এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • বিকৃত আদর্শের ব্যবসা

    ওয়াক্কাস মীর লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১৮ জুলাই ২০১১ | ১০৮০ বার পঠিত
  • অনুবাদিকা: কৃষ্ণকলি রায়

    "উগ্রপন্থা'; এই একটা জিনিষই আমাদের দেশটাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। আমাদের দেশ, যে পাকিস্তানে আমরা বড় হয়েছিলাম। আজ এই এক একটা বোমা বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে আমার চেনা দেশটাও যেন খানখান হয়ে যায়। চারধারে শুধু ধ্বংসের তান্ডব দেখতে পাই। অবাক লাগে যে এর পরেও দিব্যি চলছে ; আমাদের দেশের দিনগুলো। বোমার ঘায়ে শুধু যে মানুষের হাত পা এমনকি প্রাণটাই উড়ে যাচ্ছে তাইই নয়,একের পর এক হামলা দেখে দেখে আমরা এই হিংসাত্মক পরিবেশেই যেন অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি। বোমাবাজি আর হানাহানিই আমাদের কাছে রোজকার ব্যপারের মতো জলভাত হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আমাদের মন এখন আর যুক্তি দিয়ে এর বিচার করে দেখতে ভুলে যাচ্ছে। আমার মতে এও এক বিশাল ক্ষতি।

    আতংকে, দু:খে সমাজটা অচল হয়ে পড়লে চলবেনা তা মানি। কিন্তু এরকম সময়ে সমাজের অন্তত একবার থমকে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে দেখাটা খুব দরকার। আতংকবাদের আঘাতে আজ মনে হয় আমাদের চিন্তাশক্তিও টুকরো টুকরো হয়ে উড়ে গেছে। আঠেরোশ'র শতকে অ্যাডাম স্মিথ লিখেছিলেন যে সহানুভূতি জিনিষটা আসলে মানুষের ভাবনাতেই বেশি করে রয়েছে। সেই সময়ে অনেকেই ওঁর কথাটার "মানে' নিয়ে ধন্দে পড়েছিলো। আজকে আমার বলতে দ্বিধা নেই যে এদেশের জন্য না আছে আমাদের কোনো সহানুভূতি, না আছে কোনো লজ্জা। কেননা এই দুটো অনুভব করতে গেলে মানবিকতার দরকার হয়,নিজেদের দিকে তাকিয়ে দেখার হয়।।কিন্তু সেদিকে আমাদের নজর কোথায়?এই যে আজ প্রায় সারা দুনিয়াই আস্তে আস্তে আমাদের দেশের প্রতি বিরূপ হয়ে উঠছে এতে আর যাই হোক, কোনদিন দেশের ভালো হবে না। এরকমটা যে হচ্ছে তার অনেক কারণ আমাদের নিজেদের দেশেই শিকড় গেড়ে রয়েছে। আর তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে থেকে আমরা নিজেদের দেশের কবর নিজেরাই খুঁড়ে চলেছি।

    প্রায় দশ বছর ধরে আমরা বলে চলেছি যে আমাদের দেশে সন্ত্রাসবাদ এত বাড়তে পেরেছে তার কারণ হলো আমাদের গরিবী। এই কথাটা দুনিয়ার বেশির ভাগ দেশই বিশ্বাস করে। তা না হলে অন্যান্য দেশ আমাদের অর্থসাহায্য করতে এগিয়ে আসতোনা। কিন্তু হালে চারজন অ্যামেরিকান শিক্ষাবিৎ একটা সমীক্ষা করেছেন, তাতে দেখা গেছে যে দেশের মধ্যে যাঁরা সামরিক নীতি কিম্বা যুদ্ধবিগ্রহের রাস্তা মেনে নিতে সবচেয়ে বেশি অরাজী তাঁরা হলেন আর্থিক দিক দিয়ে সবচাইতে নীচু তলার লোক .... হ্যাঁ, সব চাইতে গরীব মানুষেরা। এর পরে কিন্তু আর গরিবীকেই সন্ত্রাসবাদের কারণ বলে চালানো চলেনা। গরিবী হঠানোর জন্য চেষ্টা করতে হবে বৈকি, কিন্তু সন্ত্রাসবাদের আসল কারণটা যে অন্য জায়গায় তা অস্বীকার করলে তো চলবেনা। আমার মতে ঐ আসল কারণ হলো শিক্ষা। হ্যাঁ, আমাদের দেশের চালু শিক্ষা-ব্যবস্থাতেই গলদটা রয়েছে। আমি যা দেখেছি, এই শিক্ষাব্যবস্থায় ইতিহাসকে বিকৃত করে দেখানো হয়। তার ফলে জন্ম হয় অসহিষ্ণুতা আর জাতিবিদ্বেষের। আরো স্পষ্ট করে বলা যায় সবকিছুর মূলে হলো একটা বিশেষ ছাপ্পা মারা রাজনৈতিক ইসলামীয় শিক্ষা যাতে ধর্মের নামে চরম হিংসার রাস্তা বেছে নিতে উস্কানি দেওয়া হয়। শুধু পাকিস্তানই নয়, সারা দুনিয়ার মুসলিমদেরই আজ এই ধর্মের দোহাই দিয়ে গড়া হিংস্র, ভয়ংকর, বন্দুকের নলে ঝোলানো অন্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সময় এসেছে।

