এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  আলোচনা  বিবিধ

  • করোনা কাল

    Prativa Sarker লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ২৪ মার্চ ২০২০ | ৩২২৫ বার পঠিত
  • করোনা- কাল ১
    ------------------
    আমার কিছু লিখতে,পড়তে, গান শুনতে ইচ্ছে করছে না। সিনেমা দেখতেও না। মাঝে মাঝে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছি। লোকের দৌড়োদৌড়ি, গাড়িতে ভারী ভারী সবজি, ফলের প্লাস্টিক তোলা দেখছি।

    শুনছি খবরের কাগজ করোনা ভাইরাস ঘরে এনে দিতে পারে। কিন্তু যিনি আছেন তার রোজ সকালে চা এবং পাঁচটি খবরের কাগজ নিয়ে না বসলে জীবন অপূর্ণ থাকে। আমার কথায় অনেক কিছু ছেড়েছেন, এটা ছাড়লে ওঁর চলবে না।

    বন্ধুরা ফোন করলে ভালো লাগছে। অনেক গল্পসল্প হচ্ছে। কিন্তু একটু আগে এক অনেক পুরনো বন্ধু ফোন ক'রে খুব কাঁদলো। সে যখন ইউনিভার্সিটি থেকে বাড়ি ফিরত, রোজ সন্ধ্যায় একটি অল্পবয়েসি ছেলে তার যাতাযাতের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতো। রোজ। কথা হয়নি কখনো। কিন্তু বোঝা যেত সে কথা বলতে চায়।

    মেয়েটি আগ্রহ দেখায়নি। কারো কাছে শুনেছিল সেই তরুণ সদ্য ব্যাঙ্কে চাকরি পেয়ে ঐ শহরে এসেছে। এরপর কোনোভাবে এক কমন পরিচিতকে যোগাড় করে সে এক সন্ধেয় তাদের বাড়িতে এসে যায়। আমার বন্ধু ততোক্ষণে ছুটি কাবার করে হস্টেলে। বোনের কাছে শুনে সে খুব হেসেছিল, হঠাত এমন অতিথি আসবার কারণটা একমাত্র তার কাছেই পরিষ্কার ছিল।

    তারপর সব আগের মতোই হয়ে যায়। যার যার জীবন তার তার কক্ষপথে ঘুরতে থাকে। আমার বন্ধুনী বিয়ে করে, বিচ্ছেদ হয়। পরিণত বয়সে এখন করোনাতঙ্কে একলা বাড়িতে হঠাত তার মনে পড়েছে সেই বিফল মনোরথ যুবককে। ফেসবুক খুঁজে একটি রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে রোজ খুলে দেখছে সে গ্রহণ করেছে কিনা।

    কিন্তু না, জানুয়ারি মাসের পর তার প্রোফাইলে কোনো নড়াচড়া নেই। রিকুও সে গ্রহণ করেনি।

    তার কান্নার আওয়াজ বৃষ্টির আওয়াজে মিশে যাচ্ছিল আর ভাবছিলাম যেন তার অনুরোধ মানুষটি কোনোদিনই গ্রহণ না করে। অবান্তর ঝামেলায় মনকে ফেলে কী হবে ! অন্য সময় হলে যাওয়া যেত, আসতে বলা যেত, কিন্তু এখন যেন একাকীত্বের অন্ধকার কালো ঢালু ছাদের ঠাসাঠাসি কবরে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে আছি আমরা। বাইরে প্রবল ঝড়বৃষ্টি আর অনাগত মৃত্যুর ইশারা।

    বিকেলে কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিলাম ছোট্ট ছোট্ট আলোর ছোপ মেখে রাস্তার ডুমুর গাছটিতে বাসায় তা দিচ্ছে কাক-মা। ঝড়ের পর এখন তার প্রবল চেঁচামেচি শুনতে পাচ্ছি। সব সম্ভাবনার ইতি !

    আমার বন্ধু আর সেই কাক- মা কে কী বলে সান্ত্বনা দিই !

    করোনা কাল ২
    ------------------

    আজ আমাকে বেরোতে হয়েছিল। অল্প দূরে। তবু তো। বেরোনই বলে তাকে।

    একজন মারা যাচ্ছে, যদিও আজকের আগে জানতাম না তার এমন অবস্থা,তার জন্য কিছু খাবার আর অর্থ নিয়ে।

    রেগে যাবেন না, ছবিতে দেখবেন আমার পোশাক প্রায় মহাকাশচারীর মতো। কিন্তু যে মরছে সে খোলা আকাশের নীচে চিত হয়ে পড়ে আছে। কাশছে। হাতে তুলে না দিলে কাত হয়ে খাবার অব্দি পৌঁছবার সাধ্য তার নেই। কাল ঝড়জলের সময় ও ঐভাবেই পড়ে ছিল নিশ্চিত।

    এর সঙ্গে আমার সম্পর্ক দশ বছরের। আমি তাকে আদর করে মায়ি বলে ডাকি। সেও আমাকে মেয়ের মতোই ভালবাসে। আসলে ও একগাদা কুকুরের মা। অনেক বেওয়ারিশ কুকুরের জন্য মুরগির দোকান থেকে ছাঁট কুড়িয়ে চালের সঙ্গে ফুটিয়ে দেওয়া,বালতিতে খাবার জল দেওয়া সন্তানস্নেহে দেখভাল করা সব মায়ি এতোদিন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে করত। কারো কাছে ভিক্ষা চাইত না, আমার মতো ওর স্বভাবগুণে যারা মুগ্ধ, তাদের সাহায্য নিয়েই চলতো।

