

ভারতে খাদ্য হিসেবে জিনশস্য চালু করতে অনেক বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছে। একমাত্র অখাদ্য ফসল হিসেবে জিনশস্য তুলোর চাষ ভারতে সর্বাধিক হয়। কিন্ত ওই তুলো বীজের তেল বনস্পতি তৈরীতে ব্যবহার হয়। এবার ভারতে অপুষ্টিতে ভোগা মানুষের সংখ্যার দোহাই দিয়ে এবার নতুন চাল। বছরে খরচ হবে প্রায় ২৭০০ কোটি টাকা (indianexpress.com/article/india/cabinet-fortified-rice-cost-rs-2700-crore-per-yea…)। সব কিছুর মূলে রয়েছে পরোক্ষ ভাবে সেই বিশ্ব বানিজ্য চুক্তি ও ভারত মার্কিন কৃষি চুক্তি ২০০৫ (AKI চুক্তি)। ভিটামিন এ’র অভাবে রাতকানা রোগ, লোহার অভাবে হিমোগ্লোবিনের পরিমান কম হওয়ার জন্য রক্তাপ্লতা ও অনান্য অনুখাদ্য ও প্রোটিনের অভাব পরিলক্ষিত হয়। অপুষ্টি দুরীকরনের জন্য বিশেষ কিছু ফসলে প্রথাগত প্রজনন, বাইরের থেকে খাবারে লোহা ও জিঙ্ক মৌলের লবন মিশিয়ে ও জিন পরিবর্তনের দ্বারা ফসলের “পুষ্টিগুন” বাড়িয়ে দেওয়া হবে। সেই ভাবে তৈরী “পুষ্টিকর ফসল” খেয়ে ভারতবাসীর অপুষ্টি দূর করা যাবে বলে দাবী করা হয়েছে। ২০১৬ সালের আগে থেকেই ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ এগ্রিকালচারাল রিসার্চ অনান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থা যৌথ ভাবে কাজ শুরু করেছে। ২০২১ এর ১৫ অগাস্ট প্রধানমন্ত্রী ঘোষনা করেন অপুষ্টিতে ভোগা গরীব গরিব মহিলা ও শিশুদের জন্য ২০২৪ সালের মধ্যে রেশনে, অঙ্গনওয়াড়ী ও দুপুরের খাবার হবে জৈবিক ভাবে “পুষ্টি সমৃদ্ধ” চাল। এ হল “পোষান অভিযান” প্রকল্প। উল্লেখ্য ১০ই জানুয়ারী, ২০২২ বর্তমান পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে বাঁকুড়ার পাত্রসায়র ব্লকে অঙ্গনওয়ারী কেন্দ্রে বিতারিত “পুষ্টিকর চালকে” প্লাস্টিকের চাল ভেবে বিভ্রান্তি ছড়ায়। অর্থাৎ বিতরন চালু হয়ে গিয়েছে। ঝাড়খন্ডে Alliance for Sustainable and Holistic Agriculture (ASHA-Kisan Swaraj)এর প্রতিনিধিরা বলছেন (২১এ মে ২০২২) ওই চাল বিতরন না করতে। জৈবিক ভাবে “পুষ্টি সমৃদ্ধ” করা মোট ২১ টা ফসলের মধ্যে ১৭টি ফসলের ব্যবহারের জন্য ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। সেগুলি হল জিঙ্ক সমৃদ্ধ CR Dhan 315, গমের HI 1633 জাত সহ ও আরো তিনটি জাত। এছাড়া আছে জৈবিক ভাবে পুষ্টি সমৃদ্ধ সংকর জাতের ভুট্টা, বেশী ওলেয়িক আসিড যুক্ত বাদাম, কম ইরুসিক যুক্ত সরিষা, লোহা ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ খামালু, লোহা ও জিঙ্ক সমৃদ্ধ-রাগী, কুটকি মিলেট ও জোয়ার। নিঃসন্দেহে উদ্যোগ ভালো। শুনতেও ভালো লাগে। এমনটা মনে হচ্ছে দেশজ ফসলে কোন পুষ্টিগুন নেই মানে অপুষ্টিকর। ওই গবেষনার জন্য প্রচুর অর্থের যোগান আসবে, নতুন গবেষণাগারে, নতুন যন্ত্র বসবে, প্রজেক্ট ও সেমিনার হবে। ওই সব ফসলের বীজের একটা বাজার হবে। কৃষককে প্রতি বছর বীজ কিনতে হবে। সেই সঙ্গে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের বাজার হবে। অথচ ওই টাকায় দেশের বহু ফসলের বহু জাতের পুষ্টিগুন যাচাই করা সম্ভব। ন্যাশনাল ইন্সটিউট অফ নিউট্রিশন, হায়দ্রাবাদের মোটামুটি ভাবে অনেক ফসলের পুষ্টিগুন যাচাই করেছে, কিন্ত আলাদা ভাবে ফসলের বিভিন্ন জাতের পুষ্টিগুন নিরুপন এখনো করেনি। বিভিন্ন জাতে পুষ্টির হের ফের হবে- কোনটায় বেশী কোনটায় কম।
উল্লেখ্য আপনাদের অনেকেরই স্মরনে থাকতে পারে সংসদের এক আইনের মাধ্যমে ভারতে ১৯৮৬ সালে সব লবনকে আয়োডিন যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল এতে নাকি
আয়োডিনের অভাব জনিত গয়টার কমে যাবে। বাস্তব কি বলে ? নীচের সারনী দ্রষ্টব্য।
কৃত্রিম উপায়ে ফসলের পুষ্টিগুন ও বৃদ্ধির লক্ষমাত্রা
| ফসল | পুষ্টি/ মৌল | বর্তমান পাওয়া* যায় (মিগ্রা / ১০০ গ্রা বা%) | লক্ষমাত্রা*(বেশী) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| ধান | জিঙ্ক | ১.২-১.৬ | ২ মিগ্রার বেশী | ধান একটি নিকৃষ্ট তন্ডুল। এর সঙ্গে ডাল ও মাছ যোগ করলে প্রোটিন ও অনান্য খাদ্যপ্রাণ যুক্ত হয়। অনেক দেশী ধানে জিঙ্ক, লোহা ও প্রোটিন স্বাভাবিক ভাবে লক্ষমাত্রার কাছাকাছি বা বেশী থাকে। অনেক দেশী চালের প্রতি ১০০ গ্রামে লোহার পরিমান ৩.২ মিগ্রা ( লাল বহাল) থেকে ৮.৫ মিগ্রা ( লাল গেতু)।আসলে জাত অনুযায়ী পুষ্টির তারতম্য হয়। |
| প্রোটিন | ৭-৮% | ১০% এর বেশী | চাল যদি পালিশ করা হয় তাহলে পুষ্টিগুন ৬০% নষ্ট হয়ে যায়। কালাভাতের মত কিছু চালে বিটা ক্যারোটিনও থাকে। আসলে আমাদের দেশজ ফসলের জাতের পুষ্টিগুন এখনো বিশ্লেষন করা হয় নি বললেই চলে। পরিশিষ্ট দ্রষ্টব্য। | |
| গম | জিঙ্ক | ৩.০-৩.২ | ৪ | পয়গম্বরী (ট্রিটিকাম স্ফেরোকক্কাম) ও খাপলি (ট্রিটিকাম ডায়োকক্কাম) গমে খনিজের পরিমান বেশী, প্রোটিন ১৩%। লোহার পাত্রে রান্না করা খাবার থেকে শরীরে লোহা আসে |
| লোহা | ২.৮-৩.২ | ৩.৮ | ||
| প্রোটিন | ৮-১০% | ১২% | ||
| ভুট্টা | লাইসিন | ১.৫-২ % | ২.৯% | রঙীন-লাল ভুট্টায় স্বাভাবিক ভাবে বেশী পুষ্টিকর, কয়েকগুন বেশী প্রোটিন আছে। আনথোসায়নিন ও আন্টি অক্সিডেন্ট হলুদ ও সাদা ভুট্টার থেকে অনেক বেশী। কচুশাক, সজিনাপাতা, কুমড়ো ইত্যাদিতে এর থেকে কয়েক হাজার গুন ভিটামিন এ (বিটা ক্যারেটিন) আছে। |
| ট্রিপটোফ্যান | ০.৩-৩.২% | ০.৬% | ||
| প্রোভিটামিন এ | ০.১-০.২ | ০.৮ | ||
| বাজরা | জিঙ্ক | ৩-৩.৫ | ৪ | খুব সামান্য পরিবর্তন, ন্যাশনাল ইন্সটিউট অফ নিউট্রিশন , হায়দ্রাবাদের তথ্যে দেখা যাচ্ছে জিঙ্ক ও লোহার পরিমান যথাক্রমে ২.৭ ও ৬.৪ মিগ্রা। আসলে জাত অনুযায়ী পুষ্টির তারতম্য হয়। তাছাড়া মিলেটে ক্যালসিয়ামের পরিমান বেশী এবং সহজে শরীরে শোষিত হয়, বাজারের স্বাস্থ্যবর্ধক পানীয়’র মত নয়। বাজারের স্বাস্থ্যবর্ধক পানীয়ের বাড়তি ক্যালশিয়াম কিন্ত শরীরে শোষিত হয় না। লবঙ্গ বীনে (আইপোমিয়া মুরিকাটা) আছে ২০০ মিগ্রা, তিল তেলে ১৪৫০ মিগ্রা। প্রতি ১০০ গ্রাম রাগীতে ৩০০ মিগ্রা’র বেশী আছে অথচ এর উপর গুরুত্ব নেই। মিলেট সব থেকে পুষ্টিকর দানাশস্য। |
| লোহা | ৪.৫-৫ | ৭ | ||
| বাঁধাকপি | বিটা ক্যারোটিন (নামমাত্র) | ০.৮ | গাজর বাদে কচুশাক, সজিনাপাতা,কুমড়ো, নটেশাক, পালং ইত্যাদিতে কয়েক হাজার গুন ভিটামিন এ (বিটা ক্যারেটিন আছে)। ভিটামিন এ’র শোষনের বেশ কিছু আভ্যন্তরীন শারীরিক বিষয়ের উপর নির্ভরশীল। শুধু খেলেই হবে না। | মিষ্টি আলু | নামমাত্র আনথোসায়ানিন | ০.৮ | বিটে কয়েক হাজার গুন আনথোসায়ানিন আছে। এছাড়া কালাভাত ও অনান্য কালো লাল চালে, রঙীন ফুলে, রঙীন ভুট্টা, রঙীন ফুলকপি, লাল বাঁধাকপি ও কালো কলাই ডালে আছে। |
* Nutritional security through crop biofortification in India: Status & future prospects, Devendra Kumar Yadava, Firoz Hossain, and Trilochan Mohapatra, Indian J Med Res. 2018 Nov; 148(5): 621–631. doi: 10.4103/ijmr.IJMR_1893_18 (Nutritional security through crop biofortification in India - NCBIhttps://www.ncbi.nlm.nih.gov › articles › PMC6366255)
যে ফসলে যে মৌল স্বাভাবিক ভাবে নেই তা কৃত্রিম ভাবে না বাড়িয়ে যে ফসলে ওই মৌলগুলি বেশী পরিমানে রয়েছে সেই ফসল গুলি খাওয়ার জন্য উৎসাহিত করা কি যুক্তি যু্ক্ত নয়? অথচ সেটাই নিরাপদ এবং শরীরে বিরুপ প্রতিক্রিয়া হয় না, স্বাভাবিক ভাবে শোষিত হয়। প্রশ্ন অনেক। ওই কৃত্রিম খাবারের পুষ্টিগুন শরীরে ঠিক মত শোষিত হচ্ছে কিনা সেটাও বিচার্য বিষয়। কিন্ত ওই কৃত্রিম খাবার খেয়ে কোন এলার্জ্জী হবে কিনা, শরীরে শোষন কতটা হবে, রান্নার পর পুষ্টির তারতম্য কি হবে, অনান্য পুষ্টিগুনের শোষনের উপর কোন প্রভাব পড়বে কিনা অর্থ্যাৎ জিঙ্ক, সেলেনিয়াম ইত্যাদির কোন তারতম্য হবে কিনা। এই সব বিতর্কের বিষয়। এটাও ঠিক চাল, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন রকম ডালে আন্টিনিউট্রিয়েন্ট হিসেবে ফাইটিক আসিড ও পলিফনল থাকে। এই রাসায়নিক গুলি বিভিন্ন খাদ্য প্রাণ শোষনে বাধা দেয়। সুতরাং কৃত্রিম ভাবে বেশী লোহা ইত্যাদির পরিমানে বাড়িয়ে দেওয়া
হলেও শরীরে তা গৃহৃীত হবে কিনা সেই নিশ্চয়তা নেই। কারন স্বাভাবিক ভাবেই খাবারে যে পরিমান লোহা ইত্যাদি থাকে সেটার অনেকটা শোষিত হয় না।
লোহার গুরুত্ব অনেক। হিমোগ্লোবিন তৈরীতে লোহা লাগে। বিভিন্ন বিপাকীয় ক্রিয়ায় অংশ গ্রহন ও ডি এন গঠনে সাহায্য করে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে ও রক্তের লোহা সব অনুজীবের কাজে লাগে। শরীরে লোহাকে নিয়ন্ত্রিত করতে পারলে রোগ জীবানু সহজে কাবু করতে পারবে না। শোষনে পেটের মধ্যে থাকা জীবাণুর (gut biome) একটা ভুমিকা আছে। বিভিন্ন উৎসেচকের সাহায্যে চিলেট আকারে থাকা খাদ্য প্রানের বিশেষ যৌগকে ভেঙে শোষনে সাহায্য করে। আবার শরীরে গ্লাইফোসেটের মত উদ্ভিদ নাশক প্রবেশ করলে পেটে জীবাণুর সংখ্যা কমিয়ে যায় এবং লোহা ও জিঙ্কের সাথে চিলেট গঠন করে শোষনে বাধা দেয়। ডালের সঙ্গে লেবু খাওয়ার চল আছে। অম্ল মাধ্যমে ফাইটিক আসিডের প্রভাবকে কাটিয়ে ডালের লোহা শোষিত হয় । কোহল সন্ধানের ফলে পান্তা ভাতে ফাইটিক আসিড ভেঙে যাওয়ার ফলে অনেক খাদ্য প্রাণ সহজে শোষিত হয় তাই পান্তা ভাত সাধারণ ভাতের থেকে পুষ্টিকর। দেখা যাক আমাদের চারপাশের খাবারে লোহা কতটা আছে। প্রতি ১০০ গ্রাম ডালে ৮-৯ মিগ্রা, কুমড়ো শাকে ৫.৫ মিগ্রা, পুদিনা পাতায় ৮.৫ মিগ্রা, খেজুরে ৪.৭৯ মিগ্রা, চিড়েতে ৫.৫ মিগ্রা, গুড়ে ১১.৮ মিগ্রা, তিল তেলে ৯.৩ মিগ্রা,কাঁকড়াতে ২১ মিগ্রা, মুরগির লিভারে ৯ মিগ্রা, পাঁঠার লিভারে ৬.৫ মিগ্রা, গরুর লিভারে ১৪.৪ মিগ্রা, ডিমের কুসুমে ৪.