    কাকে আমরা ফাঁকি দিচ্ছি বলুন? কাকে চোখ ঠারছি? ড্যানিয়েল পার্লকে খুন করার জন্য যে ওমর শেখের মৃত্যুদন্ড হলো তিনি অ্যাচিনসন কলেজ থেকে পাশ করেছিলেন, কোনো মাদ্রাসা থেকে নয়। খালিদ শেখ মোহম্মদ, ৯/১১ ঘটনার প্রধান সূত্রধরদের একজন ,কোনো বস্তিরে গরিবের ঘরে জন্মাননি। ওসামা বিন লাদেন,জোয়াহিরি,৯/১১তে যাঁরা প্লেন ছিনতাই করেছিলেন বা ৭/৭ এ ট্রেন বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিলেন কেউই গরিবীর তাড়নায় এরকম কাজ করতে নামেননি। আমি লাহোরের বাজারে অনেক দোকানে দেখেছি দোকানীরা "কাশ্মীরের কাজে' লেগে থাকা প্রতিষ্ঠানের জন্য "অর্থসাহায্যের' বাক্স নিয়ে বসেন। অর্থসাহায্য!! যাদের কাছে মানুষের জীবনের বিন্দুমাত্র দাম নেই, যারা নিজেরা কোনদিন গরিবিয়ানার ধার দিয়েও হাঁটেনি তাদের জন্য "অর্থসাহায্য'!! যতদিন না আমরা ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে শিখবো, যতদিন না আমরা অন্য দেশের, অন্য সংস্কৃতির, অন্য মতের মানুষদের জীবনের দাম বুঝতে শিখবো, ততদিন কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদকে থামানোর রাস্তা খুঁজে পাওয়া যাবেনা। গরিবীকে পুরোপুরি মিটিয়ে ফেলতে পারলেও নয়। দিনের পর দিন এত মানুষ যে উগ্রপন্থী দলে নাম লেখাচ্ছে গরিবী তার একটা কারণ হলেও হতে পারে, কিন্তু একমাত্র কারণ কখনোই নয়। চারদিকে এইসব হানাহানির ঘটনা গুলো একটু খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যায় যে এর কারণ শুধুমাত্র বিকৃত আদর্শ আর জাতি-বিদ্বেষ। আর একে থামানোর দায়িত্বই বলুন আর উপায়ই বলুন সে শুধু আমাদের হাতে। না, পৃথিবীর আর কোনো দেশের নয়, শুধু আমাদের।

    ধর্মের মূলকথাই হলো মানবিকতা। ধর্মকে বোঝার আর বোঝানোর মূলকথাও তাই। কোরানের ব্যাখ্যা করতে হলে আগে দেখা দরকার যে আমরা কোন পথে হাঁটবো। আমরা কি সেই পুরনো সময়ে আটকে থাকা আক্ষরিক মানে বেছে নেবো? নাকি দেশ-কালের উপযোগী ভাবার্থকে নিয়ে এগোবো? বলতে বাধ্য হতে হয় যে আমাদের মুসলিম বুদ্ধিজিবীদেরই কোথায় যেন খামতি থেকে গেছে। যাঁরা ইসলামের আসল ব্যখ্যা তুলে ধরতে পারতেন, ধর্মাচরণের রাস্তায় কোথায় যেন তাঁরা পিছিয়ে পড়েছেন। তার ফলে ধর্মকে লড়াইয়ের হাতিয়ার বানিয়ে একদল তথাকথিত ধর্মগুরু আজ সারা মুসলিম দুনিয়া কাঁপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের কাজই হলো মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের বোঝানো যে "আমাদের ওপর অন্যায় হয়েছে, তাই এখন শোধ তোলার দিন'। এদেরই প্ররোচনায় মানুষের মনে প্রতিনিয়ত ঘৃণা আর তিক্ততা ভরে যাচ্ছে। আর সেই থেকেই রোজ তৈরী হচ্ছে হাজার হাজার সন্ত্রাসী, খুনে, আতংকবাদী। কোনো অর্থাভাব নয়, কোন বঞ্চনা নয়, শুধুমাত্র ঘৃণা আর বিকৃতির আদর্শ রোজই জন্ম দিচ্ছে উগ্রপন্থার।

    এই "ভিক্টিম কমপ্লেক্স' থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। যারা আমাদের ধর্মকে বিষিয়ে দিয়েছে, রোজই আরো আরো বিকৃত করছে তাদের থামাতে হবে। তা না করতে পারলে দুনিয়া কোনোদিনই শান্তিকামী আমাদের, আসল ধর্মভীরু মুসলমানদের চিনবেনা, বিশ্বাসও করবেনা। ধর্মের সত্যি ব্যাখা করা,এ নিয়ে আরো পড়া, বিভিন্ন জায়গায় লেখা এখন খুব দরকার। দরকার আত্মসমীক্ষা আর আত্ম-বিশ্লেষণও। একমাত্র তাহলেই এই খুনিয়া ধর্মের ব্যাপারীদের পায়ের তলার মাটিতে কাঁপন ধরানো সম্ভব। আর কোনোই রাস্তা নেই।

    ওয়াক্কাস মীর লাহোরবাসী আইনজীবী। বুলবুলভাজায় প্রকাশিত হচ্ছে তাঁর অনিয়মিত কলাম।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১৮ জুলাই ২০১১ | ১০৮০ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    বডি  - Anjan Banerjee
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় প্রতিক্রিয়া দিন