
আবার মাঠাবুরুতে ফিরে এলাম। সকালে পাহাড়ে ওঠার ঐ কঠোর পরিশ্রমের ফলে দুপুরে ভাত খাওয়ার পর অনেকেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমিও ব্যতিক্রম নই। কিন্তু বিকেলে অপেক্ষা করছিল অন্য চমক - যার পোষাকী নাম - সেলফ কুকিং। মোদ্দা কথাটা হল, যেখানে কোন পরিকাঠামোই নেই, সেখানে পাথর-কাঠ-কুটো সাজিয়ে উনুন বানিয়ে পাতার জ্বালন দিয়ে ম্যাগি রান্না করতে হবে, নইলে উঁহু বিকেলের খাবার পাবেনা, কারণ আলাদা কিছু তৈরিই হয়নি। ... ...

নীচু ভলিউমের সেই সুর শরীরে জড়ো করতো রাজ্যের ক্লান্তি। ভাতঘুম। মেঝের পাটিতে জমে থাকা একপ্রস্ত শীতলতায় গা জুড়ানো আরাম। পাশে তন্দ্রাঘোর মায়ের চুল থেকে ভেসে আসা তিব্বত নারিকেল তেলের ভুরভুরে ঘ্রাণ। ... ...

বাউলানি গান গাইছিল সিরাজ মঞ্চে। সিরাজ সাঁইয়ের নামে মঞ্চ ভেবেছিল ইমু। লালন মেলার অন্যতম উদ্যোক্তা অধ্যাপক দিলীপ জানালেন, শুধু সিরাজ সাঁই নয়, আমরা স্মরণ করতে চেয়েছি সিরাজ-উদ-দৌলাকেও। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব। সিরাজ লড়েছিলেন ইংরেজের অবাধ বাণিজ্য নীতির বিরুদ্ধে। পনেরো বছর বয়সে মদের পাত্র ভেঙে ফেলে আর মদ ছোঁননি। বাংলার বাণিজ্য আর সংস্কৃতি রক্ষার জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন—তাই সিরাজ। ইমুর মনে পড়ল, শ্রীমতী কাফেতে ভজু ইংরেজের পুলিশদের সিরাজ-উদ-দৌলার ছবি দেখিয়ে জানিয়েছিল, সিরাজও বিপ্লবী। ... ...

আমার সালাম জানাস। এমন চালের আটার পিঠে আমাদের ঘরের মেয়েরা পারে না। ‘আমাদের’ কথাটা কানে ঠেকল মামুনের। তার মানে কমিউনিস্টদেরও 'ওরা' 'আমরা' আছে? আচ্ছা উনি তো গোরুর গোস্ত খান আনন্দ করে, সব নেতাই কম বেশি খান, যে খায় না, তাকে নিয়ে হাসি ঠাট্টা চলে পার্টিতে। হেঁদুয়ানি যায়নি এখনো? মামুন একটু দমে গেল। ... ...

সেদিনের গোবিন্দবসান গ্রাম যেমন প্রাকৃতিক এবং কিছুটা প্রশাসনিক মিসম্যানেজমেন্টের জন্য হয়ে উঠেছিল ইকোলজিকাল ভিক্টিম, সেই একইভাবে, একই কারণে আজ দীঘা সংলগ্ন সমগ্র উপকূলটিই মরতে বসেছে। দীঘার সমুদ্র পঁচিশ বছর আগেও যথেষ্ট শান্ত ছিল, খুব ছোট ছোট ঢেউ আর বিস্তৃত মহাসাগরীয় সোপানের জন্য। গোবিন্দবসানের ঐ ঢেউ ছিল ব্যতিক্রম। কিন্তু এখন রোজ অন্তত একটা মানুষের প্রাণ যায় ঐ সাগরে। ... ...

সন্ধ্যে সাতটা নাগাদ এডমান্ডের ফোন। কথা বোঝা যায় না প্রায়, পেছনে প্রচুর কলরব। অত্যন্ত জড়িত কণ্ঠে এডমান্ড বললে, হীরেন, ক্ল্যাপহ্যামের পাব থেকে ফোন করছি। পঁচাত্তর বছর বাদে মেয়ো কাউন্টি অল আয়ারল্যান্ড ফুটবল কাপ জিতেছে। দি কার্স ইজ ব্রোকেন। ... ...