    এখন অনেক বয়স হয়েছে, অসুস্থ হবেই জানতাম। কিন্তু এই করোনাতঙ্কের মধ্যে মায়ি এতোটা অসুস্থ হয়ে পড়বে ভাবিনি। অসুস্থতা ছাড়াও কোনো স্বাভাবিকতাই অবশিষ্ট নেই এখন।তবু দেখি এক জোয়ান ছেলে, মুখে হালকা মাস্ক পরা, মায়ির পনেরটা কুকুরকে লাইন করে খাবার দিচ্ছে।

    গত পনেরদিন মায়ির সঙ্গে দেখা হয়নি। আজ হঠাত মনে পড়ল ন' নম্বর ট্যাঙ্কের পাশে রাজস্থানী রেস্টুরেন্ট হাভেলিও বন্ধ। ঐ রেস্টুরেন্টের কর্মচারিরাই ওর খাবারের ব্যবস্থা করে! ধারণা হল মায়ি হয়ত উপোস করে আছে। তাই খাবারের ব্যবস্থা করলাম, আর কিছু টাকা।

    কিন্তু গিয়ে যা দেখলাম তাতে চোখ ফেটে জল এলো। মাস্কপরা ছেলেটি বলল, ক'দিন ধরেই অবস্থা খারাপ। বিধাননগর হাসপাতালে ক'দিন শুধু শুধু পড়ে থাকার পর ফুটপাথেই ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখানেই ওরা স্যালাইন দেবার ব্যবস্থা করেছে। তিন চার বোতল স্যালাইন টেনে মায়ি এখন একটু কথা বলতে পারছে।

    ইশারায় খাবার দেখিয়ে মায়ি আমায় বলল, ক্যায়া হ্যায় ইসমে?
    -মছলি
    -বাবুয়া, থোড়াসা মছলি দো । মায়ি বলল।
    ছেলেটি বলল, জরুর। পহেলে পয়সা উঠা লে।

    এইটুকুই শুনে চলে এলাম। আমি তো ব্যাটম্যান বা ক্যাট উওম্যান নই। বীরনারী নই। নেহাতই মাগুর মাছের প্রাণওয়ালা এক পাতি মধ্যবিত্ত মহিলা। সারাক্ষণ করোনার ভয় পাচ্ছিলাম। আর কতক্ষণে নিজের খুপরিতে ঢুকব সেই চিন্তা শুধু।

    মায়ির ফুটপাথের ঘর যখন সৌন্দর্যায়নের জন্য ভাঙা পড়ে তখন লিখেছিলাম ওর কথা। বন্ধুরা বিপুল সাড়া দিয়েছিলেন। ওকে দেখতে চলে এসেছিলেন অনেকে। সাহায্য করেছিলেন। এখন সবাই নিরুপায়। অতিমারীর সামনে আমাদের হাত পা বাঁধা। তবু ইচ্ছে Sanjibbplus Sudurer Piyashi সঞ্জীবের চোখে এই পোস্ট পড়ুক।

    বিধাননগর পুলিশের দৌড় স্বাভাবিকভাবেই বিধাননগর হাসপাতাল অব্দি। এই করোনার মরশুমে মায়ি সেখানে স্যালাইন না পেলে কাউকে তো দোষ দেওয়া যায় না।

    আসলে আমি বোধহয় আমার সদ্যপ্র‍য়াত মায়ের কথা ভেবেই বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছি।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • আলোচনা | ২৪ মার্চ ২০২০ | ৩২২৫ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • একলহমা | ২৫ মার্চ ২০২০ ০১:৩১91729
  • "আমার কিছু লিখতে,পড়তে, গান শুনতে ইচ্ছে করছে না। " - এক অবস্থা। তার মাঝে আপনার এই লেখা পড়ে মনটা একটু হলেও ভালো হল।
  • A | 172.69.***.*** | ২৫ মার্চ ২০২০ ০৫:৪২91730
  • sotti khub kharap obostha. San Franciscio bay area te thaaki. last 7 din amar wife khub ekta beroi ni. ami du ekbar grocery korte giyecheilam. aaj wife gechilan Whole Foods, phire eshe mukh shukno ebong bhito. dokan er baire 6 ft distance a ek ek jon dariye aache. ek jon dokan theke berole ar ekjon dhukte parche. kormochari basket gulor handle lysol diye much jaache. she really got panicked to be in the situation. CNN dekh ek, r to feel that we are in a pandemic is very tough. tao amader ekhono soubhaggo health wise thik achi.

    Protibha di bhalo thaakben r ekdom baire beroben na. apnar shob lekhai pori. ekta lekhai apnar shashkoshter katha likehchilen. ei obosthai precaution nin. 

  • Prativa Sarker | ২৬ মার্চ ২০২০ ১৫:৫৮91780
  • এখন ঠিক আছি। ওটা সিজন চেঞ্জের সময় হয়। শুভকামনার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
  • বিপ্লব রহমান | ২৭ মার্চ ২০২০ ০৭:৩৩91803
  • প্রতিভা দি, 

    কোনো শান্তনা নেই। দিদি, তোমার বন্ধুর কথায় মনে পড়লো, "কে আর হৃদয় খুড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে?" বরং এই ভালো হয়েছে। 

    বোনাইকে অনলাইনে নিউজ পড়তে বলো, এটি অনেক সুবিধার ও গতিময়, অভ্যাসের বিষয়। ট্যাব বা মোবাইলে কয়েকটা এপস নামিয়ে নিলো আরো সহজ।  

    সম্পাদকীয়- উপ সম্পাদকীয়ও অনলাইন সংস্করণে থাকে।   

    মায়ীর জন্য শ্রদ্ধা।  

    করোনার দিনলিপি চলুক  

  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন