এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  পথ ও রেখা

  • ভেরিনাগ ৩

    Shuchismita Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | পথ ও রেখা | ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ৯৭ বার পঠিত
  • [২০১৮তে কাশ্মীর ঘুরে আসার পর এগুলো লেখা হয়েছিল। তারপর ২০২৩শে আরেকবার যাওয়া হয়েছিল। সেবারে শুধুই শ্রীনগর। পাঁচবছরে ব্যবধানে একটা জায়গা এতটা অন্যরকম লাগবে ভাবিনি। ২০১৮-র লেখাগুলো তুলে রাখলাম তাই।]

    ভেরিনাগঃ হে মোর দুর্ভাগা দেশ

    |||৩||

    বাগান থেকে ফিরে দেখলাম বাজার এসেছে। আইয়ুব ভাই আর তারিক একটা খাতায় সব জিনিসপত্র এন্ট্রি করাচ্ছেন। আইয়ুব ভাই জিজ্ঞেস করলেন - "চা খাবেন নাকি?" আমরা জানালাম চা পেলে মন্দ হয়না। তারিক চা বসালো। যিনি মুর্গী রাঁধবেন সেই ওস্তাদ তখনও আসেন নি। শুনলাম নিচের কোন গ্রাম থেকে এসে রান্না করে আবার ফিরে যাবেন তিনি। কাঁচ ঘেরা ডাইনিং হলে চা-বিস্কুট নিয়ে বসলাম আমরা। একটু পরে আইয়ুব ভাই এসে যোগ দিলেন। আমাদের ইচ্ছা ছিল কিছুটা রাস্তা অন্তত পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করার। শ্রীনগরে অটো নিয়ে ঘুরেছি। কিন্তু লম্বা জার্নিগুলোর প্রতিটাতেই পথে একাধিক জায়গায় যাওয়ার পরিকল্পনা থাকায় প্রাইভেট কার নিতে বাধ্য হচ্ছিলাম। ভেরিনাগে একরাত থেকে পরের দিন বিকেলে জম্মু থেকে ট্রেন ধরার কথা। মাঝে কোথাও দাঁড়ানোর নেই। এই পথটা পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট নেওয়া যেতেই পারে। আইয়ুব ভাইয়ের থেকে তার সুলুক সন্ধান নিচ্ছিলাম। উনি বললেন সবচেয়ে কাছের রেলস্টেশন হিলার। ভোরে বাজার থেকে শেয়ারের জিপ ছাড়ে স্টেশনের দিকে। হিলার থেকে ট্রেন ধরে বানিহাল। তারপর বানিহাল থেকে বাস অথবা শেয়ারের জিপ পাওয়া যাবে জম্মুর জন্য। পরামর্শ মনে ধরল। ইতিমধ্যে তারিক এসে গেছে। তারিকের ইচ্ছা আমরা ওর ভাইয়ের গাড়ি রিজার্ভ করে জম্মু যাই। ও বারবার বলতে লাগল, তোমাদের এভাবে ভেঙে ভেঙে যাওয়ার অভ্যেস নেই, তোমরা পারবে না। আমরা সেকথায় পাত্তা দিলাম না। হিলার থেকে ভোরের ট্রেন কখন ছাড়ে সেটা আইয়ুব বলতে পারলেন না। আমাদের কাছে না আছে টাইমটেবল, না আছে ইন্টারনেট। খোঁজখবর করতে বাজারে যাওয়া মনস্থ করলাম। আইয়ুব বলে দিলেন বাগানের মধ্যে দিয়ে কিভাবে শর্টকাটে বাজারে যেতে হবে। দুপুরে বাগানে ঢোকার জন্য যে টিকিট কেটেছিলাম সেটা দেখিয়েই বিকেলেও বাগানের মধ্যে দিয়ে যাতায়াত করা যাবে জানা গেল।

