এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ব্লগ

  • ব্যক্তিগত গদ্য

    Bimochan Bhattacharya লেখকের গ্রাহক হোন
    ব্লগ | ২৭ এপ্রিল ২০১৯ | ২৩৮১ বার পঠিত
  • আমাদের বাড়ির লাগোয়া একটা জারুল গাছ আছে। এই কিছুদিন আগে গাছটি একেবারে ন্যাড়া হয়ে গিয়েছিল। একটাও পাতা ছিল না। আজ সকালে বারান্দায় গিয়ে দেখি পুরো গাছটা সবুজ। কালকের বৃষ্টিতে ভিজে এমন চেহারা দেখে মনে হচ্ছে প্রকৃতির পার্লার থেকে কেউ এসে সাজিয়ে দিয়ে গেছে ওকে। কেমন লজ্জা লজ্জা মুখ করে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এই সময় নীল নীল ফুল হয় জারুল গাছে। আজ দেখলাম বেশ কিছু নীল ফুল অঙ্গে নিয়ে দেখাচ্ছে আমায়। অদ্ভুত জায়গা আমাদের পাড়াটা। জারুল গাছ ছাড়িয়েই বড় রাস্তার ওপর একটা বিশাল কৃষ্ণচুড়া আছে জারুলের জন্মের অনেক অনেক আগে থেকে। সেই গাছের নীচেই নিজের হাতে গড়া জীর্ণ ঘরে থাকে পাড়ার মুচীদাদা। আমাদের ফুলেশ্বর।আমাদের আর সামনের ব্লকের মধ্যে রাস্তার ওপর জারুল আর কৃষ্ণচুড়া হাত ধরাধরি করে থাকে এই সময়। লাল আর নীল তখন এক হয়ে যায় প্রকৃতির নিজের খেয়ালে।

    তখন ফুলেশ্বর আমাদের ফ্লাটের সামনে বসতো। ওই কৃষ্ণচুড়া গাছে হেলান দিয়ে বসে থাকতো বুগানি বছরের এই সময় । আমাদের পেছনের পাড়ায় থাকতো ও। নাম ছিল বুলগানিন সেটা হয়ে যায় বুগানি। প্রচুর নেশা করতো সেই ছেলে। রোজ রাত্রে নেশা করে এসে ওই গাছে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়তো। বেশ রাত্রে বাড়ি ফিরে যেত।
    একদিন সকালে, তখন পাঁচিল ছিল না আমাদের আবাসনে, দেখি বুগানী হেলান দিয়ে বসে বসেই মরে গেছে। চোখ বন্ধ। জারুল গাছের নীল ফুল,পাতা উড়ে এসেছে ওর কাছে আর কৃষ্ণচুড়া লাল ফুল ফেলেছে ওর গায়ে। প্রকৃতি নিজেই সাজিয়ে দিয়েছে তার এক "অপদার"্থ সন্তানকে। পুলিশ এসে নিয়ে গেল বুগানির লাশ। জারুল আর কৃষ্ণচুড়া কি বিষন্ন হয়েছিল সেদিন!!

    আজ সকালে পেছনের ব্লক থেকে কাউকে নিয়ে গেল অ্যাম্বুলেন্সে করে। তখনও বিছানা ছাড়ি নি আমি। জানলা দিয়ে দেখেও বুঝি নি কে? আমাদের আবাসন এখন বৃদ্ধাশ্রম। প্রতি মাসেই প্রায় চলে যান কেউ। কেউ ছেলেমেয়েদের কাছে বিদেশে।কেউ ব্যাঙ্গালোর, হায়দ্রাবাদ আবার কেউ মহাপ্রস্থানে।আমিও বৃদ্ধ। আজকাল ভয় করে খুব। দুই দাদা, দিদি অসুস্থ আমাদের পরিবারেও।

