
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছে একটি বৃহৎ উপাসনালয়, পাপ মোচন জেলখানায় নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার; কারণ পাপ মোচন না হলে পরবর্তী পাপের প্রেরণা কোথা থেকে আসবে? ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারটির উপাসনালয়ে যাওয়ার জন্য কারা কর্তৃপক্ষ নিদেনপক্ষে একজন সাধারণ কারা প্রহরীর অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হয়না। অথচ কারাগারের লাইব্রেরীতে প্রবেশের জন্য জেল সুপারসহ তিন স্তরের কারা প্রহরীর অনুমতি গ্রহণের প্রয়োজন হয়। তবে বেশিরভাগ সময়ই কেউ এত ঝামেলা পোহাতে চায় না, বা এই অনুমতিই মেলে না।
উপাসনালয়ে কেউ গেলে তাতে আমার বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই, যার খুশি যাক উপাসনালয়ে যার খুশি যাবে নাপিতালয়ে। কিন্তু লাইব্রেরীতে যাবার ব্যাপারে পরোক্ষ নিষেধাজ্ঞা, বাধা সৃষ্টি করা কয়েদীদের অপরাধ প্রবণতা কতটা কমাবে নাকি বাড়াবে, সেই সম্পর্কে চিন্তার অবকাশ রয়েছে। কারাগারের নিয়ন্ত্রণ আরোপ এবং কঠোর শৃঙ্খলা মানুষের মনকে কতটা মুক্ত করে, স্বাধীন করে আর কতটা পরাধীন করে তাকে অপরাধ চক্রের মধ্যে আবদ্ধ করে, তার পরিসংখ্যান খুব সহজেই মেলে। মিশেল ফুকো এনলাইটমেন্টের মানবতাবাদী শাস্তি প্রয়োগের তত্বকে ফালাফালা করে দেখিয়ে দিয়েছেন, ওগুলো সবই আরো শক্তিশালী ও সূক্ষ্ণভাবে মানুষকে শৃঙ্খলিত করে। উল্লেখ্য, আমাদের কারাগারে ছোট অপরাধী প্রবেশ করে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত অপরাধী হয়েই বের হয়, আর পাপ মোচনের সুব্যবস্থা থাকলে তো কথাই নেই।
কারাগারের লাইব্রেরীটি মধ্যযুগীয় গালগল্পমূলক বইপত্রে পরিপূর্ণ স্বাভাবিকভাবেই। জেলখানায় গিয়ে লাইব্রেরীর খবর নেয়ার চেষ্টা করা হলে খুব সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকানো হয়। কারা প্রহরীদের দৃষ্টি দেখে নিজেকে একজন ভিনগ্রহের প্রাণী বলেও মনে হতে পারে। শুধু তাই নয় কারাগারে কোন বিদ্যালয়ও নেই, অশিক্ষিত নিরক্ষর মানুষগুলোকে অক্ষরজ্ঞানটুকু পর্যন্ত দেয়ার কোন ব্যবস্থা নেই। সাধারণত ধারণা করা হয় কারাগার ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর সব অপরাধীতে পরিপূর্ণ। তবে সত্য হচ্ছে, কারাগারের অধিকাংশ মানুষ অত্যন্ত নিম্নবিত্ত পরিবারের, যারা আইনের মারপ্যাঁচ বোঝে না বা ভাল উকিল ধরতে পারেনি, বা তাদের কোন উকিলই নেই। যাদের টাকা আছে তারা আইনের ফাঁক ফোকর গলে ঠিকই বের হয়ে গেছে, আর যারা বের হতে পারে নি তারাই হতভাগার মত পরে আছে। প্রচুর সংখ্যক মানুষকে ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করা হয়েছে, একজন ২ বছর তিন মাস ধরে জেলে বসে আছে, তার কোন শাস্তিও হয় নি! এমনকি সে এই বিষয় নিয়ে প্রতিবাদীও না, এটাকে নিজের নিয়তি মনে করে জেলে বসে আছে। আল্লাহ যেদিন চাইবে সেদিন তার জামিন হবে, এমনটা ভেবে আশায় দিন গুনছে শিক্ষা-বঞ্চিত এই হতভাগা মানুষটি।
