এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  স্কুলের খাতা

  • তিন ছোটুর গপ্পো : পর্ব - ২

    Somnath mukhopadhyay লেখকের গ্রাহক হোন
    স্কুলের খাতা | ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ১৭৮ বার পঠিত | রেটিং ৫ (২ জন)
  • পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
    তিন ছোটুর গপ্পো…. পর্ব – ২

    আমার সাথে প্রায় নিয়মিতই ছোটুদের দেখা হয়। প্রথম প্রথম এই ছোটুদের সংখ্যা ছিল নেহাতই হাতেগোনা, কিন্তু যতদিন যাচ্ছে মনেহচ্ছে এই সংখ্যাটা বেড়ে চলেছে। ভাবছেন তো ছোটুরা কারা? একদা শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম বলেই হয়তো পড়াশোনার পাট মাঝপথে চুকিয়ে মুক্ত পুরুষ হয়ে ঘুরে বেড়ানো সকলেই আমার কাছে ছোটু। এইসব ছোটুদের কার‌ও নাম হয়তো রাজেশ, কেউবা আবার মাণিক, আলম কিংবা গোপীনাথ। এদের সকলেই নানান কারণে স্কুল ব্যবস্থার বাইরে ছিটকে বেরিয়ে আসা ছোটু। এদের প্রত্যেকের নিজের নিজের জীবনের গল্প আছে– সুখ দুখ, আনন্দ বিষাদের কথা আছে, স্বপ্ন আছে, লড়াই আছে। আমি পথে নামলেই এদের সঙ্গে কথালাপে মেতে উঠি। আমার সঙ্গী হিসেবে যাঁরা থাকেন তাঁরা অনেকসময় এই বিশেষ কথোপকথনের পর্বটিকে খুব খুশি মনে মেনে নিতে পারেন না জানি, তবে আমি তাতে কান পাতিনা। ওদের কথা মেনে নিয়ে বাতচিত বন্ধ করে দিলে এতো লেখালেখির খোরাক মিলবে কোথায় ? শুরু করি ওদের গল্প। আজ দ্বিতীয় পর্ব।

    আমার দু নম্বর ছোটুর সঙ্গে পরিচয় নিছকই আকস্মিকভাবে। সংসার করার অর্থই বোধহয় হলো নিরন্তর বাতিল জিনিসের বোঝা বাড়িয়ে চলা। কত রকমের জিনিসপত্র যে দু চারদিন ব্যবহার করার পরে অথবা আধা ব্যাবহারের পরেই বাতিলের তালিকায় ঢুকে পরে তার ইয়াত্তা নেই। একালের সব সংসারের‌ই এক‌ই হাল। আঁটি নিংড়ে রস বের করার কথা একালে কেউই হয়তো আর ভাবেনা। এতে অবশ্য খুব একটা সমস্যা নেই কেননা সকাল থেকেই ভাঙাচোরা বাতিল জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য গণ্ডায় গণ্ডায় মানুষ হেঁকে ডেকে পাড়াময় ঘুরে ঘুরে হয়রাণ হচ্ছে।
    এমন‌ই একজন হলো আমার ছোটু নম্বর দুই।
    – দাদু! পুরনো বাতিল ভাঙ্গাচোরা জিনিসপত্র কিছু আছে নাকি ?

    একনজরে পাঁচিলের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা প্রশ্নকর্তার দিকে তাকাই। নেহাতই ছেলে মানুষ। বছর ষোলো সতেরোর এক ঝকঝকে কিশোর। গলায় একটু ওজন খেলিয়ে বলি –
    – কী নাম তোর্? দরদাম ঠিক আছে? বুড়ো মানুষ দেখে ঠকানোর চেষ্টা করবি তো ঠেঙিয়ে সিধে করবো
    আয় ভেতরে আয়।

    সঙ্গের ভ্যান গাড়িটা নিয়ে গেট খুলে সটান ঢুকে পড়ে শ্রীমান।
    – ক‌ই দাদু! মালপত্রগুলো বাইরে বের করে দাও। ঝটপট মেপে দেখে নিই।

    এরপরের কিছু সময় নিতান্তই ব্যবসায়িক কথাবার্তায় কেটে যায়। পুরনো খবরের কাগজ, গুচ্ছের প্লাস্টিকের বোতল কৌটো, ভাঙ্গা কাঁচ ও কাঁচের বোতল,ছাট লোহা লক্কড়, পিস বোর্ডের বাক্স, দুধের খালি প্যাকেট……। এত্তা জঞ্জাল! রীতিমতো হাঁপিয়ে উঠি আমরা দুজন। সেই পালা শেষ হতেই শুরু হয় হিসেব নিকেশের পর্ব। সেও এক লড়াই, খুঁটিনাটির দর কষাকষি। হিসেবের সুবিধা হবে ভেবে আমি খাতা আর পেন খুলে লিখে লিখে রাখছিলাম। তাই দেখে আমার কাছ থেকে তা নিজের হাতে নিয়ে সে বলে –
    – দাও দেখি খাতাটা। আমি হিসেব করে দিচ্ছি।

