এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • বুলবুলভাজা  আলোচনা  বিবিধ

  • বৈচিত্র্যে ভয়?

    ওয়াক্কাস মীর লেখকের গ্রাহক হোন
    আলোচনা | বিবিধ | ১২ জুন ২০১১ | ৯৫৯ বার পঠিত
  • ওয়াকাস মির লাহোরবাসী আইনজীবী। বুলবুলভাজায় এবার থেকে প্রকাশিত হবে তাঁর অনিয়মিত কলাম।


    "বৈচিত্র্য' শব্দটা সরকারী দপ্তরে যাকে বলে একটা "ফীল গুড' শব্দ। তবে সত্যি বলতে কি এ নিয়ে শুধু আলোচনা করা একরকম, আর একে সরকারী স্বীকৃতি দেওয়া পুরোপুরি আলাদা জিনিষ। একটা গোষ্ঠীর মধ্যে ভাষার দিক দিয়েই বলুন কি জাতির দিক দিয়েই বলুন বৈচিত্র্য অনেকই থাকতে পারে। কিন্তু যতদিন না দেশের আইনে আর সংবিধানে ঐ বৈচিত্র্যকে খাতায় কলমে স্বীকার করা হচ্ছে ততদিন পর্য্যন্ত দেশের রাজনীতিতে ঐ গোষ্ঠীর বক্তব্য ঠিকমতো পৌঁছোতে পারবেনা। "দেশ আর জাতির' বিংশ শতকের যে মডেলটা তৈরী হয়েছিলো তার অতুলনীয়তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। হয়তো স্বাধীনতার ভিত্তিতে তৈরী হয়েছিলো বলেই এটা সম্ভব হয়েছিলো। কিন্তু তারপরে দিনে দিনে সরকারের স্বৈরাচারী শাসন যতই চলতে লাগলো, জাতির ভেতরকার রাজনীতিতে ভাঙন ধরার সম্ভাবনাটাও ততই বেড়ে উঠলো।

    ভাঙন যদি ধরেই তাহলে তার একটা বড় কারণ হবে ভাষা। আজকের দিনে অনেক দেশেই দেখবেন (বিশেষ করে পোস্টকলোনিয়াল দেশগুলোতে) একটা জাতীয় ভাষার মধ্যে দিয়েই তাদের জাতীয় সংস্কৃতিটা গড়ে উঠেছে। দেশের হাল-হকিকৎ এর ওপরে সেই জাতীয় সংস্কৃতির প্রভাবটা কিন্তু খুব কম নয়। পাকিস্তানের মত একটা সংযুক্ত রাজ্যের দেশে কোন একটা ভাষা "জাতীয় ভাষা'র হিসেবে চললে দেশের বৈচিত্র্যের ওপরে তার প্রভাব কি হবে? এই জাতীয় ভাষার ধারনাটা আমাদের মত কোনো পোস্ট কলোনিয়াল দেশে সরকারের এই নাগরিক অধিকার দেবার প্রতিশ্রুতি আর মরিয়া হয়ে সেটাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টার ওপরেই বা কি প্রভাব ফেলবে? একটা দেশের নানান রাজ্যে যখন ভাষা নানান রকম হয়,সংস্কৃতি নানান রকম হয় তখন এই এতগুলো "নানান'এর জন্যই দেশের সামগ্রিকতায় বরাবর একটা চাপ তৈরী হয়। তখন সেই নানা ভাষার নানা বক্তব্য, তা সে যতই ঠিকঠাক হোক না কেন,সরকার আর কানে তোলেননা। হয় জোর খাটিয়ে তাদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, নয়তো ইচ্ছে করে কান বন্ধ করে রাখা হয়। হয়তো এতগুলো ভাষার এত গুলো কথা সরকারকে ভয় পাইয়ে দেয়। সত্যি বলতে কি দেশভাগের পর বাংলাদেশ (তখন বলতো পূর্ব পাকিস্তান) আর পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেলে যে দাঙ্গা বেধেছিলো তখন থেকেই সংস্কৃতির আর ভাষা এই দুটো জিনিষ যে একেকটা রাজ্যের কাছে কত জরুরী তা কেউ ভেবেই দেখেনি। যে টুকরো টুকরো রাজ্যগুলো একসাথে মিলিয়ে দেশ তৈরী হলো তাদের সবার মুখের ভাষা যে তাদের পরিচয়ের একটা অঙ্গ এমনটা কারুর মনেই হয়নি। কোন দেশের সরকারের মনে যদি সবসময় ভয় থাকে যে "এই বুঝি রাজ্য গুলো সব আলাদা আলাদা হয়ে পড়লো', তাহলে সেদেশের মূল কাঠামোটাই যে কত নড়বড়ে তা বুঝতে কষ্ট হয়না। তখন মনে এই প্রশ্নটাও জাগে যে "দেশের কাঠামোটা সত্যিই কতটা ফাঁপা? কতদিন আর এমনি "একতা'র ভান করে চালানো যাবে?'

