এই সাইটটি বার পঠিত
ভাটিয়ালি | টইপত্তর | বুলবুলভাজা | হরিদাস পাল | খেরোর খাতা | বই
  • হরিদাস পাল  ধারাবাহিক  বিবিধ

  • মুক্তচিন্তার বিকেন্দ্রীকৃত সামাজিক মাধ্যম : চতুর্থ পর্ব 

    অরিন লেখকের গ্রাহক হোন
    ধারাবাহিক | বিবিধ | ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৪৯ বার পঠিত
  • 1990 থেকে 2007 এর মধ্যে মানুষের তথ্য আদানপ্রদান এবং ভাব বিনিময়ের মাধ্যমের একটি আমূল পরিবর্তন ঘটেছে যাকে রীতিমতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন বলা চলে| সেই পরিবর্তনের ধারা আজ ও অব্যাহত | 1990 এ যখন বার্নার্স লি ওয়েব আবিষ্কার করলেন তখন ওয়েব ছিল প্রকৃত অর্থে উন্মুক্ত এবং সার্বজনীন | আপনাকে কোথাও একাউন্ট সেটআপ করতে হতো না, আপনি একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি মেনে একটি লেখা লিখলে তাকে ওয়েব সার্ভার এ তুলে রাখলে আর তার "ঠিকানা" জানলে তাকে যে কোনো মানুষের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারতেন |

    ওয়েব সৃষ্টি করা হয়েছিল, অন্তত তার স্রষ্টার কথা মেনে নিলে, এমন একটি মাধ্যম যেখানে যে কেউ যা খুশি ছাপতে পারতেন, এবং একবার ছাপার পর তার লিংক যাকে খুশি দিতে পারতেন, এবং যিনি লিংক পেলেন সেই ব্যক্তি একটি কম্পিউটার এর সাহায্যে ইন্টারনেট এক্সেস করতে পারলে সেই লেখা পড়তে পারতেন | এবং শুধু লেখা নয়, গান, কথা, চলমান ছবি, সবকিছুর ক্ষেত্রেই এই ব্যাপারটি বলবৎ ছিল | আপনার কারো অনুমতির প্রয়োজন ছিল না, কোথাও আপনাকে কোন রকম একাউন্ট খুলতে হয়নি, পাতায় একটি নীল রঙের দাগ দেয়া hyperlinked
    বাক্য বা কথা দেখতে পেলে তাকে চিহ্নিত করে আপনি এক পাতা থেকে আরেক পাতায় অনায়াসে বিচরণ করতে পারতেন | মানে সে যুগে ওয়েব ছিল একটি বিশাল মুক্ত লাইব্রেরির মতন, অসংখ্য বই, পাতা মিলেমিশে বিশাল ব্যাপার | জনতা ব্যক্তিগত হোমপেজ তৈরী করতো, ব্লগ লিখত, সে একরকম হট্টমেলার মতন ব্যাপার, কোথাও বিধিনিষেধের ঘেরাটোপ নেই, কেউ কোথাও দেয়াল তুলে দেয়নি |