বেলা বাড়ছিল। খিদেও। একটু আলুকাবলি, একটু ঝাল মুড়ি, একটু ঘুগনি খাওয়া হয়েছে, গ্রামের দিকে রান্নায় এক ধরনের স্বাদ আছে—যা শহরের জীবনে অমিল। এ স্বাদ মুখ মেরে দেয় না। মুখকে আরও চালিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা দেয়। তার সঙ্গে যোগ হয়েছিল হাঁটার ক্রিয়া। ফলে খিদের কোনও দোষ নেই। আর গরিব-বড়লোক সবার খিদে সমান। তফাৎ এই বড়লোকেরা খিদের ব্যাপারটা খুব একটা টের পায় না। আর পেলে সহ্য করতে পারে না। বাকি দলে ইমুরা। এই সময় ইমু গুনতে বসল। দল বেঁধে বেড়াতে গেলে মাঝে মাঝেই মাথা গোনে ইমু। এটা তার অভ্যাস। দরকারও। কারণ এই রকম জায়গায় ছেলে-মেয়েরা হারাতে চায়। হারানো ভালোও কিন্তু দলপতির পক্ষে বিপদের। না হারালে ছেলেরা যে ছেলে, মেয়েরা যে মেয়ে—তা প্রমাণ হবে কেমন করে। বাউল মেলায় গিয়ে দেখা গেল ঈক্ষণ্যা আর নাসিম নামে দুজন উধাও। এদের তেমন চেনে না—ইমু। ... ...

দাঁয়েরা ছোট জমিদার। জমিদারি প্রথা নামে উচ্ছেদের। কাজে আছে। এখনও কংগ্রেসি নেতাদের সাহায্য নিয়ে চলে জমিদারি। পাইক আছে। মাসোহারা পায় না। কিছু জমি চাষ করে। তাই বেতন। যারা এখন চাষ করেছে, এবং যাদের ধান কেটে নিতে এসেছে – তাঁদের পূর্বপুরুষও পাইক ছিল – এখন মামুন ভাইয়ের পাল্লায় পড়ে তারা নিজেদের লেঠেল পেশা ছেড়েছে, লাল ঝাণ্ডা ধরে জমির তেভাগা চাইছে, বর্গা চাইছে।-- কিন্তু দাঁয়েরা তা চায় না। ... ...

ততদিনে আমরা শহরে থিতু হয়েছি। তবে উৎসব আয়োজনে বাড়িতে আসা চাই-ই। অবশ্য শহরের সঙ্গে কিন্তু একটা সখ্যতাও গড়ে উঠেছে ততদিনে। নয়তো ছুটিতে বাড়ি আসার দিন যখন বাস ধরার জন্য রিকশায় উঠেছিলাম তখন বানিয়াপট্টির বাতাসে ভেসে থাকা শিউলির ঘ্রাণটুকু আজও নিজের ভেতর পুষে চলতাম না নিশ্চয়ই। ... ...

কিছু বিষয় থাকে একান্তই ব্যক্তিগত। ব্যক্তিগত পরিসরে প্রকাশ্যে নানা মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক অপরাধ। অথচ ওই অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করার কোনও বিধান নেই। উল্টে এরা সমাদৃত হয়। পরদোষ অন্বেষক সমাজে এরা কেউ কেউ তালেবর হয়ে যান। অদীনও সেদিন পেল হিরোর সম্মান। কলেজের ক্যান্টিনে বসে সে অর্ণকে ডাকল, ভোলা, এই ভোলা। ক্যান্টিনে কাজ করত ভোলা নামের একটি লোক। সে তো অবাক। বাপের বয়সীকে নাম ধরে ডাকছে। এ কোন শিক্ষিত ছেলেরে বাবা! বন্ধুদের হাসির সমবেত হুল্লোড়ে আর অর্ণর বিব্রত হাসি বোঝাল, ভোলা নামের একজনের উদয় হয়েছে ইংরেজি বিভাগে। ... ...