৯ মিগ্রা। আমাদের দেশের সহজ লভ্য খাদ্যদ্রব্যে লোহার কোন খামতি আছে কি?। কৃত্রিম উপায়ে বাড়ানোর থেকে অনেক বেশী (নীচের সারণী দ্রষ্টব্য)। প্রানীজ খাবারে থাকা হিম লোহা অম্ল মাধ্যম ছাড়াই সহজে শোষিত হয় আর প্রধানত উদ্ভিজ্জ খাবার ও ডিম ও দুধের নন হিম লোহা কম শোষিত হয়। হিম লোহা ও নন হিম লোহা খাদ্যে থাকা লোহা যৌগের বিশেষ জৈব রাসায়নিক গঠন। উল্লেখ্য প্রানীজ খাদ্যে নন হিম লোহার পরিমান প্রায় ৫৫%। চা, কফি ও ক্যালশিয়াম সমৃদ্ধ খাবার লোহার শোষনে বাধা দেয়। আবার প্রানীজ খাদ্যের হিম লোহার থেকে বেশী লোহা শোষিত হওয়ার কারনে অন্ত্রের ক্যানসার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বেশী লোহা শরীরের পক্ষে ভালো নয়।
বাইরের থেকে লোহা ও জিঙ্কের লবন– ফেরাস সালফেট ও ফেরাস ফিউমারেট ও জিঙ্ক সালফেট গমের ও ভুট্টার আটার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হবে। চালের গুড়োর সঙ্গে ওই সব লবন , ভিটামিন ইত্যাদি মিশিয়ে কৃত্রিম চাল তৈরী করার পরে নিদৃষ্ট পরিমান সাদা চালের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে। কিন্ত প্রাকৃতিক ভাবে উৎপাদিত দেশজ ফসলে লোহা ও জিঙ্ক চিলেট ( বিশেষ গঠন) আকারে থাকে, শরীরে আয়ন ফর্মে শোষিত হয় না। লোহার পরিমান বৃদ্ধি হলে শরীরে বিষক্রিয়া হতে পারে কারন লোহা শরীর থেকে সহজে বের হয় না। প্রাকৃতিক ফসলে লোহা, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, কোবাল্ট, তামা, মাঙ্গানীজ প্রোটিন ও শর্করা ইত্যাদির স্বাভাবিক মাত্রা থাকে। রক্তাপ্লতা রোধে ফোলিক আসিড ও ভিটামিন বি ১২ আলাদা করে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় যদিও তা স্বাভাবিক খাবার থেকে পাওয়া যায়। পানীয় জলে থেকেও আমরা লোহা পেতে পারি। দেখতে হবে তা যেন অতিরিক্ত মাত্রায় না হয়। অনেক দেশী চালের প্রতি ১০০ গ্রামে লোহার পরিমান ৩.২ মিগ্রা (লাল বহাল) থেকে ৮.৫ মিগ্রা (লাল গেতু)।
জিঙ্ক মৌলটি মানব দেহের ৩০০’র বেশী এনজাইমে পাওয়া যায়। বিপাকীয় ক্রীয়ায় লোহার পরেই এর স্থান। আন্টিঅক্সিডেন্ট হিসাবে, ক্ষত সারাতে , ডি এন এ সংশ্লেষ করে ও শ্বাসনালীর সংক্রমন কমাতে অংশ নেয়। দেশী চালে ৩.৩ মিগ্রা (দ্বারকা শাল) থেকে ১৫ মিগ্রা (গরীবশাল ধান) প্রতি ১০০ গ্রা চালে থাকে। ছোলার ডালে ৬ মিগ্রা , বরবটিতে ৪.৬ মিগ্রা, ও তিল তেলে ১২.২ মিগ্রা থাকে। ধান জিঙ্ক ও লোহার গবেষনা করেছেন ড. দেবল দেব (দেবল দেব ও তাঁর সহযোহী বৃন্দ, কারের্ন্ট সায়েন্স,ভলিউম ১০৯, নং ৩, ১০ অগাস্ট ,২০১৫)। খেসারি শাকে লোহা আছে ৭.৪ মিগ্রা, ক্যালশিয়াম ১৬০ মিগ্রা, ভিটামিন সি ৪১ মিগ্রা, বিটাক্যারোটিন ৫০০০ মাইক্রোগ্রাম এবং ডালে ও পর্যাপ্ত লোহা ও প্রোটিন আছে।আবার কাচা অড়হরে ডালের থেকে তিনগুন বেশী বিটা ক্যারেটিন (৪৬৯ মাইক্রোগ্রাম) আছে।