    আমি যে খুব প্রকৃতি প্রেমিক তা নয় কিন্তু যদি কোনদিন ছাদে উঠি দেখি আমার পাড়ায় সবুজের সমারোহ। কত, কত গাছ লাগিয়েছিলেন আমাদের বাবা কাকারা এই পাড়ায়।

    সেই সত্তর সালে, তখন আমরা উল্টোদিকের পাড়ায় ভাড়া থাকি। কলকাতা কর্পোরেশনের আধিকারিক ছিলেন এস পি সমাদ্দার। তিনি এসে কয়েকটি গাছ পুঁতেছিলেন। আমার বাবা পুঁতেছিলেন দুটি গাছ। সেগুলি সবই এখন মহীরুহ। কোনটায় লাল, কোনটায় নীল, কোনটায় হলুদ আবার কোনটায় সাদা ফুল হয় বছরের নির্দিষ্ট সময়ে।
    কাল শুনলাম তেমনই একটা গাছ পড়ে গেছে সেদিনের ঝড়ে! কাল ঝড়বৃষ্টির মধ্যেই শিবু-বুড়িকে তুলে দিতে গিয়েছিলাম দত্তবাগান মোড়ে। ছাতা নিই নি। ফেরার পথে ভিজলাম বেশ। তখনই দেখলাম গাছটি নেই। সেই গাছটি। যেটি আমার বাবা পুঁতেছিলেন সেই সত্তর সালে! প্রচন্ড হাওয়া সহ বৃষ্টি হচ্ছিল তখন। আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম সেই কেটে নেওয়া গাছটার কাছে।
    একটি কন্যাসমা মেয়ে বললো - ও বাসু কাকু, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছো কেন? ঠাণ্ডা লাগিয়ে জ্বর বাঁধাবে তো? এসো আমার ছাতার নীচে( কত বিশ্বাস করে!! এই আকালেও এক তরুণী নির্দ্বিধায় ছাতার নীচে ডেকে নেয়, তার পিতাসমান এক বৃদ্ধকে ঝড়বাদলের রাতে, প্রায় নির্জন রাস্তায়!!)। বললাম তুই যা।আমি রামের দোকানে যাবো।
    ওকে বলতে পারি নি, আত্মীয়বিয়োগ হয়েছে রে আমার।। আমি কিছুক্ষন এই ফাঁকা হয়ে যাওয়া জায়গাটায় দাঁড়াবো। বাবার পুঁতে যাওয়া গাছটা আর নেই রে। বাবার তো তবু ছবি আছে। গাছটার তো ছবিও তুলে রাখি নি আমি!!

    সম্পূর্ণ ভিজে বাড়ি ফিরেছি কাল...।

    *লেখার পরেই ভাবছিলাম বাবার পোঁতা আরেকটি গাছের ছবি তুলে রাখবো। তারপর মনে হল জারুল আর কৃষ্ণচুড়াও ছবি তুলে রাখি। কে বলতে পারে? একদিন.....
    পরে পড়লাম ঊর্ণাও লিখেছেন ছবি দেওয়ার কথা। বড্ড রোদ্দুর বাইরে। ফুলগুলো দেখা যাচ্ছে না। রোদ্দুর পড়ে এলে আর একবার তুলবো আর একটা ছবি। প্রকৃতির পার্লার ফেরৎ জারুলের ছবি দেখাতে হবে না?? **
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ব্লগ | ২৭ এপ্রিল ২০১৯ | ২৩৮১ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
    আরও পড়ুন
    পত্তাদকাল - %%
    আরও পড়ুন
    বাদামি - %%
    আরও পড়ুন
    বিজাপুর - %%
    আরও পড়ুন
    হামপি - %%
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • বিপ্লব রহমান | unkwn.***.*** | ২৮ এপ্রিল ২০১৯ ০২:২৩48026
  • অসম্ভব মায়াময় একটি লেখা।
  • | unkwn.***.*** | ০৫ মে ২০১৯ ০৮:৪৪48027
  • ভারী নরম সুন্দর।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। মন শক্ত করে মতামত দিন