এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  অপর বাংলা

  • 'ঘুম ভেঙে বেশ মজা হয়েছে'...

    বিপ্লব রহমান লেখকের গ্রাহক হোন
    অপর বাংলা | ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৫১০ বার পঠিত | রেটিং ৫ (৫ জন)


  • বাংলা ভাষায় 'পাতি' কথাটি এপারে বাংলাদেশে লেবুর সাথে যোগ করে বলা হয়, 'পাতিলেবু'। কখনো 'পাতিহাঁস'ও চলে। এছাড়া তেমনভাবে 'পাতির' চল নেই। এমনকি 'আতিপাতি' বা 'পাতি বুর্জোয়া'ও নয়।

    অথচ ওপারে চলতি কথায় অহরহ 'পাতি নেতা', 'পাতি অভিনেতা' ইত্যাদি বলা হয়।

    এই সেদিনই গুরুমাতা পাইদি রাতের শহরের অসাধারণ ঝলমলে ছবি দিয়ে ফেসবুকের ফটোপোস্টে লিখলেন, "পাতি" মোবাইলে তোলা'! অনভ্যস্ত চোখে 'পাতি' কথাটি খুব লাগল।

    অর্থাৎ এপার বাংলায় 'পাতি' কথাটি একটি ছোট্ট গণ্ডিতে আটকে আছে।
    আবার একইভাবে ওপারে অনেক বাংলা শব্দের তেমন চল নেই, যা এপারে অহরহ বলা হয়।


    বছর পাঁচেক আগে শান্তিনিকেতন রেলওয়ের ক্যান্টিনে নিরামিষ খেয়ে প্রশংসা করে বলা হয়েছিল, 'ভাই, দারুণ "মজা" হইছে!'

    ক্যান্টিন বয় অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। পরে বললো, 'নিরামিষ আবার "মজা" হয় কি করে?'

    তাকে বুঝিয়ে বলতে হলো, এখনে 'মজা' সুস্বাদু অর্থে। মোটেই 'পুকুরটি "মজে" গেছে', বা 'কলাটি "মজে'' গেছে' এরকম সাধারণভাবে-- নষ্ট হয়ে গেছে-- অর্থে নয়।

    আবার লোকগানে, 'আমার মন "মজাইয়ারে" দিল "মজাইয়া", মুর্শিদ নিজের দেশে যাও', বা 'ঘুম ভেঙে খুব "মজা" হয়েছে/এঁড়ে গরু বেড়া ভেঙে খেজুর গাছে চড়েছে'...

    'মজা' কথাটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। প্রথমটিতে 'বশ' এবং দ্বিতীয়টিতে 'আনন্দ' অর্থ বোঝাচ্ছে।

    অথচ "মজা" কথাটি ওপারে স্বল্প পরিসরে ব্যবহৃত, তার ব্যবহারিক সীমানা খুব বেশি নয়।

    এই হচ্ছে বাংলা ভাষার যাদু বাস্তবতা।


    এপারে 'বাসা' বলতে অস্থায়ী নিবাস, শহরের ভাড়া বাসা ইত্যাদি বোঝানো হয়। আর গ্রামের পৈতৃক ভিটা, স্থায়ী ঠিকানাকে বলা হয় 'বাড়ি'।

    জালালউদ্দিন খাঁর লোকগানে আব্দুল আলিমের কণ্ঠে যেমন বলা হয়েছে, 'সেই পারে তোর "বসত-বাড়ি", এ পারে তোর "বাসা"...।

    অথচ কলকাতাসহ ওপারে সর্বত্র শোনা হয়েছে শুধু 'বাড়ি' কথাটি, সেখানে 'বাসা'র তেমন কদর নেই। অবশ্য এপারে দেওয়ালে দেওয়ালে 'টু-লেট' বিজ্ঞাপনে 'বাড়ি ভাড়া'ই লেখা হয় কেন, কে জানে?
    আরও যাদু ও বাস্তবতা আছে।

    আবার 'উদয়ের পথে" নামক ১৯৪৪ সালের পুরনো বাংলা ছবিতে দেখেছি 'বাটী ভাড়া'!

    এপারে ২০কে অহরহ 'বিশ' বলা হয়, যেমন, বিশ টাকা-- ইত্যা দি। কলকাতার বাংলায় 'বিশ' যেন 'বিষবৎ', ওপার বাংলায় ২০ মানে 'কুড়ি', এর বাইরে কেউ কখন দুই দশের বাইরে ভাবতে পেরেছেন কি?


    মহামারী যুগের আগে ২০১৭ সালে এপারে প্রথম ওটিটি 'বায়স্কোপে' বিস্তর ডেটা খরচ করে দেখা হয়েছিল সত্যজিৎ রায়ের 'শেয়াল দেবতা রহস্য' গল্প অবলম্বনে ঢাকায় ফেলুদার অভিযান।

    বিবিসির আধুনিক শার্লক হোমসের মতো এই খানে ফেলুদা চরিত্রে পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় ডিজিটাল, আর তোপসে চরিত্র ঋদ্ধি সেন যেন ডাবল ডিজিটাল।

    এরপরেও ফেলুদা ঢাকার আদি জ্ঞানে ফেল মেরে তোপসেকে বলেন, ঢাকায় নাকি সিঙ্গারাকে 'সামুচা' বলে!
    আর পুরো সিনেমা ঢাকাইয়া ফ্লেভার দিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আদি ঢাকাইয়া ভাষার প্রক্সি সংলাপের বিষয় না হয় উহ্যই থাক।

