
অতঃপর কালোজিরে, কাঁচালঙ্কা, থেঁতো রসুনপোড়ার মধ্যে নুন, মিষ্টি, হলুদের সুঘ্রাণে সবাই একজোট হয়। মুখরোচক সবার ভালো লাগে, ফিরে আনোয়ারা আজকেই বানাবে তমরেজের মেজাজ ঠান্ডা করতে, সীমী বানাবে মায়ের জন্য, কল্পনা ভাবলো নিজের জন্যই বানাবে। যারা আজ বানাবে না, তারা কাল বা পরশু বানাবে আলু, কুমড়ো, পেঁপে সহযোগে। ... ...

ফিরতে হবে, প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া দিনে, পুজোতে, পয়লা বৈশাখে, পৌষালী সন্ধ্যেয়, ফাগুন ভোরে, ফিরতে হবে শৈশবের খেলার মাঠে, যৌবনের দীঘল দীঘির সূর্যাস্তে। বেলায় ঘুম থেকে উঠে, আটপৌরে সে, চায়ের কাপ হাতে ঘাটের ধারে বসে গল্প করবে, বৌদির সাথে, মালার সাথে। সন্ধ্যের মুখে চুল বেঁধে, খোঁপায় গন্ধরাজ ফুল গুঁজে মন্দিরতলার দিকে হাঁটতে যাবে। বর্ষায় যাবে, মাঠের সবুজে চোখ ডুবিয়ে, ভরা পুকুরে ডুব সাঁতার কাটতে। শীতের সকালে ঘাসের শিশিরে পা মাড়িয়ে, দুরে কুয়াশা জড়ানো দিগন্ত পেরিয়ে, ধানের সোনালী ছুঁয়ে আসবে। ... ...

মহামন্ত্রী শাহুজি পড়েছেন গভীর ভাবনায়। চিন্তার চোটে তাঁর নাওয়া খাওয়া সব শিকেয় উঠেছে। মেজাজ তিরিক্ষে হয়ে রয়েছে, এই একটু আগে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র জয়দ্রথ দণ্ডগেন্ডুক খেলার কী একটা দুর্ঘটনা নিয়ে বলতে এসেছিল, তিনি চেঁচিয়ে উঠে বলেছেন, এই সব ছোটখাট বিষয়ে যেন সে কোনো নালিশ জানাতে না আসে ভবিষ্যতে। ভাগ্যিস মহামন্ত্রীপত্নী সেসময় সখীদের সাথে কোনো এক উদ্যান পরিদর্শনে গিয়েছিলেন, তাই সেকথা সাথে সাথে জয়দ্রথ, মাকে নালিশ করতে পারেনি। ... ...

ছোটবেলায় মৌরি ভালই ছবি আঁকত, পরে কেন যেন কিছুতেই আর আঁকতে চাইত না। অনিতা যা যা নিয়ে প্রশংসা করেছে, গর্ব করেছে প্রতিটা জিনিষ মৌরি ছেড়ে দিয়েছে, দক্ষতা, ক্ষমতা আঙুলের ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে গেছে অবহেলায়। অথচ মেয়ে এমনিতে খুব বাধ্য ছিল, কোনোদিন কোন কথা অমান্য করে নি, কোনো অনুরোধ ফেলে নি শুধু অনিতার পছন্দের কাজগুলো জিনিষগুলো নষ্ট করেছে চুপচাপ। সুখের সংসারই তো ছিল ওদের, মৌরির এই অদ্ভুত আচরণের কোন ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না অনিতা। ... ...

নতুন ওষুধটা আশ্চর্য ভাবে কারুকে মেরে তো ফেললই না, বরঙ অনেক অসুস্থ লোকের ভেতরে একটা পরিবর্তন দেখা যেতে লাগল। প্রাথমিকভাবে তাদের যার যা সমস্যা ছিল সেগুলো কেমন যেন কমে যেতে লাগল। যে চোখ পিটপিট করত তার পিটপিটানি কমল। যার মুখ ফ্যাকাশে ছিল তার ঠোঁটে সামান্য রং দেখা দিল। যে সবকিছু হারিয়ে ফেলত সে সবকিছু খুঁজে পেতে শুরু করল। ... ...

