এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • খেরোর খাতা

  • ডাউন মেমোরি লেন - নৃপতি চ্যাটার্জি

    Rajat Das লেখকের গ্রাহক হোন
    ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ | ১৪ বার পঠিত
  • অন্ধকার মঞ্চ। একপাশে একটি খাট। তার ওপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছেন ছবি বিশ্বাস। সেটা উপস্থিত দর্শক জানে। তাঁকে খুঁজে বের করবেন নৃপতি চ্যাটার্জি। এই ছিল নাটকের দৃশ্য। নৃপতিবাবু মঞ্চে এলেন। খোঁজাখুঁজি শুরু হল। মঞ্চের ওপর শুরু হল ধুন্ধুমার খোঁজাখুঁজির পালা। নৃপতিবাবু সর্বত্র খুঁজছেন শুধু খাটের ওপর কম্বলটি ছাড়া। নৃপতিবাবুর খোঁজার ধরনে দর্শক হেসে কুটিপাটি। আর ওদিকে গরমকাল, তায় মঞ্চের আলো... কম্বলের নিচে ছবি বিশ্বাস দরদর করে ঘামছেন। দৃশ্যটি তিন মিনিটে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নৃপতিবাবুর দৌলতে সেই দৃশ্য দশ মিনিট কেটে গেলেও ছবি বিশ্বাসকে কিছুতেই কম্বল থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে না। 

    গরমের জ্বালায় ছবি বিশ্বাসের প্রাণ ওষ্ঠাগত প্রায়। কিন্তু কে কার কথা ভাবে!
    এই ছিলেন নৃপতি চ্যাটার্জি... বাংলা সিনেমায় সবচেয়ে ছোট ছোট চরিত্রে অভিনয় করা কৌতুক শিল্পী। সেদিন কেন ওরকম করেছিলেন? উত্তরটা খুব সহজ। উক্ত দৃশ্যের আগে গ্রীনরুমে নৃপতিবাবু, ছবি বিশ্বাসের থেকে মদ্যপানের উদ্দেশ্যে দশটি টাকা চেয়েছিলেন। ছবিবাবু তা দেননি। সেই না পাওয়া থেকেই নৃপতিবাবুর রাগের জন্ম। আর ছবি বিশ্বাসকে মঞ্চের ওপর শাস্তি দান। তারপর থেকে ছবি বিশ্বাস আজীবন নৃপতি চ্যাটার্জিকে সমঝে চলতেন। কারণ অভিনয়ের ময়দানে নৃপতি চ্যাটার্জি কখন কি করে দেবেন, কেউ জানত না।

    বাংলা সিনেমার কৌতুক কারিগর
    বাংলা সিনেমার দীর্ঘ পথচলায় কিছু নাম উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা থাকে, আবার কিছু নাম থেকে যায় নীরবতার আড়ালে—কিন্তু তাঁদের অনুপস্থিতিতে ছবির গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যেত। নৃপতি চ্যাটার্জি সেই শ্রেণির অভিনেতা, যাঁরা আলোয় দাঁড়াননি, অথচ আলো তৈরি করে দিয়েছেন। স্মরণিকার পাতায় তাঁকে ফিরে দেখা মানে বাংলা চলচ্চিত্রের এক অবহেলিত অধ্যায়কে নতুন করে উন্মোচন করা।

    নৃপতি চ্যাটার্জির শিল্পীসত্তার জন্ম রঙ্গমঞ্চে। থিয়েটার ও যাত্রার কঠোর অনুশীলন তাঁর অভিনয়কে দিয়েছিল দৃঢ় ভিত্তি। সংলাপ বলার ভঙ্গি, শরীরী ভাষার কারিকুরি, চরিত্রের ভেতরে ঢুকে পড়ার ক্ষমতা—সবকিছুতেই ছিল মঞ্চের শৃঙ্খলা। সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই তিনি প্রবেশ করেন বাংলা সিনেমার জগতে, এমন এক সময়ে, যখন চলচ্চিত্র ভাষা নিজেই গড়ে উঠছে।
    ১৯৪০ থেকে ১৯৬০-এর দশকে নৃপতি চ্যাটার্জি ছিলেন নিয়মিত কর্মরত অভিনেতা। তিনি কখনও মুখ্য চরিত্রে সুযোগ পাননি। কিন্তু অসংখ্য ছবিতে ছিলেন অপরিহার্য। ভাবুন, লুকোচুরি ছবিতে সেই মিউজিক ডিরেক্টরের কথা—ছোট্ট রোল, কিন্তু কি দাপটের সঙ্গে তিনি দৃশ্যটি নিজের দিকে টেনে নিয়েছিলেন। ওইরকম সব চরিত্রে তিনি যে বিশ্বাসযোগ্যতা এনেছেন, তা আজও বিস্ময় জাগায়। তাঁর অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল এই যে, চরিত্রটি কখনও অভিনেতাকে ছাপিয়ে যায়নি; বরং চরিত্রই হয়ে উঠেছে আসল মুখ।

    বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগের বহু দিকপাল অভিনেতার সঙ্গে নৃপতি চ্যাটার্জি একই পর্দা ভাগ করে নিয়েছেন। ছবি বিশ্বাসের দৃঢ় উপস্থিতি, উত্তম কুমারের আভিজাত্য বা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বুদ্ধিদীপ্ত অভিনয়ের পাশে দাঁড়িয়েও তিনি কখনও নিষ্প্রভ হননি। বরং পার্শ্বচরিত্রে থেকেও দৃশ্যের ভার বহন করেছেন নিঃশব্দে। কখনও একটি সংলাপ, কখনও শুধু একটি দৃষ্টি—এই সামান্য উপকরণেই তিনি দৃশ্যের আবহ নির্মাণ করতেন।

    নৃপতি চ্যাটার্জির অভিনয়ে ছিল এক ধরনের সংযত বাস্তবতার সাথে মজার মিশেল। অতিনাটকীয়তা বা বাহুল্য ছিল না তাঁর স্বভাবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, অভিনয় মানে নিজের উপস্থিতি জাহির করা নয়, বরং গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গিই তাঁকে আলাদা করেছে। বাংলা সিনেমার যে মানবিক, মাটির কাছাকাছি ধারা—তার সত্যিকারের বাহক ছিলেন তিনি।

    ব্যক্তি জীবনে নৃপতি চ্যাটার্জি ছিলেন প্রচারবিমুখ। খ্যাতির আলো, সাক্ষাৎকার, চটকদার উপস্থিতি—এসব তাঁর স্বভাবের সঙ্গে মানানসই ছিল না। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি জনপ্রিয়তার কেন্দ্র থেকে সরে যান। কিন্তু তাঁর কাজ থেকে যায়—ফিল্মের রিলে, সেলুলয়েডের ফ্রেমে, দর্শকের স্মৃতির অলিন্দে। 

    আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন বাংলা সিনেমার ইতিহাস পুনর্মূল্যায়ন করা হয়, তখন নৃপতি চ্যাটার্জির মতো শিল্পীদের গুরুত্ব নতুন করে বোঝা যায়। কারণ সিনেমা শুধু নায়ক-নায়িকার গল্প নয়; সিনেমা তৈরি হয় অসংখ্য চরিত্রের সম্মিলনে। সেই চরিত্রগুলোর প্রাণপ্রতিষ্ঠা যাঁরা করেছেন, তাঁদের স্মরণ না করলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

    ______________
    ©রজত দাস 

     

    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। যা মনে চায় মতামত দিন