আরো উদ্বেগের বিষয় হল “কৃত্রিম পুষ্টিকর” ফসল গুলি জিন পরিবর্তিত কিনা। খাদ্য হিসেবে জিনশস্য খাওয়াও ঝুকিপূর্ণ। ওই ফসল চাষের জন্য প্রচুর রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও আগাছানাশকের অবশেষ ফসলে ও মাটিতে থাকবে। অবশ্য হাইব্রিড ফসলেও বেশী সার ও বিষ লাগবে। জীবন্ত মাটিতে যদি পর্যাপ্ত মৌল থাকে তাহলে তা ফসলে চলে আসে। ইদানিং রাসায়নিক কৃষির জন্য মাটিতে অনুখাদ্যের অভাব দেখা যাচ্ছে। এই কারনে ফসলেও লোহা, জিঙ্ক ইত্যাদি কম পাওয়া যাচ্ছে। রাসায়নিক সারের থেকে আসা ভারী ধাতু-ক্যাডমিয়াম, শিসা ইত্যাদি ও কীটনাশকের অবশেষও ফসলে চলে যাচ্ছে। তাহলে তথাকথিত “কৃত্রিম পুষ্টিযুক্ত ফসলে”ও ওই বিষ সমূহ থাকবে। তাহলে ওই “বর্ধিত পুষ্টির” কি মূল্য থাকল? যে মাটিতে জৈব সার ও অনান্য উদ্ভিদ মৌলের উপস্থিতি কম সেই মাটিকে অসুস্থ ও মৃত মাটি বলা চলে। রাসায়নিক সারে চাষ হওয়া ফসলে পুষ্টিগুন ও স্বাদ কম থাকে।
আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ভারতে নিযুক্ত কৃষিবিদ স্যার আলবার্ট হোয়ার্ড আশংকা প্রকাশ করেছিলেন অসুস্থ ও মৃত মাটিতে জন্মানো ফসল খেয়ে মানুষও অসুস্থ হয়ে পড়বে। আমাদের দেশের অজস্র ফসল পুষ্টি গুনে সমৃদ্ধ । সেই সব দেশজ
ফসলের পুষ্টি মূল্য বিচার করা হয় নি। বেশী খরচ করে নতুন করে ওই সব কৃত্রিম ফসল তৈরী না করে যা আছে তাই জনসমক্ষে তুলে ধরা প্রয়োজন।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে জিন শস্য সোনালী ধানের বুজরুকির কথা। লোহা সমৃদ্ধ জিন পরিবর্তিত ধান নিয়েও বিস্তর চর্চা হয়েছে। চলছে বিতর্ক। লোহার উৎস আমাদের দেশের বহু ফসলেই পাওয়া যায়। লোহার পাত্রে রান্না করা খাবার থেকে শরীরে লোহা আসে, পানীয় জল থেকে আসে। এটা ঠিক আমাদের দেশে রক্তাপ্লতা একটা সমস্যা বিশেষত মহিলাদের। অন্য দিকে থালাসেমিয়া ও সিকল সেল অনিমিয়া রোগীর পক্ষে অতিরিক্ত লোহা সমস্যা তৈরী করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে রক্তে লোহার (হিমোগ্লোবিন) পরিমান সাদা চামড়ার মানুষের থেকে এখানকার মানুষের কম থাকলেও রক্তাপ্লতার লক্ষন দেখা যায় না। সেটা অনেকটা অভিযোজনের মত বিষয়। রক্তে লোহার পরিমান নিদৃষ্ট করা হয়েছে বহু মানুষের রক্তে গড় লোহার পরিমাপের ভিত্তিতে। এটি ব্যক্তি বিশেষ, জলবায়ু, খাদ্য গ্রহন, খাদ্যে কীটনাশকের উপস্থিতি ও মানুষের জাতের উপর নির্ভর করে। আবার আঙুলের মাথা ফুটিয়ে নেওয়া রক্ত ও শিরার রক্তের মধ্যে হিমোগ্লোবিনের তারতম্য হতে পারে।