আসলে কমলা পবনের বাপের চোখে সেই বেড়ালটাকে দেখতে পেয়ে গেছিল। যে বেড়ালটা এখন নাতির সঙ্গে টিভিতে দেখে। একটা বেড়াল আর একটা একটা ইঁদুর। একে অপরকে জব্দ করতে দৌড়ে বেড়াচ্ছে। একবার বিল্লি মাত দিচ্ছে, পরক্ষণেই ইঁদুর তাকে হারিয়ে দিচ্ছে। নাতি বলেছিল, “দেখো দাদি, বিল্লিটা কেমন চুহাকে মারবে বলে দৌড় করাচ্ছে।” ... ...

এমনকি তাদের স্কুলেও নাকি অলৌকিক পুরুষের বইয়ের প্রতিটি খণ্ড লাইব্রেরিরুমে রাখা হয়েছে এবং কম্পিউটারেও আপলোডেড। নাম দিয়ে সার্চ করলে সবকিছু স্পষ্ট জানা যায়। মহান পুরুষের কাছে ভিড় ঠেকাতে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে ইদানিং। ইয়ান এবং তার বন্ধুরা সবাই সবার মৃত্যুর তারিখ জানে। বৈশালী জানে। এবং আমিও। জোহরা জানে, তাকে একটা দীর্ঘ সময় এই দুনিয়ায় কাটাতে হবে আমাদের তিনজনকে ছেড়ে। ... ...

আমার গল্পের পৃথিবীতে এক জঙ্গলের মধ্যে এক হ্রদ ছিল। সেখানে বাঘে গরুতে একসঙ্গে জল খেতে আসত। জঙ্গল থেকে বহুদূরে শহরে এক ছেলে আর এক মেয়েও থাকত। মেয়েটি বাড়ি বানায়। মরুভূমিতে বা খাঁ খাঁ মাঠের মাঝখানে। মাটির ওপরে নয়, মাটির নীচে। বেসমেন্টে। মাটির ওপর জেগে থাকে শুধু হালকা কাঁচের জানলা। সেখান দিয়ে যাবতীয় সূর্যালোক আসে। মেয়েটি সঙ্গে ট্যাব নিয়ে ঘোরে বড় বড় ধনকুবেরদের কাছে। ট্যাব সরিয়ে সরিয়ে সেসব নির্জন বাড়ির ছবি দেখায়। আসলে এগুলো বাঙ্কার। বাকি পৃথিবীতে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও ওখানে বেঁচে থাকা যাবে। ... ...

ইন্দিরাজী এমার্জেন্সি ঘোষণা করলেন। ব্যাপক ধরপাকড়। সাধারণ উর্দি পরা সেপাই পর্যন্ত কালেক্টরের রোব দেখিয়ে কথা বলত। এদের মধ্যে আমাদের দু’জন জয়প্রকাশ নারায়ণের নাম নিয়ে স্থানীয় স্কুল ও কলেজে মিছিল বের করায় গ্রেফতার হল। ব্যস্ এদের পুরো গ্রুপটাই ইন্দিরা ও এমার্জেন্সি তথা নসবন্দী বিরোধী হয়ে গেল। নানান গোপন কাজকর্ম, যেমন ইস্তেহার ছড়িয়ে দেয়া, গোপন শেল্টারের বন্দোবস্ত, --এসবে ভিড়ে গেল। তারপর একদিন পুলিসের হুড়ো খেয়ে বিলাসপুর ছেড়ে দূরে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিল। একজন তো একটি সরকারি হেলথ সেন্টারে দূরসম্পর্কের ডাক্তার দাদার কম্পাউন্ডার সেজে ছিল। ... ...

রবিন তথা প্রোডাক্টিভ সিটিজেন, বাস্তবে যে এই গল্পটির ভিন্নধর্মী চরিত্রগুলির মধ্যে সংযোগ রক্ষাকারী সেতু মাত্র, খুব সতর্ক ভঙ্গিতে উত্তর দেয়, “আমি কিছু বলবো না। আমার কাজ ছিল যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া, দিয়েছি। পরে আপনার কাছ থেকে কি মাসিমার কাছ থেকে কোন কথা শুনতে আমি রাজি নই! আপনার মেয়েকেও আমি বিউটি পার্লারে ঢুকিয়ে দেবো, সেখানেও ওই একই কথা, বুঝে নাও করবে কিনা! মন্দ ভালো কোন কিছুরই দায়িত্ব আমি নেব না!” ... ...