    তবে তখন অন্য একটি ব্যাপার ছিল, সবাই সর্বত্র চাইলেই যে ওয়েব access করতে পারতেন তেমন নয় | প্রথমত আপনাকে internet কানেকশন নিতে হত, সে এক ব্যাপার, তারপর তখন যে ধরণের সেল ফোন ছিল তাতে ওয়েব দেখা বেশ কষ্টকর, এবং সমাজ মাধ্যমে অংশগ্রহণ তো আরো ব্যয়সাপেক্ষ; ফলে কে ইন্টারনেট access করে ওয়েব এর এই নতুন মাধ্যমে অংশগ্রহণ করবেন আর কে বা কারা করতে পারতেন না, তার একটা মস্ত তারতম্য ছিল | তাছাড়াও ধরুন 2004 থেকে 2007 এর মধ্যে যখন নতুন বৈদ্যুতিন সমাজ মাধ্যম আসছে, তখন মূলত ডেস্কটপ বা ল্যাপটপ কম্পিউটার এ ওয়েব ব্রাউসার এর মাধ্যমেই তাদের নাগাল পেতে হতো, যার জন্য আজকে যত সহজে আমরা স্থির বা চলমান ছবি সমাজ মাধ্যমে তুলে দিতে পারি, তখনকার দিনে ব্যাপারটি তত সহজ ছিল না | ছবির ব্যাপারটাই ভেবে দেখুন না, 2004 পাঁচ সালেও দেখেছি, বেশির ভাগ ফোটোগ্রাফি সমঝদার লোককে আমি অন্তত যে কজনকে চিনতাম, তাঁরা দামি ক্যামেরা বলতে আজকের দিনে যাকে এনালগ ক্যামেরা বলা হয় (এখন আর বিশেষ বিক্রি হতে দেখি না) সেই ধরণের ক্যামেরাকেই বোঝাতেন, ডিজিটাল ক্যামেরা তখন ততটা জনপ্রিয় হয় নি, বাড়বাড়ন্ত দূরস্থান | অতএব সেই ধরণের ক্যামেরা থেকে ছবি তুলে তারপর তাকে ডেভেলপ করার পর স্ক্যান করে ছবি তুলতে হতো; যাঁরা ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার করতেন তাঁদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটি সহজ ছিল না, সেই ক্যামেরা থেকে cable বা SD কার্ড এর মাধ্যমে আরেকটি কম্পিউটার এ ছবি সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেখান থেকে তাঁদের ওয়েবসাইট এ পোস্ট করতে হতো, ব্যাপারটি শুধু সময়সাপেক্ষ ছিল তাই নয়, বেশ কষ্টসাধ্য ও বটে | যে কারণে প্রথম দিককার সমাজ মাধ্যমে মানুষ টেক্সট করে কাজ সারতেন |

    এই সমস্ত ব্যাপার পুরোপুরি বদলে গেল 2007 এর পর থেকে | 2007 এ যখন প্রথম স্মার্টফোন বাজারে এলো, বিশেষ করে iphone এবং তার পরবর্তী android ফোন, সেখানে ক্যামেরা থাকতো, যদিও প্রথম আমলের আইফোনে ক্যামেরা এমন কিছু আহামরি ছিল না দুই মেগাপিক্সেল এর ক্যামেরা আর শুধু এক দিকে ক্যামেরা থাকতো, সেলফি নেওয়া যেত না | Android ফোন গুলোতে প্রথম থেকেই ক্যামেরা থাকত | সে যেমন ই হোক, স্মার্টফোনে বাজারে আসার পর, আর ক্যামেরা মাইক্রোফোন এর সৌজন্যে সমাজ মাধ্যমে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন এল | এবার সমস্যা অন্যত্র | এই যে ওয়েব কে আমরা চিনতাম মুক্ত অবাধ তথ্যের বিচরণভূমি রূপে, তাকে ফেসবুক তো প্রথম থেকেই রুদ্ধ করে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছিল, টুইটার ও কিয়দংশে সেই পথের পথিক, স্মার্টফোনে বিশেষ করে iOS আর Android এসে তাকে আরো কড়া করে আটকানোর বন্দোবস্ত করে দিল, কারণ উভয় তরফেই App Store চালু করলো, যদিও Apple আর Android (তখন Android Market বলা হত, গুগল প্লে Store পরে নামকরণ হবে) এদের দুরকম ব্যাপার ছিল, Apple এর কঠিন প্রহরার বন্দোবস্ত, Android সে তুলনায় অপেক্ষাকৃত উদার | তবে তাতে আর কি? দু তরফেই সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে মুক্ত ওয়েব কে বেঁধে ফেলার ব্যবস্থা হয়েছিল; App সেই আগুনে বিস্তর ঘৃতাহুতি দিয়ে ব্যাপারটিকে পাকাপাকি করে ফেলল |

