এই সাইটটি 37,637,092 বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  বিবিধ

  • মহাভারতের অশুদ্ধি 

    Kishore Ghosal লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | বিবিধ | ০৩ এপ্রিল ২০২৫ | ২০৭ বার পঠিত | রেটিং ৫ (১ জন)
  • ১ম পর্ব | ২য় পর্ব
    প্রাত্যহিক বাক্যালাপে, ধরা পড়ে যাওয়া ছোটখাটো ভুলত্রুটি ঢাকতে আমরা প্রায়ই বলে থাকি “একটু আধটু ভুলভ্রান্তি করে ফেলেছি তো কী হয়েছে, তাতে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে নাকি?”। বঙ্গের ভক্তপ্রাণ সরল কবি শ্রী কাশীরাম দাস একথা শুনলে নির্ঘাৎ দুঃখ পেতেন। তিনি মহাভারতের বঙ্গ সংস্করণ লিখতে গিয়ে বারবারই আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, “মহাভারতের কথা অমৃত সমান, কাশীরাম দাস কহে শুনে পুণ্যবান”। অমৃত কখনো অশুদ্ধ হয় নাকি? নাকি তাকে উচ্ছিষ্ট করা যায়? অমৃত সর্বদাই পবিত্র।
    কিন্তু মহাভারত সত্যিই অমৃত কী না, সে ব্যাপারে ঘোরতর সংশয়ের উদ্রেক করেছিলেন স্বয়ং দেবর্ষি নারদ। আজ্ঞে হ্যাঁ, টিভির মহাভারত সিরিয়ালে, হাতে বীণা আর কপালে তিলক আঁকা যে নারদকে দেখেছিলেন, ইনিই সেই নারদ। যাঁর মুখে সদা সর্বদা “নারায়ণ, নারায়ণ” শুনে তাঁর ভক্তিরসে আমরাও আপ্লুত হতাম। আবার সামনে বিবদমান দুই বন্ধুজনের ঝগড়া উস্কে দিতে, নখে নখ ঘষে আমরা ছোটবেলায় যে “নারদ, নারদ” জপ করতাম, ইনিও সেই একই নারদ। এ হেন নারদই মহাভারতকে যাচ্ছেতাই রকম হ্যাটা করেছিলেন। তাও আড়ালে আবডালে নয়! মহাভারত রচয়িতা স্বয়ং কৃষ্ণ দ্বৈপায়নের মুখের ওপরেই ছ্যা ছ্যা করে উস্তুম-ফুস্তুম ধমক দিতে কার্পণ্য করেননি। সেই ঘটনার কথা আবার নিজেই গুছিয়ে লিখে গিয়েছেন কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, শ্রীমদ্ভাগবত পুরাণের প্রথম স্কন্ধের চতুর্থ এবং পঞ্চম অধ্যায়ে! ঘটনাটা কেমন ঘটেছিল, সংক্ষেপে আগে বলে নিই।


    “শুক, শুক, অ্যাই শুক, কোথায় চললি? ধেড়ে ছেলে, এই অবস্থায় কেউ বাইরে বের হয়? কোমরে একটা কাপড় জড়িয়ে নে হতভাগা! তোর না হয় লাজ-লজ্জার বালাই নেই, কিন্তু আমার ব্যাপারটা বোঝ, সমাজে আমি মুখ দেখাব কী করে?”
