বছর বয়সে মদের পাত্র ভেঙে ফেলে আর মদ ছোঁননি। বাংলার বাণিজ্য আর সংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন—তাই সিরাজ। ইমুর মনে পড়ল, শ্রীমতী কাফেতে ভজু ইংরেজের পুলিশদের সিরাজ-উদ-দৌলার ছবি দেখিয়ে জানিয়েছিল, সিরাজও বিপ্লবী। ... ...

আমার সালাম জানাস। এমন চালের আটার পিঠে আমাদের ঘরের মেয়েরা পারে না। ‘আমাদের’ কথাটা কানে ঠেকল মামুনের। তার মানে কমিউনিস্টদেরও 'ওরা' 'আমরা' আছে? আচ্ছা উনি তো গোরুর গোস্ত খান আনন্দ করে, সব নেতাই কম বেশি খান, যে খায় না, তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা চলে পার্টিতে। হেঁদুয়ানি যায়নি এখনো? মামুন একটু দমে গেল। ... ...

বেলা বাড়ছিল। খিদেও। একটু আলুকাবলি, একটু ঝাল মুড়ি, একটু ঘুগনি খাওয়া হয়েছে, গ্রামের দিকে রান্নায় এক ধরনের স্বাদ আছে—যা শহরের জীবনে অমিল। এ স্বাদ মুখ মেরে দেয় না। মুখকে আরও চালিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা দেয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল হাঁটার ক্রিয়া। ফলে খিদের কোনও দোষ নেই। আর গরিব-বড়লোক সবার খিদে সমান। তফাৎ এই বড়লোকেরা খিদের ব্যাপারটা খুব একটা টের পায় না। আর পেলে সহ্য করতে পারে না। বাকি দলে ইমুরা। এই সময় ইমু গুনতে বসল। দল বেঁধে বেড়াতে গেলে মাঝে মাঝেই মাথা গোনে ইমু। এটা তার অভ্যাস। দরকারও। কারণ এই রকম জায়গায় ছেলে-মেয়েরা হারাতে চায়। হারানো ভালোও কিন্তু দলপতির পক্ষে বিপদের। না হারালে ছেলেরা যে ছেলে, মেয়েরা যে মেয়ে—তা প্রমাণ হবে কেমন করে। বাউল মেলায় গিয়ে দেখা গেল ঈক্ষণ্যা আর নাসিম নামে দুজন উধাও। এদের তেমন চেনে না—ইমু। ... ...

দাঁয়েরা ছোট জমিদার। জমিদারি প্রথা নামে উচ্ছেদের। কাজে আছে। এখনও কংগ্রেসি নেতাদের সাহায্য নিয়ে চলে জমিদারি। পাইক আছে। মাসোহারা পায় না। কিছু জমি চাষ করে। তাই বেতন। যারা এখন চাষ করেছে, এবং যাদের ধান কেটে নিতে এসেছে – তাঁদের পূর্বপুরুষও পাইক ছিল – এখন মামুন ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে তারা নিজেদের লেঠেল পেশা ছেড়েছে, লাল ঝাণ্ডা ধরে জমির তেভাগা চাইছে, বর্গা চাইছে।-- কিন্তু দাঁয়েরা তা চায় না। ... ...

কিছু বিষয় থাকে একান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত পরিসরে প্রকাশ্যে নানা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক অপরাধ। অথচ ওই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার কোনও বিধান নেই। উল্টে এরা সমাদৃত হয়। পরদোষ অন্বেষক সমাজে এরা কেউ কেউ তালেবর হয়ে যান। অদীনও সেদিন পেল হিরোর সম্মান। কলেজের ক্যান্টিনে বসে সে অর্ণকে ডাকল, ভোলা, এই ভোলা। ক্যান্টিনে কাজ করত ভোলা নামের একটি লোক। সে তো অবাক। বাপের বয়সীকে নাম ধরে ডাকছে। এ কোন শিক্ষিত ছেলেরে বাবা! বন্ধুদের হাসির সমবেত হুল্লোড়ে আর অর্ণর বিব্রত হাসি বোঝাল, ভোলা নামের একজনের উদয় হয়েছে ইংরেজি বিভাগে। ... ...

সালেহাকে নিয়ে বিনয়বাবু যখন মামুনের ঘরে পৌঁছালেন, দেখলেন থমথমে অবস্থা। মামুনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। আঁতুড় ঘরে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। ছেলে কাঁপছে। নুরপুরের দাই ঘরে উনুন জ্বালিয়েছে। নুরপুরের দাই এ তল্লাটে বিখ্যাত। প্রায় সব ঘরের ছেলেমেয়ে হয়েছে তার হাতে। জমিলা বিবি। হিন্দু মুসলিম প্রায় সব ঘরে ক্রিটিক্যাল রোগী হলেই জমিলা বিবি মুশকিল আসান। কালো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। বিনয়বাবুকে দেখেই এগিয়ে এল মামুনের মা। মামুনের নিজের মা নেই সৎ মা। সৎ মা জহুরা ছেলে অন্ত প্রাণ। কী ভালই না বাসেন। বিনয়বাবুর গল্প উপন্যাস পড়ার খুব নেশা। রামের সুমতি বিন্দুর ছেলে নিষ্কৃতি বোধহয় এই সব মায়েদের দেখেই লিখেছিলেন শরৎবাবু। ভাবেন বিনয়। ... ...

স্কুল গ্রাউন্ডের ঠিক মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে, একবার গোল ঘুরে চারধারটা দেখে নিল। কী সুন্দর রঙিন লাগছে, রোদ ঝলমল নীল আকাশের নীচে, মাটিতে যেন রামধনু নেমে এসেছে। সীমানা বরাবর মাঠের দুই ধারে সারি সারি স্টল,যেমনটা হয় প্রতিবার। বাইরের লোক আসা শুরু হয়নি এখনো, স্টলে স্টলে শেষমুহূর্তের প্রস্তুতির উত্তেজনা তুঙ্গে। অন্যান্যবারে তারাও এই সময় নিজের নিজের স্টলে ব্যস্ত থাকত, টিচারদের বকাবকি, হাঁকডাক, এটা ভুলে যাওয়া সেটা ভুলে যাওয়া, স্টলের সাজ, নিজেদের সাজ, সবেতে শেষ মুহূর্তের ছোঁয়া দিয়ে নেওয়া। অবশ্য নিজেদের সাজ বলতে পরণে সেই স্কুল ড্রেস, তবু এত লোক আসবে, এই বিশেষ দিনে, তাই ওরই মাঝে সম্ভব হলে চুলের ছাঁটে সামান্য হেরফের, মাথায় শ্যাম্পু, নখে পালিশ, হাল্কা লাইনার, কড়া ডিসিপ্লিনের টীচাররাও এদিন ওটুকু নাদেখা করে দেয়। ... ...

শীত এলেই এই শহরে পিকনিকের ধুম পড়ে যায়। অবশ্য শীত কালটা হয়ও খুব সুন্দর। কনকনে ঠান্ডা রাত্রি, ঝলমলে রোদের দিন, ঝকঝকে নীল আকাশে ভাসে দূর পাহাড়ের বরফ চূড়া। আগে তো শীতের শুরুতেই হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা শেষ হয়ে গিয়ে, রেজাল্ট বেরোতো ক্রিসমাসের ছুটির আগে। ছুটিটা তাই মজায় ভরা থাকত, এমনিতে ক্যাম্পাসে একটু সাহেবিয়ানা বেশী বেশী, লোকে হরদম বিদেশ যাচ্ছে পড়তে বা পড়াতে, বিদেশী ছাত্রছাত্রীও আছে বেশ কিছু, তাই ক্রিসমাসের শুরুতেই সেজে ওঠে ঘর বাড়ি রাস্তা। এর ওপরে আবার এই শহর জুড়ে আছে বেশ কয়েকটা পুরনো নামী চার্চ। ঝিমলিদের স্কুলের চ্যাপেলও সেজে ওঠে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই, সাজানোর কাজে সিস্টারদের সাহায্য করে ছাত্রীরা যারা আর্টস আর ক্রাফটে ভালো, অনুর মত। আর অনু যেখানে সেখানে ঝিমলি থাকবেই। প্রতি বছরই ওরা খুব ভালোবেসে টাইনি টটের সিস্টাররা যারা এর দায়িত্বে থাকে তাদের সঙ্গে হাত মেলায়। ক্লাস টেনের পর থেকে তো ওদের পরীক্ষার সময়গুলো সব উল্টোপালটা হয়ে গেছে, এসময় ওদের ছুটি, আর ছুটির পরে প্রিবোর্ড, তাই এই দু বছর আর ওরা ক্রিসমাস ডেকরেশনে নেই, এমনকী ছুটি পড়ার দিনের সকালে যে প্রোগ্রামটা হয় প্রতি বছর সেটাও বোধহয় আর এ জন্মে দেখা হবেনা। গত বছর থেকে ওদের ক্লাসের সরিতা আর সান্টা সাজেনা, শুনছিল, ছোটরা নাকি সান্টার বদলটা ঠিকমত বুঝতে না পেরে, জিজ্ঞেস করেছে, “সান্টা দিদি, তুমি এত রোগা হয়ে গেছ কেন?” ... ...

দেওয়ালিতে এবার তার বাজি পোড়ানো বারণ, ঝিমলির তাই মুখ বেজার। সেই টেনের বোর্ডের আগে থেকে এ এক আপদ শুরু হয়েছে। এবার তো আবার তার সাথে কলেজে ভর্তির সব পরীক্ষা, বারো ক্লাস বলে কথা, কত দায়দায়িত্ব, বাজিটাজিতে হাত পুড়ে কিছু একটা হলে! কলেজে উঠে যাও তারপরে যত খুশী আশ মিটিয়ে বাজি পোড়াও, দোল খ্যালো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মারো, আমরা কিচ্ছু বলতে যাবনা। কথার ওপর কথা বলতে গেলে মা বলবে সবকিছুতে ঝিমলির নাকি যত কুযুক্তি, আর নিজেদের এইসব যুক্তি তাহলে কী? কলেজে উঠে গেলে বন্ধুরা তখন কে কোথায় থাকবে তার কোনো ঠিকানা আছে, নিজেই বাড়িতে আর থাকবে কিনা কে জানে! দেখছে তো অন্যদের অবস্থা, সিনিয়রদের সবাইকে। কার কখন ছুটি হয় কে কখন বাড়ি আসছে, কোনো ঠিক নেই, এর সেমিস্টার একসময় শেষ হয় তো ওর প্রজেক্ট তখন মাঝখানে। ... ...