    ধরুন যতদিন App Store ছিল না, আপনি যা দেখতেন ওয়েব ব্রাউজার দিয়ে দেখতেন | URL বা বার্নার্স লি যাকে URI বলতেন তাই দিয়ে আপনাকে "resource" দেখতে হত | আপনার ব্রাউজার ই ছিল প্রাথমিক | App Store তৈরী হবার পর, সবটাই কারারুদ্ধ হয়ে গেলো আপনার device তার ঘেরাটোপে | তার সঙ্গে যে ব্যাপারটি হল আরো ভয়ঙ্কর, অন্তত কিছু মানুষের ক্ষেত্রে তো বটেই, সমাজ মাধ্যম একটি ওয়েবসাইট থেকে অভ্যেসে রূপান্তরিত হয়ে গেলো, কেমন করে যেন আপনি আগে রীতিমতো কসরত করে সময় বার করে ওয়েবসাইট এ গিয়ে পড়ে আসতেন, সে এখন আপনার বুকপকেটে, প্যান্টের পকেটে হ্যান্ডব্যাগে ; সেলফোনে যেই ঝুমঝুমি বাজতে থাকে, আপনি বের করে দেখতে থাকেন, ঘন্টায় ঘটনায় নোটিফিকেশন এর চক্করে আপনি আটকে গেলেন | বহু বছর আগে একবার বিখ্যাত মার্কিন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী ও দার্শনিক লামা Alan Wallace কথাপ্রসঙ্গে এক আড্ডায় বলেছিলেন Attention বা মানুষের নজর আকর্ষণ করা এখন সাংঘাতিক ব্যবসার উপলক্ষ | কথাটা ফেলবার মতন নয়, এবং সেইটাই কালক্রমে হয়েছে |

    এই যে একটি আদ্যোপান্ত বিকেন্দ্রীকৃত মিডিয়াম কেন্দ্রায়িত হয়ে একটি বা দুটি কোম্পানির কুক্ষিগত হয়ে আপনার যাবতীয় তথ্য বলুন, খবর বলুন, প্রমোদ বলুন, মতামত যা বলুন তার দায়িত্ব নিয়ে আপনাকেই উল্টে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেছে, শুধু আপনাকেই বা কেন, আপনার আমার দেশের সরকারও তার আওতার বাইরে বেরোয় নি, দেশের প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে মন্ত্রক সবাই প্রায় এদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ার আওতায় | যদিও ক্যালিফোর্নিয়ায়, জাপানে, জার্মানিতে বা ইউরোপের অন্যান্য কিছু দেশে ব্যাপারটি ইদানিং অন্যরকম | এ বছরের জানুয়ারী তে প্রকাশিত ডিজিটাল 2026 এর রিপোর্ট ( https://wearesocial.com/uk/blog/2025/10/digital-2026-global-overview-report/)
    দেখলে দেখা যায় যে অক্টোবরের 2025 এর হিসেবে অনুযায়ী প্রায় 570 কোটি মানুষ নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়া দেখেন এবং এদের মধ্যে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া দেখার সংখ্যা লক্ষণীয় (নিচের চিত্রটি দেখলে বোঝা যাবে):
     


    সমস্যাটি কোথায় জানেন? এই বিশাল সংখ্যায় মানুষ যারা ধরুন ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম বা টুইটার এ অংশগ্রহণ করছেন বা করছি, আমাদের পোস্টগুলো কিন্তু ঠিক পৃথিবীর অন্যান্য সকলের সঙ্গে যে আমরা ভাগ করে নিতে পারছি তা কিন্তু নয়, আমরা ভাবছি তাই, কিন্তু আদপে ব্যাপারটা সেরকম নয় | ধরুন আপনি ফেসবুক করেন এবং সদ্য বেড়িয়ে এসে বেড়ানোর ছবি পোস্ট করেছেন, আপনার ফেসবুকের বন্ধুরা প্রশংসা করছেন, এদিকে আপনার এক বন্ধু ফেস বুকে নেই, টুইটার এ আছেন, তাঁকে আপনি আপনার তোলা ছবি দেখতে চান | কিন্তু যেহেতু তাঁর ফেসবুকে একাউন্ট নেই, আপনি ইচ্ছে করলেও ফেসবুক থেকে আপনার বন্ধুকে আপনার বন্ধুকে টুইটার এ দেখতে পারবেন না, কারণ ফেসবুক টুইটার এর সঙ্গে কথা বলে না | ফেসবুকের বন্ধ ঘরে আপনার ছবি রয়ে যাবে | টুইটার ও তাই, সে হয়তো খোলা হাওয়ায় শুরু হয়েছিল, কিন্তু কালক্রমে সেও বন্ধ হয়ে গেছে |