    এই এক ছেলে শুকের জন্যে দ্বৈপায়নের দুশ্চিন্তার অবধি নেই। তাঁরই পুত্র, অথচ তিনি তাঁকে ঠিক বুঝতে পারেন না। সবাই বলে, তিনি মহাযোগী, পরম ব্রহ্মে একনিষ্ঠ, তিনি ব্রহ্মজ্ঞ। তিনি সমদর্শী এবং ভেদজ্ঞানরহিত, অর্থাৎ বসন ও দিগ্বসনে অথবা খাদ্য এবং বিষ্ঠার মধ্যে তিনি কোন প্রভেদ দেখতে পান না। যদিও তিনি এখন যুবক, কিন্তু তাঁর আচার আচরণ দেখলে মনে হয়, অপরিণত বুদ্ধি শিশু। এই নিয়েই দ্বৈপায়নের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। তিনি তো এমন পুত্র চাননি। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর নিজের মতো পুত্র শুকও বেদজ্ঞ হয়ে উঠবে, তাঁর দেহরক্ষার পর পুত্র শুক পিতার নাম আরও উজ্জ্বল করবে। কিন্তু যতদিন যাচ্ছে তিনি বেজায় হতাশ হয়ে পড়ছেন, তাঁর মনে হচ্ছে এ পুত্র উল্টে তাঁর নাম ডোবাবে।
    শুক ছাড়াও দ্বৈপায়নের আরও তিন পুত্র ছিল, তারা সকলেই তখন গতায়ু। তাছাড়া সেই পুত্রদের ওপর তাঁর পিতৃত্বের তেমন কোন অধিকার ছিল না। আত্মজকে কোলে পিঠে করে, লালন করার যে আনন্দ, ওই তিন পুত্রের ক্ষেত্রে সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। কারণ ওই তিন পুত্রের মধ্যে দুজন ছিল হস্তিনাপুরের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী, ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডু। আর অন্যজন বিদুর, প্রাসাদের অন্তঃপুরিকা এক দাসীর গর্ভজাত। যাকে ভাইপো দুর্যোধন উঠতে বসতে কটুকাটব্য করতেন, ক্ষত্তা, দাসীপুত্র আরও অশ্রাব্য কত কি!
    অতএব পিতৃস্নেহের সবটাই তিনি শুকদেবকে উজাড় করে দিয়েছেন। কিন্তু পুত্রের নির্বিকার ব্যবহারে তিনি বিড়ম্বিত বলেই সর্বদা উৎকণ্ঠায় থাকেন। আজও পুত্র শুককে নগ্ন অবস্থায় আশ্রমের বাইরে বেরোতো দেখে, ব্যাকুল হয়ে ডাকতে ডাকতে দ্বৈপায়ন পুত্রের পিছু নিলেন, “দাঁড়া, শুক দাঁড়া, আমার কথাটা শুনে যা”। শুকদেব সম্পূর্ণ নির্বিকার, কোন দিকেই দৃকপাত নেই, পিতার ডাক যেন শুনতেই পেলেন না। একই গতিতে তিনি পিতার বদরিকাশ্রম ছেড়ে হেঁটে চললেন সরোবরের পাশ দিয়ে, কাননে ঘেরা গ্রামের পথ দিয়ে। দ্বৈপায়নের বয়েস হয়েছে তিনি এখন বার্ধক্যের সীমায় পৌঁছেছেন, যুবক পুত্রের হাঁটার সঙ্গে তাল রাখতে না পেরে তিনি অনেকটাই পিছিয়ে পড়লেন।
    যথা সম্ভব দ্রুত এসে যখন তিনি সরোবরের কাছে পৌঁছলেন, সরোবরের জলে যেন হুলস্থূল পড়ে গেল। তিনি চমকে তাকিয়ে দেখলেন, বেশ কয়েকজন অপ্সরাতুল্য খোলামেলা যুবতী সরোবরের জলে স্নান করছে। তাঁকে দেখতে পেয়ে তাদের মধ্যে কেউ জলের মধ্যে গলা অব্দি ডুবে রইল, কেউ ভেজা কাপড়ে শরীর ঢাকতে ব্যস্ত হয়ে উঠল, কেউ বা লজ্জায় স্তম্ভিত হয়ে মুখ ঢাকল তাদের করকমলে। পুত্রের জন্যে উদ্বেগের মধ্যেও নারীদের আচরণে দ্বৈপায়ন বিস্মিত হলেন, তিনি ওই রমণীদের জিজ্ঞাসা করলেন, “একটু আগেই আমার যুবক পুত্র তোমাদের সামনে দিয়েই নগ্ন অবস্থায় হেঁটে গেল, তখন তো তোমরা লজ্জা নিবারণের কোন চেষ্টা করনি! তাহলে আমার মতো বৃদ্ধকে দেখে তোমরা এত উতলা হলে কেন বলো তো, বাছা? তোমরা কী জানো না, আমি কে?”
    লজ্জানত মুখে এক যুবতী উত্তর দিল, “আপনাকে কে না চেনে মহর্ষি, আপনি আমাদের গৌরব। আর আপনার যুবক পুত্র শুকদেব যোগীশ্রেষ্ঠ – নিষ্পাপ শিশুতুল্য, তাঁর দৃষ্টিতে নারীপুরুষে কোন প্রভেদ নেই। তাঁর দৃষ্টিতে আমাদের সংকোচ আসে না, কিন্তু আপনার...”। যুবতী কথা সম্পূর্ণ করল না, লজ্জায় মুখ নীচু করে আকণ্ঠ ডুব দিল সরোবরের জলে। স্তম্ভিত দ্বৈপায়ন পুত্র শুকদেবের পিছনে আর দৌড়লেন না, তিনি মাথা নীচু করে ধীর পায়ে চিন্তিত মুখে ফিরে চললেন তাঁর আশ্রমের দিকে। সরোবরে স্নানরতা প্রগলভা রমণীরা আজ তাঁর ও তাঁর পুত্রের আচরণের প্রভেদটুকু তাঁর চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দিল।
    অথচ সারাজীবনে তিনি তো ধর্মাচরণ ও ধর্মপথ থেকে কখনও বিচ্যুত হননি। তাঁর প্রগাঢ় জ্ঞান ও গভীর বোধের প্রয়োগে বলা যায় তিনি অসাধ্য সাধন করেছেন। বেদের বিক্ষিপ্ত মন্ত্র সমূহ তিনি একত্র করে চারটি বেদগ্রন্থে সংহত করেছেন। এর জন্যে দেশের পণ্ডিত মহল তাঁকে “বেদব্যাস” উপাধিতে সম্মান করেছেন। শূদ্র আর স্ত্রীলোকের বেদপাঠ নিষিদ্ধ। কিন্তু তাঁর মনে হয়েছিল, কেনই বা তারা ধর্ম আচরণ এবং ধর্মতত্ত্ব থেকে বঞ্চিত হবে? বিশেষতঃ তাদের এবং সর্বসাধারণকে সকল ধর্মতত্ত্ব জানানোর জন্যেই তিনি মহাভারত রচনা করেছেন। সে গ্রন্থকে বিদ্বানসমাজ পঞ্চমবেদ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর অসাধারণ এই দুই কীর্তিই ভারতের ধর্ম চেতনাকে এক উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠা করেছে। কিন্তু তাও লঘুমতি ওই চপলা তরুণীরা তাঁর দৃষ্টিতে সমদর্শন খুঁজে পায় না!



    আপাত তুচ্ছ এই ঘটনাটাই নড়িয়ে দিল তাঁর আত্মবিশ্বাসের ভিত। গভীর চিন্তায় তিনি এখন সর্বদাই নিমগ্ন থাকেন, প্রাত্যহিক নিত্যকর্ম ছাড়া অন্য কোন কাজেই তিনি আর নিবিষ্ট হতে পারেন না। সর্বদাই তাঁর মনে হয়, তাঁর এই অগাধ পাণ্ডিত্য, তাঁর ওই অসামান্য কীর্তিসমূহ সবই অসার, ব্যর্থ। তাঁর এতদিনের জীবন ও জীবনচর্যা যেন এক ঊষর ক্ষেত্র, যেখানে তাঁর জ্ঞান ও বোধের বীজ তিনি উপ্ত করার চেষ্টা করেছেন ঠিকই, কিন্তু মনে হচ্ছে সে সবই সম্পূর্ণ ব্যর্থ এবং নিষ্ফল হয়েছে।
    সারাটাদিন প্রাত্যহিক নিয়মানুবর্তী কর্ম ব্যস্ততার মধ্যে কোনভাবে কালাতিপাত করার পর, সায়াহ্নে তিনি নিজেকে সব কিছু থেকে মুক্ত করে নেন। এই সময়ে তিনি চলে আসেন আশ্রমের অদূরে বহমানা সরস্বতী নদীর নির্জন তীরে। একটি পাথরের উপরে বসে তিনি তাকিয়ে থাকেন বহতা নদীর দিকে, নদীর ওপারে এবং এপারেও। সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে ধীরে। সারাদিনের কর্মব্যস্ত মানুষজন এবং গৃহপালিত পশুরদল এসময়ে যে যার ঘরে ফেরে। তাদের পায়ে-চলা পথে, ক্ষুরের আঘাতে ধুলো উড়তে থাকে। সে ধুলোয় আবছা হয়ে আসে তাঁর পশ্চাৎপট, ঝাপসা হয়ে যায় পিছনে ফেলে আসা তাঁর আশ্রম। সব কিছুই মনে হয় অলীক, মায়া। তাঁর এতদিনের বিপুল কর্মকাণ্ডকেও যেমন আজকাল অনর্থক পণ্ডশ্রম মনে হচ্ছে। তিনি বিষণ্ণ মনে গভীর চিন্তায় ডুবে যান, তিনি নিজের প্রতিই অসন্তোষে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন বারবার, মাথা নাড়েন নিজের অসাফল্যে!
