
এই মুখোশ তৈরির উপাদান গুলি স্থানীয় ভাবেই সংগ্রহ করেন শিল্পীরা - যেমন পুরোনো সুতির কাপড়, তেঁতুল বীজের গুঁড়ো, কলাপাতার মিহি ছাই, কাগজ, ময়দার আঠা, হলুদ আর খড়িমাটির রং, বার্নিশ ইত্যাদি। তবে খবরের কাগজ ব্যবহার করা হয় না। এই মুখোশ নির্মাণের পদ্ধতিটি বেশ চমকপ্রদ এবং কাজের অনেকগুলি ধাপ আছে। ... ...

একটা টিনের দোচালা, নেহাতই সাদামাটা একটা ঘর। তাতে কড়ে গুনে মানুষ মাত্র চারজন। কেউ হলুদ খামে সিল লাগায়, কেউ চিঠি বাছাই করে, কেউবা লাল ডাকবাক্সের তালা খোলে। তবে সকলেই বেশ আয়েসি ভঙ্গিতে ধীরেসুস্থে এসব কাজ করে। এসবের মধ্যে একজনই চেয়ার টেবিলে অসং্খ্য কাগজপত্রের ভেতর হাবুডুবু খায়। এই কাগজে কিছু লেখে তো ওই কাগজে কিছু পড়ে। নাকের ডগায় চশমা বসিয়ে সারাক্ষণ চোখ নিবন্ধ টেবিলের এলোমেলো নানা কাগজে। ... ...

দরিরামপুর থেকে গফরগাঁও কতদূর? কেউ কি আসবে না সম্মেলনে? দরিরামপুর হাই স্কুলের ছাত্র নজরুল ইসলাম এখন বঙ্গবিখ্যাত বিদ্রোহী কবি, অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মত তেজোদ্দীপ্ত তার ভাষণ - সে খবর কি পৌঁছায়নি ত্রিশালের নামাপাড়ায়? বীররামপুরে? খিদির পন্ডিত স্যার কি না এসে থাকতে পারবেন? আর নূরজাহান? নিশ্চয় এতদিনে সে গৃহিণী হয়ে গিয়েছে। নূরের জ্যোতিতে ভরিয়ে তুলেছে কারো ঘর। তার কানে কি পৌঁছয়নি এই খবর? গফরগাঁওয়ে নজরুল আসছে শুনে সে কি থাকতে পারবে ঘরে? একবার দেখতে ইচ্ছে করবে না? কিন্তু আসবে কার সাথে? পন্ডিত স্যার কি তাকে সঙ্গে নিতে রাজি হবেন? ... ...

নজরুল নিজে কোনদিনই অহিংস চরকা-পন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন না সেকথা বিজয় লাল ভালোই জানে। ইতিমধ্যে হেমন্ত সরকার, মুজফফর আহমদ, কুতুবউদ্দিনদের সঙ্গে জোট বেঁধে কমিউনিস্টপন্থী দল গঠন করেছেন, মানবেন্দ্রনাথ রায় ওদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন --- এসব কথাও তাঁর অজানা নয়। তবু প্রকাশ্য সভা সমিতিত নজরুলকে নিয়ে তাঁর অকৃত্রিম উচ্ছাস নজরুলকে খুবই মুগ্ধ করে, বুকের মধ্যে একটা নিকটজনের ছোঁয়া লাগে। ... ...

রহিমার তখনও গোয়ালঘর, মাঠকোঠা ঘরে আলো দেখান বাকি। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘরে ঘরে আলো দেখানো এ রীতি গ্রামের সব মানুষের। চক্কোত্তি বাড়ির বড় বউয়ের শাঁখ বাজলেই হিন্দু মুসলমান সবাই বুঝে যায় ঘরে আলো দেখানোর সময় হয়েছে। চক্কোতি বাড়ির বড় বউ বড় নিষ্ঠাবতী। গ্রামে ঘড়ি আর কটা? এ গ্রামে মসজিদ নাই মন্দিরও তেমন নাই। শিবের মন্দির একটা আছে। তবে চৈত মাসে সেখানে বড় ধুম। গাজন হবে। বাকিসময় হিন্দু মুসলমান সব ছেলে ছোকরার আড্ডা। চার পাড়া মিলে গোটা তিনেক পীরতলা আছে। আগে অনেকেই যেত। এখন যাঁদের বাড়ির কাছে তাঁরা এবং আর কেউ বিশেষ ব্যাপার থাকলে মাটির দীপ জ্বালায়, ধুপ ধুনো দেয়। হিন্দু মুসলমান সবাই কম বেশি পীরকে মানে। তবে ইদানীং পশ্চিমপাড়ার পীরের প্রভাব খুব বেড়েছে। সেখানে লোকে বেশি মানত করে মঙ্গল শনিবারে। ... ...