    তো এতে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? একটা উদাহরণ দিয়ে লেখার চেষ্টা করি | মনে করুন আপনি একটি নতুন রকমের ফোন আবিষ্কার করেছেন, এখন আপনাকে যদি বলা হয় মশাই এই রকম ফোন আপনি আবিষ্কার করলেন কি বলে, আপনি কি আপনার ফোন কোম্পানি'র অনুমতি নিয়েছেন? এ তো মহা মুশকিল! বহু বছর পূর্বে একদা কলকাতায় আমি সরকারি ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী (BSNL) এর আপিসে গিয়ে ব্রডব্যান্ড কানেকশন এর জন্য আবেদন করেছিলাম, এবং বেশ কয়েকদিন যাবার পর টেলিফোন আপিসের কাছে ওনাদের অফিস থেকে ওনারা মডেম আর তার ইত্যাদি দিয়ে বললেন যে বাড়িতে নিয়ে রেখে দিন, আমাদের লোক গিয়ে সেট করে আসবে | তো সে লোক আর আসে না দেখে আমি নিজেই modem সেট করে যেই তাঁদের অফিস গিয়ে জানিয়েছি, তাঁদের সে কি রাগ, আমাকে রীতিমতন ধমক দিয়ে বললেন এতো সাহস আমার কি করে হলো যে তাঁদের অনুমতি না নিয়ে নিজের বাড়িতে লাইন সেট করেছি | তাঁদের রাগে যে বিশেষ ক্ষতি হয়েছিল তা নয়, কিন্তু ওই আর কি | এই অনুমতি দেবার ও নেবার ব্যাপারটি একেক সময় এক অবাস্তব বিভীষিকায় পরিণত হয় | এই যে ধরুন ইমেল, বা উইকিপেডিয়া, এ কি কারো অনুমতি সাপেক্ষে কেউ তৈরী করেছে, তাহলে আজকে ফেসবুক বা টুইটার নির্ভর কোনো App যদি আপনি তৈরী করতে মনস্থ করেন আর তাদের যদি আপনার কাজে প্রয়োজন হয়, আপনার ই তথ্য, আপনাকে আবার সেই কোম্পানির কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে! এখন আপনি বলতেই পারেন যে কজন আর App বানায়, কাজেই, আমি মুফতে যদি এদের দৌলতে তথ্য বিনিময় করতে পারি, ক্ষতি কি? তাহলেও এই "মুফত" ঠিক মুক্ত ও নয় | তারপর ধরুন যে তথ্য আপনি এদের ঘরে জমা রাখছেন সেসব কিন্তু এদের কাছে আটকে থাকছে | আপনি সময় করে এদের আওতা থেকে বেরিয়ে যাবার সময় নিয়ে যেতে পারেন, তবে সে কিন্তু বেজায় হ্যাপা | আপনার প্রচুর ছবি ও স্মৃতি, যদি এদের মালিকানা বা হাত বদল হয়, চিরতরে হারিয়েও যেতে পারে, এমনকি সেসবের মালিকানা যে ঠিক কার, তাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠাও বিচিত্র নয় | তারপর এলগোরিদম এর ঝামেলা তো রয়েইছে, আপনি সর্বক্ষণ এদের নজরদারির অন্তর্গত | একটি উদাহরণ | মনে করুন আমি আপনি দার্জিলিং বেড়াতে যাবো, দুজনেই খাবার দোকানের সন্ধান করছি, গুগল দিয়ে, আপনি নির্ঘাত দেখেছেন যে আপনার আর আমার সার্চ রেজাল্ট কিন্তু এক আসবে না, আমাদের ইতিপূর্বে সন্ধান আর হাজারো এক ব্যাপার স্যাপার নিয়ে আমার আপনার সার্চ অন্যরকম হবে |