চাঁদিতে ঝুঁটি বাঁধা প্রীতি নামের বালিকাটি যার সামনের দুখানা দাঁতের বাঁদিকেরটি পড়ে গেছে - সন্ধ্যে নামলে দোকান দুটির পসরাতে ধূপ ঘুরিয়ে যায়। কান আর চোখ তার সবে গজাতে শুরু করেছে - দাঁত পড়ে যাওয়া সামাল দিতেই বোধহয়। অবাক মুখে, বড় বড় চোখ করে রাস্তার বামদিকের শুন্ডি আর ডানদিকের হাল্লাকে রোজ দেখে ও শোনে সে; দুই দোকানীর কাছেই মানুষের চাহিদা হুবহু এক। ... ...

সে রাতে ঘুমের মধ্যে স্ক্রল করতে করতে আমি শুনতে পেলাম, - স্ক্রীনের ওপারে ভুষুন্ডি মেঘেদের দল বৃষ্টি ঢেলেই চলেছে। নিজেকে দেখবার ইচ্ছে, সময় বা চোখ কোনোটাই নেই ওদের। তাই নাকি ঘ কে জুটিয়েছে। ঘ দেখছে ওসব। জল থেকে মেঘ, মেঘ থেকে জল। শ্যাওলার ভেলভেট প্রতি বর্ষায় নতুন করে জমছে পাথরে। আশ্চর্য সব ধীরস্বভাব রিল। ইলেকট্রিক ছাড়াই নিজে-নিজে তৈরী হচ্ছে। একের পর এক, লাইভ। ... ...

লোকটা বলেই চলেছে, ‘তখন আমি রঙের কাজ করি। এই যে গ্রীলে, দেয়ালে, চারদিকে সবুজের পোঁচ দেখছেন, এর অনেকগুলো খাঁচা আমি আর বিকাশ একসাথে করেছি। বিকাশ আর কী করবে? রোশনি, আমার বৌ, বুঝলেন? কমলা রং খুব পছন্দ। তা কমলাটা আমি আবার ঠিক - মানে পছন্দ টছন্দের ব্যপার না! নানী মরবার দিন রাতে কমলা খেতে চেয়েছিল। দিতে পারিনি। সেই থেকে আর খাইও না, পরিও না। তারপর দেখুন 'ঈঈ' - এই কুমিরের মতো দাঁত! আমার সাথে কী ওর থাকা মানায়?' ... ...

বাবা, আমার তিরিশ বছরের জীবনে এই প্রথম তোমাকে মেল করছি, বা বলা ভাল, তোমাকে, শুধু তোমাকেই উদ্দেশ্য করে কিছু লিখছি। তোমার ব্যক্তিগত ইমেল ঠিকানায় লিখছি,অফিসের ঠিকানায় নয়। আমি জানি, এই মেল তুমি কালেভদ্রে একবার খোলো, ব্যক্তিগত খাতা খুলে দেখাতে চিরকালই গভীর অনীহা তোমার। দিনে প্রায় বারো ঘন্টা অফিস, মাসে মাসে ফরেন ট্যুর,সেমিনার, আরও অজস্র পেশাগত কর্মকান্ড-এই তো তোমার কাছে জীবনের মানে। A workaholic is a person who works a lot of the time and finds it difficult not to work - এই সংজ্ঞাটা মনে হয় তোমাকে দেখেই কেউ লিখেছিল। তাই ভাবছিলাম, কবে তুমি অতিব্যস্ত জীবনের ফাঁকে আমার এই লেখা খুলে পড়বে, কে জানে! ... ...

এখন তার স্টুডিওয় আলমারিতে সারি সারি ক্যানভাস। সিরিজ ভিত্তিক কাজ। “মাটির সোঁদা জ্যামিতি”, “রাতের মহুয়া দেহ”, “মেঠো রাস্তার চিলেকোঠা।” সে প্রতিদিন একটি করে ক্যানভাস তৈরি করে, রুটিনে বাঁধা। সকাল আটটা, জলখাবার, স্টুডিও, দুপুরে ডাল-ভাত-মাছ, আবার স্টুডিও। রাত্রে সাদা মদের সঙ্গে সামান্য বাদাম। কোনো শব্দ নেই, তাড়াহুড়ো নেই কেবল ক্যানভাসে রঙের শব্দ। আঁকতে আঁকতে তার হাত কাঁপে না, চোখও না। শুধু মাঝে মাঝে থেমে যায়। ব্রাশ থেমে যায় মাঝ-আঁকায়। টানা তিন মিনিট সে বসে থাকে একরঙা মেঝের দিকে তাকিয়ে। কি যেন মনে করার চেষ্টা করে। ঘাড়ের কাছে হাত বোলায়। মনে করতে পারে না। তারপর আবার। ... ...