    আবারও একবার বাগানে ঢোকার সুযোগ পেয়ে বেশ ভালোই লাগল। বিকেলবেলা অনেক মানুষ বাগানে এসেছেন। জলপ্রণালীর দুধারে সারি দিয়ে গোলাপ বাগান। তার সামনে পাথরের বেঞ্চি। সন্ধ্যা নামার আগের উষ্ণতাটুকু শুষে নিচ্ছে অশান্ত উপত্যকা। জলধারা যেখানে নদী হয়ে শহরে পড়েছে বাগানের সেই প্রান্তে কার্পেট ধুয়ে নিচ্ছে দুই অল্পবয়েসী ছেলে। তাদের পেরিয়ে শহরে ঢুকছি, দেখি একজন মানুষ সিঙারা ভাজছেন। ট্রেনের কথা জিজ্ঞেস করলাম তাঁকে। তিনি উত্তর দিতে পারলেন না, তবে জিপ স্ট্যান্ডের রাস্তা দেখিয়ে দিলেন। জিপওয়ালারা নিশ্চয়ই ট্রেনের টাইম জানবে। কাশ্মীরের অন্য শহরগুলোর মতই বেশ পরিস্কার রাস্তা। একটা মুদির দোকানের সামনে বসে এক ভদ্রলোক দোকানীর সাথে গল্প করছিলেন। আমাদের দেখে হাসলেন। জানতে চাইলেন কোথা থেকে আসছি। আমরা তাঁর কাছেও ট্রেনের কথা জানতে চাইলাম। দোকানী বললেন - "আমি তো টাইম জানি না, তবে চিন্তার কিছু নেই, এক্ষুনি ফোন করে জেনে দিচ্ছি।" আমরা ভাবিনি দুই অপরিচিত পথচারী, যারা তাঁর দোকান থেকে কিছু কেনেও নি তাদের জন্য উনি ফোন করে কাউকে দিয়ে টাইমটেবিল ঘাঁটাবেন। জানা গেল সোয়া সাতটায় একটা ট্রেন আছে। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে উঠে আসছি, বাইরের বসে থাকা ভদ্রলোক বললেন আমার বাড়ি কাছেই, চা খেয়ে যান। আতিথ্য নেওয়ার লোভ হচ্ছিল, কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলে না করতে হল। জিপ স্ট্যান্ডেও একটা নেমন্তন্ন পেয়ে গেলাম। জিপওয়ালার কাছে জানতে চাইলাম সকালের ট্রেন ধরার জন্য কখন আসতে হবে, তিনি টুরিস্ট দেখে খুব খুশি হয়ে গল্প জুড়লেন। তাঁরও বাড়ি কাছেই। চা খাওয়াতে চাইলেন। বললেন চা খাইয়ে নিজের গাড়িতে করে গেস্ট হাউসে পৌঁছে দেবেন। তাঁকেও ধন্যবাদ জানিয়ে ফোন নম্বর নিয়ে ফিরে এলাম। বাগানে ঢোকার মুখে সেই সিঙারওয়ালার সাথে দেখা। তিনি তখন ঝাঁপ তুলছিলেন। আমাদের দেখে জানতে চাইলেন সব খোঁজ পেয়েছি কিনা। সন্ধ্যা ধীরে ধীরে গাঢ় হচ্ছিল। বাংলোয় ফিরে দেখি ওস্তাদ এসে গেছেন। তবে কারেন্ট অফ। রান্না হচ্ছে এমার্জেন্সি লাইটে।