    এবং তার থেকেও বড় কথা, যে বিষয়টিকে নিয়ে লেখাটি শুরু করেছিলাম, কেন্দ্রায়িত সোশ্যাল মিডিয়া হওয়া মানে খবরদারি | যেমন সরকার যদি না চান, আপনার পোস্ট ফেসবুক বা টুইটার নাও দেখাতে পারে, বা এমন করে সরকারি বা অন্য প্রভাবশালী বাণিজ্যিক অঙ্গুলিহেলনে চলবে যে, আপনাকে প্লাটফর্ম থেকে বিতাড়িত করেও দিতে পারে, এমনকি আপনার সোশ্যাল মিডিয়া বাকস্বাধীনতা খর্ব ও করতে পারে | এবং, ওই একই যুক্তিতে, একজন প্রভাবশালী বা জনপ্রিয় মানুষ যেমন ধরুন একজন ফিল্ম ষ্টার বা রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী র জনপ্রিয়তাকেও যে "নির্মাণ" করা যায়, যারা হালফিল সমাজ মাধ্যম চর্চা করেন, তাদের জানা আছে |
     
    তো সে যাই হোক, এই মানুষকে এভাবে শৃঙ্খলিত করে রাখা যে যায়না, এর বিপ্রতীপে আন্দোলনও গড়ে উঠছে, এবার তাকে নিয়েও আলোচনা করা যাক | আমাদের পুরোনো ওয়েব কে ফিরে পেতে চাই, অন্তত এমন একটি সামাজিক মাধ্যম চাই, যে মাধ্যম ওয়েব এর যে মুক্ত মন ও সার্বজনীনতা, তাকে যেন তুলে ধরতে সক্ষম হয় | আমরা কর্পোরেট ওয়েব এর বাণিজ্যিক খবরদারি চাই না, আমরা চাইনা কোন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান আমার বাক স্বাধীনতা খর্ব করুক, সর্বোপরি, আমরা খাঁচায় আটকে থাকতে চাইনা, আমরা চাই, আমি যে মাধ্যমই ব্যবহার করি না কেন, ওয়েব এর প্রথম প্রতিশ্রুতি, যেকোনো ডকুমেন্ট থেকে যেকোনো ডকুমেন্ট কে দেখতে পাবার স্বাধীনতা তা যেন অক্ষুন্ন থাকে | সে কি সম্ভব?
     
    অবশ্যই! সে শুধু সম্ভব নয়, আজ সেটিই ভবিষ্যতের দিক নির্দেশ করে | এবং সেইখানেই প্রোটোকল এর জিৎ | আজকে তিনটি প্রোটোকল নিয়ে পর্যালোচনা করবো, আপাতত এই পর্ব দীর্ঘায়িত না করে দু একটি প্রাথমিক আলোচনা করি, পরের পর্বগুলোতে এদের নিয়ে আরো বিস্তারিত লেখার ইচ্ছে আছে | এই তিনটি প্রোটোকল এর একটির নাম ActivityPub, একটির নাম AT প্রোটোকল, আর অপরটির নাম Nostr | ActivityPub দিয়ে শুরু করা যাক |

    আবার সেই টিম বার্নার্স লি, ওয়েব আবিষ্কার করার বছর চারেকের মাথায় 1994 সালে বার্নার্স লি উপলব্ধি করেছিলেন যে ওয়েব এর ভবিষ্যৎ, তাকে যদি বেঁচে থাকতে হয়, তাকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইতস্তত বিক্ষিপ্ত দ্বীপের আকারে নয়, বরং মুক্ত, সার্বজনীন একটি বৃহৎ আকারকে যদি রূপ দিতে হবে | সেই অভিপ্রায়ই, রূপ দেবার জন্যই MIT, এবং Michael Dertouzos এর নেতৃত্বে বার্নার্স-লি একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুললেন, তার নাম দিলেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব কনসোর্টিয়াম, সংক্ষেপে W3C |
     