সালেহাকে নিয়ে বিনয়বাবু যখন মামুনের ঘরে পৌঁছালেন, দেখলেন থমথমে অবস্থা। মামুনের বউয়ের বাচ্চা হয়েছে। আঁতুড় ঘরে। প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। ছেলে কাঁপছে। নুরপুরের দাই ঘরে উনুন জ্বালিয়েছে। নুরপুরের দাই এ তল্লাটে বিখ্যাত। প্রায় সব ঘরের ছেলেমেয়ে হয়েছে তার হাতে। জমিলা বিবি। হিন্দু মুসলিম প্রায় সব ঘরে ক্রিটিক্যাল রোগী হলেই জমিলা বিবি মুশকিল আসান। কালো গাঁট্টাগোট্টা চেহারা। বিনয়বাবুকে দেখেই এগিয়ে এল মামুনের মা। মামুনের নিজের মা নেই সৎ মা। সৎ মা জহুরা ছেলে অন্ত প্রাণ। কী ভালই না বাসেন। বিনয়বাবুর গল্প উপন্যাস পড়ার খুব নেশা। রামের সুমতি বিন্দুর ছেলে নিষ্কৃতি বোধহয় এই সব মায়েদের দেখেই লিখেছিলেন শরৎবাবু। ভাবেন বিনয়। ... ...

মেয়েদের প্রস্তুতির ফাঁকে বড় মাতাজী জিজ্ঞেস করলেন - ‘তুমি কি উঠবে ভাবছ?’ বললুম - ‘হ্যাঁ মাতাজী।’ কলেজে এমনিতেই সবাই আমাকে ছিনে জোঁক হিসেবে চেনে, কোন সমস্যা সামনে এলে তার শেষ না দেখে ছাড়িনা। তাই এখানে কোন ছাড়ান ছুড়িনের প্রশ্ন নেই। সুযোগের সদব্যবহার করতেই হবে। ... ...

বাবা ওপার বাজার থেকে কিনে এনে দিয়েছিলো একটা চারকোনা টিনের বাক্স। শুরু হলো বালিকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম দিন। মধ্য জানুয়ারী, বাংলায় মাঘ। নদী জল থেকে উঠে আসা কুয়াশায় ঢেকে থাকা মফস্বলি শহরের আলস্য ভেঙে যে দু'একজন রাস্তায় থাকে তারা হয় ফুলের সাজি ভরে সাদা টগরে নয়তো চায়ের টঙ দোকানের উনুনে আগুন দিতো ঘষিতে। বাবার ঠিক করে দেওয়া রিকশা। রহিম চাচা। প্যাডেলে পা। রিকশার টুংটাং বেল। ... ...

এক ঘুমে রাত কাবার। ভোর রাতে ওঠা। ছোট মাতাজী ভার নিয়েছেন সকলকে ঘুম থেকে ডেকে দেবেন। পড়ি কি মরি কি করে রেডি হয়ে বাইরে এসে দেখি - সেই আবছা কুয়াশা ঘেরা মাঠাবুরুর জঙ্গলের মাঝে ফাঁকা জায়গায় সারি বেঁধে প্রার্থনা শুরু করেছে মেয়েরা। আহা সেই ব্রহ্ম মুহূর্তে ওই সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ আর প্রার্থনা সঙ্গীত এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি করেছিল। সে যে না দেখেছে, না শুনেছে তার পক্ষে অনুভব করা সম্ভব নয়। ... ...

ছাঁচনপুরের আত্মবিশ্বাসের কথাই যদি উঠলো তবে আর একটা আত্মবিশ্বাসের গল্প শোনাই। ঘটনাটা আমার ভৌগোলিক জীবনে অনেক দিক থেকেই খুব স্পেশাল। প্রথম ব্যাপার হচ্ছে সেই প্রথম আমি নিজের কলেজের সঙ্গে না গিয়ে অন্য কলেজের ছাত্রীদের সঙ্গে ফিল্ডে গিয়েছিলাম ফিল্ড এক্সপার্ট হয়ে। দ্বিতীয়ত এই যাওয়াটার সঙ্গে আমার শৈশবের আশাপূরণের একটা যোগসূত্র ছিল। ... ...

