একদা একটি টিভি চ্যানেলে 'আমার রবীন্দ্রনাথ' নামে একটি টক্ শো সম্প্রচারিত হত। সেই অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরা অতিথি হয়ে সেখানে আসতেন। অপর্ণা সেন, সুধীর চক্রবর্তী, জয় গোস্বামী, কালিকাপ্রসাদ ভট্টাচার্য, চন্দ্রিল ভট্টাচার্য ও আরো অনেকের মতো একটি এপিসোডে অতিথি হয়ে এলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ।
সঞ্চালক কতকগুলো চিরপরিচিত প্রশ্ন করতেন, যেমন— আপনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় হয় কী ভাবে? কেমন করে সুখে-দুঃখে তাঁকে পেয়ে থাকেন? ইত্যাদি। দর্শকের মন বলবে অতিথিরা নিজেদের মতো করে বলে গেলে খুব ভালো হয়, কারণ ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ এখানে অতিথির। এক্ষেত্রে বলে রাখি জয় গোস্বামী আর চন্দ্রিল ভট্টাচার্য বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে তাঁদের নিজস্ব স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে নিজেদের রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে শেষপর্যন্ত বলতে পেরেছিলেন।
এই 'আমার রবীন্দ্রনাথ' অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসাহিত্য-নির্ভর-ছবি সম্পর্কে ঋতুপর্ণ ঘোষের অবজারভেশানগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেগুলো সাজালে মোটামুটি এরকম দাঁড়ায়— ক. চলচ্চিত্রকারদের কাছে রবীন্দ্রনাথ আখ্যানে আটকে আছেন। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথের গল্প-আশ্রিত ছবি যেগুলো আমরা দেখি সেগুলির মধ্যে কোনোটাই তাঁর খুব রাবীন্দ্রিক লাগে না। 'চারুলতা' ছবিটা তাঁর খুব প্রিয় কিন্তু ছবিটাকে তিনি রাবীন্দ্রিক বলে মনে করেন না। 'নষ্টনীড়' আর 'চারুলতা' আলাদা ভাবে তাঁর খুব ভালো লাগে কিন্তু 'চারুলতা'কে রবীন্দ্রগল্পের চিত্রায়ণ হিসেবে ততটা ভালো লাগে না। 'তিনকন্যা' দেখে তাঁর মনে হয় 'পোস্টমাস্টার' খুব সহজেই বিভূতিভূষণের ছোটোগল্প হতে পারে, 'মনিহারা' ত্রৈলোক্যনাথের একটা গল্প আর 'সমাপ্তি' প্রভাতকুমারের। নিজের বানানো 'নৌকাডুবি' যে-কোনো সময় শরৎচন্দ্রের গল্প হতে পারে! খ. তিনি রবীন্দ্রনাথকে সিনেমায় খুঁজে পান কুরোসাওয়ারর 'র্যান' দেখে। অন্ধ তোসুরুমারু একাকী হেঁটে যাচ্ছে ধ্বংসপ্রাপ্ত দুর্গের ল্যান্ডস্কেপের উপরে দিয়ে, ঠিক খাদের ধারে এসে তার হাত থেকে পড়ে যায় একটি থানকা। আমরা, দর্শকরা, দেখি থানকায় আমিদা বুদ্ধের ছবি আঁকা যেটি তার দিদি সু তাকে দিয়ে অপেক্ষায় থাকতে বলেছিল। দর্শক একটু আগেই জেনে গেছে তার দিদি সু আর ফিরবে না। ক্যামেরা দূর থেকে দেখতে থাকে, ছবি শেষ হয়। এই দৃশ্যকল্পনাটাই তাঁর মনে হয় রাবীন্দ্রিক। গ. পিটার ব্রুকের 'মহাভারত'-এ যখন গান্ধারী ধৃতরাষ্ট্রের কাছে যাচ্ছে প্রথম সাক্ষাতের জন্য তখন 'ধীরে বন্ধু ধীরে ধীরে' গানের ব্যবহারটাই তাঁর কাছে রাবীন্দ্রিক মনে হয়। এই গান হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের 'ফাল্গুনি' নাটকে অন্ধ বাউলের গান। এই বাউল জন্মান্ধ ছিল না। সে যখন অন্ধ হলো তখন 'অন্ধকারের বুকের মধ্যে আলো' দেখতে পেতো, অন্ধকারকে তার আর ভয় লাগতো না। সে গান গাইতে গাইতে যায় আর বলে 'আমার গান আমাকে ছাড়িয়ে যায়— সে এগিয়ে চলে, আমি পিছনে চলি'। ঘ. তিনি মনে করেন তাঁদের মতো যাঁরা রিয়েলিস্টিক সিনেমা বানান তাঁদের পক্ষে রবীন্দ্রনাথের সাবলাইমটা টাচ্ করা মুশকিল। ওই যে সাবলাইমের মধ্যে অ্যাবস্ট্রাকসান আছে, ওই অ্যাবস্ট্রাকসান তো