    2010 এবং সেই দশকের গোড়ার দিকে ফেসবুক টুইটার বাদ দিলেও বেশ কয়েকটি অন্তর্জাল নির্ভর সমাজ মাধ্যম গড়ে উঠছিলো তবে সবকটাই সেই একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতন | এবং কেন্দ্রীভূত সামাজিক মাধ্যমের বিপ্রতীপে একটি বিকেন্দ্রীকৃত সামাজিক মাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা বোঝাও যাচ্ছিলো | Christine Lemmer-Webber (https://buttondown.com/blog/what-is-activitypub ) 2018 সালে এটির নেতৃত্ব দেন | ActivityPub নিয়ে পরে বিশদে লেখা যাবে, খুব সংক্ষেপে একে একটি ভাষার মতো মনে করুন, যেখানে মনে করুন বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম সফটওয়্যার একই "ভাষায়" কথা বলছে, অতএব আপনার যেখানেই একাউন্ট থাকুক না কেন, এক এপ্লিকেশন এর পোস্ট আপনি অন্য এপ্লিকেশন থেকে দেখতে পাবেন, যেমন ধরুন আপনার যদি Mastodon নাম দিয়ে একটি সামাজিক মাধ্যমে একাউন্ট থাকে, আর আপনার বন্ধুর ধরুন Pixelfed নামে ঐরকম একটি সামাজিক মাধ্যমে ছবি পোস্ট করেছেন, আপনি আপনার বন্ধুর pixelfed একাউন্ট কে আপনার Mastodon একাউন্ট থেকে ফলো করতে পারবেন ও সেই ছবিকে আপনার "দেয়ালে" দেখতে পাবেন, যেন আপনার বন্ধু ও আপনার মতোই Mastodon সামাজিক মাধ্যমেই রয়েছেন ও তাঁর পোস্ট শেয়ার করছেন | মানে এই ধরণের সামাজিক মাধ্যমে এই যে ফেসবুক বনাম টুইটার এর নিজেদের মধ্যেকার বেড়া তুলে রাখা, তাকে ভেঙে ফেলা গেল |
     
    অনেকটা পোস্ট অফিস এর মতন | যখন প্রথম প্রথম আন্তর্জাতিক ভাবে চিঠি পাঠানোর কথা ভাবা হচ্ছিলো, এই ধরণের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বৈকি | ইউনাইটেড পোস্টাল ইউনিয়ন (এক সময়ে 1874 সালে জেনারেল পোস্টাল ইউনিয়ন নাম দিয়ে প্রতিষ্ঠিত) পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার 71 বছর আগে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটির কাজ ছিল যাতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে চিঠি পত্র সুষ্ঠুভাবে পৌঁছতে পারে তাকে সুনিশ্চিত করা | অনেকটা একই রকম ভাবে, চিঠি পাঠানোর মতো করেই ActivityPub এবং তার সূত্রে Fediverse এর কথা ভাবা হয়েছিল |
     
    কিন্তু এক্ষেত্রেও একটি সমস্যা রয়ে গেলো, যে আপনাকে ফেডিভর্স এর একেকটি ইনস্ট্যান্স এ একাউন্ট খুলে কাজ করতে হবে | যদিও প্লাটফর্ম এর স্তরের যে সমস্যাটি নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম, তার নিরসন করা গেলো, এখন আরেকটি বিষয় ভাববার, যে, আমি যদি একটিমাত্র একাউন্ট ই খুলে রাখি, এবং সেটিকে সর্বত্র ব্যবহার করি, তাহলে কেমন হয়? যেমন আমার মোবাইল ফোন নম্বর, আমি ধরুন Carrier পরিবর্তন করলাম, আমার পুরোনো নম্বর যেমন তেমন ই রইলো, অথচ নতুন সার্ভিস পেতে অসুবিধে হলো না | বা সামাজিক মাধ্যমের ক্ষেত্রে ধরুন কেউ ফেসবুক থেকে টুইটার এ চলে এলো, সে যে কেবল টুইটার থেকে ফেসবুক এর সব পোস্ট দেখতে পাবে তাই নয়, তার পুরোনো যে ইউসার নাম, (ব্যবহারকারী নাম ), এক ই থেকে গেলো | এই ব্যাপারটি সুনিশ্চিত করলো আরেকটি প্রোটোকল, তার নাম AT প্রোটোকল | একে নিয়ে এর পরের বার |
     