    এমনই একদিন, সরস্বতীর তীরে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। রাত্রির আকাশে জেগে উঠছে একটি-দুটি তারা। কে যেন পিছন থেকে তাঁকে ডাক দিলেন, “এই অন্ধকারে একলা বসে, কী চিন্তা করছ, দ্বৈপায়ন? অগাধ পাণ্ডিত্য সত্ত্বেও তোমার এত চিন্তা কিসের বলো তো?” দ্বৈপায়ন আশ্চর্য হলেন, আশ্রমে সকল শিষ্যদের তিনি কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন, এই সময় কেউ যেন তাঁকে বিরক্ত না করে। তা সত্ত্বেও কে এখানে এল তাঁর সঙ্গে আলাপ করতে?
    দ্বৈপায়ন উঠে দাঁড়িয়ে পিছনে তাকালেন, এবং অস্পষ্ট তারার আলোতেও তাঁর দেবর্ষি নারদকে চিনতে অসুবিধে হল না। দ্বৈপায়ন নত হয়ে করজোড়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে বিস্মিত বিনীত কণ্ঠে বললেন, “দেবর্ষি, আপনি অসময়ে এখানে?”
    দেবর্ষি নারদ মৃদু হাস্য করে বললেন, “বসো হে, বসো। তোমার সঙ্গে দুটো মনের কথা কইব বলেই আসা। তোমার আশ্রমে গিয়েছিলাম, সেখানে শুনলাম, তুমি এখানে, আর তুমি শিষ্যদের বলে এসেছ, কোনভাবেই কেউ যেন তোমাকে বিরক্ত না করে। তা গায়ে পড়ে বিরক্ত করার ব্যাপারে নারদের মতো সুনাম ভূভারতে আর কারও নেই, কী বলো?” এই কথা বলে দেবর্ষি হা হা করে হাসলেন, এবং পিড়িং পিড়িং শব্দ তুললেন তাঁর বীণায়। তারপর হাসি থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, “কিছুদিন ধরেই তোমাকে বিষণ্ণ, অবসন্ন দেখছি, দ্বৈপায়ন। সেই উদ্বেগেই আমার এখানে আসা। তোমার শারীরিক কুশল তো?”
    দেবর্ষির প্রশ্নে খুশিই হলেন দ্বৈপায়ন, দেবর্ষি বহুদর্শী সর্বতত্ত্বজ্ঞানী, তাঁর কাছে ত্রিভুবনে অজানা কোন বিষয়ই নেই। তাঁর মনের সংশয় দূর করা একমাত্র এই দেবর্ষির পক্ষেই সম্ভব। দ্বৈপায়ন বিনীত কণ্ঠে নিজের মনের সকল কথা মেলে ধরলেন দেবর্ষিকে। সব কথা শুনে দেবর্ষি কিছুটা বিদ্রূপের স্বরে বললেন, “বলো কী হে? তুমি সর্ব ধর্মতত্ত্বে পূর্ণ মহাভারতের মতো গ্রন্থ রচনা করেছ, আসমুদ্রহিমাচলের মানুষ তোমার কীর্তিতে ধন্য ধন্য করছে। আর তুমি কি না মনের অশান্তিতে একলা বসে আছে, নির্জন তমসাচ্ছন্ন এই সরস্বতী তীরে?”