    ডাইনিং হলে মোমবাতি জ্বালিয়ে আমরা বসলাম। নিচের শহরে আলো আছে। পাওয়ার অফ শুধু গেস্ট হাউসেই। তারিক গল্প করছিল। নব্বইয়ের টালমাটাল সময়ে গেস্টহাউসে নাকি নাকি আগুন ধরিয়ে দেয় বিচ্ছিন্নতাবাদীরা। হতাহত হয় নি কেউ। তবে ডাইনিং হল বাদে বাকি সব পুড়ে গেছিল। যে ছ'টা বাংলোর একটায় আমরা থাকছি সেগুলো সব নতুন তৈরী। তারিককে জিজ্ঞেস করলাম এখন এলাকার অবস্থা কেমন। আসিফ যা বলেছিল তারিকও তাই বলল। বুরহান ওয়ানির মারা যাওয়ার পর পঁয়তাল্লিশ দিন কার্ফিউ ছিল। জনতা পাত্থরবাজি করেছে। পুলিশও নির্মম ভাবে তার উত্তর দিয়েছে। এখন পরিস্থিতি অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল। কিন্তু শান্তি আসবে এমন আশা কেউই আর করে না। শ্রীনগর, সোনমার্গ, পহেলগাম অঞ্চলে তবু টুরিস্টের আনাগোনা আছে এখনও। কিন্তু অনন্তনাগ সেটাও হারিয়েছে। আরু উপত্যকায় যাওয়ার পথে মার্তন্ড সূর্যমন্দিরে দাঁড়িয়েছিলাম আমরা। হায়্দার সিনেমার একটা গানের শুটিং হয়েছিল এই মন্দিরে। আমার ধারনা ছিল হয়তো সে কারণেও ওখানে কিছু ভীড় থাকবে। কিন্তু সেখানেও আমরাই একমাত্র টুরিস্ট। দুজন মানুষ মন্দিরের চাতালে বসে গল্প করছিলেন। তাদের মধ্যে একজন আমাদের দেখে বললেন - "আমি গাইডের কাজ করি, আপনাদের মন্দির দেখিয়ে দেব।" খুব যত্ন নিয়ে ঘোরালেন। ড্রাইভার আসিফের কাছে জানতে চাইলাম, "এখানে আসো না টুরিস্ট নিয়ে?" সে বলল - "না তো, তোমরা এর সন্ধান পেলে কি করে তাই ভাবছি। আমরা ছোটবেলায় এখানে খেলতে এসেছি। হিন্দুদের কি মন্দির জানি না। পান্ডবেরা এইসব বড় বড় পাথর এনে এখানে রেখেছে, এই আমরা শুনেছি। আমরা একে পান্ড্বল্বাদেন বলি।" - "এখন তো টুরিস্ট নিয়ে আরু-পহেলগাম-শ্রীনগর করছ। অফ সিজনে কি করবে আসিফ?" - "মধ্যপ্রদেশে একটা কাপড়ের দোকানে কাজ করি, শীতে সেখানে চলে যাব।" তারিক, আইয়ুব ভাইদের মত যারা সরকারী চাকরী করে, তাদের বাদ দিলে টুরিজমের সাথে যুক্ত বহু মানুষের এভাবেই বছর চলে।

    গল্প করতে করতে ওস্তাদের রান্না হয়ে গেছে। ওস্তাদের নাম ফৈয়জ ভাই। রেঁধেছেন চিকেন তেহরাওয়ালা। গর্বভরে এক টুকরো মাংস আর ঝোল আমাদের টেস্ট করতে দিলেন। সত্যি বলতে কি দশে ছ'য়ের বেশি ওনার প্রাপ্য হয়না, তবে যেভাবে তাকিয়েছিলেন তাতে দশের কম দিতে সাহস পেলাম না। ভদ্রতাভরে রেসিপিও জেনে নিলাম। ভুলে গেছি যদিও। ইতিমধ্যে আলো এসেছে। আইয়ুব ভাই তার মেয়ের ছবি দেখালেন মোবাইলে। স্কুলে পড়ছে মেয়ে। - "কলেজে পাঠাবেন তো আইয়ুব ভাই?" - "নিশ্চয়ই পাঠাবো। যতদূর চায় পড়বে।" মনে পড়ল নার্গিস আর শবনমের কথা। কার্গিল থেকে সাংকো গ্রামে গেছিলাম তিরিশ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি দেখতে। বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তি ভেঙে ফেলার পর পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা অতিকায় বুদ্ধ আর তিনটে পড়ে রয়েছে পৃথিবীতে। তিনটেই লেহ অঞ্চলে। ফেরার পথে দেখলাম দুটো মেয়ে ব্যাকপ্যাক কাঁধে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের গাড়ি দেখে হাত দেখাল। ড্রাইভারকে বললাম তুলে নিতে। দুজনেই কলেজে পড়ে। একজন আর্টস। অন্যজন সায়েন্স। জিজ্ঞেস করলাম কলেজ শেষ করে চাকরিবাকরি করবে কিনা। বলল - "এখানে তো তেমন সুবিধে নেই। বাবা-মা বাইরে ছাড়বে না। জানোই তো কাশ্মীরের অবস্থা। তবু দেখি চেষ্টা করে।" - "দ্যাখো হয়ত একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমাদের আর কতদিন বাকি যেন?" - "সেটাও তো জানি না ঠিক করে। এখানে অনেক সময় পরীক্ষা বন্ধ হয়ে যায় ঝামেলার জন্য। এভাবে কত স্টুডেন্টের যে বছর নষ্ট হয়েছে! কে জানে আমাদের কি হবে!" ভেরিনাগ আসার আগে আরু গ্রামে ছিলাম ক'দিন। সেখানে একটাই স্কুল। স্কুলের এক শিক্ষকের সাথে কথা হচ্ছিল। তিনি বললেন এখন বাবা-মায়েরা ভয় পায় ছেলেমেয়েকে শহরের কলেজে পাঠাতে। বিশেষ করে ছেলেদের নিয়ে বেশি ভয়। পাছে কলেজে গিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে। কেই বা চায় তার সন্তান মৃত্যুভয় নিয়ে ঘুরুক! কিছুদিন আগে কোন রিটায়ার্ড জেনারেলের সাথে নাকি এই শিক্ষকের কথা হচ্ছিল। জেনারেল বেড়াতে এসেছেন আরুতে। দেখেন ঘোড়াওলা ছেলেটি ভারী সপ্রতিভ, বুদ্ধিমান, ঝরঝরে ইংরিজিতে কথা বলছে। শিক্ষকের কাছে ছেলেটি সম্পর্কে জানতে চান। সে ছেলে বোর্ড পরীক্ষায় পহেলগাম তহশিলে প্রথম হয়েছিল। তারপরে আর পড়ে নি। আরুর স্কুলে সাকুল্যে চারজন মাস্টারমশাই। দুজন উর্দু। বাকি দুজন ইতিহাস-ভূগোল ইত্যাদি। অঙ্ক, ইংরিজি এবং বিজ্ঞানের কোন শিক্ষক নেই। আরুতে যে চারদিন ছিলাম, রোজ সন্ধ্যায় আমাদের গেস্টহাউজের সামনের মাঠে ঘোড়াওলা ছেলেদের ক্রিকেট খেলা দেখতাম। তাদের বেশিরভাগই টুরিস্টদের সাথে কথা বলতে বলতেই দিব্যি ইংরিজি শিখে ফেলেছে। ব্যবহার অত্যন্ত ভদ্র। ভারতের যে কোন স্কুল এই ছেলেদের ছাত্র হিসেবে পেলে গর্বিত হবে।

    ইতিমধ্যে তারিক খবর এনেছে পরের দিন ট্রেনের স্ট্রাইক। হিলার থেকে ট্রেনে বানিহাল যাওয়ার প্ল্যান বাতিল করতে হল। তারিক চাইছিল আমরা ওর ভাইয়ের গাড়িতে যাই। কিন্তু আমাদের পাব্লিক ট্রান্সপোর্টের বাসনা প্রবল। আইয়ুব ভাই বললেন জিপস্ট্যান্ড থেকে শেয়ারের জিপ বানিহাল যায়। সকালে সেই জিপে তুলে দেবেন আমাদের। ওদিকে মুর্গি ঠান্ডা হচ্ছিল। খালিপেটে বকবক করার চেয়ে চারজনে খেতে খেতে গল্প করার প্রস্তাব সকলেরই পছন্দ হল। খাওয়া শেষ হতে না হতে আবার লোডশেডিং। আইয়ুব ভাই গোটা চারেক মোমবাতি দিয়ে বললেন রাতে আলো নাও আসতে পারে। অন্ধকারে সারি দেওয়া ছ'টি বাংলো। সবার শেষেরটি আমাদের। বাংলোর পিছনে ঘন জঙ্গল। মাথার ওপর ঝকঝক করছে তারা। ঘরে এসে মোমবাতি জ্বালিয়ে নিজেদের দীর্ঘ ছায়াগুলো দেখে কেমন গা ছমছম করল। হঠাৎ করে মনে পড়ল তারিক বলছিল নব্বইতে এই বাংলো পুড়িয়ে দিয়েছিল সন্ত্রাসবাদীরা। আমরা মেনল্যান্ড ইন্ডিয়ার লোক। আমাদের রাজ্য, আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য থেকে সেনা পোস্টিং হয় এখানে। তাদের পেলেট গানে অন্ধ হয়েছে এমন ছেলের কথা একটু আগেই তারিকের মুখে শুনেছি। তারা যদি সেই অপরাধের জন্য আমাদের শাস্তি দিতে চায়? মনের ভাব মুখে আনার আগেই লজ্জায় মিশে গেলাম। মাত্র ক'ঘন্টা আগে বাজারে গিয়ে অভাবনীয় আতিথেয়তা পেয়েছি। পাঁচ মিনিটের পরিচয়ে মানুষ চায়ের নেমন্তন্ন করেছে। মূলত ব্যবসাসূত্রে স্মরণাতীত কাল থেকে কাশ্মীরে নানা জাতি, নানা ধর্মের মানুষের আনাগোনা। এখানকার মানুষ মিষ্টভাষী, আন্তরিক, আমুদে। এ অঞ্চলে রাজনৈতিক দুর্যোগ এই প্রথম নয়। স্বাধীনতার আগেও অত্যাচারী মুসলিম শাসক, হিন্দু শাসক এই উপত্যকাকে শোষন করেছে ক্রমান্বয়ে। সাতচল্লিশে দেশভাগের সময় কাশ্মীর চেয়েছিল একটা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে। ভারত বা পাকিস্তান কারোর সাথেই সে যেতে চায়নি। তারপর কি হল, সে আলোচনার উপযুক্ত স্থান এই লেখা নয়। গত তিরিশ বছর ধরে অশান্তির আগুন নেভার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। মূলত ব্যবসা নির্ভর অতিথিবৎসল একটি জাতি ক্রমশঃ তার নিজস্বতা হারাচ্ছে। শ্রীনগরে থাকাকালীন সেখানকার পুরোনো মসজিদগুলো আমরা ঘুরে দেখেছিলাম। একসময়ে সুফি ইসলামের পীঠস্থান কাশ্মীর ক্রমশ চরমপন্থী রক্ষণশীল ইসলামের দিকে ঝুঁকছে। নেহেরুর প্রতিশ্রুত গণভোট দেশভাগের সত্তর বছর পরেও হয়নি। কোনদিন হবে এমনও আশা নেই। জওহর টানেলের নিচে ভারতের মূল ভূখণ্ডের মানুষ একরাশ ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে এদিকে তাকিয়ে আছে। এদিকের মানুষও তাই। এমনকি আমিও, পনেরো দিন ধরে কাশ্মিরী আতিথেয়তা গ্রহণের পরেও অন্ধকার জনশূন্য বাংলোয় ভয় পেয়েছি একটু আগেও। দুর্ভাগা সেই দেশ যেখানে সহনাগরিকের প্রতি অবিশ্বাস বুকে নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিতে হয়।