    (চলবে )

     
    পুনঃপ্রকাশ সম্পর্কিত নীতিঃ এই লেখাটি ছাপা, ডিজিটাল, দৃশ্য, শ্রাব্য, বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আংশিক বা সম্পূর্ণ ভাবে প্রতিলিপিকরণ বা অন্যত্র প্রকাশের জন্য গুরুচণ্ডা৯র অনুমতি বাধ্যতামূলক। লেখক চাইলে অন্যত্র প্রকাশ করতে পারেন, সেক্ষেত্রে গুরুচণ্ডা৯র উল্লেখ প্রত্যাশিত।
  • ধারাবাহিক | ১৭ আগস্ট ২০২৬ | ১৪৯ বার পঠিত
  • আরও পড়ুন
    মাংস - অরিন
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • পাঠক | ১৭ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৩৬742294
  • অরিন বিচ্ছিন্ন ভাবে সম্পর্কিত কিছু কথা বহুদিন ধরে বলে চলেছেন, উনি আপত্তি করা সত্ত্বেও বেশির ভাগ সময়েই সেগুলি impractical লেগেছে। তবু কথাগুলো ফেলে দেওয়া যাচ্ছিল না, অথচ সেসবের পেছনে দেবার মত সময়ও নেই, প্রধানতঃ কোথা থেকে শুরু করা উচিত - এই ভেবে। সে সমস্যা ​​​​​​​দূর ​​​​​​​হল।
    অন্য কারোর কথা জানিনা, তবে আমার জন্যে এই লেখাটা দারুণ উপকারী হচ্ছে - এটুকু বলতে পরি।
  • অরিন | ১৮ আগস্ট ২০২৬ ০২:০১742296
  • পাঠক, আমার একান্ত শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ গ্রহণ করবেন। আপনার মন্তব‍্য যে এই কথাগুলো, কোথায় শুরু করব, আপনার কাজে লাগছে, জেনে যারপরনাই আনন্দিত বোধ করলাম।
  • মতামত দিন
  • বিষয়বস্তু*:
  • কি, কেন, ইত্যাদি
  • বাজার অর্থনীতির ধরাবাঁধা খাদ্য-খাদক সম্পর্কের বাইরে বেরিয়ে এসে এমন এক আস্তানা বানাব আমরা, যেখানে ক্রমশ: মুছে যাবে লেখক ও পাঠকের বিস্তীর্ণ ব্যবধান। পাঠকই লেখক হবে, মিডিয়ার জগতে থাকবেনা কোন ব্যকরণশিক্ষক, ক্লাসরুমে থাকবেনা মিডিয়ার মাস্টারমশাইয়ের জন্য কোন বিশেষ প্ল্যাটফর্ম। এসব আদৌ হবে কিনা, গুরুচণ্ডালি টিকবে কিনা, সে পরের কথা, কিন্তু দু পা ফেলে দেখতে দোষ কী? ... আরও ...
  • আমাদের কথা
  • আপনি কি কম্পিউটার স্যাভি? সারাদিন মেশিনের সামনে বসে থেকে আপনার ঘাড়ে পিঠে কি স্পন্ডেলাইটিস আর চোখে পুরু অ্যান্টিগ্লেয়ার হাইপাওয়ার চশমা? এন্টার মেরে মেরে ডান হাতের কড়ি আঙুলে কি কড়া পড়ে গেছে? আপনি কি অন্তর্জালের গোলকধাঁধায় পথ হারাইয়াছেন? সাইট থেকে সাইটান্তরে বাঁদরলাফ দিয়ে দিয়ে আপনি কি ক্লান্ত? বিরাট অঙ্কের টেলিফোন বিল কি জীবন থেকে সব সুখ কেড়ে নিচ্ছে? আপনার দুশ্‌চিন্তার দিন শেষ হল। ... আরও ...