    “সবই সত্য, দেবর্ষি, কিন্তু শুকের ওই ঘটনার পর থেকেই আমার মনে হচ্ছে, আমি সম্পূর্ণ হতে পারিনি, আমার জ্ঞানে কী একটা যেন অধরা থেকে গিয়েছে। বহু চিন্তা করেও, সেটা যে কী কিছুতেই ধরতে পারছি না। আপনি কি আমাকে সাহায্য করতে পারেন, দেবর্ষি? আপনার তুল্য জ্ঞান এই জগতে আর কার আছে? আমার মনের এই সংশয় দূর করতে পারবেন একমাত্র আপনিই”।
    দেবর্ষি নারদ গম্ভীর স্বরে বললেন, “দ্বৈপায়ন, তোমার মহৎ রচনায় তুমি ভগবানের নির্মল যশের কথা প্রায় উল্লেখই করনি। তুমি কী বুঝতে পারছ না, ভগবান বাসুদেবের মহিমা বর্ণনা ছাড়া যে কোন সৃষ্টিই অসার এবং নিষ্ফল? তোমার মতো সর্ববেদজ্ঞ কীভাবে এমন ভুল করলে, দ্বৈপায়ন? মহাভারতের অপরূপ কাহিনী, রমণীয় উপমা, বিচিত্র অলঙ্কারের পদবিন্যাস সব কিছুই জলাঞ্জলি হয়েছে, কারণ ওই গ্রন্থে শ্রীহরির জগৎপবিত্র যশোগাথা তুমি বর্ণনা করনি। দ্বৈপায়ন, তুমি কি জানো না, বাসুদেবের অপার মহিমার বর্ণনাহীন যে কোন গ্রন্থই, শুধুমাত্র কাকের মতো ব্যক্তিরাই উপভোগ করে। তারা কিছুক্ষণের জন্য তোমার বিশাল গ্রন্থের বিচিত্র কাহিনী, অলঙ্কার ঠুকরে ঠুকরে উপভোগ করবে, তারপর অন্যত্র উড়ে যাবে। কিন্তু ব্রহ্মনিষ্ঠ সত্ত্বপ্রধান ভক্ত হংসরা তোমার এই গ্রন্থে কখনোই তৃপ্তি লাভ করতে পারবেন না। দ্বৈপায়ন, তুমি কি জানো না, যে গ্রন্থ ভগবানের যশোগাথা বিবৃত করে, সেই গ্রন্থই সম্পূর্ণ। সেই গ্রন্থ যদি অশুদ্ধপদ, ভ্রষ্ট উপমা ও ভ্রান্ত অলঙ্কারে রচিত হয়, তবুও সেই গ্রন্থই হয়ে ওঠে সারগ্রন্থ, সেই গ্রন্থই হংসসম ভক্তজনের লীলাক্ষেত্র হয়ে ওঠে”।
    দ্বৈপায়ন নত মস্তকে দেবর্ষির কথাগুলি চিন্তা করতে লাগলেন। অন্ধকারে নীরব দ্বৈপায়নকে কিছুক্ষণ চিন্তা করার সময় দিয়ে দেবর্ষি নারদ আবার বললেন, “দ্বৈপায়ন, তুমি ভগবানের অপার লীলা সমস্তই অবগত আছো। তুমি নিজেকে পরমপুরুষ পরমাত্মার অংশ বলেই জেনে রাখো। তোমার জ্ঞান নিশ্ছিদ্র, তোমার দৃষ্টি অব্যর্থ, তোমার জন্য কোন আচার্যের উপদেশের প্রয়োজন নেই। এখন থেকে তুমি মহানুভব শ্রীহরির গুণাবলী বর্ণনা করো। প্রজ্ঞাবান লোকেরা বলেন, উত্তমশ্লোক ভগবানের গুণবর্ণনাই সৎপুরুষের তপস্যা। ভগবান বাসুদেবের যশোগাথাই বেদজ্ঞান; সকল যজ্ঞের অনুষ্ঠান, স্তবপাঠ, জ্ঞান ও দানের অক্ষয় ফল স্বরূপ। অতএব বিলম্ব না করে, আগামী কাল থেকে তুমি সেই কর্মেই নিরত হও”।
    মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস তাই শুরু করলেন। হরিবংশ, শ্রীমদ্ভাগবতের মতো মহাপুরাণ সহ অন্ততঃ আঠারোটি পুরাণ তিনি রচনা করে ফেললেন!