    এবার একে ভাষার যাদু বললে কম বলা হয়, বলতে হবে, বাংলা ভাষার ভেল্কি!
    এবার সাম্প্রতিক ছবির প্রসঙ্গ।
    'একেন বাবু ও ঢাকা রহস্য' সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে একটি দৃশ্যে ঢাকা মহানগরী ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে অনিবার্ন চক্রবর্তীকে অনেকটা এরকম বলতে শোনা যায়, 'এখানে (ঢাকায়) "প্যারা" কোনো মিষ্টি নয়, নানা ঝুট-ঝামেলাকে এখানে "প্যারা" বলা হয়'...।
    মানে, অঞ্চল ভেদে শব্দের অর্থটাই বদলে গেছে।


    কিছুদিন আগেই কোরবানি ঈদের সময় পশুর হাটের নানান ব্যানারে ছেয়ে গেল মেগাসিটি ঢাকা। আর ডিজিটাল পোস্টারে ফেসবুক।

    বিস্ময়ের সাথে দেখা গেল, আশৈশব দেখা 'বিরাট গরু-ছাগলের হাট' কথাটিকে যান্ত্রিকভাবে 'শুদ্ধ' করে এখন লেখা হচ্ছে, 'গরু-ছাগলের বিরাট হাট!' অথচ প্রচলিত প্রথম কথাটি মোটেই ভুল নয়।

    এ যেন, রাখলাম রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল!
    প্রায় চার দশক পেরিয়ে মনে পড়ছে ঢাকা সিটি কলেজের বাংলার ক্লাস। খ্যাতিমান অধ্যাপক নরেন বিশ্বাসকে দেওয়া হয়েছিল 'বিরাট গরু-ছাগলের হাট'-এর সমাধান।

    নারকেল মাথার ছাত্রদের সেদিন তিনি সহজ কথায় বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, এটি প্রচলিত বলে একে 'শুদ্ধ' করার দরকার নেই। এখানে 'বিরাট' কথাটির সাথে 'হাট' কথাটি অদৃশ্য ব্রিজে সংযুক্ত।

    ঠিক যেমন, 'উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়' কথাটিতে মোটেই 'বালিকা উচ্চ' নয়। এখানে 'উচ্চ' কথাটির সাথে 'বিদ্যালয়' কথাটি ব্রিজ তৈরি করে সংযুক্ত।

    আবার যেমন, 'খাঁটি গরুর দুধ' ইত্যাদি। এসবই শুদ্ধ বাংলা।

    এরকম আরও অজস্র আছে, বলে বোধহয় শেষ হবে না!

    এসবই হচ্ছে বাংলা ভাষার যাদু বাস্তবতা, একই সঙ্গে মাধুর্য।
    _____
    *ছবি: একদা কলকাতা বইমেলায় পাইদি সকাশে (বাম দিক থেকে দ্বিতীয়)।

    বছর ছয়েক আগে বইমেলায় গুরুচণ্ডালীর স্টলে তোলা ছবি। এতে রৌহিন (নীল জ্যাকেট) ও সবার সামনে (মাঝখানে) মারিয়াকে চেনা যাচ্ছে। বাকীদের নাম মনে পড়ছে না।

    ____
    *কমদামী মোবাইলের ঝাপসা ছবি, এআই দিয়ে হালকা ব্রাশ করে উজ্জ্বল করা হয়েছে, আগাম ক্ষমা প্রার্থনা।

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • অপর বাংলা | ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৫১০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    জলছবি  - Chandan Ghosh
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Aditi Dasgupta | ১০ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:৩৯736561
  • এ নিয়ে গল্পের শেষ নেই তবে বাসা আর বাড়ি নিয়ে এমন একটা গল্পের সুতো চলতে পারে l "বাসা নিয়েছে" কথাটা শুনেছি ছোটবেলায়। তবে সেই বাসাই একদিন বাড়ি হয়ে যায় ---বাড়ি যখন আর থাকেনা বা ফেরার পথ বন্ধ হয়ে যায় !
  • বিপ্লব রহমান | ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৯:১৯736577
  • @Aditi Dasgupta, তাই? এ নিয়ে বিস্তারিত লিখুন না! পড়ার আগ্রহ রইল। yes
  • হীরেন সিংহরায় | ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ ০২:৩৮736619
  • অশেষ ধন্যবাদ! সবে শুরু করলেন। চলতে থাকুক। প্রসঙ্গত ঢাকায় দীর্ঘদিন যাতায়াতে স্থায়ী বা অস্থায়ী দুই প্রকারকে বাসা বলতে শুনেছি। পাতি শব্দের আরেক ব‍্যবহার আছে উত্তর কলকাতায়। আপনি তো ঝাঁপ খুলে ফেলেছেন। অনেক লিখুন।
  • বিপ্লব রহমান | ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০০:৫৪736635
  • @ হীরেন সিংহরায়,
     
    পাঠ ও বিনীত মন্তব্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। আগামীতেও সাথে থাকার অনুরোধ রইল ভাই। শুভ
  • Somnath mukhopadhyay | ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৮:০৫736708
  • ভাষা যখন এক তখন এপার ওপার কথাটা মনে মোচড় দিচ্ছে যদিও এই বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
    যে আখ্যান লিখতে শুরু করেছেন তা চলুক। মাঝের বিরতির কালে আমরা বরং আতিপাতি করে খুঁজে দেখি কোথাও এমন কথার মজায় মজতে পারি কিনা!
  • বিপ্লব রহমান | ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:২৭736744
  • @ Somnath mukhopadhyay,
    দারুণ প্রস্তাব! আপনিও এগিয়ে এলে ভীষণ খুশী হবো।
     
    অনেক ধন্যবাদ।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে প্রতিক্রিয়া দিন