এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ভ্রমণ  পথ ও রেখা

  • ভেরিনাগ ২

    Shuchismita Sarkar লেখকের গ্রাহক হোন
    ভ্রমণ | পথ ও রেখা | ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ৭৪ বার পঠিত
  • [২০১৮তে কাশ্মীর ঘুরে আসার পর এগুলো লেখা হয়েছিল। তারপর ২০২৩শে আরেকবার যাওয়া হয়েছিল। সেবারে শুধুই শ্রীনগর। পাঁচবছরে ব্যবধানে একটা জায়গা এতটা অন্যরকম লাগবে ভাবিনি। ২০১৮-র লেখাগুলো তুলে রাখলাম তাই।]
     
    ভেরিনাগঃ হে মোর দুর্ভাগা দেশ
     
    ||২||

    কোকেরনাগের বাগানটা মুঘলদের বানানো নয়। পাহাড়ি ঝরনা থেকে জল এসে যেখানে জমেছে তার আকৃতি মুরগীর নখের মত। সেই থেকেই এই জায়গার নাম কোকেরনাগ। এখানেও আমরা ছাড়া কোন ট্যুরিস্ট নেই। কিছু মানুষ গোল হয়ে বসে গল্প করছেন। বাগানের ভিতরের দিকে স্ফটিকস্বচ্ছ জলের ওপর একখানি বাঁকা ব্রিজ। একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকার দেখা মিলল সেখানে। তাদের নির্জন মূহুর্তটিতে বাধা না দিয়ে আমরা সন্তর্পণে বেরিয়ে এলাম। বাদাম গাছে ঝেঁপে ফুল এসেছে। গাছের তলায় একটু দাঁড়িয়েছিলাম। হালকা গোলাপী ফুল টুপটাপ ঝরেই চলেছে। তাদের সংগ্রহ করি। নখপ্রান্তে ঈষৎ হরিদ্রাভ পরাগরেণু লেগে থাকে।

    কিছু স্ন্যাকস কিনে বাগানের বাইরে এসে দেখি ড্রাইভার আসিফ ভাই একজনের সাথে গল্প জুড়েছে। আসিফ একেবারেই বাচ্চা ছেলে, কুড়ি-বাইশ বছরের। নতুন ছেলেটিও তেমনই হবে। আমরা ভেরিনাগ যাচ্ছি শুনে সে বলল, আমার দাদা তারিক ভেরিনাগের গেস্টহাউসেই কাজ করে। আমি বলে রাখছি দাদাকে তোমরা যাচ্ছ এখন। আমরা ওকে সেই সাথে খাবার ব্যবস্থাও করে রাখতে বলে গাড়িতে উঠলাম। ভেরিনাগ খুব বেশি দূর নয় কোকেরনাগ থেকে। কিন্তু রাস্তা পাহাড়ী এবং সরু। আসিফ বলছিল এখানেই কোনো এক জায়গায় বুরহান ওয়ানিকে মারা হয়। কাশ্মীর উপত্যকা আপাত স্থিতাবস্থা থেকে আবার অশান্ত হয়ে উঠেছিল বুরহানের মৃত্যুর পরে। ঘরের ছেলের মৃত্যুতে রেগে গিয়ে সাধারণ মানুষ পাথর ছুঁড়েছে আর্মির দিকে। আর্মিও নির্বিচারে পেলেট গান চালিয়ে জখম করেছে শত শত মানুষকে। বিগত দশদিনে যখনই কোনো সেনা বা আধাসামরিক কর্মীর সাথে কথা হয়েছে, তাঁরা বলেছেন, কবে এখান থেকে বদলী হব তার আশায় আছি। বিহার, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান থেকে আসা এই মানুষেরা কাশ্মীরিদের নিজেদের দেশের মানুষ ভাবতে পারেন না। কাশ্মীরিরাও এঁদের বহিরাগত শত্রু মনে করেন।

    ভেরিনাগের সরকারী টুরিস্ট্লজে পৌঁছতে পৌঁছতে আড়াইটে বেজে গেল। সার দেওয় ছয়টি বাংলো। জনা চারেক ছেলে বাংলোর সামনের লনে খেলছিল। লন থেকেই মুঘল গার্ডেন দেখা যাচ্ছে। তারিক আমাদের ঘর খুলে দিল। বলল, আমি তোমাদের জন্য ডাল-ভাত রান্না করে রেখেছি। এর বেশি আমি পারি না। বিকেলে ওস্তাদ আসবে। তোমরা মুর্গী খেতে চাও তো বল। আমরা আসিফকে বললাম, তোমার তো আজ শ্রীনগর ফেরা হবে না। তুমিও খেয়ে নাও আমাদের সাথে। আসিফ কিছুতেই রাজি হল না। কাছেই তার এক বন্ধু থাকে। তার সাথে কাটাবে সন্ধ্যাটা। খাবার ঘরে গিয়ে আইয়ুব ভাইয়ের সাথে আলাপ হল। মাঝবয়েসী ভদ্রলোক সামান্য খুঁড়িয়ে চলেন। বানিহালের সরকারী টুরিস্টলজে ওয়েটারের চাকরী করেন। ভেরিনাগে যেহেতু বহুদিন কোন লোক আসে না, তাই একা তারিকই ভেরিনাগ সামাল দেয়। আমরা আসব বলে বানিহাল থেকে আইয়ুব ভাইকে পাঠানো হয়েছে। আইয়ুব ভাইয়ের বৌ-মেয়ে ভেরিনাগে থাকে। বিজনেস ট্রিপে ঘরে ফেরাটাও জুড়ে দিতে পারলে সবারই আনন্দ হয়। আইয়ুব ভাইও ব্যতিক্রম নন।