বাংলার পশ্চিম পারে পুরুলিয়ার বাগমুন্ডিতে ছোট্ট গ্রাম চড়িদা। ছোট হলেও গ্রামটি জগদ্বিখ্যাত, কারণ এটি হল ছৌ শিল্পীদের গ্রাম। এখানে ছৌনাচের মুখোশ তৈরি হয়। আমি প্রথম চড়িদায় আসি খুব সম্ভবত ২০০৩ সালে। তখন পুরো গ্রামটাই ছিল অতি নির্জন - পাহাড়ি পথে কিছু কাঁচা আর আধ পাকা বাড়ি। সেবারে আমি বড় এক কার্টন মুখোশ কিনে বাড়ি ফিরেছিলাম, সকলকে উপহার দেব বলে। ... ...

নজরুল বিস্ময়ের চোখে গিরিবালা দেবীকে দেখছিলেন। কী আশ্চর্য দক্ষতায় একদিনের মধ্যে উপরের বৌদি, তাঁর কাজের মেয়ে, আর শিবেনকে নিয়ে সংসারটিকে গুছিয়ে ফেলেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে আশপাশের মানুষজনের সাথে একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলতে পারা, তাদের দিয়ে সংসারের দরকারি টুকটাক কাজ করিয়ে নেবার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা আছে মাসিমার। বিয়ের পর থেকে সংসারের যাবতীয় হাল তিনিই ধরে রেখেছেন। অভাব অনটন আর সংসারের পারিপার্শ্বিক ঝামেলার প্রায় পুরোটাই তিনি একা হাতে সামলেছেন - দোলনের গায়ে আঁচ লাগতে দেননি। ... ...

বিস্ময়ে অবাক হচ্ছিলেন নজরুল। এতো কথা তো জেলে থাকার সময় বলেনি বিজয়। - তারপর আর কি বাবা। হাই স্ট্রীটের সেই স্কুলের ঘরেই থাকে ওরা। এতোদিন পার হয়ে গেল, প্রায় রোজই একবার করে আসে, গল্প করে, হৈচৈ করে - কিন্তু এক গ্লাস জল পর্যন্ত খায় না। একবার ভাবেন তো দিদি, আমি বাড়িতে রোজ রান্না করি। আমার ছেলেরা চোখের সামনে কিছু মুখে না দিয়ে চলে যায়, সে ভাত মুখে তুলতে আমার কেমন লাগে? ... ...

তিনি বলে রেখেছেন মামুনের বউকে, বাড়িতে কেউ এলে যা থাকবে তাই দেবে। যদি খাবার না থাকে নিজের খাবার দেবে। দরকারে দুধভাত দেবে। এমনকী রান্না করেও দেবে, কিন্তু ভিখারি হোক আর সন্ন্যাসী হোক বা ভিনদেশি, শুকনো মুখে কেউ যেন না ফেরে। ফলে ঘরে রাবণের চিতার মতো একটা উনুন জ্বলতেই থাকে। রহিমাকে বললেন, আলির বন্ধুর জন্য পরোটা বানা। ঘরে ছোলার হালুয়া আছে তার সঙ্গে ডিম নিংড়ি করে দে আর চিনির সিরা বানা। আর রহমতকে বল একটা মোরগ ধরে জবাই করতে। মামুন কি ফিরেছে? ... ...

মাঠাবুরুকে টা টা করে আমরা চললাম ঝালদা। সেখানে আছেন জয়দেব মাহাতো। এই অদ্ভুত মানুষটি একজন সাধারণ লাক্ষাচাষী হিসেবে জীবন শুরু করে নিজের উদ্যম, কঠোর পরিশ্রম এবং অনুসন্ধিৎসা নিয়ে আজ এক বিরাট প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠেছেন। অসংখ্য রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভরা তাঁর ঝুলি। অরণ্যচারী মানুষের সংগঠন তাঁর করায়ত্ত। বর্তমানে তিনি লাল মাটির জেলাগুলিতে প্রায় তিন হাজার লাক্ষাচাষীর মাস্টার ট্রেনার, ৩৫টি এমন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) সহায়ক, যারা লাক্ষা দিয়ে অলঙ্কার, কলমদানি, মোমদানির মতো নানা হস্তশিল্প তৈরি এবং বিক্রি করে। ... ...