    যদি ধরে নেওয়া যায় যে শাসক আর শাসিতের মধ্যে যোগাযোগের ভাষাটাই হলো রাজনীতি তাহলে বলতেই হবে যে আমাদের শাসকরা কিন্তু শাসিতদের নিজেদের বক্তব্য সেই ভাষার দরবারে পেশ করার ক্ষেত্রে কোনদিন এতটুকুও সাহায্য করেননি। কাজেই যারা আজ সরকারের নিজের ভাষায় কথা বলে তাদের বাদ দিলে "টু নেশন থিয়োরী'র আর কোন ভিত্তিই বাকি থাকছেনা। হ্যাঁ, সরকার শুধু তাঁর নিজের ভাষায় কথা বলেন। আর অন্য যত ভাষা, নানান রাজ্যের ভাষা, নানান সংস্কৃতির ভাষা, নানান ভাষার ভাষা, তাদের চুপ করিয়ে রাখারই চেষ্টা চলে। তার ফলে আমদের যা কানে যা আসে তা হলো শুধুই চেঁচামেচি। আর? আর আসে একরাশ বিভ্রান্তি,সেই জিনিষটি নিয়ে যা যেকোন রাষ্ট্রের ভিৎ তৈরী করে। সে জিনিষ হলো একতা।

    ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাস নিয়ে যার কিছুমাত্র পড়াশোনা আছে তার মনে সঙ্গত ভাবেই একটা প্রশ্ন আসবে। অন্য আরো আঞ্চলিক ভাষাগুলোকে পেছনে হঠিয়ে দিয়ে কেন উর্দুই পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা হলো? যদি আমরা মুসলিম জাতিকে একটা বিশিষ্ট জাতি বলে মেনে নিই তাহলে কখনই এই জাতির ইতিহাসকে, এই জাতি উর্দু ছাড়া আরো কত ভাষায় কথা বলতো সেই সত্যিটাকে আমরা অমনি অমনিই মুছে ফেলতে পারিনা (অবশ্য আমাদের ছাপা ইতিহাসের বইতে সেসব মুছেই দেওয়া হয়)। উর্দু তো উত্তর ভারতে চালু হয়েছিলো কিন্তু যে আরো অন্য অঞ্চলগুলো পাকিস্তানেরই অংশ সেখানে পাশ্‌তো,সিন্ধী, বালোচি, বাংলা আরো কত ভাষাতেই তো লোকে কথা বলতো। তাহলে?

    দেশভাগের সময়ে এমন কোন কথা হয়নি যে দুদেশের ভাষা-সংস্কৃতি ভারতের মুসলিম জাতির অনুসরনেই চলবে। কিন্তু আমাদের সরকারে চিন্তাভাবনা সেই ১৯৪৭ সালেই থেমে রয়েছে। উর্দু ভারতীয় মুসলিমদের মধ্যে একটা বড় অংশের ভাষা(উত্তরভারতে। অবশ্য অন্য অনেক মুসলিমরা অন্য ভাষাতেও কথা বলেন) তাই তাকে ভারতের তামাম ইস্‌লামের সাথে এক ধরে নেওয়া হয়েছে। আর তাইই দেশপ্রেমী হতে গেলে এই ইসলামীয় ভাষাভাষী হওয়াটা অবশ্যকর্তব্য হয়ে পড়েছে।

    "বৈচিত্র্য'কে পাকিস্তানী সরকার বরাবরই ভয় পেয়ে এসেছে। আলাদা আলাদা রাজ্যের আলাদা আলাদা ভাষা, আর সরকারের নিজস্ব ভাষার সাথে তার অমিল এই নিয়েই ভয়, বিচ্ছিন্নতার ভয়। আর এই ভয়ের কারণে সবকটা রাজ্যের নিজেদের ভাষার দিক থেকে সরকারের এইযে মুখ ফিরিয়ে থাকা এর ফলে শুধু যে রাজ্যের মানুষদের আশা চোট খাচ্ছে তাইই নয়, সংযুক্ত রাজ্যের দেশ হিসেবে সারা পাকিস্তান দেশটার ঐক্য চোট খাচ্ছে। যেকোন "ফেডারেশন'ই তার মধ্যেকার রাজ্যগুলোর যোগফলের থেকেও বড় সেকথা সত্যি। তবে তার আগে এটা তো মানতেই হবে যে সে দেশটা আসলে এই সমস্ত রাজ্যগুলোরই সমষ্টি। কাজেই সে রাজ্যগুলোর কিছু গুরুত্ব নিশ্চয়ই প্রাপ্য। তার বদলে তাদের কপালে জঘন্য নিন্দাবাদ ছাড়া কি আর জুটছে?

    গত সপ্তাহে পাকিস্তানের সব আঞ্চলিক ভাষাকেই জাতীয় ভাষার স্বীকৃতি দেবার দাবি নিয়ে শ্রীমতি মার্ভী মেমন পার্লামেন্টে সোচ্চার হয়েছিলেন। যথারীতি তাঁকে "পাকিস্তান বিরোধী' তকমা দেওয়া হয়। শ্রীমতি মেমনের দাবিগুলো পাকিস্তানকে একটা উদার সংযুক্ত-রাষ্ট্র করে তুলতে পারে (যা পাকিস্তান আজ অব্দি হয়ে উঠতে পারেনি)। কাজেই ওঁর বক্তব্য সরকারের ধৈর্য্য ধরে শোনা দরকার, ব্যপারটার সম্প্রচার হওয়াও দরকার। সারা দুনিয়া এখন পাকিস্তানের কাছে আশা করে যে দেশটা নিজেদের দুর্দশা কাটিয়ে উঠবে, ঠিক রাস্তায় এগোবে। দুনিয়ার সামনে নিজেদের কথা নিয়ে পৌঁছোবার আগে পাকিস্তানের দরকার নিজের ভেতরের সবকটি কোণের বক্তব্য কান পেতে শোনার।


    ** অনুবাদ: কৃষ্ণকলি রায়
    লেখকের যোগাযোগের ঠিকানা -- wmir.rma@gmail.com

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক।
  • আলোচনা | ১২ জুন ২০১১ | ৯৫৯ বার পঠিত
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ভালবেসে মতামত দিন