    পরের দিন ভোরে বাজারে গিয়ে শেয়ারের জিপ ধরি। আইয়ুব ভাই সাথে আসেন। আসার পথে ভেরিনাগের বাগান থেকেও একটি চিনার পাতা তুলে নিই। আমার বইয়ের ভাঁজে জাহাঙ্গীর ও নূর জাহানের দুই বাগানের দুটি পাতা পাশাপাশি শুয়ে থাকে। ব্যক্তিজীবনে এ ব্যবস্থা তাঁদের পছন্দ হত কিনা জানার কোন উপায় নেই। ইতিহাস তো মনের খোঁজ রাখে না। আজ থেকে পাঁচশো বছর পরে আজকের দিনগুলো সম্পর্কে ইতিহাস বইতে ক'লাইন লেখা থাকবে কল্পনা করার চেষ্টা করি। পঁয়ষট্টি, একাত্তর, নিরানব্বইয়ের যুদ্ধের কথা তো থাকবে জানি। কার্গিলের ছাত্রীটির কথা লেখা হবে কি? পরীক্ষা পাশ করা নয়, ঠিক সময়ে পরীক্ষা হবে কিনা নিয়ে যার সংশয় ছিল? অথবা আরুর সেই ঘোড়াওলা ছেলে? বোর্ড পরীক্ষায় খুব ভালো করেও যাকে কলেজে পাঠানোর সাহস পেল না তার বাপ-মা? ভেরিনাগের মানুষগুলো, যারা যতটুকু সময় রইলাম অকুণ্ঠ আতিথেয়তা দিল, যদিও তাদের চোখে আমি সেই অঞ্চলের মানুষ যেখানকার লোকেরা যখন তখন তাদের ঘর থেকে বার করে চিরুনীতল্লাসী করতে পারে? ক্রমশ অস্থির হয়ে ওঠা ভারতে আসিফ কি পারবে সামনের শীতেও মধ্যপ্রদেশে গিয়ে কাজ করতে? মুঘল বাগানের ভিতরে থাকা প্রাচীন মাতৃমূর্তি, যাকে ২০১৮তেও পুজো পেতে দেখে এসেছি, অসহিষ্ণু সময় তাকে কি ব্রাত্য করে দেবে? বাইরে বেরোলে, মানুষকে দেখলে বোঝা যায় কত সহজেই আমরা নিজেদের মনগড়া ভাবনায় রাশি রাশি শত্রু বানিয়ে রাখি। অন্নসংস্থান আর সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার - এর বেশি মানুষ আর কি চায়? এটুকু পেলে কোন মূর্খ নিজের জীবন-যৌবন বিসর্জন দেয়? আর এটুকু যে পেল না, সে প্রতিবাদ করবে না এমন আশাই বা করে কোন মূর্খের স্বর্গের বাসিন্দা? সত্যদ্রষ্টা ঋষির ভবিষ্যৎবাণী মনে করে ভয় হয় - "সবারে না যদি ডাক, এখনো সরিয়া থাক, আপনারে বেঁধে রাখ চৌদিকে জড়ায়ে অভিমান- মৃত্যুমাঝে হবে তবে চিতাভস্মে সবার সমান।


    ভেরিনাগ শহর


    কার্পেট ধোয়া হচ্ছে


    ভেরিনাগে জম্মু-কাশ্মীর ট্যুরিজমের বাংলো


    সাংকো গ্রামের তিরিশ ফুট উঁচু বুদ্ধমূর্তি


    মার্তণ্ড মন্দির
     
    মার্তণ্ড মন্দির

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ৯৭ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    হোমানল  - Srimallar
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে মতামত দিন