    এ সবই ভক্তি এবং বিশ্বাসের কথা। ভাবনা-চিন্তা, বিদ্যা-বুদ্ধি বন্ধ করে বিশ্বাস করতে পারলে মহর্ষি দ্বৈপায়নের এই কীর্তিতে এতটুকুও সংশয় জাগে না।
    কিন্তু বিশেষজ্ঞরা অতটা বিশ্বাসী হতে পারেন না। তাঁরা বলেন, মহাভারতের কেন্দ্রীয় ঘটনা “কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ”-র সময় কাল মোটামুটি ৯০০ বি.সি.ই। আমরা জানি এই যুদ্ধের প্রধান প্রতিপক্ষ একই কৌরব গোষ্ঠীর দুই জ্ঞাতি শাখা, কুরু এবং পাণ্ডব। মহাভারতের রচয়িতা নিজেই লিখেছেন, তিনি নিজেই এই দুই শাখা গোষ্ঠীর পিতা, অর্থাৎ তাঁর নিয়োগেই শান্তনুর দুই পত্নীর ক্ষেত্রে ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুর জন্ম। তখনকার রাজবংশের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্রই রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারী হতেন। কিন্তু শান্তনুর দুই পুত্রের মধ্যে ধৃতরাষ্ট্র অগ্রজ হওয়া সত্ত্বেও জন্মান্ধ ছিলেন বলে রাজা হতে পারেননি। রাজা হয়েছিলেন অনুজ পাণ্ডু। বেশ কয়েক বছর রাজত্ব করার পর রাজা পাণ্ডু রাজ্যের শাসন ভার দাদা ধৃতরাষ্ট্রের হাতে সমর্পণ করে, বনবাসী হয়েছিলেন।
    পাণ্ডু যতদিন রাজা হয়ে হস্তিনাপুরে উপস্থিত ছিলেন, ততদিন অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী গান্ধারীর সঙ্গে পাণ্ডুপত্নী রাণি কুন্তীর আদৌ সুসম্পর্ক ছিল না। জন্মান্ধ পতির কারণে তিনি রাণি হতে পারেননি। অতএব কুন্তী যখন রাণি হলেন, অত্যন্ত ধর্মনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও এই সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিতা হওয়ার জ্বালা তাঁর অন্তরে তীব্র ঈর্ষার সঞ্চার করেছিল। সেই ঈর্ষা আরও প্রবল হয়ে উঠল, যখন দুই নারী প্রায় একই সময়ে গর্ভধারণ করলেও, কুন্তীপুত্র যুধিষ্ঠিরে জন্ম হল গান্ধারী পুত্র দুর্যোধন ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই। অর্থাৎ কুরু রাজবংশের পরবর্তী প্রজন্মের জ্যেষ্ঠ পুত্র হলেন যুধিষ্ঠির, ফলতঃ তিনিই হলেন হস্তিনাপুর রাজসিংহাসনের ন্যায্য উত্তরাধিকারী। তীব্র এই ঈর্ষার বাতাবরণ থেকেই কুরুক্ষেত্রে যুদ্ধের সূচনা হল।
    কুটিল রাজনৈতিক আবর্তের নানান উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে ঘটনা পরম্পরা যখন অনিবার্য কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছিল, সেই সময়ে পাণ্ডুপুত্রদের পক্ষে সর্বদাই সহায় ছিলেন মহর্ষি দ্বৈপায়ন। সত্যি বলতে, পাণ্ডবদের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয়ের পিছনে ভগবান কৃষ্ণের ভূমিকা যতখানি গুরুত্বপূর্ণ, মহর্ষি দ্বৈপায়নের ভূমিকাও প্রায় তার সমান বললেও হয়তো অত্যুক্তি হয় না।
    অতএব, নিঃসন্তান শান্তনুর ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার বপন থেকে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ পর্যন্ত দ্বৈপায়নের ওতপ্রোত উপস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্ট। সেক্ষেত্রে, বিশেষজ্ঞজনের মতানু্যায়ী নশো খ্রীস্টপূর্বাব্দকেই যদি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের নির্দিষ্ট কাল বলে ধরে নিই, তাহলে, তাঁর জীবনকাল ৯৭০ থেকে ৮৯০-৮৮৫ খ্রীস্টপূর্বাব্দের মধ্যে অনুমান করাই যায়। অথচ পণ্ডিতেরা পুরাণ রচনার প্রারম্ভিক কাল অনুমান করেছেন, খ্রীস্টপূর্বাব্দের শেষ পর্যায়ে অথবা খ্রীস্টাব্দের প্রাথমিক পর্যায়ে। এর অর্থ দেবর্ষি নারদের পরামর্শে তিনি যখন পুরাণ রচনায় হাত দিলেন তখন তাঁর বয়েস প্রায় হাজার বছরের কাছাকাছি!