বিয়ের পর কলকাতায় মুসলমান পাড়ায় ঘর মেলেনি। সাহিত্যের বন্ধুরাও ছিল একরকম মুখ ফিরিয়ে। অভিমান হয়েছিল খুব। সেই অভিমান থেকেই বোধহয় স্বপ্ন দেখেছিলেন কবি --- পুত্রের মধ্যে কৃষ্ণ আর মহম্মদ একসাথে বিকশিত হোক। কিন্তু অভাগা যেদিকে চায় --- চার মাস না পেরেতেই সে ফাঁকি দিয়ে চলে গেল। নিজেকে অপরাধী মনে হতো খুব। দোলনকে এরকম অবস্থায় রেখে বসিরহাটে না গেলেই বোধহয় ভালো ছিল। কিন্তু তাই বা কী করে হয়? ... ...

এক শাস্ত্রীয় আলোচনায় লোকটা এই শুদ্ধিকরণ বিষয়ে শুনেছিল। গুরুদেব বলছিলেন যে, বিশেষ অন্যায় করলে মনুসংহিতার একাদশ অধ্যায়ের ২১২ নং শ্লোকে কৃচ্ছ্র সান্তপন নামক এক বিশেষ প্রায়শ্চিত্ত করার বিধান আছে। গোমূত্র, গোবর, দুধ, দই, ঘি এবং কুশোদক(কুশ ঘাস মিশ্রিত জল)—এই ছয়টি দ্রব্য মিশিয়ে একদিন পান করতে হবে এবং পরের দিন উপবাস করতে হবে। ... ...

এককালে ইমিগ্রেশন অফিসারের নাকের ডগায় ব্রিটিশ পাসপোর্ট দেখিয়ে কয়েক সেকেন্ডে সীমানা পার হয়েছি, সব সময়ে সঠিক পাতা খুলে আত্ম পরিচয় প্রদর্শন করতে হয়নি, কখনো কোন স্ট্যাম্প পড়েনি পাসপোর্টে।এখন দিনকাল বদলেছে। স্বেচ্ছায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিত্যাগ করে আমরা হয়েছি ব্রাত্য, অবাঞ্ছিত। নানান দেশের ইমিগ্রেশন অফিসার আমার পাসপোর্ট উলটে পালটে দেখেন, একান্ত অব্রিটিশ মুখচন্দ্রিমা অবলোকন করেন, সাত সতেরো প্রশ্ন তোলেন। হাসিমুখে তার জবাব দিতে হবে জানি, তবু আজ এই স্কিফোল এয়ারপোর্টে মনে হল এই তরুণ অফিসারকে কি বোঝাতে পারি ১৯৭৭ সালের নভেম্বর মাসের এক শীতল সন্ধ্যায় কলকাতা হতে ফ্রাঙ্কফুর্ট যাবার পথে আকাশে কোথাও সুটকেস হারিয়ে এই আমস্টারডাম পৌঁছেছিলাম? ... ...

আমার বাপ-মা ছিল না। মেদিনীপুরের বানের জলে ভেসে যায়। এক গানের আসরে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ওর বাবা তুলে নিয়ে এসে মানুষ করেন। পড়াশোনা শেখান। গান শেখান। বাঁশিও। কত জায়গায় গেছি গাইতে। সম্বিতি, ওর বাবা। আমি। ওর মা। ওর বাবা খুব গুণী মানুষ। দার্শনিক কথাবার্তা। বামুনদের খুব বিরোধী। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুরের সাক্ষাৎ শিষ্য। কত অনুরাগী যে আসতো। আমি পরে বুঝতে পারি, তারা যত না বাবাঠাকুরের জন্য আসছে, আসছে সম্বিতির জন্য। সম্বিতি আর আমি পাশাপাশি বড় হয়েছি। সম্বিতি আমাকে মানুষ বলে গণ্যই করতো না। ... ...