বিরজু এখন আর তর্ক করে না। তর্ক করে লাভ নেই। সিদ্ধান্ত মানেই সিদ্ধান্ত। পাগলটাকে মারতেই হবে। তবুও তো তার ভাগ্য ভালো একটা পাগলকে মারবে সে। চাঁদুর ভাগ্য তার চাইতেও খারাপ ছিল। তাকে মারতে হয়েছিল ক্লাস টেনে পড়া ফুলকুমার মান্ডিকে। যখন মাওবাদীদের ভয়ে গ্রামের পর গ্রাম ভয়ে সিঁটিয়ে থাকত তখন সে ব্যাটা সাইকেল চালিয়ে একা একা জঙ্গল পথে স্কুলে আসত। কমান্ডার বলেছিল। ও ব্যাটা নির্ঘাৎ পুলিশের চর। স্কুলে আসার নাম করে বেলপাহাড়ী আসে আমাদের গতিবিধির খবর দিতে। শালার কী ভয় ডর নাই? একজন সাহস দেখালেই অন্যরা সাহস পাবে। মাধ্যমিক সামনেই ছিল কিন্তু তার আগেই চাঁদু তাকে শুইয়ে দিল জঙ্গল ঘেরা পিচ ঢালা রাস্তায়। তারপর চাঁদু তিনদিন ঘুমায়নি। এক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে বিরজু দেখল, চাঁদু চাটাইয়ে উঠে বসে রয়েছে। সে ফিসফিস করে বলেছিল, কী হয়েছে চাঁদু? চাঁদু উদভ্রান্তের মত তার দিকে তাকিয়ে বলেছিল, আমি রাস্তার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে ছিলাম। ছেলেটা আমাকে দেখে সাইকেল থামিয়ে নামল। তারপর জিজ্ঞেস করল, বাবা! চাঁদু কাকা কত্তদিন পরে দেখলাম গো। গাঁয়ে যাবে বুঝি। লও লও সাইকেলটো তুমহি চালাও। আমি তুমাকে বইতে পারব লাই। ... ...

চা নিয়ে প্রথমটা আমরা বসতাম রান্নাঘরের সামনের চাতালটিতে। পরে সেখানটা ঘিরে একটা স্টোর রুম বানানো হল। তখন আমরা বসতাম মায়ের ঘরে। পরে মা অসুস্থ হতে তিনি সারাদিন ঘরেই থাকতেন। তাই সন্ধ্যেবেলায় চা খেতে তাঁকে একটু জোর করেই নিয়ে আসতাম বাড়ির পিছনের দিকের সিঁড়ির চাতালে। শেষ বিকেলের মিঠে রোদ, পেয়ারা গাছের সবজে হলুদ রঙের মাঝে লঙ্কা ঠোঁটের টিয়াপাখির খেলা দেখে যদি এই মরজগতের আঁকিবুকিতে মা’র মন ফেরে। কিন্তু মা’র চোখে হয়তো এসব পড়লনা। মা ইহজগতের মায়া ভুলেছেন। ... ...

"ফিরলেন? উইক এন্ডে কী করছেন?" এই অনিবার্য প্রশ্ন আসতেই আমি মনে মনে হেসে ফেলি। এক গতে বাঁধা সবকিছু। এতটুকু বৈপরীত্য নেই একটা দৃশ্যের সাথে আরেকটা দৃশ্যের। এই নিপুন অভিনয়ের পুনরাবৃত্তি আমাকে কম বয়েসের একটা পাগলামির কথা মনে করিয়ে দেয়। বক্সঅফিস-হিট হিন্দি সিনেমা দেখতে যাচ্ছি মফঃস্বলী সিনেমা হলে। পরপর তিনবার। তিনবারই আলাদা করে রিকোয়েস্ট এসেছে শুধু আমার জন্য। কারণ, আমি স্মার্ট, আমি কথা বলতে জানি। ওদের ভাষায় বললে, আমি 'অ্যাকটিং ভালোই জানি।' এসব ক্ষেত্রে কী করে অজুহাতকে প্রায়োরিটি হিসাবে সেট করতে হবে তা আমার জানা। কোন গলি দিয়ে অভিসারিকাকে নিয়ে গেলে সবচেয়ে কম লোক দেখবে, কোন চায়ের দোকানের পিছনে নিভৃত গুমটি আছে, মেলার মাঠের কোন দিকটার লাইটপোস্টের আলোটা জনস্বার্থে ভাঙা থাকে এসব নিগূঢ় তথ্য সাপ্লাই করে মফঃস্বলের প্রধান দূতী হয়ে উঠেছি তাই, এইসব গোপন অভিসারে আমি ফার্স্ট চয়েস। এ বিষয়ে অন্য ছেলেপিলেরা চেষ্টা করেও বিশেষ সুবিধা করতে পারত না। ... ...