আমরা খাবারে প্রোটিন, ফ্যাট, শর্করা ও খনিজ নিয়েই কথা বলি। কিন্ত Canadian Institutes of Health Research, Canada Foundation for Innovation এবং The Metabolomics Innovation Centre (TMIC)যৌথভাবে বিস্তারিত গবেষনা চালিয়ে ফসলে পাওয়া বহু জৈব রাসায়নিক চিহ্নিত করেছে। সব গুলো রাসায়নিকের কাজ জানা যায় নি। খাদ্যই পথ্য। খাবারেই ওষধি গুন আছে। কমলালেবুর আসকরবিক আ্যসিড লেবুর ৪৩৩৩টি রাসায়নিকের মধ্যে একটি। টমাটোর লাইকোপিন টমাটোর অন্য ৪২৪৩টি রাসায়নিকের সাথে থেকেই কাজ করবে। গরমে সবজির ওই ঔধধি গুন অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। কোন একটি জৈব রাসায়নিক খাবারের সব উপাদানের সাথে মিশেই কাজ করবে। বিছিন্ন ভাবে কাজ না করাই স্বাভাবিক। এটাই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাপনা। যেমন চালে ৪২১১টি গমে ৪১০১, আলুতে ৪৪৭০টি হলুদে ৪১১৭টি আমে ৪০০৯টি রাসায়নিক চিহ্নিত করা হয়েছে (https://foodb.ca)। কিভাবে শরীরের বিপাকীয় ক্রিয়ায় অংশ নেয় তা সম্পূর্ণ অজানা। একটি বা দুটি মৌল কৃত্রিম উপায়ে বৃদ্ধি করা হলে অন্য মৌলের উপর কি বিরুপ পড়বে, শরীরে পরে কি কি অসুবিধা দেখা দেবে সেটা অজানা। ভারতে এই নিয়ে কোন গবেষনা হয় নি।
সুতরাং দেশের ফসলের উপরের গুরুত্ব দিয়ে পুষ্টিগুনের কথা জনসমক্ষে প্রচার করলে মানুষ সহজেই ওই খাবারে আকৃষ্ট হবেন। ফাস্ট ফুড নয়, বিজ্ঞাপনের খাবার ও নয়। বাড়াতে হবে জনসচেতনা, জোর দিতে হবে জনস্বাস্থ্যে। পাতে লেবু, টক দই, শুক্ত, শাক পালিশ না করা চাল ও মরশুমি সবজি ও ফল দরকার। পুষ্টিকর কালাভাত, লালচাল, ফেন ভাত, বিভিন্ন মিলেট, রঙীন সবজি ও স্থানীয় ফসলের উপর জের দিতে হবে। এর চাষও বাড়তে হবে এবং সর্বসাধারনের কাছে পৌঁছতে হবে। অবশ্যই জৈব সার প্রয়োগেই ওই ফসল গুলির চাষ করা দরকার। সেইসঙ্গে চাই বিশুদ্ধ পানীয় জল ও সঠিক লবন। বৈদ্যুতিন মাধ্যমে পরিশ্রুত জলে খনিজ পদার্থ কম থাকে। অনেক কম খরচেই কোন ঢক্কা নিনাদ ছাড়াই সেটা সম্ভব।
•লেখক: কৃষি বিশেষজ্ঞ
লেখকের কৃষি ভাবনা ও দুর্ভাবনা (কলাবতী মুদ্রা, ২০২২) গ্রন্থের অংশ বিশেষ
santosh banerjee | ০২ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১২:৫৫511564
Anamika | 2409:4060:2d96:8b09::104b:***:*** | ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২২ ১৬:৩৩511708