তাঁদের অ্যালাও করতে হবে। রিয়েলিজম-ভিত্তিক সিনেমাতে রবীন্দ্রনাথকে আহ্বান করা যায় না। সেটার মধ্যে ওই স্পেস নেই। ঙ. রবীন্দ্রনাথের আখ্যানের সংলাপ সরাসরি ছবিতে ব্যবহার প্রসঙ্গে তিনি বলেন— বাংলা ছবি বিবর্তনের মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে অ্যাকোমোডেট করার মতো জায়গায় পৌঁছায়নি। এখনো বাংলা ছবি অনেক নাবালক। তাঁর মনে হয় যদি 'রক্তকরবী' ও 'চারঅধ্যায়'-এর ক্ষেত্রে শম্ভু মিত্র রবীন্দ্রনাথের সংলাপ একেবারে অবিকৃত রেখে মঞ্চে উপভোগ্য নাটক করতে পারেন তাহলে কেন ছবিতে হতে পারে না! এই দোষটা দর্শকের উপর চাপিয়ে লাভ নেই। এটা যাঁরা ছবি বানায় তাঁদের দুর্বলতা, অ্যাক্টরদের দুর্বলতা। অ্যাক্টরদের মধ্যে ভাষাটাকে হ্যান্ডল্ করার মতো সজাগ প্রয়াস নেই। তাহলে শুধুই সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে তাঁদের ছবি করে যেতে হবে। রবীন্দ্রনাথকে ধরতে গেলে বোধহয় রবীন্দ্রনাথের কথা ছাড়া ধরা যাবে না। চ. রবীন্দ্রনাথের কথার সূত্রে তাঁর কাছে একটি রাবীন্দ্রিক স্মৃতি হচ্ছে সত্যজিৎ রায়ের 'ঘরে বাইরে'র প্রারম্ভিক দৃশ্য।
কী আছে সত্যজিৎ রায় পরিচালিত 'ঘরে বাইরে' ছবির প্রারম্ভিক দৃশ্যে? সেখানে দেখব আগুনের ব্যাকড্রপ, তার'পর পরিচয়লিপি যাচ্ছে, সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক কিছু পরে বন্দেমাতরম্ ধ্বনি। উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর 'মিউজিক অব সত্যজিৎ রে' নামক তথ্যচিত্রের সৌজন্যে এই মিউজিকটির মেকিং-ও আমাদের সকলের পরিচিত। পরিচয়লিপি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখি দূরে সরে গেছে আগুন আর শুরু হচ্ছে বিমলার ভয়েস-ওভার— “আমি আগুনের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি— যা পোড়বার তা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা বাকি আছে তার আর মরণ নেই। সেই-আমি আপনাকে নিবেদন করে দিলুম তাঁর পায়ে যিনি আমার সকল অপরাধকে তাঁর গভীর বেদনার মধ্যে গ্রহণ করেছেন।...” ক্যামেরা প্যান করে বিমলার উপর আসে। এই ভয়েস-ওভার চলতে থাকে দৃশ্য বদলাতে থাকে। এই ভয়েস-ওভারের মাধ্যমে বিমলা তার স্বামী, জা, রঙিন শার্শি দেওয়া বারান্দা, শ্বশুরবাড়ির ঘর আর বাইরেটার পরিচয় ঘটাচ্ছে দর্শকদের সঙ্গে। এটি চলবে তার গানের শিক্ষক মিস্ গিলবির দৃশ্যমান হওয়া পর্যন্ত। ভয়েস-ওভার শেষ, গান শেখা শুরু।
ঋতুপর্ণ ঘোষ বললেন যে “আমি আগুনের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছি— যা পোড়বার তা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, যা বাকি আছে তার আর মরণ নেই।”— এই লাইনটি 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসে নেই। সত্যজিৎ রায়ের নিজের রচনা। তিনি উপন্যাসে কোথাও খুঁজে পাননি। ঋতুপর্ণ ঘোষের নিজের কথায়— "আমি যখন ছবিটা দেখি, আমি ভীষণ অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যে এতো ইম্পর্ট্যান্ট একটা লাইন আমি মিস্ করে গেছি! আমি পাইনি! আমি আবার 'ঘরে বাইরে' পড়তে লাগলাম, দেখলাম লাইনটা নেই। তখন আমি বুঝলাম লাইনটা সত্যজিৎ রায়ের বানানো।… ওই জায়গাটা খাঁটি রাবীন্দ্রিক মনে হয়।" কিন্তু এই লাইন দু'টি পাওয়া যাবে 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসে বিমলার শেষ আত্মকথায়। এটি উপন্যাসেরও শেষ আত্মকথা। 