হ্যাঁ, নটরাজনকে মাত্র ৩ টাকা ওভারড্রাফটের চার্জ লাগিয়ে সাস্পেন্ড করা হয়, যদিও সেটা ওর ক্যাশিয়ার মহিলার ভুলের ফসল। কিন্তু ম্যানেজমেন্ট জানত যে নটরাজন বিধবা বাঙালি সহকর্মীটির প্রেমে পড়েছে। সে মেয়েটিকে ফাঁসাবে না। তাই হল, নটরাজন সব দোষ নিজের ঘাড়ে নিল এবং দশমাস সাস্পেন্ড হল। এক ইনক্রিমেন্ট স্টপের শাস্তি পেল। শেষে বোর্ডে আপিল করে রেহাই পায়। তো সচ্চিদানন্দ একেবারে কড়া। কমিশন দূর কী বাত, কোন বিজনেসম্যানের থেকে দীপাবলীর মিঠাইয়ের বাক্সও নেয় না। স্টাফদের বিলিয়ে দেয়। ওর দোষ বড্ড মুহফট। যা ভাবে তাই বলে ফেলে। বর্তমান জিএম ওকে চেনেননি। বারবার দূত পাঠাচ্ছেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এবং ইশারায় একটাই বার্তা। ... ...

অনেক মানুষের ভিড়। ওলাই চণ্ডী বস্তির মানুষেরা এসেছে, এসেছে নতুন পাড়ার নেপালিরা, বেলগাছিয়া ট্রামলাইনের ওপারে মুসলমানপাড়ার লোকেরা, রাজা মণীন্দ্র রোডের ২১নং বস্তি, শহীদ কলোনি, সরকার বাগান, প্রচুর বিহারী মানুষজন, রানী রোড, খিলাৎবাবু লেন, বেশির ভাগ মহিলা। ভিড় সামলাতে মাকে ঘরের বাইরে উঠোনে বার করা হল, মায়ের গায়ে যাতে রোদ না লাগে, সেইজন্য মাথার উপরে শাড়ি দিয়ে সামিয়ানার মত করে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হল। তৃণমূল কংগ্রেস, সি পি এম ও কংগ্রেসের নেতারা মালা দিয়ে মাকে সম্মান জানিয়ে গেছে। চিৎপুর থানার বড়বাবু মাথার টুপি খুলে স্যালুট দিয়ে, একটা বড় মালা দিয়ে সম্মান জানিয়ে গেছে। কয়েকটি ক্লাবের ছেলেরা এসে মালা দিয়ে গেছে। শুধু ফুল আর ফুল। ফুলের মধ্যে মা যেন ঘুমিয়ে আছে। অনিমেষ ভাবছিল, এত মানুষকে খবর কে দিল। খবরটা বাতাসের মতো, ঝড়ের মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। ও অনুভব করল, বেঁচে থাকা, জীবন যেন শান্ত, ছন্দ সুর তাল লয় নিয়ে সংগীতের মত। আর বেদনা ভয়ঙ্কর। অশান্ত সমুদ্রে ভয়ঙ্কর ঢেউয়ের মত। অনিমেষ পুনরায় মায়ের পায়ে হাত রেখে ভাবতে থাকে, মাকে এত কাছে পেয়ে মায়ের কাজকর্ম, মায়ের চিন্তাভাবনা, আমি যে অন্তরঙ্গ লাভ করেছি, মায়ের জীবন দর্শনের অনুভূতি সম্প্রসারণে আমি ঋদ্ধ হয়েছি, অভিজ্ঞতালব্ধ সম্পদ, সংগ্রাম, আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। মায়ের জীবন দর্শনকেই আমার দর্শন করে আমি এগিয়ে চলেছি। ... ...