কারাগারের কয়েদীদের সাথে কথা বলে জানা গেল, কারা হাসপাতালের ঔষধ খেয়ে কোন কাজ হয়না, বরঞ্চ পেট খারাপ বা বুকে ধড়ফড় জাতীয় সমস্যা হয়। কথাগুলো শুনে ব্যাপারটা আমার তদন্ত করতে ইচ্ছা হলো, কিন্তু সুযোগ ছিল না। তাদের এই কথাগুলো পরবর্তীতে পরিষ্কার হল।
পৃথিবীর প্রতিটি দেশে জীবনরক্ষাকারী ঔষধের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার তারিখ কঠোরভাবে মনিটর করা হয়। জীবনরক্ষাকারী ঔষধের মেয়াদ চলে গেলে তা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায় এমনকি তা বিষ বলেও গণ্য হতে পারে। মেয়াদ-উত্তীর্ণ ঔষধের জন্য অনেক বড় বড় কেলেঙ্কারি ঘটে গেছে পুরো পৃথিবীতে। বেশ কিছুদিন কারা হাসপাতালের ঔষধ খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ার পরে খেয়াল করে দেখলাম, মেয়াদ লেখা অংশটি তারা ঔষধের পাতা থেকে কেটে ফেলে তারপরে দেয়। এভাবে বেশ কিছুদিন যাবার পরে একপাতা ঔষধ পেলাম যেখানে মেয়াদ অংশটি ছিল। দেখলাম ঐ ঔষধটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাই তারা ঐ অংশটি কেটে কয়েদীদের দিচ্ছে। এই পাতাটির মেয়াদ অংশটুকু কোনভাবে তারা কাটতে ভুলে গেছে।
প্রিজন সেল, পিজি হাসপাতালের ডিরেক্টর বরাবর এই বিষয়ে জানানোর পরে পিজির ডিরেক্টর থেকে একটা চিঠি যায় জেল কর্তৃপক্ষের কাছে, এবং জেলের ফার্মাসিস্ট আস্বাদ এসে দেখা করে। সে এসে এমন একটা ভাব করে যে, এত সামান্য বিষয় আমি কেন পিজির ডিরেক্টরকে জানালাম! এই ঔষধ খেয়ে তো আর আমি মারা যাই নি! মারা গেলে তারপর একটা কথা ছিল! অর্থাৎ মারা যাবার পরে কেন আমি অভিযোগ করলাম না, সেটা একটা মস্তবড় অপরাধ হয়ে গেছে! যদিও আমি বুঝতে পারলাম না যে, মারা যাবার পরে আমি কীভাবে অভিযোগ দায়ের করতাম, আর সেই অভিযোগ দায়ের করে ফায়দাটাই বা কী হতো!
সে আরো জানালো, এরকম তো হতেই পারে। এই নিয়ে এত বাড়াবাড়ির কি আছে! আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি ফার্মাসিস্ট হয়েছেন কি যোগ্যতায়? আপনি জানেন, এটা একটা মস্তবড় অপরাধ? এই অভিযোগে আপনার জেল হতে পারে?
সে আমাকে জানালো এইসব কথাকে সে পাত্তা দেয় না একটুও। সে পয়সা পাতি খরচ করেই এই পজিশনে এসেছে, একটু পয়সা না কামালে চলবে কীভাবে?