'ঘরে বাইরে' উপন্যাস মোট আঠারোটি আত্মকথার সমাহার। আত্মকথাগুলি হচ্ছে বিমলা, নিখিলেশ আর সন্দীপের। এর মধ্যে সাতটি আত্মকথা বিমলার। উপন্যাস শুরু হয় বিমলার আত্মকথা দিয়ে আবার শেষও। মজার কথা কেবলমাত্র ওই দু'টি লাইনই উপন্যাসে আছে বাকিটা সত্যজিৎ রায়ের বানানো। ভয়েস-ওভারে সত্যজিৎ রায়ের নিজস্ব সংযোজনটুকু হল— "আজ জানি, তাঁর মত মানুষ হয় না। এই মানুষটিকে আমি প্রথম দেখি আজ থেকে দশ বছর আগে। তিনি ছিলেন রাজপরিবারের সন্তান। আর আমি এলাম সেই পরিবারের বউ হয়ে। আগেই শুনেছিলাম যিনি আমার স্বামী হবেন তিনি সংযমী পুরুষ। শুনে নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে হয়েছিল। আমার বড় জা-কে এসে ওব্দি থান পড়েই দেখেছি। বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও আমি জানি আমার বড় জা বিবাহিত জীবনে কোন সুখ পাননি। আমাদের দুজনের স্থান ছিল রাজবাড়ির অন্তঃপুরে। অন্দর আর বাইরের মধ্যে ছিল রঙিন শার্শি দিয়ে ঘেরা বারান্দা। এই বারান্দার দরজা আমাদের বন্ধই থাকতো। তাতে আমার কোনো খেদ ছিল না। কারণ আমার মনটা ছিল সাবেকি সুরে বাঁধা। আমার স্বামী কিন্তু ছিলেন এযুগের মানুষ। এ বংশে তিনিই প্রথম এম.এ. পাশ করেন। তাঁর শখ মেটাতেই মিস্ গিলবি এলেন আমাকে মেমসাহেব বানাতে।" স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের কন্ঠে ওই ভয়েস-ওভার অমলিন হয়ে থাকে তাঁর পজ্ নেওয়া-সহ।
উপন্যাসে বিমলার শেষ আত্মকথায় লেখা লাইন দু'টির পরে সত্যজিৎ রায়ের বিমলা বলছে "আজ জানি, তাঁর মত মানুষ হয় না। এই মানুষটিকে আমি প্রথম দেখি আজ থেকে দশ বছর আগে।" শুরুতেই দশ বছর আগের কথা বলছেন কারণ সত্যজিৎ রায় ছবির শুরুতে ক্যামেরায় বিমলার যে মুখটি দেখান ওটা আসলে ছবি শেষ হবার আগে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো বিমলার বিধ্বস্ত মুখ। এর কিছু আগে বিমলা জানালা দিয়ে দেখে দাঙ্গা পরিস্থিতিতে আসন্ন বিপদের মধ্যে নিখিলেশ ঘোড়া ছুটিয়ে বেরিয়ে গেল, অনুনয় করেও সে-রাতে নিখিলেশের যাওয়াটা সে আটকাতে পারেনি। একই জায়গায় পরের শট্ সাদা থান পড়া বিমলার মুখ। যেমনটি তার বড় জা-কে এবাড়ি আসা থেকে সে দেখে এসেছে, যেটাকে সে শাস্তি বলে মনে করল। এখানে ছবি শেষ। অবশ্যই এই দু'টি লাইন উপন্যাসের ঘটনাকালের শেষে বিমলার উপলব্ধি যা একেবারেই শেষে পাওয়া যাবে। তাই ভয়েস-ওভারের বাকি অংশ ছবির চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় ঘটানোর জন্য প্রাথমিক বর্ণনাটুকু উপন্যাসে বিমলার আত্মকথা অংশের নির্মেদ সারাংশ করেছেন সত্যজিৎ রায়। এক কথায় পুরো ছবিটাই ফ্ল্যাশব্যাক। কারণ ভয়েস-ওভারের শুরুতে যে-আগুনের শট্ দেখি ওটাই দাঙ্গার আগুনের শট্। একই দৃশ্য। এটাই কি বলতে চাওয়া হয় যে, উগ্র জাতীয়তাবাদের আগুনই দাঙ্গার আগুনের কারণ! উপন্যাসের ঘটনাকালের শেষে বিমলার উপলব্ধি ছবির শুরুতে বেশ মানানসই হয় যেহেতু ছবিটি ফ্ল্যাশব্যাক। কিন্তু ছবির শেষটা! 'চোখের বালি'র শেষটা নিয়ে না হয় রবীন্দ্রনাথ অনুতপ্ত ছিলেন কিন্তু 'ঘরে বাইরে'র শেষটা নিয়ে তাঁর কোনো আক্ষেপ ছিল বলে জানা যায় না।
যে মহাকাব্যিক ব্যাপ্তি ঋতুপর্ণ রবীন্দ্রনাথের আখ্যান-নির্ভর ছবিতে খুঁজে পাননি, তা আকিরা কুরোসাওয়ার 'র্যান' আর পিটার ব্রুকের 'মহাভারত'-এর মধ্যে খুঁজে নেন। এজন্যই বুঝি 'চোখের বালি', 'নৌকাডুবি' পেরিয়ে একদিন 'চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইস্' তৈরি হবে! হয়তোবা এভাবেই 'জীবনস্মৃতি: সিলেক্টেড মেমোরিজ'কে একটি স্মার্ট, ইন্টেলিজেন্ট ছবিমাত্র না করে তাঁর মনের কাছাকাছি করবেন!
ভিডিওটা থাক এস এ রেফারেন্স -