    ঠিক এইখান থেকেই শুরু হল প্রকৃত ঘটনার সাজানো ইতিহাস রচনা। যার ফলে কোন ঘটনার নির্দিষ্ট কাল নির্ণয়ে আমাদের অনুমান ছাড়া অন্য কোন পন্থা অবশিষ্ট রইল না। মহাভারত রচনার প্রায় আটশ-নশ বছর পরে, সরাসরি অভিযোগ তোলা হল মহাভারত আদতে একটি অসার গল্পকথা। বলা হল বেদব্যাস বিরচিত এই বহুল জনপ্রিয় উপাখ্যান “কাক”-এর মতো অধার্মিক মানুষদের কাছেই রুচিকর, ভক্ত ও ধার্মিক “হংস”-তুল্য মানুষরা, কখনোই এই উপাখ্যান শ্রবণে তৃপ্তি পেতে পারেন না।
    শুরু হল, মেদবর্জিত নিরাভরণ মহাভারতে বিক্ষিপ্ত অপ্রাসঙ্গিক ঘটনার অনুপ্রবেশ। তার সঙ্গে নিত্য নতুন পুরাণ রচনারও হিড়িক পড়ে গেল। কিন্তু সাধারণ মানুষ আচমকা উৎপন্ন এই সব পুরাণের গল্প বিশ্বাস করবে কিসের ভরসায়? অতএব পুরাণকার পণ্ডিতেরা ব্যবহার করলেন বেদব্যাসের নাম, খ্যাতি এবং প্রায় হাজার বছর ধরে প্রচলিত তাঁর জনপ্রিয় বিশ্বাসযোগ্যতা। তাই পুরাণ রচনার সূচনায় পুরাণকারেরা গড়ে তুললেন, অদ্ভূত ওই কাহিনী, যেখানে অবিসংবাদিত পণ্ডিত ও বেদজ্ঞ দ্বৈপায়ন নত মস্তকে মেনে নিলেন তাঁর ভ্রান্তি। এরপরেও মাত্র একখানি পুরাণ রচনা করেই তিনি ক্ষান্ত হলেন না, পরবর্তী চারশ-পাঁচশ বছরে তিনি কত যে পুরাণ রচনা করেছেন, তা নিয়ে আজও বিতর্কের শেষ নেই। আর এই সময় কালেই তাঁর রচিত “অশুদ্ধ” মহাভারত কালে কালে কলেবর বৃদ্ধি করে হয়ে উঠল শুদ্ধ হংস-বিহারযোগ্য ধর্মগ্রন্থ।
    অতএব ক্ষমতালিপ্সু তথাকথিত সমাজসংস্কারকরা ইতিহাসের বিকৃতি ঘটিয়ে সেই ধুরন্ধর পুরাণকারদের ট্র্যাডিশানেই আজও যে ইতিহাসের অশুদ্ধি ঘটাবেন, তাতে আর আশ্চর্য কী? কিন্তু তাতেও কী আর অমৃতসমান মহাভারতের অশুদ্ধি ঘটতে পারে?

    ..০০..
    ("ধর্মাধর্ম" গ্রন্থের একটি অধ্যায় থেকে সংগৃহীত)   
               
     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
    ১ম পর্ব | ২য় পর্ব
  • ধারাবাহিক | ০৩ এপ্রিল ২০২৫ | ২০৭ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    কবিতা - Suvankar Gain
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • Guruchandali | ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৯:০৬542078
  • বইটি পাওয়া যাচ্ছে কলেজ স্কোয়ার বইমেলায় গুরুচণ্ডা৯-র স্টলে। মেলা চলবে ১ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল, ২০২৫, বেলা ৩টে থেকে রাত ৮টা।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি 37,637,095 বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। বুদ্ধি করে প্রতিক্রিয়া দিন