    তারিকের যারপরনাই খারাপ রান্না খেয়ে আমরা বাগানের দিকে রওনা হলাম। খাবারের পরিমানও বেশ কম। কেউ আসে না। চাল-ডাল বাড়ন্ত। আইয়ুব ভাই বাগানের গেট পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দিয়ে বাজারে গেলেন মুর্গী আনতে। বাগানে অনেক লোক। তবে টুরিস্ট বলতে আমরাই। নীলকান্তমণি বসানো যে আংটির স্বপ্ন দেখে এতদূর ছুটে এসেছি তার কাছে যাওয়ার আগেই চিনার গাছের নিচে একটি শিবমন্দির চোখে পড়ল। মন্দিরের দরজায় তালা দেওয়া। তবে উঁকি মেরে দেখতে পেলাম শিবলিঙ্গে ফুল ছড়ানো আছে। ফুলগুলি তাজা।

    শিবমন্দিরের সামনে জলের নালা। তারপর একটি খিলান পেরোলেই সেই সবুজাভ নীল অবিশ্বাস্য জলাধার। জাহাঙ্গীর তাঁর আত্মজীবনীতে লিখে গেছেন, এই জল এত স্বচ্ছ যে একটা পোস্তদানাকেও দেখা যায় যতক্ষণ না সে অতল স্পর্শ করে। জলে অনেক মাছ খেলা করছে। লোকজন মুড়ি খাওয়াচ্ছে মাছকে। আমরা বাদে সবাই স্থানীয় মানুষ। অষ্টভুজাকৃতি জলাধারকে ঘিরে চব্বিশটি তোরণ। আমরা ডানদিক ধরে হাঁটতে শুরু করলাম। খুব সম্ভব তৃতীয় তোরণে আরো একটি শিবলিঙ্গ। শিবলিঙ্গের পিছনে তোরণের দেওয়ালে মাতৃমূর্তি। তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরিতে এই মাতৃমূর্তির উল্লেখ আছে। এখানেও তাজা ফুল দেখতে পেলাম। আরো ক'টি তোরণ পেরোলে পশ্চিম দেওয়ালে দেখা যায় একটি পাথরের ফলক। তাতে ফার্সীতে লেখা আছে হায়দার নামে স্থপতি শাহজাহানের নির্দেশে ১০৩৭ হিজরিতে এই জলপ্রণালী নির্মান করেন। আরো একটি ফার্সীতে লেখা পাথরের ফলক পাওয়া যায় দক্ষিণ দেওয়ালে। সেটা থেকে জানা যাচ্ছে ১০২৯ হিজরিতে আকবরের ছেলে নুর-উদ-দিন জাহাঙ্গীর তাঁর রাজত্বের পঞ্চদশ বছরে ভেরিনাগে আসেন এবং এই জলাধার তৈরী করেন। জাহাঙ্গীরের শুরু করা কাজ তাঁর ছেলে শাহজাহান শেষ করেছিলেন বোঝা যাচ্ছে। আরও শোনা যায়, ভেরিনাগ জাহাঙ্গীরকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে তাঁর বাসনা ছিল এখানে সমাধিস্থ হওয়ার, যদিও সে ইচ্ছা পূর্ণ হয়নি। আরো কিছু তোরণ পেরিয়ে আমরা পূর্ব দেওয়ালে চলে আসি। চারশো বছরের পুরোনো কোন প্রাচীন লিপি এই দেওয়ালে খুঁজে পাওয়া যাবে না। হয়ত এই দেওয়ালে যা দেখে এসেছি তা আর ক'মাস পর মুছেও যাবে। তবুও পাথরের ওপর চকখড়ি দিয়ে লেখা বুরহান নামটা বুকের ভেতর ধাক্কা দিল। "দুর্ভাগা সেই দেশ যেখানে নায়কের প্রয়োজন হয়"। দুর্ভাগা সেই দেশ যে দেশের নাগরিক সন্ত্রাসবাদী হয়।


    ভেরিনাগে ফার্সী শিলালিপি


    ভেরিনাগে মাতৃমূর্তি


    ভেরিনাগে মাতৃমূর্তি


    ভেরিনাগের একটি তোরণে শিবলিঙ্গ


    ভেরিনাগের দেওয়ালে বুরহানের নাম


    ভেরিনাগের মুঘল গার্ডেনের ভিতরে শিবমন্দির
     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ভ্রমণ | ৩০ আগস্ট ২০২৬ | ৭৪ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    হোমানল  - Srimallar
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। হাত মক্সো করতে মতামত দিন