গল্প বদলে যাচ্ছিলো বাড়ির। বদলে যাচ্ছিলো বাড়ির সন্ধ্যা। মাটির কোলে, যদি কিছু মনে না করেন, এইসব দিনরাত্রি, ছায়াছন্দ, পূর্ণ দৈর্ঘ্য বাংলা ছায়াছবি, দ্যা বিল কসবি শো, মাটি ও মানুষ---আমরা বড়ঘরকে পেছনে ফেলে একটু একটু করে অভ্যস্ত হচ্ছিলাম সেই অবাক সাদাকালো বাকশে। মেঝেয় পাতা পাটিকে একলা করে আমাদের চায়ের আড্ডা সীমিত হয়ে আসছিলো ঘড়ির কাঁটা সাতটার ঘরে পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই। ... ...

আমাদের একান্ন উঠোনকে মাঝখানে রেখে চারপাশের ঘরগুলোর মধ্যে বড়ঘরই ছিল আমাদের অঘোষিত বৈঠকখানা। কেতাবিয়ানা ছিল না তাতে মোটেও। ঘরের মেঝেয় নেহাতই পাটি পেতে সকাল-সন্ধ্যায় চা মুড়ি খাওয়া অথবা জরুরি কোনো আলোচনার আটপৌরে আয়োজনে সে ঘরই ছিল আমাদের অব্যর্থ গন্তব্য। একখানা কালো রঙের নকশি কাঠের খাট, খুব সাধারণ একখানা টেবিলক্লথে ঢাকা টেবিল আর মাত্র একটা চেয়ার। সেই চেয়ার অবশ্য বাড়ির যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সময়ে একমাত্র দাদুর দখলে থাকতো দায়িত্বশীলতার একমাত্র বাহক হয়ে। ... ...


অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন তখন অনেক দূরে, বিপদে পড়লে দমকল ভরসা, তারা বিপন্ন মানুষকে বড়জোর হাসপাতাল নয় বাড়ি পৌঁছে দেয়, গাড়ি সারায় না। ক্লেয়ারমন্ট অবাক হয়ে দেখলেন হেনরির গাড়ি দিব্যি পৌঁছুল নুটসফোর্ডে, বাড়ির সামনে কৌতূহলী জনতার ভিড়! হেনরির নিজের হাতে বানানো গাড়ি থেমে যায়নি। নতুন কিছু তিনি আবিষ্কার করেননি, যা পেয়েছেন তারই ওপরে খোদকারি করে বানালেন এমন গাড়ি যা চলে মসৃণ ভাবে। যে আমলে গাড়ি ছিল খাটারা, যার বিকট শব্দে পথচারী সন্ত্রস্ত হয়ে রাস্তা ছেড়ে দিতো সেই সময়ে হেনরির গাড়ি চলল, গাড়লের মতো না কেশে, লোককে জানান না দিয়ে! হেনরি আনলেন দশ হর্স পাওয়ার টু সিলিন্ডার সাইলেন্ট গাড়ি। ভবিষ্যতের রোলস-রয়েসের জন্ম হলো, সেদিন এপ্রিল ফুলস ডে, শুক্রবার, পয়লা এপ্রিল ১৯০৪। ... ...

ঝাড়বাগদায় ফিল্ড করার সময় আমরা ছিলাম মুকুটমণিপুর বাঁধ-এর কাছে। এই জায়গাটায় যতবার আসি, ততবারই নতুন করে ভালো লাগে, মন্দও লাগে। কংসাবতী নদীর ওপর তৈরি বিশাল জলাধারের নীলচে বিস্তার, দূরে মুকুটের মতো জেগে থাকা পরেশনাথ পাহাড়—সব মিলিয়ে যেন শান্ত সমুদ্রের ধারে এসে দাঁড়ানোর অনুভূতি হয়। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক বাস্তবতা। গত শতকের পাঁচের দশকে জলাধার তৈরির সময় বিশাল বনভূমি, গ্রাম ও মানুষের বসতি জলের নীচে তলিয়ে গিয়েছিল। ... ...