  • বুলবুলভাজা
  • এ হল ক্ষমতাহীনের মিডিয়া। গাঁয়ে মানেনা আপনি মোড়ল যখন নিজের ঢাক নিজে পেটায়, তখন তাকেই বলে হরিদাস পালের বুলবুলভাজা। পড়তে থাকুন রোজরোজ। দু-পয়সা দিতে পারেন আপনিও, কারণ ক্ষমতাহীন মানেই অক্ষম নয়। বুলবুলভাজায় বাছাই করা সম্পাদিত লেখা প্রকাশিত হয়। এখানে লেখা দিতে হলে লেখাটি ইমেইল করুন, বা, গুরুচন্ডা৯ ব্লগ (হরিদাস পাল) বা অন্য কোথাও লেখা থাকলে সেই ওয়েব ঠিকানা পাঠান (ইমেইল ঠিকানা পাতার নীচে আছে), অনুমোদিত এবং সম্পাদিত হলে লেখা এখানে প্রকাশিত হবে। ... আরও ...
  • হরিদাস পালেরা
  • এটি একটি খোলা পাতা, যাকে আমরা ব্লগ বলে থাকি। গুরুচন্ডালির সম্পাদকমন্ডলীর হস্তক্ষেপ ছাড়াই, স্বীকৃত ব্যবহারকারীরা এখানে নিজের লেখা লিখতে পারেন। সেটি গুরুচন্ডালি সাইটে দেখা যাবে। খুলে ফেলুন আপনার নিজের বাংলা ব্লগ, হয়ে উঠুন একমেবাদ্বিতীয়ম হরিদাস পাল, এ সুযোগ পাবেন না আর, দেখে যান নিজের চোখে...... আরও ...
  • টইপত্তর
  • নতুন কোনো বই পড়ছেন? সদ্য দেখা কোনো সিনেমা নিয়ে আলোচনার জায়গা খুঁজছেন? নতুন কোনো অ্যালবাম কানে লেগে আছে এখনও? সবাইকে জানান। এখনই। ভালো লাগলে হাত খুলে প্রশংসা করুন। খারাপ লাগলে চুটিয়ে গাল দিন। জ্ঞানের কথা বলার হলে গুরুগম্ভীর প্রবন্ধ ফাঁদুন। হাসুন কাঁদুন তক্কো করুন। স্রেফ এই কারণেই এই সাইটে আছে আমাদের বিভাগ টইপত্তর। ... আরও ...
  • ভাটিয়া৯
  • যে যা খুশি লিখবেন৷ লিখবেন এবং পোস্ট করবেন৷ তৎক্ষণাৎ তা উঠে যাবে এই পাতায়৷ এখানে এডিটিং এর রক্তচক্ষু নেই, সেন্সরশিপের ঝামেলা নেই৷ এখানে কোনো ভান নেই, সাজিয়ে গুছিয়ে লেখা তৈরি করার কোনো ঝকমারি নেই৷ সাজানো বাগান নয়, আসুন তৈরি করি ফুল ফল ও বুনো আগাছায় ভরে থাকা এক নিজস্ব চারণভূমি৷ আসুন, গড়ে তুলি এক আড়ালহীন কমিউনিটি ... আরও ...
গুরুচণ্ডা৯-র সম্পাদিত বিভাগের যে কোনো লেখা অথবা লেখার অংশবিশেষ অন্যত্র প্রকাশ করার আগে গুরুচণ্ডা৯-র লিখিত অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। অসম্পাদিত বিভাগের লেখা প্রকাশের সময় গুরুতে প্রকাশের উল্লেখ আমরা পারস্পরিক সৌজন্যের প্রকাশ হিসেবে অনুরোধ করি। যোগাযোগ করুন, লেখা পাঠান এই ঠিকানায় : guruchandali@gmail.com ।


মে ১৩, ২০১৪ থেকে সাইটটি বার পঠিত
পড়েই ক্ষান্ত দেবেন না। ঠিক অথবা ভুল মতামত দিন