আমি জানতে চাইলাম, পয়সা কামাবার ধান্ধায় হাজার হাজার মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছেন, আবার বড় গলায় কথা বলছেন? এরপর আমি ব্যাপারটা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ অথবা পত্রিকাতে ছাপাবার কথাও বললাম। সে অবলীলায় জানালো, পত্রিকার সাংবাদিকরাও জেলের নানা দুর্নীতির ভাগ প্রতিমাসেই পেয়ে যান, তাই এই বিষয়ে প্রথম সাড়ির কোন দৈনিক পত্রিকা কোনদিন উচ্চবাচ্য করবে না। সে আমাকে রীতিমত হুমকি দিল যে, এই নিয়ে আমি যেন আর উচ্চবাচ্য না করি। উচ্চবাচ্য করলে আমার সমস্যা হবে।
একই সাথে, সে আমাকে জানালো আপনি তো একজন নাস্তিক। রোগ শোক এগুলা সৃষ্টিকর্তা দেয়, এবং তিনিই তা সারিয়ে তোলেন। ঔষধ তো অছিলা মাত্র। স্রষ্টা চাইলে এই ঔষধেই কাজ হবে, আর স্রষ্টা না চাইলে ভাল ঔষধেও কিছু হবে না! তার কথা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম!
কোন সাংবাদিকের যদি আমার এই লেখাটি নজরে আসে, তার কাছে অনুরোধ জানাবো, ব্যাপারটি নিয়ে পত্রিকাতে লিখুন, প্রয়োজনে তদন্ত করে দেখুন। প্রচুর কয়েদী, কারা প্রহরী ও তাদের পরিবারের জীবন এই সব লোকদের হাতে জিম্মি হয়ে আছে। আমরা ভেজাল খেয়ে খেয়ে এখন মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধও হজম করে ফেলি, কিন্তু সবাই তা পারে না। যারা পারে না, তাদের মৃত্যুকে হত্যা হিসেবেই গণ্য করতে হবে, এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
কারাগারের নিরক্ষর মানুষগুলো, এমনকি অনেক পড়ালেখা করা মানুষও ঔষধের মেয়াদ খেয়াল করেন না। কারাগারে নিয়তির উপরে নির্ভর করানোর শিক্ষা দেয়া হয়, কোন বিদ্যালয় বা পাঠাগার বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষের কোন চিন্তা নেই। কোন কারা কর্তৃপক্ষের যদি এই স্ট্যাটাসটি নজরে আসে, অনুগ্রহ করে কারাগারে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করুন, এবং কয়েদীদের লাইব্রেরীতে প্রবেশের অধিকার দিন। তারা যেন একটি করে বই রাতের বেলা তাদের সেলে নিয়ে আসতে পারে, পড়তে পারে। প্রয়োজনে আমি সেই বিদ্যালয়ে বিনামূল্যে শিক্ষকতা করতেও রাজি আছি।
কারাগারের মানুষগুলো বিজ্ঞান শিখুক, যুক্তিবাদ পড়ুক, মহাবিশ্ব এবং পৃথিবী সম্পর্কে জানুক-বুঝুক। যারা বইয়ের খোঁজ পায়, মহাবিশ্বের বিশালতা যাদের কাছে ধরা দেয়, জানার আগ্রহ যাদের তাড়িত করে, তারা তুচ্ছ ইয়াবার ব্যবসার জন্য অন্যের পেটে ছুরি চালাতে পারে, এমনটা আমি বিশ্বাস করি না।
বিপ্লব রহমান | unkwn.***.*** | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০২:০৯75208
সে | unkwn.***.*** | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০৯:৩০75204
aranya | unkwn.***.*** | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১০:০২75209
de | unkwn.***.*** | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:৩২75205
san | unkwn.***.*** | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:৩৫75206
she jai hok | unkwn.***.*** | ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:৪২75207
debu | unkwn.***.*** | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০২:০১75211
বিপ্লব রহমান | unkwn.***.*** | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:৩২75210
Asif Iqbal | unkwn.***.*** | ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০৫:৩০75212
debu | unkwn.***.*** | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০২:৩২75213
siki | unkwn.***.*** | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০৭:২২75214
debu | unkwn.***.*** | ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০৭:৩৫75215
siki | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০১:০৬75220
4z | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০১:১৫75221
pi | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০১:১৬75222
Blank | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ০১:৩৭75223
asif iqbal | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:১২75216
siki | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:১৫75217
siki | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:১৯75218
4z | unkwn.***.*** | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৩ ১২:৪৬75219
সিকি | unkwn.***.*** | ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ০১:৫৭75224
su | unkwn.***.*** | ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ ০১:০৫75225