আগের দিন মামুন বাজারে গিয়ে বৃষ্টিতে পড়েছিল। সাইকেল রাখা ছিল তাঁর মিল মালিক বন্ধু হরিপ্রসন্নের বাজারের দোকানে। সেখান থেকে সাইকেল নিয়ে সে বিডিআর রেল লাইনের পাশ দিয়ে এসে স্টেশন মাস্টারের বারান্দায় রেখে এসেছে চেন তালা দিয়ে। স্টেশনের জমাদার ভুলুয়া গোপনে পার্টির সমর্থক। তাঁর ছিল চুল্লুর নেশা। বহু কষ্টে ছাড়িয়েছে মামুন আর নবাব। সেজন্য ভুলুয়ার বউ রামি খুব খুশি। মামুন আর নবাব এলে সে খুব খুশি হয়। কিছু না কছু খাওয়ায়। এরা নাকি কমুনিস। ছোঁইয়াছুঁইয়ি মানে না। ভুলুয়ারা যাতে চামার। সেজন্য ঘেন্নাপত্তি নাই। কমুনিস কেমন জাত বা ধম্ম? সবাই যদি কমুনিস জাতে জম্মাত? ... ...

পাঁচগুটি, চোরডাকাত আর কাটাকুটি খেলা। আফরোজা আপার হাজিরা খাতায় মোটে কয়েকটা টিক পড়তেই বৃষ্টির তোড় বেড়েছিলো আরোও সেদিন। অফিসরুমে যাবার আগে সরল অঙ্কের সময় বেঁধে দিলেও আষাঢ় পেরিয়ে সে জটিল সময়ের কাছে ফেরার ইচ্ছা কিংবা আগ্রহ কোনোটাই ছিল না আমাদের। ... ...

ইমু ভাবছিল, মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে এই দিলীপদার সঙ্গে যদি ফিরত সে—তাহলে কি এড়ানো যেত দুর্ঘটনাটা। এমনিতে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়লেও দূরপাল্লার যাত্রায় চালকের পাশে বসে সে। নিজেও ঘুমোয় না, চালককেও অসতর্ক হতে দেয় না। ইমু হাহাকার করছিল মনে মনে। চূর্ণী সেটাই বুঝে বলল—সব ব্যাপারে নিজেকে দোষ দেবেন না তো। ... ...

হাসির বর গ্যাঁড়া। গ্যাঁড়া আলসে কুড়ে লোক। তাকে দিয়ে নিড়ানির কাজ হবে না। ফলে হাসিকে সংসার টানতে হয়। নতুন বউ আসার পর হাসির মাইনে বাড়েনি। কিন্তু ভাত তরকারি বেশি মিলছে। নতুন বউয়ের রান্নার হাত বেশি ভালো। বাংলাদেশে কিছু আত্মীয় আছে। দেশভাগের সময় চলে যান। পরে কিছুজপ্ন বিয়ে শাদিও করেছেন। সেখান থেকে বেশ কিছু ভালোমন্দ, নবাবি খানা শিখেছে। মাঝে মাঝেই সেসব রান্না করে। খেয়ে শ্বশুরমশাই খুব খুশি। খুশির আরেকটা কারণ, নতুন বউ আসার পর আয় বেড়েছে। চালকলটা ভালো চলছে। ... ...

আবার মাঠাবুরুতে ফিরে এলাম। সকালে পাহাড়ে ওঠার ঐ কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুপুরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু বিকেলে অপেক্ষা করছিল অন্য চমক - যার পোষাকী নাম - সেলফ কুকিং। মোদ্দা কথাটা হল, যেখানে কোন পরিকাঠামোই নেই, সেখানে পাথর-কাঠ-কুটো সাজিয়ে উনুন বানিয়ে পাতার জ্বালন দিয়ে ম্যাগি রান্না করতে হবে, নইলে উঁহু বিকেলের খাবার পাবেনা, কারণ আলাদা কিছু তৈরিই হয়নি। ... ...

নীচু ভলিউমের সেই সুর শরীরে জড়ো করতো রাজ্যের ক্লান্তি। ভাতঘুম। মেঝের পাটিতে জমে থাকা একপ্রস্ত শীতলতায় গা জুড়ানো আরাম। পাশে তন্দ্রাঘোর মায়ের চুল থেকে ভেসে আসা তিব্বত নারিকেল তেলের ভুরভুরে ঘ্রাণ। ... ...