    বলতে না বলতেই বিড়বিড় করে হিসেব কষে আমায় বলে –
    – দাদু, তোমার হলো ৭৩৭ টাকা। তোমার ইচ্ছে হলে নিজেই আরেক বার হিসাব করে দেখো।

    হিসেবে করবো কি? আমি তো ওর কাণ্ড দেখে অবাক! আমার বিমূঢ় মনের অবস্থা টের পেয়েই সে বলে ওঠে –
    – হিসাব তুমি ধীরেসুস্থে করো । এই আমি তোমায় ৭৫০ টাকা দিলাম। বাকি ১৩ টাকা তোমায় আর ফেরত দিতে হবে না। ওটা তুমি রেখে দাও।

    আমি আর কি বলবো, মন্ত্রমুগ্ধের মতো আমি টাকা হাতে নিই
    – এই তোর্ নামটাই তো জানা হয়নি। কী নাম তোর্?

    জিনিসপত্রগুলো গুছিয়ে নিতে নিতে উত্তর দেয় –

    – ইমরান।
    – সেতো মস্ত বড়ো এক খেলোয়াড়ের নাম! তা তুইও কি খেলাধুলো করতি?
    – ( মাথা নিচু করে উত্তর দেয়) হ্যাঁ, একটু আধটু করতাম। প্রথমে স্কুলের হয়ে, তারপর জেলার হয়ে। রাজ্যের হয়ে আর খেলা হলোনা । ঐটাই বড়ো আক্ষেপ হয়ে র‌ইলো।
    – কোন্ স্কুলে পড়তি? কতদূর পর্যন্ত পড়াশোনা তোর্?
    – আমি মাধ্যমিক পাশ। ২০২৩ সালে….. হাইস্কুল থেকে পাঁচটা বিষয়ে লেটার নিয়ে পাশ করেছিলাম। তার সঙ্গে চলতো খেলাধূলা। সেখানেও বেশ চলছিল। কিন্তু হঠাৎ করে আব্বু একটা বড়ো দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে জখম হয়। বাঁচার কোনো আশাই ছিলোনা। আব্বুর চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমাদের সংসারটাই নড়বড়ে হয়ে গেল। কোনো উপায় না পেয়ে নেমে পড়লাম এই ভাঙ্গাচোরা কেনাবেচার কারবারে। আমাদের ভাঙ্গা সংসারটাকেতো আবার চাঙ্গা করতে হবে। কি বলেন দাদু? নিজেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল। সেসব আপাতত শিকেয় তুলে রেখেছি। সন্ধ্যায় পাড়ার ছোটো ছোটো কয়েকটা বাচ্চাকে পড়াই। ওদের চোখ দিয়ে নিজের হারানো স্বপ্নগুলোকে খুঁড়ে দেখার চেষ্টা করি। আসলে স্বপ্ন তো মরেনা, বুকের মধ্যে জড়িয়ে থাকে। তাইনা দাদু …… ?

    আমি বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ি। জীবনের এমন ওঠা পড়া সামলে ওই সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণ এক নতুন স্বপ্ন পথের ফেরিওয়ালা হয়ে পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে। ওর এই সফর সফল হোক।
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    পর্ব ১ | পর্ব ২ | পর্ব ৩
  • স্কুলের খাতা | ২৯ নভেম্বর ২০২৫ | ১৭৮ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Somnath mukhopadhyay | ০৪ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৭:০০736403
  • শ্রীমল্লার বলছি কে ধন্যবাদ জানাই সাদা পাতায় আঁচড় কাটার জন্য।
  • বিপ্লব রহমান | ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ০৮:০৭736599
  • "আসলে স্বপ্ন তো মরেনা, বুকের মধ্যে জড়িয়ে থাকে।'' 
     
    অসাধারণ! আরও লিখুন 
  • Somnath mukhopadhyay | ১২ ডিসেম্বর ২০২৫ ১৭:২৩736610
  • @ বিপ্লব রহমান 
    এই চরিত্রগুলো আমার খুব কাছ থেকে দেখা । নিজের নিজের লড়াইতেই তারা অনন্য। ভালো লাগাটার ১০০% কৃতিত্ব তাই ওদের। আমি কেবল একটু সাজিয়ে গুছিয়ে ওদের হাজির করেছি বৃহত্তর পাঠক সমাজের কাছে।
     
    পড়ুন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। ভালো থাকবেন।
     
     
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঝপাঝপ মতামত দিন